সুজাতার স্বপ্ন

By: Amrita Chakraborty

October 9, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে : inscript.me

“পাবলিকের লাইন দেওয়া মানে জীবন দেওয়া এই কথাটা মনে রাখবেন”- সমাজসেবী সজলদা বীরপাড়ার তিনের পল্লীর একটা মাথা। কথাটা যখন বলছেন তখন লোক-ফোক কাঁপছে! সজল এমনিতে গোটা বছর চুপচাপ। কিন্তু চক্ষুপরীক্ষা শিবির হলেই কেমন একটা জ্বলে ওঠে। এর কারণ সজল হাতিবাগানের  ‘শ্রী’ সিনেমা হলে অমিতাবচনের ‘অমর-আকবর-অ্যান্টনি’ বই দেখতে গেছিল। আরো দুজন ছিল, কিন্তু ওটা তো কথা নয়। অমিতাবচন- এটাই আসল কথা।  সিনেমাহলের পিছনের গলিতে পঁচাত্তরের লাইনে দাঁড়িয়ে সজল ইতিউতি চাইছিল। এহেন ফ্রি-টাইমে সে বস্তির কলে জল নিতে আসা এক মহিলার দিকে চেয়ে চোখ মারে। মহিলা চোখে মগ ছুঁড়ে মারেন। সজল বাড়ি ফিরে আসে। বই দেখে। পরের দিন সকালে উঠে সে দেখে ডানদিকে সূর্য বাঁ-দিকে অমাবস্যে। চোখ গেল পাখি-টাখি দেখলেই সে কী খিস্তি!

তাই চোখ শিবিরে তার খুব দরদ। কানা সজল (পাড়ার সবাই পিছনে এই নামেই ডাকে) আজ লাইন রেখেছিল সুজাতার জন্য। সুজাতা কেউ নয়। হাফ ভিখিরি-হাফ অনাথ মেয়ে। আশে-পাশের বাড়িতে ফাইফরমাস খাটে। কালো, অমসৃণ চামড়া। কোঁকরানো চুল, স্বয়ং জননী তৃতীয় বিশ্ব। সুজাতা লাইন ছেড়ে জলটা নিতে গিয়েছিল। ছোকরা ডাক্তার বলে দিল ওকে পিছনে দাঁড়াতে হবে। সজল আর থাকতে পারেনি। পরশু একটা স্কুটি সুজাতাকে ধাক্কা মেরেছে। সবাই ভেবেছে স্কুটির দোষ, তারপর দেখে সুজাতা বাসের নম্বরও দেখতে পাচ্ছে না। সজল আগে এগিয়ে এসেছে। তাই আজ  ফয়সালাটা করে দিয়ে নিজেকে সংবরণ করবে বলে একটা বিড়ি ধরালো। না-ইনসাফি সহ্য করতে পারে না ও আর। লেডিসদের প্রতি বিশেষ করে।

সুজাতা তাঁবুতে ঢুকেই একবার ভাবল, এইখানে আমাকে থাকতে দিক না! ঝুপড়ির মধ্যেটা যদি ভদ্রলোকের বাড়ির মতন হয়, যেমন হবে! পাখা, আলো, কম্পিউটার মেশিন। আর একটা কী যেন পাম্পের বাক্সের মতন দেখতে। ডঃ সৌম্য সুজাতাকে ‘সম্পূর্ণ কম্পিউটার দ্বারা চক্ষু পরীক্ষা’- র আসনে বসে চোখ রাখলেন লেন্সে। ভেসে উঠল দু’খানা চোখ।

কটা বাদামী, দীর্ঘ অনাদরে গভীর বিরাগী চোখ। সৌম্য অজান্তেই বলে উঠলেন “ভারী সুন্দর চোখ তো তোমার!” তারপর যন্ত্র থেকে মুখ সরিয়ে বললেন, “কী অসুবিধা হয়?”

সুজাতার জন্যে যন্ত্রে থুতনি ঠেকানোর ওই ক’টা মুহূর্ত অনেক সময়। মিষ্টি কোলনের গন্ধ পেয়েছে সে। ভারি আদরযত্নের গন্ধ। সৌম্যর কন্ঠার রং সিনেমার মতন! অসুবিধা কি আর কিছু আছে? তবু লজ্জায় জরজরে হয়ে সে বলল, “দূরেরটা দেখতে অসুবিদে লাগে। হেজিয়ে যায়।”

কাছেরটা দেখতে পাও?

মানে?

কত কাছেরটা দেখতে পাও?

খুব কাছের।

ডঃ সৌম্য উঠে গিয়ে পাওয়ার লিখতে থাকেন। সিভিয়ার কেস। গ্লুকোমার দিকে টার্ন নিচ্ছে এখন, যে কোনওদিনই আলো নিভে যাবে। মেয়েটিকে দেখে মায়া আর বিরক্তি দুই-ই হয়। কেন যে এরা এত কেয়ারলেস!

