অবহেলিতা নেপালি মেয়ের চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠার কাহিনি: প্রথম পর্ব

By: Anasuya Sen

October 22, 2021

Share

চিত্রঋণঃ গুগল

ক্যামেরা হাতে তুলে নেওয়ার পরে মেয়েটির চোখ মুখে ফুটে উঠল সেই পুরোনো প্রাণোচ্ছলতার ঝিলিক | মেয়েটি বলে উঠল-“নেপালী মেয়েরা যে শৃঙ্খল ও অবদমনের মধ্যে দিনযাপন করে, তার কাহিনী আমি মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাই | আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই |”

‘আই আম বেলমায়া’ এই তথ্যচিত্রটির উপজীব্য চরিত্র হল সেই মেয়েটি | বেলমায়া নেপালি সেই তথ্যচিত্রটির কেবলমাত্র বিষয়বস্তু নয়, সহ-পরিচালিকাও বটে |

নেপালের পশ্চিমপ্রান্তে একটি দারিদ্র-দীর্ণ-পাহাড়ী গ্রামে নিম্নবর্ণের পরিবারে বেলমায়ার জন্ম| বেলমায়ার বয়স যখন মাত্র আট, তখনই সে অনাথ| মাথার ওপর চার বড় ভাই আর এক বোন, এদের সংসারেই কোনরকমে ঠাঁই পেল বেলমায়া | হতদরিদ্র পরিবারে যেটুকু অন্নের সংস্থান  হতো, তা প্রথমে যেত বাড়ীর ছেলেদের পাতে | প্রায় দিন বেলমায়া অভুক্ত থাকত | খিদের জ্বালায় কোনও কোনও দিন পড়শীর গাছের কুল চুরি করে খেত | যে বয়সে ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে যায়, সে বয়সে বেলমায়ার দিন কাটতো বাড়ীর গরুদের জন্য ঘাস কেটে আর জঙ্গল থেকে জ্বালানির কাঠ কেটে | পিঠে বাঁশের ঝুড়িতে করে বোঝা বয়ে নিয়ে আসতে হত |

শত বাধাবিপত্তি এড়িয়ে একদিন বেলমায়া যখন লেখাপড়া শেখার আশায় স্কুলে গেল তখন মাস্টারমশাই তাকে ভর্তি না করে বললেন যে তার মাথায় ‘গোবর পোড়া’| এবারেও তার লেখাপড়ায় ছেদ পড়ল | তার বড় ভাইয়েরাও তাকে লেখাপড়া শেখানোর কোনও চেষ্টা করল না | নেপালের প্রায় সর্বত্র মেয়েদের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বিশেষ করে নিম্ন বর্ণের দলিত পরিবারে | এ ধরনের পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়| বিয়ের পর স্বামীর সংসারেই গোটা জীবন কাটে তাদের | অতএব মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে টাকা ঢেলে লাভ কী?

খালি পায়ে গ্রামের মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো অবাধ্য মেয়েটি এরপর হাতের কাজ শেখার তাগিদে গিয়ে ভর্তি হল পোখাবাং শহরে একটি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে | সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘ইউ’ ম্যাগাজিনের তরফে দায়িত্ব মহিলা সাংবাদিক সিউ কার্পেন্টার গিয়ে উপস্থিত হন | তখন ২০০৬ সাল| কার্পেন্টারের দায়িত্ব ছিল কাঠমান্ডু শহরের একটি মেয়েদের আশ্রয়কেন্দ্র সম্মন্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন রচনা লিখে পাঠানো| যে সমস্ত নেপালি কিশোরীরা দুর্দশাগ্রস্থ পরিবার থেকে এসেছে, যারা গৃহহীন, যারা অনাথ, যারা অবহেলিত ও প্রায় অশিক্ষিত- তাদের ফটোগ্রাফি শেখানোর একটি প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যেও কার্পেন্টার পোখারা শহরে গেছিলেন | এখানকার অভিজ্ঞতাই তাকে প্রণোদিত করেছিল ইংল্যান্ডবাসীদের দানে ‘আশা নেপাল’ নামে এক দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে যার কাজ নেপালের মহিলাদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা | এইখানেই বেলমায়ার সঙ্গে পরিচয় হয় কার্পেন্টারের| কার্পেন্টার প্রথম থেকেই লক্ষ করেছিলেন যে, বেলমায়া একটি প্রাণবন্ত, সাহসিনী ও স্পষ্টবক্তা কিশোরী | যখন অন্য মেয়েরা শিখেছিল শান্ত ও বিনীত হয়ে সমাজের অনুশাসন মানতে, তখন বেলমায়াকে দেখা গেল স্পষ্ট ভাষায় নিজের অনুভূতির কথা স্বচ্ছন্দে ব্যক্ত করতে| কার্পেন্টারের প্রস্তাবে বেলমায়া সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠল- “আমি একজন ফটোগ্রাফার হতে চাই | আমি দেখতে চাই কেমন করে মেয়েরা কষ্ট করে পাথর কাটে, জ্বালানির কাঠ কাটে, আর ছেলেরা আরাম করে বসে শুধু মেয়েদের ওপর কর্তৃত্ব চালায় আর ফরমায়েশ করে |”

