নোট বাতিলের ৫ বছর : নরেন্দ্র মোদির তুঘলকী সিদ্ধান্তে লাভ কি আদৌ হলো?

By: Sourish Das

November 11, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর, আপামর ভারতবাসীর কাছে এই তারিখটি একেবারে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই দিনকেই রাত ৮টায় লাইভ এসে একটা বিশাল বড় ঘোষণা করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। ডিমনিটাইজেশন, বা সহজ ভাষায় বলতে গেলে নোট বন্দি, যা ওইদিন সমগ্র ভারতবাসীকে একেবারে নড়িয়ে দিয়েছিল। রাত্রি ৮টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মিস্টার মোদী জানিয়েছিলেন, দুর্নীতি আর কালো টাকার কবল থেকে মুক্ত হতে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঐদিন মাঝ রাত থেকেই বাতিল হয়ে যাবে সমস্ত ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট। মোদি ভক্তদের দল বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এই পদক্ষেপটিকে মাস্টার স্ট্রোক বলার জন্য রীতিমতো হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু, আদৌ কি এই নোটবন্দির সুফল পেলো মানুষ? বন্ধ হলো কালো টাকা? 

নোট বাতিলের ঘোষণার পরদিন থেকেই সমস্যায় নাজেহাল ভারতবাসীর কপালে আরও একটা নতুন সমস্যা যোগ হলো। এতদিন পর্যন্ত যে সমস্ত নোট দিয়ে বাজার হাট থেকে শুরু করে টাকা-পয়সার লেনদেন সবকিছু হয়ে এসেছে, সেগুলো সব নাকি এক লহমায় বাতিল হয়ে যাবে। চাকরিজীবী মধ্যবিত্তদের খুব একটা সমস্যা না হলেও, নোট বন্দির সবথেকে খারাপ প্রভাব পড়েছিল শ্রমিক শ্রেণীর মানুষদের উপরে এবং ব্যবসায়ীদের উপরে। ভারতের মতো একটি বৃহৎ আকৃতির ইকোনমি, যেখানে প্রায় সবকিছুই ক্যাশের মাধ্যমে চলে, সেখানে হঠাৎ করে কার্যত সমস্ত নোট বাতিল করে দেবার সিদ্ধান্ত যেন এটম বোম এর মত পড়েছিল।

সবার গলাতেই ছিল উদ্বেগ, সকলেই ভাবছেন এবার কি হবে! কেউ কেউ বললেন কোন বাজার হাট করতে পারলাম না, আবার কেউ বললেন মজুরির সমস্ত টাকাটাই বাতিল হয়ে গেল। একজন পেনশনভোগী বৃদ্ধ বললেন, কালোটাকা কি আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে? বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী কে বাহবা দিলেন বটে। অনেকে বললেন ধনীদের কাছে থাকা কালো টাকা উদ্ধার করার প্রচেষ্টার সাধুবাদ প্রাপ্য। ৯ নভেম্বর বন্ধ রাখা হলো সব ধরনের ব্যাংকিং লেনদেন। কিন্তু, আসল বিপদটা শুরু হলো ১০ নভেম্বর থেকে। যে সমস্ত ব্যাংকে কার্যত মানুষে যেতেই চাইতেন না, সেখানেও মানুষ ভোর ছয়টা থেকে হত্যে দিয়ে পড়ে রইলেন, শুধুমাত্র পুরনো নোট জমা দিয়ে অন্যদিকে নতুন নোট জোগাড় করার তাগিদে। 

চালু থাকা নোটের প্রায় ৮৬ শতাংশ যখন বাতিল হয়ে যাওয়া নোট, সেগুলির পরিবর্তে নোটের যোগান কার্যত অপ্রতুল বলা চলে। পরের কয়েক মাস দিনরাত নতুন নোট ছাপা এবং বিমানবাহিনী দিয়ে দেশের নানা দিকে ওই নোট পৌঁছে দেওয়ার বিশাল কর্মযজ্ঞ চলেছে। রিজার্ভ ব্যাংকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই কর্ম যজ্ঞের জন্য রিজার্ভ ব্যাংকের বিশাল পরিমাণ আমানত খরচ করতে হয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের কথায়, “আগের আর্থিক বছরের তুলনায় সেই বছর নতুন নোট ছাপাতে আর সেগুলো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বন্টন করার জন্য রিজার্ভ ব্যাংক এবং ভারত সরকারের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচা হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ যে ব্যাংকে গিয়ে পুরনো নোট জমা দিয়েছিলেন, তার জন্য রিজার্ভ ব্যাংককে অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গুলিকে ১৮ হাজার কোটি টাকা সুদ দিতে হয়েছে। এত টাকা সুদ দেওয়া এবং, নোট ছাপানো এবং বন্টন এর জন্য এত টাকা খরচ করার পরে রিজার্ভ ব্যাংকের ভাঁড়ারে প্রায় কিছুই এলো না বললেই। রিজার্ভ ব্যাংকের এতটা খরচ কোনভাবেই হতো না যদি এই নোট বাতিল না হতো।”

অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন করছেন, “এত টাকা খরচ করে কালো টাকা উদ্ধার এর নাম করে ভারত সরকার যে টাকা আয় করল, তাতো ওই খরচের সামনে অত্যন্ত নগণ্য বললেই চলে। তাহলে এটা করার লাভ কি হল?” অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নোটবন্দি তেমন একটা লাভজনক ফল তো দেখাতে পারলোই না, বরং, বহু মানুষের নিত্যদিনের রুটিন হয়ে গিয়েছিল এই সকালে গিয়ে পুরনো জমা দেওয়া এবং নতুন নোট বাড়িতে নিয়ে আসা। অত্যধিক পরিমাণে ওভারটাইম করতে হলো ব্যাংকের কর্মীদের। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো মানুষের লাইন, কিন্তু তবুও অনেকেই নতুন নোট পেতেন না। কিন্তু সবথেকে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই নোট পরিবর্তনে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে প্রাণও হারালেন। 

তার মধ্যেই একজন ছিলেন কলকাতা বেহালা অঞ্চলের বাসিন্দা কল্লোল রায়চৌধুরী। কর্মসূত্রে তিনি কোচবিহারে থাকলেও, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নতুন নোট জোগাড়ের ব্যর্থ চেষ্টা করার পর অবশেষে কলকাতায় ফিরে ছিলেন তিনি। হুগলির ব্যান্ডেল স্টেশন লাগোয়া একটি এটিএমে নতুন নোটের আশায় দীর্ঘক্ষন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই বছর নভেম্বর মাসে খুব একটা ঠান্ডা ছিল না, দুপুরের তাতাপোড়া গরমে সেখানেই মাথা ঘুরে পড়ে যান তিনি, আর উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। রাজ্য সরকারের তরফ থেকে কল্লোল রায় চৌধুরীর স্ত্রী কে ওই একই অফিসে চাকরি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা হল, এত চাকরি দেওয়া, নোট পাল্টানো, এই সিদ্ধান্তের ফলে আদৌ কি লাভ লোকসান কিছু হল?

নরেন্দ্র মোদী তার ভাষণে শুরুতেই প্রথমেই বলেছিলেন, এই পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করছেন শুধুমাত্র দুর্নীতি বন্ধ করতে এবং কালো টাকা উদ্ধার করতে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী যেটাকে কালোটাকা বলছেন, সেটার সিংহভাগটাই কিন্তু রাখা থাকে বিদেশি ব্যাংকে অথবা জমি বাড়ি গয়না হিসেবে। স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে কালোটাকা রূপান্তরিত থাকে, কোন অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে নয়। অনেক জায়গায় আবার বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এই কালোটাকা ব্যবহার করা হয়। তাই সাধারণ মানুষকে বিনা কারণে কষ্টের মধ্যে ফেলে তেমন কিছু কালো টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

পরিসংখ্যান বলছে, বাতিল হয়ে যাওয়া নোটের ৯৯ শতাংশ কিন্তু আবারও ফিরে এসেছে ব্যাংকিং সেক্টরে। তবে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট এর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অম্বুজ মহান্তি আবার অন্য কথা বলছেন। তিনি বলছেন, “আপনারা যদি শুধুমাত্র নোট বাতিল কে আলাদা করে দেখেন তাহলে কিন্তু হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী জন ধন যোজনা, নোট বাতিল, জিএসটি চালু করা, বেনামী সম্পত্তি আইন সহ আরো অনেক নতুন প্রকল্প চালু করেছেন। এছাড়াও ডিজিটাল পেমেন্টকে নতুন দিশা দেখানোর কাজ শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জনধন যোজনা যে কয়েক লক্ষ ব্যাংক একাউন্ট খোলা হয়েছে সেখানে নোট বাতিল করার প্রচুর টাকা জমা পড়েছে।” 

এছাড়াও তিনি বলছেন, এই ব্যাংক এবং টাকাপয়সা জনিত নতুন নিয়মাবলী কার্যকর হওয়ার পরে প্রায় ১৮ লক্ষ্য সন্দেহজনক একাউন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে আয়কর দপ্তর নোটিশ পাঠিয়েছে। তাই সেখান থেকে তিনি কালোটাকা উদ্ধার করা হবে বলে মনে করছেন। এছাড়াও অর্থনীতিতে নগদের যোগান কমানো এবং প্লাস্টিক মানি ও ই ওয়ালেট এর মত ব্যবস্থাগুলি চালুর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদির এই নতুন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অধ্যাপক মহান্তি। তবে এসব ছিল তত্ত্বকথা। আদতে অনলাইনে শপিং করতে গেলেও ভারতের মানুষ ক্যাশ অন ডেলিভারির উপর বেশি বিশ্বাস করেন, খুব কাজে না লাগলে কেউ এটিএম এ গিয়ে টাকা তোলেন না, ই ওয়ালেট ব্যবহারের ব্যাপার তো ছেড়েই দিন। কোন বড় বড় জায়গাতেও আজকাল ই ওয়ালেট এর মত বিষয়টি কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

