বর্ধমান রাজপরিবার কাহিনি

By: Arunima Mukherjee

September 7, 2021

Share

বর্ধমান রাজপরিবার ।। ছবি সৌজন্যে : আনন্দবাজার পত্রিকা

মোঘল মসনদে তখন সম্রাট ঔরঙ্গজেব বিরাজমান । ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে বাংলার নানান স্থানে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায়ই প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। বলা হয়, তিনি নাকি জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় এই বিদ্রোহ দমনেই অতিবাহিত করেছিলেন। আর সম্ভবত, এই বিদ্রোহ দমনের মূল অস্ত্র হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বাংলার জমিদারদের। ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে তাই বাংলায় নতুন করে বহু জমিদারগোষ্ঠী জন্ম নেয়, পরবর্তীতে এদের মধ্যে অনেকেই স্বাধীন রাজাধিরাজরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। বর্ধমান রাজপরিবারের জন্মও তার বিপরীত ঘটনা নয়।
ভারতের শাসন ক্ষমতায় তখন মোঘল সম্রাট আকবর বিরাজমান। সেই সময় পাঞ্জাব থেকে পুরীতে তীর্থ ভ্রমনে আসেন ব্যবসায়ী সঙ্গম রাই। সঙ্গম রাই ছিলেন লাহোরের কোটলিমহল্লার বাসিন্দা। ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছে যান বাংলার বর্ধমান জেলায়। বর্ধমান জেলার নিকটে বৈকুণ্ঠপুরে তিনি বসতি স্থাপন করেন। সম্ভবত, সেইসময় পাঞ্জাবের রাজনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে তাঁর ব্যবসার বিশেষ ক্ষতি হচ্ছিল, তাই তিনি আর ফিরে যেতে চাননি। প্রথমে তিনি ক্যারাভানে করে ঘুরে ঘুরে মাল বিক্রি করতেন , অবশেষে একদিন এই যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি বৈকুন্ঠপুরে স্থায়ী হাট বসান।
সঙ্গম রাইয়ের ছেলে ছিলেন বঙ্কুবিহারী এবং তাঁর ছেলে ছিলেন আবু রাই। বর্ধমান রাজবাড়ির ইতিহাসে এই আবু রাই নামটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাংলার শাসনে ইতিমধ্যেই বসেছেন সম্রাট ঔরঙ্গজেব। পূর্বেই বলা হয়েছে, তাঁর শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে অগুনতি প্রজা বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তেমনই বাংলায় বারো ভূঁইঞা-র নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়। বাংলার এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট বিশাল এক সেনাবাহিনী পাঠান। কিন্তু ফিরতি পথে হঠাৎই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাংলায় প্রবল বর্ষণ শুরু হয়ে যায়। মুঘলসেনারা বর্ধমানে আটকে গেলে তাঁদের রসদ জোগায় এই আবু রাইয়ের হাট। ঔরঙ্গজেব কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পথ হিসাবে আবু রাইকে বর্ধমান পরগণার কোতোয়াল–’চৌধুরী’র পদ দেন। ১৬৫৭ সালে তিনি এই সনদ দিয়েছিলেন। এরপর ১৬৮৯ সালে তিনি এই আবু রাইয়ের নাতি, কৃষ্ণরাম রাইকে পুরোদস্তুর জমিদার করে দেন। কৃষ্ণরামের আমলে চন্দ্রকোণা ঘাটালের জমিদার শোভা সিংহ মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে, শোভা সিংহ কর্তৃক কৃষ্ণরাম নিহত হন, নিহত হন পরিবারের আরো পঁচিশজন সদস্য। কৃষ্ণরামের নাবালক পুত্র জগৎরাম কোন ক্রমে প্রাণে বেঁচে যান এবং ঢাকায় গিয়ে নবাবের কাছে আশ্রয় নেন। শোভা সিংহের মৃত্যুর পর তিনি আবার বর্ধমানে ফিরে যান এবং শোভা সিংহের আত্মীয়দের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন। বর্ধমানের জমিদারি ফিরে পেয়ে তিনি মাত্র পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন। ১৭০২ সালে তিনি মারা যান এবং ১৭০৭ সালে মারা যান সম্রাট ঔরঙ্গজেব। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর বাংলার শাসনভার নামে মাত্র মুঘলদের অধীনে ছিল বললেই চলে, বাংলায় তখন স্বাধীনভাবে নবাব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। বাংলার শাসন কেন্দ্র ঢাকা থেকে স্থানান্তর হয় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদ হয় বাংলার নতুন রাজধানী। তাই স্বাভাবিকভাবেই তখন দিল্লী অপেক্ষা মুর্শিদাবাদের উপর নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, তৎকালীন সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ উন্নত না হওয়ায় মুর্শিদকুলি খাঁ’এর পক্ষেও দিল্লীর উপর নির্ভর করা সম্ভব ছিল না। বাংলার জমিদাররাই ক্রমে তাঁর শক্তির মূল উৎস হয়ে ওঠে।
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল শাসনব্যবস্থা ক্রমশ ভেঙে পরতে থাকে। বাংলায় শুরু হয় মারাঠা আক্রমণ। জগৎরামের মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে কীর্তিচাঁদ ও মিত্রসেন। তাঁদের আমলে শুরু হয় মারাঠা আক্রমণ। মারাঠারা মূলত আক্রমণ চালাত উড়িষ্যা, মেদিনীপুর এবং বর্ধমানের পথে। বর্ধমান পড়ে যায় সমূহ বিপদের মুখে। বাংলাকে মারাঠা আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে বর্ধমানের জমিদারদের যে ভূমিকা থাকবে তা বলার অবকাশ থাকে না। এই সুযোগ নিয়েই বর্ধমানের জমিদাররা চন্দ্রকোণা, ঘাটাল, বিষ্ণুপুর এবং বীরভূমের ছোট ছোট জমিদারিগুলি নিয়ে এক বিশাল জমিদারি স্থাপন করেন। ফলে তাঁরা এক বিপুল প্রতিপত্তির মালিকানা লাভ করেন। এই সময়ে কীর্তিচাঁদ মুঘলদের অনুমতি নিয়ে তাঁর পুত্র চিত্রসেনকে রাজা বানিয়ে দেন। এক সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বর্ধমান পায় তাঁর প্রথম রাজা। চিত্রসেন সিংহাসনে বসেন ১৭৩৬ সালে। অপুত্রক অবস্থায় তিনি মারা যান। এই ছিল বর্ধমান রাজপরিবারের কাহিনী। চিত্রসেনের পরেও বহুকাল যাবৎ এই রাজকার্যে অব্যাহত ছিল।
বর্ধমানের এই রাজপরিবার নিয়ে এক কাহিনী প্রচলিত আছে। পলাশির যুদ্ধের পর যখন বাংলায় কোম্পানির দৌরাত্ম্য চলছে, তখন রাজা তেজচন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা অপশাসনের অজুহাত দিয়ে তাঁকে গৃহবন্দি করেছিলেন। প্রথম থেকেই কোম্পানির সাথে এই পরিবারের সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না। তেজচন্দ্রের ছেলে প্রতাপচন্দ্র, তেজচন্দ্রের জীবদ্দশাতেই মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ১৪ বছর পরে একজন নিজেকে প্রতাপচন্দ্র বলে দাবি করেন। ভাওয়াল রাজার প্রত্যাবর্তনের কাহিনী বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করলেও এই কাহিনী অনেকেরই অজানা। এই কাহিনী ‘জাল প্রতাপ মামলা’ নামে খ্যাতি লাভ করেছিল।
বর্তমানে বর্ধমানে যে রাজপ্রাসাদটি দেখা যায়, তা আসলে মূল প্রাসাদের অনেক পরে স্থাপন করা হয়। প্রথম প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল বর্ধমানের নিকট কাঞ্চননগরে। পরে মোট সাতটি প্রাসাদ নিয়ে এক কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়, যা বর্তমান প্রাসাদ।

তথ্য সূত্র – দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’।
চিত্রঋণ – আনন্দবাজার পত্রিকা।

More Articles

error: Content is protected !!