কার্পেন্টারের ভাষায়- “বেলমায়ার ছিল অদম্য উৎসাহ আর বাঁধন ভাঙার আনন্দ | তার ঘন কালো চোখদুটিতে ছিল তারুণ্যের ঝলকানি | ক্যামেরা হাত নিয়ে ছবির বিষয়বস্তুর ওপর গভীর মনযোগ দিয়ে সে একের পর এক ছবি তুলত | সে প্রায়ই ক্যামেরার লেন্সগুলিকে নিজের দিকে তাক করত- সেলফি তখন ভবিষ্যতের গর্ভে | এই সাহসী ও অহমিকাপূর্ণ ছবিগুলির ভাণ্ডারই তাকে ১৫ বছর পরে সাহায্য করেছিল ‘আই অ্যাম বেলমায়া’ তথ্যচিত্রে তার নিজের কাহিনি শোনাতে এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে | কিন্তু তার এই প্রাণোচ্ছলতার নীচে লুকিয়ে ছিল এক গভীর বিষন্নতা ও তীব্র অভাববোধ | ফটোগ্রাফি শিক্ষায় তার সাফল্যকে এবং তার সত্তাকে কে আমি সম্মান দিয়েছিলাম, মূল্য দিয়েছিলাম | তাকে আমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটা পথ দেখিয়েছিলাম | তাই প্রকল্পের কাজের শেষে আমার যখন দেশে ফিরে যাওয়ার সময় হল, তখন তার কাছে বিষয়টা হৃদয়বিদারক মনে হল | সে কান্নায় ভেঙে পড়ল | তার বিপন্নতা আমার কাছে স্পষ্ট হল |”

বস্তুত কার্পেন্টার নেপাল ছেড়ে যাওয়ার পর ঐ আশ্রয় কেন্দ্রের পরিবেশ মেয়েদের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকূল হয়ে উঠল | বহিরাগতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল | মেয়েদের ক্যামেরাগুলো তালাবন্ধ করে রাখা হল | বাইরের জগতের সঙ্গে মেয়েদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন হল | বাধ্য ছাত্রীদের মতো মতো পড়ার বই নিয়ে আঁকড়ে না থেকে, মেয়েরা নিজেদেরকে মেলে ধরার এবং মতপ্রকাশ করার স্বাধীনতা কিছুটা উপভোগ করেছিল | তাই বুঝি মেয়েদের শাসনে বাঁধা শুরু হল |

এই আশ্রয়কেন্দ্রে একটি যুবকের সঙ্গে বেলমায়ার পরিচয় হয় | পরিচয় থেকে হয় পরিণয় | সে খুব আশা করেছিল যে বিয়ের পর সে সুদিনের মুখ দেখবে | কিন্তু সুদিনের পরিবর্তে দুর্দিন দেখতে হল | বেলমায়ার ভাষায়- “সংসার জীবনে কখনও সুখের মুখ দেখিনি | তা দেখার আসায় ত্যাগ করেছি | যদি একটু লেখাপড়া শিখতাম, তাহলে একটা ভদ্রস্থ চাকরী জোটাতে পারতাম | আমাকে আমার স্বামী আর তার ভাইদের ওপর নির্ভর করতে হত না |” বস্তুত, এই বিয়ের পরে বেলমায়া একটি কন্যাসন্তান, দারিদ্র্য, মদ্যপ স্বামীর হাতের মার ভিন্ন আর কিচ্ছু পায়নি |

More Articles

error: Content is protected !!