প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রের কিছু উপাচার, নারীর ত্বক বিষয়ক- শেষ পর্ব

By: Sourish Das

October 11, 2021

Share

চিত্রঋণ: গুগল

শরীরের ভারসাম্য বজায় –

উর্দু টিব্বি চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত দেহরস-এর ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এর উপর বেশি জোর দিয়ে থাকে। রক্ত, হলুদ পিত্ত, কফ এবং কালো পিত্ত এই চারটি দেহরসের ভারসাম্য বজায় রাখার উপরেই এই টিব্বি চিকিৎসা পদ্ধতি দাঁড়িয়ে আছে। দেহের ভারসাম্য বজায় রাখলেই প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকবে, এটাই এই চিকিৎসা পদ্ধতির মূল মন্ত্র। ঔপনিবেশিক সময়ের একাধিক উর্দু পুস্তিকায় এই ধরনের দেহরসের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, গায়ের রঙের সঙ্গে এই সমস্ত দেহরসের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও এই সমস্ত পুস্তিকায় জোর দেওয়া হয়েছে। দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দূষিত রক্ত, সবকিছুর জন্যই শরীরের রং খারাপ হয়। পাশাপাশি, রক্ত দূষিত থাকলে এবং এই ধরনের কোন বদ অভ্যাস থাকলে বৃক্কের সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক এবং তার প্রভাবে গায়ের রং খারাপ হয়ে যায় বলেও উল্লেখ এই সমস্ত পুস্তিকায়।

ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত দু’টি বিষয়ের উপরে কাজ করে। প্রথমটি হল, প্রতিজনের আলাদা আলাদা শারীরিক বিন্যাস এবং দ্বিতীয়টি হলো মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখা। যারা ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতির হাকিম, তারা সব সময় প্রত্যেকটি মানুষের জন্য আলাদা আলাদাভাবে ওষুধ তৈরি করেন। এই বিষয়টি নিয়েই নিজের পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন সুলতান জাহান বেগম। ‘হিফজ এ সিহ্যত’-এর একটি অংশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তিনি লিখেছেন, “প্রত্যেকে খাদ্যের অভ্যাস এবং প্রত্যেকের দেহের গঠন আলাদা আলাদা রকমের।” এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি মিষ্টি খাবার এবং ফ্যাট জাতীয় খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “স্থূল মহিলাদের কখনোই প্রচুর পরিমাণে মিষ্টি এবং ফ্যাট জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত নয়। বরং এই জাতীয় খাবার খেতে পারেন শীর্ণকায় মহিলারা। তাদের দেহে এইসব খাবারের প্রয়োজন আরও বেশি।”

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রকাশিত হওয়া একাধিক খাদ্য সম্পর্কিত পুস্তিকায় খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে একাধিক আলোচনা রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের দুটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি ইউনানি এবং আয়ুর্বেদ, দুটিতেই এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সুলতান জাহান বেগম এবং হাকিম ডাক্তার আজিমুল্লাহ দুজনেই তাদের পাঠকদের নিজেদের খাদ্যাভ্যাসের উপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আজিমুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, “শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মত পাকস্থলীর বিশ্রাম দরকার। যদি আপনি সব সময় কিছু না কিছু খেতে থাকেন, তাহলে আপনার পাকস্থলীকে সব সময় কাজ করতে হবে, যা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত হানিকারক।” তারা দুজনেই খাদ্যের সময় নিয়েও আলোচনা করেছেন এই সমস্ত পুস্তিকায়।