হয়তো কিউআর কোড লাগানো আছে, হয়তো কার্ড পাঞ্চিং মেশিনও রয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত ভারতের বহু মানুষ রয়েছেন যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতেই জানেন না। তাদের ক্ষেত্রে তো এটিএম কার্ড ব্যবহার করাটাও বিলাসিতা। ভারতের মত একটা দেশ যেখানে লিকুইড ক্যাশ এর থেকে হার্ড ক্যাশের উপরে বেশি ভরসা করা হয়, সেখানে লিকুইড মানিট্রান্সফার হবে, সেটা খুব একটা বলা যায়না। নোট বাতিলের পরের ছয় মাসের তথ্য থেকেই দেখা যাচ্ছে, ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার নিম্নমুখী। এখন তো আবার বাংলাদেশের মত একটা দেশ, তারাও আমাদের টক্কর দিচ্ছে জিডিপি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। আবার ব্যাঙ্কগুলি যেকোনো শিল্পক্ষেত্রকে যে ঋণ দেয়, সেখানেও আর্থিক বৃদ্ধির হার নেগেটিভ।

সর্বোপরি মারণ ভাইরাস করোনা, যার কারণে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ভারত সম্পূর্ণরূপে বাড়িতে বসে। মানুষের হাতে টাকা-পয়সা কমছে। এরকম জায়গায় দাঁড়িয়ে লিকুইড মানিট্রান্সফার খুব কম লোকেই করতে চাইছেন। তারপর আবার ইউপিআই এর মত জায়গায় টাকা আটকে যাওয়ার ভয় থাকে। ভারতের সার্ভার সব সময় ভালো কাজ করে না, তাই হয়তো অনেকেই পেন্ডিং তালিকায় নিজের টাকা খোয়ানোর ভয় নিয়ে এই ধরনের অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করতে চান না। অর্থনীতিবীদ অভিরূপ সরকার বলেছেন, নোট বাতিলের ঘোষণাকে শুধুমাত্র অর্থনীতির মাপকাঠি দিয়ে বিচার করা সম্পূর্ণরূপে অনুচিত হবে – কারণ সেটা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটা সিদ্ধান্ত। ওপরে ওপরে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও এটার পিছনে একটা রাজনৈতিক খেলা ছিল।

দুর্নীতিবাজ লোকেদের উপরে সাধারণ মানুষের রাগ থাকাটা স্বাভাবিক, এবং লোকসভা নির্বাচনের আগে এই রাগটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। ভারতের সাধারণ মানুষ যারা অর্থনীতির ব্যাপারে খুব একটা বেশি বোঝেন না, তারা মনে করেছেন, টাকা বাতিল হলে সব থেকে বেশী অসুবিধায় পড়বে বড় লোকেরা। আর আমাদের সরকার গরিবের সঙ্গে আছে ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু, এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফলে না কারো লাভ হয়েছে, আর না কারো ক্ষতি। বড় আখের গুছিয়েছে শুধুমাত্র বিজেপি, যার বড় প্রমাণ উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে যোগী আদিত্যনাথ এর বিপুল ভোটে জয়লাভ। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে, যখন গরিবের পেটে টান পড়বে, এবং ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হবে, সেই সময় কিন্তু বিজেপি সাধারণ মানুষের কাছে জবাব দিতে বাধ্য হবে। 

লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ইতিমধ্যেই কষ্ট করেছে এই নোট বন্দির সময়ে। অনেকেই এটিএম এ দাড়িয়ে দীর্ঘক্ষন নিজের কাজের সময়টা নষ্ট করেছেন। শুধুমাত্র নতুন নোটের জন্য, অনেককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে। অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। কল্লোল রায়চৌধুরী ১০ বছর বয়সী পুত্র শুভদীপ এখনো তার বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। তার জেঠা স্বপন রায় চৌধুরী বলেছেন, ‘ও এখনও বোঝে না যে ওর বাবা নেই। ওভাবে ওর বাবা বাইরে চাকরি করে। তাই এখনো অপেক্ষা করে বসে আছে। নোট বাতিলের ফলে কার কি উপকার হলো সেটা জানিনা, কিন্তু আমার পরিবারটা বিপর্যস্ত হয়ে গেল।’

তথ্যসূত্র –

  • https://www.google.com/amp/s/www.bbc.com/bengali/news-41929837.amp

More Articles

error: Content is protected !!