অস্পৃশ্যদের মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ সাবিত্রীবাই

By: Anasuya Sen

October 2, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

তখনও সিপাহী বিদ্রোহ হয়নি | দেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন | ভারতবর্ষ তখন জাতপাতের বিচার, ছুঁতমার্গে ইত্যাদি ঘোরতর কুসংস্কারের মোহনিদ্রায় সমাচ্ছন্ন | জাতির মনুষ্যত্বের চেতনার আকাশ প্রায়ান্ধকার | এইরকম দমবন্ধকরা সময়ে মহারাষ্ট্রের উচ্চবর্ণ প্রভাবিত পুণে শহরের ভিদেওয়ারায় খোলা রাস্তা দিয়ে চলেছে নিম্নবর্ণের অচ্ছুত সম্প্রদায়ের এক কিশোরী, সঙ্গে স্বামী | কিশোরীটির বয়স ১৭, পরনে একটি শতছিন্ন শাড়ি | তার চলার পথে বাধা সৃষ্টির জন্য, তাকে আটকানোর জন্য | উৎসাহ দমিয়ে দেওয়ার জন্য উচ্চবর্ণের মুরুব্বিরা তার গায়ে ছুঁড়ে মারছে ঢিল -পাটকেল- কাদা-বিষ্ঠা | অশ্রাব্য গালাগাল বর্ষণ করছে তার ওপর | তার অপরাধ সে তার স্বামীর সঙ্গে বানিয়েছে একটি স্কুল, যেখানে নিচু জাত ও অস্পৃশ্য সমাজের বালিকারা লেখাপড়া শেখার সুযোগ পায়, যেখানে সে নিজে পড়ায় | এই কাজ করতে সে লজ্জা শরমের বালাই ভেঙে মেয়ে হয়ে রাস্তায় নেমেছে, এই তার অপরাধ | সে নিচু জাতের মানুষদের শিক্ষিত করে সবার সমান করার চেষ্টা করছে, এই তার অপরাধ | এ তো শুধু অপরাধ নয়, এ ঔদ্ধত্য, এ স্পর্ধা ! একটা নিচু জাতের মেয়ে হয়ে যে পথে তার চলাচল করার অধিকার নেই, সেই পথ ধরেই সে কি না যাতায়াত করছে, তাও আবার স্কুলে পড়াতে ! তার তো উচিত ছিল নিজেদের মহল্লায় শুদ্রপাড়ায় বসে অচ্ছুতদের করণীয় নিচ কাজগুলি করা ! এই দুর্বিনীত আচরণ মেনে নেওয়া যায় না, এই স্পর্ধা ভেঙ্গে দিতে হয় |

তাই মেয়েটির কপালে রোজ জুটতো এইরকম লাঞ্ছনা | স্কুলে যাওয়ার পথে প্রতিদিন সে ঝোলায় করে নিয়ে যেত একটি কাচা শাড়ি | স্কুলে যাওয়ার পর নোংরা হয়ে যাওয়া শাড়িটি বদলে সে পরে নিতো কাচা শাড়িটি | স্কুলে পড়ানো হয়ে গেলে, ছুটির পর সে আবার কাচা শাড়ি বদলে পরে নিতো নোংরা শাড়িটি | কারণ ফেরার পথে আর একবার হেনস্থা হওয়া বাকী আছে যে! হতোও তাই, প্রতিদিন | কিন্তু শত লাঞ্চনাতেও মেয়েটি নিজের সঙ্কল্পে অবিচলিত থাকত | এই সর্বংসহা মেয়েটির নাম সাবিত্রীবাই ফুলে | আর তার স্বামীর নাম জ্যোতিরাও ফুলে | শুধু স্বামী নন, সহকর্মী, সহযোদ্ধা | প্রকৃত অর্থেই তাঁর সহধর্মিনী সাবিত্রীবাই সমাজপতিদের বলেছিলেন —– আমার বোনেদের অশিক্ষার অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে আনার কঠিন ব্রত নিয়েছি আমি | আপনাদের ছুঁড়ে মারা ঢিল আর নোংরা আমার গায়ে এসে ফুল হয়ে যায় | ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গোল করুন | ঘটনাটির কালপর্ব ১৮৪৮ সাল | ভারতের ইতিহাসে সেই প্রথম নিচু জাত আর অস্পৃশ্য সমাজের মেয়েদের জন্য খুলে গেল স্কুল |