সঠিক গায়ের রং –

ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় রচিত স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পুস্তিকার মূল বিষয়বস্তুটি হল মহিলাদের ত্বকের রং। এর জন্য বিভিন্ন পুস্তিকায় বিভিন্ন ধরনের খাবার, এবং বিভিন্ন নুসখা(টিপস)-এর উল্লেখ রয়েছে। হাকিম এবং বৈদ্য থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ঘরোয়া চিকিৎসা পুস্তিকা, সবকিছুতেই বাড়িতে তৈরি ত্বকের যত্ন নেওয়ার উপাদান, বাড়িতে তৈরি প্রসাধনী সামগ্রী এবং নিত্যনতুন বিভিন্ন রান্নার উল্লেখ সব জায়গাতেই মেলে। ম্যাগাজিন, পত্রিকা এবং একাধিক পুস্তিকাতে এইরকম ধরনের বহু টিপসের উল্লেখ পাওয়া যায়। বহু প্রজন্ম ধরে এই ধরনের টিপস মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই সমস্ত টিপস প্রথমবার ছাপানো হিসাবে আসে এই ধরনের উর্দু পুস্তিকাগুলিতে।

কাবলি ছোলার ছাতু, ইউনানী হাসপাতাল থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করে একাধিক প্রসাধনী সামগ্রী তৈরির বিষয় নিয়ে উল্লেখ পাওয়া গেছে একাধিক উর্দু পুস্তিকায়। ভোপালের বেগম সাহেবাও নিজের পুস্তিকায় লিখেছিলেন, “ভালো গায়ের রঙ হলো ভগবানের দান, কিন্তু সেটাকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে আপনাকে পরিশ্রম করতে হবে। আপনাকে শক্তিশালী হতে হবে, সঠিক আহার গ্রহণ করতে হবে, শরীরচর্চা করতে হবে, তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যেতে হবে।” পুরাতন টিব্বি চিকিৎসা পদ্ধতিতে এরকম কিছু নুস্কার ব্যাপারে জানা যায়। যদি ত্বকের রঙ কোন ভাবে খারাপ হয়ে যায়, কিংবা ত্বকে কোন রকম সমস্যা দেখা যায়, সেটা কিভাবে সঠিক করতে হবে সেই নিয়েও একাধিক পুস্তিকায় একাধিক আলোচনা রয়েছে।

জাহান বেগমের পুস্তিকার ত্বকের রঙ নিয়ে লেখা অংশের দুটি প্রধান বিষয় ছিল, পরিষ্কার গায়ের রং এবং খারাপ রংকে ভালো করার পদ্ধতি। তার পুস্তিকায় তিনি বার বার উল্লেখ করেছেন, কিভাবে গায়ের রং ফর্সা করা যায় সেই নিয়ে। দুধ, ডিমের সাদা অংশ, জুঁই ফুলের তেল, এবং সাদা মোম, সবকিছু মিলিয়ে একটি বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করার বিষয়ে তিনি লিখেছেন তার পুস্তিকায়। তার কথায়, এই মিশ্রণটি যদি মুখে লাগিয়ে ভালোভাবে মাসাজ করা যায় তাহলে মুখের রং আরও উজ্জ্বল হবে। পাশাপাশি, বেসন দিয়ে মুখ ধোয়া, ডিম এবং ময়দার মিশ্রনের মাধ্যমে মুখের কালো দাগ দূর করা এবং আরো অনেক কিছু নিয়েই এই পুস্তিকায় উল্লেখ রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতির মধ্যেই এই ধরনের রীতিনীতি এবং ত্বকের চর্চার পদ্ধতি বিপুলভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আজকের দিনের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও এই পুরনো ঘরোয়া ত্বক চর্চার পদ্ধতিগুলি সমানভাবে জনপ্রিয়। ফ্যামিলি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে শুরু করে, ইউটিউবের বিভিন্ন বিউটি চ্যানেল, সব জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়েছে এই ধরনের ত্বক চর্চার পদ্ধতিগুলি, যেগুলির আদি উৎস ছিল বিংশ শতাব্দীর আয়ুর্বেদ এবং ইউনানি নির্ভর ঘরোয়া চিকিৎসার বিভিন্ন পুস্তিকাগুলি।

More Articles

error: Content is protected !!