প্রেসক্রিপশন নিয়ে সুজাতা যখন বেরোচ্ছে তাঁবু থেকে তখন কণ্টক গাড়াও ছিল না, পদতল কমলসম-র তো সিনই নেই। উল্টে সজল ছোঁ মেরে প্রেসক্রিপশন নিয়ে চলে গেল ওষুধ কিনতে। তবু সুজাতা আজ অবাক করা চালে হাঁটছিল। নায়িকা-লক্ষণ চাল।

আজ আর কাজ হল না তার। যতক্ষণ চোখ পরীক্ষা চলল, সে বসে রইল ঠায়। ডাক্তারটা আরেকবার যদি দেখা দেয়। চোদ্দ বছরের সুজাতা কব্বে মেয়েছেলে হয়েছে, তার মন গজিয়েছে আজ।

ঘন্টা চারেক বাদে ডাক্তার বেরোয়। সঙ্গে ক্যাম্পের লোক, তারা পাখা-টাখা তুলতে শুরু করে ম্যাটাডোরে। ডাক্তারকে দেখেই তড়াং করে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে পরে সুজাতা। গলে যাবে মনে হয়। তার মনে হয় চুমুই খেয়ে ফেলবে আজ!

সব খোয়াব মেরে দিয়ে ডঃ সৌম্য গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেন। রেডিও বেজে ওঠে। “এসো প্রাণভরণ হৃদয় হরণ হে”। দাদার কীর্তি, ক্লাসিক বাঙালি ছায়াছবির প্রেমের পুজোর গান।

সুজাতা বিশ্বাসই করতে পারেনি বলে বোধহয় অমন থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গাড়িটা চলে যাবার পর ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে সে। আজ তার কান্নার কারণ সে জানে না। বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে এইটুকু শুধু জানে।

হু হু করে হাওয়া বইতে থাকে ক্যাম্পের মাঠে। আজ ঝড় আসার কথা আছে। সুজাতা এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে লাল টুকটুকে তাঁবুর দিকে। তাহলে সব মিথ্যে? ওই গন্ধ পাওয়া, ওই ‘কত কাছে’ জিজ্ঞাসা? সব মিথ্যে? যেমন সজলদা ওকে বলে ও সজলের মেয়ের মতন? সুজাতা সজলকে ‘সজলদা’ বলে।কেউ  ওর চোখ সুন্দর বলেছে আজ এই চোদ্দ বছরে এই প্রথমবার। সজলদা বলেছিল ওর এক চোখেই নাকি ডবল পাওয়ার, মানুষের চরিত্র বলে দিতে পারে। ডাক্তারের চরিত্র ভালো?

খুব ঝড় উঠেছে মাঠে। বেড়া মুঠোয় করে দাঁড়িয়ে আছে সুজাতা। সুন্দর বলে ভুলে যায় কেউ? ভেতরে বলল সুন্দর বাইরে চিনল না, এমনও হয়? রোঁ রোঁ আওয়াজে ঝড়ের হাওয়ায় দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিল সে। চারিদিকে বস্তির লোক ছুটোছুটি করছে। হুল্লোড় করছে। বৃষ্টি এলে নাকি সাবাং মেখে রাস্তায় চান করবে। সুজাতা তাঁবুর দিকে দেখছে।

দমকা হাওয়ায় সামনের পর্দাখানা উড়ে গিয়ে দেখে ওই মেশিনটা বসানো। সঙ্গে জেনারেটর। আলো জ্বলছে মেশিনের গায়ে। সুজাতার এতক্ষণের সব প্রশ্ন যেন ঝড়ের উড়নিতে লাগা আতরের মতন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। আহ! এই সহজ কথাটা কেন বোঝেনি ও! ওই মেশিনে চোখ রাখলে তবেই ওকে সুন্দর লাগে। ও আসলে সুন্দর ডাক্তার মেশিনের বাইরে দেখেছে বলে চিনতে পারেনি। মেশিন তো না যেন ডেসিনটেবিল! মনে মনে বলেই হেসে ফেলে হিহি করে। পা তার শ্রীরাধিকার, তাঁবু তার গন্তব্য, বৃষ্টিতে চারিদিক অন্ধকার। ভরদুকুরে।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ বাজ পড়ে। সজলের প্রতিবেশী সুরজিৎ সোমের বাড়িতে সেটটপ বক্স নষ্ট হয়ে গেছে। গঙ্গার ধারে কে এক ফটকে ছেলে খরচা হয়ে গেছে। আর বীরপারার সুজাতা মারা গেছে। বাজ পড়ে। ওই চোখ দেখার  ইলেকট্রিক মেশিনটা চলছিল না? ওইটায় চোখ মুখ দিয়ে বসেছিল। বাজ পড়ে স্পট। কালো কাঠ হয়ে গেছে।

সজল কাছা পরে কাশী মিত্তিরে বসে চা খাচ্ছিল। প্রতিবেশী সুরজিৎ সোম চায়ের দোকানে এ গল্পটা বলছিল, শুনলাম। সেট টপ বক্স বিকেলেই সেরে ফিরবে। চারশো নিচ্ছে। দাম আটশো।

More Articles

error: Content is protected !!