কেমন ছিল যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউক্রেন? তার দ্রষ্টব্য জায়গাগুলি ফিরে দেখা...

১৯৯১ এ যেদিন পৃথিবীর আপামর কমিউনিস্টদের হৃদয়বিদ্ধ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হল সেদিনই নতুন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় ইউক্রেন। বয়সের হিসেবে ধরলে ইউক্রেনের এখন সদ্য ৩০। সেই ইউক্রেনই এখন যুদ্ধের কবলে। প্রতিমুহূর্তে সেই দেশ এখন নিজের অস্তিত্ব তিকিয়ে রাখতে লড়ে যাচ্ছে অসীম শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে। এক্ষেত্রে ইউক্রেনের মনোভাব যেন ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী’। সেনাবাহিনীর মনোবল বাড়াতে মাঠে নেমেছেন স্বয়ং ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট।

চারদিনের যুদ্ধে যা ক্ষয়ক্ষতি তা অঙ্কের নিরিখে বিশাল। ইউক্রেনের রাজধানী কিভ দখলের পথে রাশিয়া। ভেঙে পড়ছে শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্য। ইতিমধ্যেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০০ র বেশি মানুষ। কিভের আকাশে আছড়ে পড়েছে ১৬০ টির ও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র। আজ ইউক্রেনের আকাশে বাতাসে বারুদের গন্ধ, গোলাগুলির শব্দ। চতুর্দিকে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু কেমন ছিল যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইউক্রেন?

রাশিয়াকে বাদ দিলে ইউরোপের মধ্যে আয়তনের হিসেবে সবচেয়ে বড় হল ইউক্রেন। মোট আয়তন ৬০৩. ৬২৮ বর্গ কিলোমিটার। এই বিশাল আয়তন থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যা অনেকটাই কম। মাত্র পাঁচ কোটি মানুষ বাস করেন এখানে।

আবার শিক্ষিত মানুষের পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে ইউক্রেন রয়েছে একেবারে প্রথম সারিতে। এদেশের প্রায় ১০০ শতাংশ মানুষই শিক্ষিত। ১৫ বছরের বেশি বয়সী প্রায় সকলেই লিখতে পড়তে পারে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ও ইউক্রনে খুবই উন্নত পরিকাঠামো রয়েছে। রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়।

আবার ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছেও ইউক্রেন অন্যতম সেরা গন্তব্য। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম খরচে ঘুরে আসা যায় ইউক্রেন। সেরা দ্রষ্টব্যগুলির মধ্যে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীন দুর্গ এবং একাধিক ঐতিহাসিক গির্জা। আবার ইউক্রেন রাশিয়ার সীমানায় রয়েছে কারপাথিয়ান পর্বতমালা যা হাইকিং, ট্রেকিং এর স্বর্গরাজ্য। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রয়েছে সেন্ট সোফিয়া ক্যাথিড্রাল এবং ব্রড বুলেভারডের মত স্থাপত্য। এছাড়া ও পর্যটকদের কাছে ওদেসা শহর ও লভিভ শহর ও অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ইউক্রেনে ইউনেস্কো স্বীকৃত হেরিটেজ সাইট ছয়টি। আসুন সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক ইউক্রেনের হেরিটেজ স্থাপত্যগুলি।

 

সেন্ট সোফিয়া ক্যাথিড্রাল এবং কিভ পারচেস্ক লাভরা

একাদশ শতাব্দীর শুরুতে নির্মিত এই চার্চ পৃথিবীর অন্যতম সেরা মোজাইক এবং ফ্রেস্কোর নিদর্শন। আবার কিভ শহরে অবস্থিত পারচেস্ক লাভরা ইউক্রেনের শিল্প স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। ১০৫১ সালে এন্টনি এবং থিওডোসিয়াস নামের দুই পাদ্রী এই স্থাপত্যটি তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানই হয়ে ওঠে খ্রিস্ট ধর্ম চর্চার অন্যতম আঁতুড়ঘর।

লভিভের ঐতিহাসিক স্মারক

এই লভিভ শহরের প্রায় গোটা অংশটাই ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে পড়ে। গোটা শহর জুড়ে অসংখ্য বিখ্যাত স্থাপত্য রয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত টাউন হল, রাইনক স্কোয়ার, ব্ল্যাক হাউজ, পাউডার টাওয়ার, সেন্ট জর্জ ক্যাথিড্রাল সবই ইতিহাসের অংশ হিসেবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই শহরে।

স্ত্রুভ জিওডেটিক আর্ক

বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের এক অদ্ভুত মিশেল এই স্ত্রুভ আর্ক। গোটা নির্মাণটি  ২৫৮ টি ত্রিভুজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি প্রায় ২৮২০ মিটার দীর্ঘ।

ভার্জিন বিচ ফরেস্ট

কারপেথিয়ান পর্বতমালার বুক জুড়ে এই ঘন অরণ্য অবস্থিত। প্রায় ১৫ টি দেশ জুড়ে ৭৮ টি জঙ্গল যার প্রায় ১২ টি ইউক্রেনের সীমানার মধ্যে অবস্থিত। এই জঙ্গল পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। হাইকিং থেকে শুরু করে জঙ্গল ভ্রমণ সব মিলিয়ে এই বিচ ফরেস্ট ভ্রমণপিপাসুদের কাছে স্বর্গরাজ্য।

রেসিডেন্স অফ বুকোভিনিয়ান অ্যান্ড ডালমেশিয়ান মেট্রোপলিটানস

মধ্যযুগীয় এক দুর্গের ভিতর শতাব্দী প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। এই পরিবেশেই এখানে চলে পঠনপাঠন। শীতকালে তুষারপাতের পর এখানে এলে আপনার মনে হতেই পারে কোনও তুষারাবৃত প্রাচীন রাজত্বে চলে এসেছেন।

 

 কারপেথিয়ান অঞ্চলের চার্চ

পোল্যান্ড ও ইউক্রেন মিলিয়ে প্রায় ১৬ টি কাঠের চার্চ আছে যেগুলি ২০১১ সালে ইউনেস্কো হেরিটেজের তকমা পায়। এর মধ্যে আটটি চার্চ ইউক্রেনে অবস্থিত। মূলত চারটি স্থাপত্য শৈলী মেনে এই চার্চগুলি নির্মাণ করা হয়। এই চার্চগুলিতে রয়েছে এমন সব কাঠের কাজ যা বর্তমানে নতুন করে বানানো সম্ভব নয়।

এসব স্থাপত্য ছাড়া ও ইউক্রেন আরও নানান বৈচিত্র্যে ভরা। বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা সঙ্গীত যন্ত্র ব্যবহার হয় ইউক্রেনে। নাম ট্রেমবিটা। একে ইউক্রেনের জাতীয় বাদ্য বলা যেতে পারে। এছাড়া ও বিশ্বের গভীরতম পাতাল রেলস্টেশনটি ও রয়েছে ইউক্রেনে।

কিন্তু এই এতসব স্থাপত্য, বৈচিত্র্যের পরিণতি কী? যুদ্ধ যেভাবে ইউক্রেনকে গ্রাস করতে শুরু করেছে তাতে এই নিদর্শন ভেঙে পড়া কি সময়ের অপেক্ষা? সিরিয়া যেভাবে তার শরীরে গৃহযুদ্ধের ক্ষতচিহ্নকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেনের পরিণতিও কি তাই? প্রশ্ন অনেক কিন্তু উত্তরগুলো অজানা।

 

 

More Articles

;