সাবিত্রীবাই ফুলের জন্ম হয়েছিল ১৮৩১ সালের, ৩রা জানুয়ারী | তার যখন নয় বছর বয়স তখন তার বিয়ে হয় বারো বছর বয়সী জ্যোতিরাও-এর সঙ্গে | জ্যোতিরাও পড়াশুনা করতে খুব ভালবাসতেন | নিজে লেখাপড়া করে যা শিখতেন তা শেখাতেন স্ত্রীকে | সাবিত্রীবাই আগ্রহ সহকারে সেই শিক্ষা গ্রহণ করত | এমনি করেই শুরু হলো দুজনের ভাবের আদানপ্রদান, প্রাণের রসায়ন | ব্রাহ্মণ শাসিত ভারতবর্ষে যুগযুগ ধরে চলে আসা শূদ্র, অতিশূদ্র ও নিচ জাতির মানুষদের ওপর দমন পীড়ন ও অবহেলার বিরুদ্ধে যে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে | সে কথা সাবিত্রীবাইকে বোঝাতে শুরু করেন জ্যোতিরাও | পরস্পর উপলব্ধি করেন যে নিচু জাতির মানুষদের মধ্যে বিশেষকরে মেয়েদের মধ্যে, শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারলেই ধীরে ধীরে মোচন হবে জন্মসূত্রে পাওয়া শৃঙ্খল | যেমন উপলব্ধি, তেমন কাজ | কিন্তু অস্পৃশ্য সমাজের বালিকাদের জন্য স্কুল খোলার অপরাধে উচ্চবর্ণের মানুষদের চাপে জ্যোতিরাওদের ছাড়তে হলো ভিটে | তখন তাঁদের আশ্রয় দেন এক মুসলমান দম্পতি | ওনারা তখন ব্রিটিশ সরকারের দ্বারস্থ হলেন | দাবী করলেন প্রতিটি গ্রামে যেন অস্পৃশ্য সমাজের বালক-বালিকাদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন সরকার | তারা নিজেদের উদ্যোগে ১৮৫২ সালের মধ্যেই গড়ে তুলেছিলেন তিনটি স্কুল, যাতে অচ্ছুত মাহার ও মাং জাতের বালক বালিকারা শিক্ষালাভ করতে পারে | স্কুলগুলি চলত ইউরোপীয়দের আনুকূল্যে ও সহযোগিতায় |

১৯৭৩ সালে জ্যোতিরাও একটি বই লেখেন, নাম ‘গুলামগিরি’ | বইটি পড়লে মনে হবে যেন সাবিত্রীবাই-এর সঙ্গে তিনি আলাপচারিতা করছেন | বইটিতে তিনি মতপ্রকাশ করলেন যে, প্রকৃত বিচারে এশিয়া মাইনর থেকে  বহিরাগত আর্য্য জাতির মানুষেরা ভারতবর্ষের দেশ ভূমিজাতির ওপর নিজেদের স্থায়ী কর্তৃত্ব কায়েম করার করার উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছে জাত-পাতের ভিত্তিতে গড়া উঁচু-নিচুভেদ, দমন-পীড়ন আর অস্পৃশ্যতা | সামাজিক ভেদাভেদের মাধ্যমে নিচু জাতির মানুষদের কাজে শৃঙ্খলিত করে রাখার নির্গূঢ় উদ্দেশ্যে হল তাদের অর্থনৈতিকভাবে দমন করে রাখা | কারণ অস্পৃশ্যদের অর্থনৈতিকভাবে দমন করে রাখলে তারা কখনই সাবলম্বী হতে পারবে না, তাদের চিরকালের জন্য সামাজিকভাবে দমন করা সহজ হবে | আর্য্য – ব্রাহ্মণদের হাতে গড়া সংস্কৃত সাহিত্য এবং বিশেষভাবে ‘মনুসংহিতা’ গ্রন্থের বিধি – বিধান নিচু জাতের মানুষদের সমাজ জীবনে আষ্ঠে – পৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে | এই শৃঙ্খল ভাঙ্গা দরকার | জ্যোতিরাও বুঝেছিলেন যে ইংরেজ ও ইউরোপীয় সমাজ অস্পৃশ্যদের মধ্যে শিক্ষার আলোক ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে | তাই তিনি ইংরেজ ভাষায় পড়াশোনা করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন | তিনি বললেন যে ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়া করে বুঝতে হবে মানুষদের অধিকার বলতে কী বোঝায়, সাম্যের ধারণাটা কী | তবেই ব্রাহ্মণ্য সমাজের দমন-পীড়নের সঙ্গে যুঝতে পারা যাবে |

