এখনও দেখি ফিরে, খুঁটিপুজো রয়ে গিয়েছে স্মৃতির সেই ভিড়ে

By: Ishan Bandopadhyay

October 6, 2021

Share

চিত্রঋণঃ গুগল

আর কিছু থাক বা না থাক, মাঠ ছিল তখন আমাদের। অল্প খানিক ছড়ানো, স্বল্প খানিক বিস্তৃত,  সন্ধে নামার মুখে নাম ধরে ডাকতো মা। দুই হাঁটুতে হালের দশ টাকার কয়েনের সাইজের লালচে ক্ষতচিহ্ন লুকিয়ে আরও কিছুক্ষণ চলত সেই বিকেল ভাঙার উজান, ফুটবলে ক্রিকেটে আর খোপ কেটে কেটে গিজো খেলায়– সে খেলা আজ আর জানে না কেউ। 

সে মাঠে ডিসেম্বরে ফিস্ট আর বসে আঁকো প্রতিযোগিতা হতো, মার্চে ন্যাড়াপোড়া। আর হতো পুজো– চাঁদা তুলতে গেলেই অবধারিত প্রশান্তকাকু ‘সরস্বতী’ বানান আর বন্দনার মন্ত্র জিগাবেন, আর ফুটবল সেনাপতি রিন্টু নির্ঘাত কোন ‘স’ এর নিচে ‘ব’ সেটা গুলিয়ে ফেলবে, আর ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’ প্রোপাগান্ডা ডিসমিস হয়ে পাওয়া যাবে মোটে পাঁচ টাকা চাঁদা। ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে’ উচ্চারণের আগেই আমাদের জিভে নিষিদ্ধ কুলের প্রাণজুড়োনো সেই অনির্বচনীয় স্বাদ– পাপ তো লাগবেই এট্টু! 

সরস্বতী আমাদের ডিপার্টমেন্ট, কচিকাঁচার মোনোপলি, তবু বাকি সব পুজোতেও আমরা থাকতাম স্বমহিমায়। মহিমা তখন এমনিতেই বাজার কাঁপাচ্ছে, সুভাষ ঘাইয়ের ‘পরদেশ’ এর অডিও ক্যাসেট-এর দাম প্রিন্টে বিয়াল্লিশ আছে বাবুদার দোকানে, বাবুদা উদাস হয়ে পঁয়ত্রিশ টাকায় দেবে এরকমই ডিল ফাইনাল, কিন্তু সেটাই বা আসে কোথা থেকে! পঁয়ত্রিশ টাকা! চাট্টিখানি কথা নয়! আর্জেন্টিনা গিয়ে মারাদোনার সঙ্গে দেখা করতে হলে প্লেনেই যেতে হবে এইটুকু তো জানি, পঁয়ত্রিশ টাকায় ভাড়া হবে না এক পিঠের? 

সেই ‘পরদেশ’-এর ‘মেরি মেহবুবা’ বাজত পুজোয়, বিশ্বকর্মাপুজো আর দুর্গাপুজো দুটোতেই, তবে সে সব পরের কথা, আমাদের পুজো শুরু হতো এসবের অনেকদিন আগে, ঠিক কোনও একটা মেঘলা দুপুরে যখন ডিফেন্স থেকে ছাপান্নদা’র থ্রু-পাসটা বাঁ  পায়ে ধরেই নাড়ু কাটিয়ে নিয়েছে ভাইপোকে ঠিক ডেনিস বার্গক্যাম্পের কায়দায়, এইবার গোল নির্ঘাত– তখনই অচানক হল্ট! পুজো কমিটির সত্য কাকারা হঠাৎ মাঠের মাঝখানে, সঙ্গে নাতিদা, এলাকার কিংবদন্তি  পুরোহিত ছিলেন নাতিদার দাদু, সেই পরিচয়ে ক্ষুদিরাম নাম ওভারল্যাপ হয়ে ‘নাতি’ নাম বিখ্যাত, আমাদের মতো নেহাত বালখিল্যরা সে নামের সঙ্গে ‘দা’ যোগ করে নিয়েছি। ব্যাপার কী, হঠাৎ এই বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো সিরিয়াস ম্যাচের আবহে দর্শকের ইন্টারভেনশন কেন– তা বুঝে ওঠা তৎক্ষণাৎই, সবুজ এক লম্বা বাঁশ তার মাথায় ধ্বজা বাঁধা, সেটা স্থাপন হবে মাঠের ঈশান কোণে! ও হো, খুঁটিপুজো আজ নাকি? মানে তো পুজো এসে গেলো! গোলটা হল না বটে, বদলে যে মনের মাঝে পেলাম আগমনীর পাসপোর্ট, তাতে যাওয়া যাবে গোল মিসের দুঃখ পেরিয়ে আরও বহু বহু দূর। 

আর সেই আমাদের শুরু, ঐ খুঁটিটা পোঁতা হলেই ঠিক জানতাম, বকুনির গ্রাফ এখন থেকেই নামতে শুরু করবে, বাড়িতে কাগজ-কাকু দিয়ে যাবে শুকতারা আর আনন্দমেলার সেই মন মাতানো গন্ধওলা পূজাবার্ষিকী সংখ্যা, দূরের আত্মীয়-স্বজনদের থেকে একে একে আসতে শুরু করবে পুজোর জামা, হ্যাঁ এসবের ফাঁকেই ইস্কুলে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষাটা আছে বটে, কিন্তু সে আর বিশেষ পাত্তা দিতাম না কেউই, রেজাল্ট তো বেরোবে পুজোর পর! 