ব্রিটিশ সরকারের হাতে মহারাষ্ট্রে পেশোয়াদের প্রভুত্ব চূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে নিচু জাতের মানুষেরা অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল | সুযোগ পেয়ে তারা ব্রিটিশ সরকার ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন | তারা বুঝেছিলেন যে ব্রিটিশ সরকার থাকতে থাকতেই যতদূর সম্ভব শিক্ষায়-দীক্ষায় এগিয়ে যেতে হবে, ব্রাহ্মণ্য সমাজ সব সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে যাতে ‘দলিত’ সমাজ উন্নতি করতে না পারে | এই ‘দলিত’ শব্দটির সৃষ্টি ও প্রয়োগ প্রথম করেছিলেন জ্যোতিরাও | 

সামাজিক অবদমনের হাজার ফন্দি-ফিকিরের অন্যতম কায়দা হল গ্রামের কুয়ো থেকে অস্পৃশ্যদের জল নিতে না দেওয়া | সাবিত্রীবাই তাই নিজের বাড়ির প্রাঙ্গনে একটি কূপ খনন করেছিলেন যাতে দলিতরা জল পান | এইরকম বিভিন্ন প্রকারে তিনি উচ্চবর্ণের চাপিয়ে দেওয়া নিপীড়ণের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলেন | একটি দলিত মেয়ে বর্ণ-হিন্দুদের অত্যাচারে বাধ্য হয়েছিল একটি শিশুপুত্রের জন্মদান করতে | সেই পিতৃ – পরিচয়হীন শিশুপুত্রটিকে দত্তক নিয়েছিলেন সাবিত্রীবাই – জ্যোতিরাও | তাঁরা দলিতদের জন্য একটি আশ্রম খুলেছিলেন | সেই আশ্রমেই সব মহিলাদের সম্মান যাতে অটুট থাকে তার জন্য একটি উইল করে জ্যোতিরাও ঘোষণা করেছিলেন যে ওই আশ্রমের সব মহিলাই সাবিত্রীর কন্যা |

১৮৭৩ সালে জ্যোতিরাও প্রতিষ্ঠা করেন ‘সত্যশোধক সমাজ’ | উদ্দেশ্যে দলিত সমাজের মানুষদের যুক্তি ও ন্যায়পথের শিক্ষা দেওয়া | এই সমাজে গণবিবাহের আয়োজন করা হতো বিবাহযোগ্য দলিত-কন্যাদের সৎপাত্রস্ত করার উদ্দেশ্যে | সেই বিবাহের অনুষ্ঠান হতো ব্রাহ্মণ, অগ্নিসাক্ষী ও দেনা-পাওনা ছাড়া | জ্যোতিরাওয়ের মৃত্যুর পর সাবিত্রীবাই সেই সমাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন | 

এ দেশের দলিত সমাজ আজও অত্যাচারিত হয় | আজও দলিতদের জন্য আলাদা পাতকুয়ো নির্দিষ্ট থাকে | উচ্চবর্ণের মানুষদের যদি মনে হয় যে দলিতরা সীমা লঙ্ঘন করছে, তবে দলিত পুরুষদের গাড়িতে বেঁধে রাস্তার উপর দিয়ে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় | সংবাদপত্রের পাতা ওল্টালে প্রায় প্রতিদিন দেশের কোনও না কোনও প্রান্ত থেকে এরকম অত্যাচারের সংবাদ পাওয়া যায় | কিন্তু এই সীমাহীন অন্যায়, অবিচার, অপমান, বঞ্চনা ও নিপীড়নের সমাপ্তি চেয়ে সাবিত্রীবাই – জ্যোতিরাও যে সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন, যে সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তার স্বীকৃতি অধরাই থেকে গেল | দেশের ইতিহাসের পাতায় সংস্কারক হিসাবে যাদের উল্লেখ থাকে, সেই পাতায় স্থান হয় না সাবিত্রীবাই-এর, জ্যোতিরাও-এর | তাঁরা বিস্মৃতির গর্ভে লীন হয়ে যান |

তথ্যসূত্র: 

https://www.google.co.in/url?sa=i&url=https%3A%2F%2Fwww.financialexpress.com%2Findia-news%2Fsavitribai-phule-7-facts-about-indias-first-feminist-icon%2F1432140%2F&psig=AOvVaw1g5drkHwKlzL-Pv3CuXyc6&ust=1631634129908000&source=images&cd=vfe&ved=0CAgQjRxqFwoTCMjWjpin_PICFQAAAAAdAAAAABAD

 

More Articles

error: Content is protected !!