অথচ, এই অবেলায় বড় হয়ে সে সব মায়াময় দিনরাতের আখ্যান স্মৃতির আটলান্টিক থেকে তুলে আনতে গিয়ে জানতে পারি, খুঁটিপুজো বলে কিছু নেই নাকি শাস্ত্রমতে! যা ছিল, তা হল কাঠামোপুজো, দেবীর আরাধনা করে জন্মাষ্টমীর দিন থেকে বিধিমতে শুরু করা হতো মৃন্ময়ী মাতৃপ্রতিমাকে চিন্ময়ী রূপদানের শুভ কাজ। প্যান্ডেল বানানোর ব্যাপারটাই ছিল না তখন, মণ্ডপ অস্থায়ী হতো না এখনকার মতো। সেই যে ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপুজো করলেন, যার থেকে নাম হল ‘বারোয়ারি’– তার আগে পর্যন্ত বাবুদের দরদালানেই  পুজো হতো মায়ের, ‘মণ্ডপ নির্মাণের শুভারম্ভ’ হিসেবে তিথি-নক্ষত্র মেনে খুঁটি পুঁতে কাজ শুরু করার কোনও লোকাচার ছিলই না আগে। যুগ বদলেছে যুগের নিয়মে, বড় মানুষের বাড়ির পাকা দালান থেকে নেমে এসে মা আরও বেশি করে হয়ে উঠেছেন সক্কলের, এ পাড়ার সঙ্গে ও পাড়ার কম্পিটিশন শুরু হয়েছে কারা ভাল লাইটিং আনল চন্দননগরের, কাদের উদ্বোধনে টলি পাড়ার মাঝারি নায়ক এসে মাইকে বলে গেল আমি এখানকারই ছেলে, আর সে সব দিন থেকেই খুঁটিপুজো হয়ে উঠল সেই শুরুয়াতের অমোঘ মার্কিং– এসে গেল, পুজো এসে গেল আমাদের! 

আমরাও সেরকমই ছিলাম। রোদে, বৃষ্টিতে, হিট উইকেটে, সেম সাইডে, পাশের পাড়ার নাম না জানা লাবণ্যময়ী একজোড়া চোখের অপাঙ্গের একবিন্দু তাকানোতে, সামান্য হাতখরচে, লুকিয়ে নেওয়া কাউন্টারে– ওই একটা খুঁটি বড় শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল আমাদের। টেনিদার থেকে আমরাও দিব্যি শিখে নিয়েছিলাম কখন যেন অজান্তেই, খুঁটি ইংরেজি পোস্ট, বানানে দু’খানা ‘টি’, না হলে শক্ত হবে কী করে!

কতটা শক্ত আর অমোঘ ছিল সেই খুঁটি, এই ভাঙনকাল থেকে যখন তাকাই সেই কল্পলোকসম অতীতে, বেশ বুঝতে পারি‌। সবাই যেন বাঁধা, সবাই যেন ভীষণ ভীষণ আপন, জড়িয়ে-জাপটে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে সবসময়। সবার বাড়িই যেন আমার বাড়ি, সর্বস্বটাই আমাদের– আর দুর্গাপুজোটা একটু বেশি স্পেশাল, ঠিক যেন নিখুঁত মাপে থার্ড-পকেট হওয়া ‘রেড’। পকেটে তো যাবেই, কিন্তু একটু আলাদা রেলা সমেত! খুঁটিপুজোর পর থেকে বাঁশের প্যান্ডেল শুরু হলেই, সেই আলাদা রেলাটুকু মনে হরমোনে নিয়ে ‘আমরা সবাই রাজা’। যে সে রাজা নয়, অরণ্যাধিপতি টারজান– আর সে শাখামৃগসম কীর্তিকলাপ দেখে পাড়ার বড়দের সমবেত সন্দেহ, আদৌ ডারউইনের এভোলিউশনের তত্ত্ব ঠিক? 

আজ সব পেরিয়ে, খুঁটিপুজো হয় আজও সেই মাঠে, আছে সব, তবু যেন নড়বড়ে খানিক। নাড়ু আর আউটসাইডে ডজে মার্কারকে ছিটকে দেয় না অনেকদিন। প্রশান্তকাকু আর ইহজগতে নেই ‘সরস্বতী’ বানান ঠিক করে দেওয়ার জন্য। পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা মাইনে পাই অনেকে। তাই হয়তো, সেই পঁয়ত্রিশ টাকা আর পকেটে নেই ‘পরদেশ’ ক্যাসেটটা কেনার মতো।‌

সে খুঁটি, সে খুঁটিপুজো, সে আশ্চর্য সময়, সত্যি সত্যি অন্য দেশের লাগে…

লেখা: ঈশান বন্দ্যোপাধ্যায়

More Articles