অটিজমের মোকাবিলায় সমন্বয় বজায় রাখুন, পাবেন সুফল, বলছে সমীক্ষা

By: Susen

September 10, 2021

Share

চিত্র ঋণ : Google

সুসেন: শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশিষ্ট সমাজসেবী সংগঠন উত্তরণের উদ্যোগে এবং প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে শিশুদের অটিজম সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে বেশ কিছু জরুরি তথ্য।

তুষার, ২ বছরের শিশু -এখনও কোনও কথা বলে না। যদিও সে সবকিছু শুনতে পায়। তার বাবা-মা খুবই চিন্তিত কেননা ঐ বয়সে তার বড় বোন অনেক কিছুই বলতে পারত, তুষার বাবা-মা বা অন্য কারোর দিকে চোখ রেখে তাকায় না, সে কোনও খেলার জিনিস পছন্দ করে না, তবে প্লাসটিক পেপার নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। সে টেলিভিশন দেখতে চায় তবে একই ছবি বারবার দেখতে পছন্দ করে। আর কাজে বাধা দিলেই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। 

তিন বছরের শুভম,বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তার বাবা-মা খুবই চিন্তিত কেননা বাবা-মা ছাড়া অন্য কেউ তার ভাষা, তার প্রয়োজন বুঝতে পারে না; একই শব্দ বারবার বলতে থাকে কিন্তু তার প্রয়োজনীয় জিনিস নির্দিষ্ট ভাবে বলে চেয়ে নেয় না। প্রয়ােজন হলে সে নিজেই তা জোগাড় করে অথবা বড়দের কারাের হাত ধরে টেনে এনে নিয়ে নেয়। সে কোনও সময় স্থির হয়ে বসে না বরং সারাদিন ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং এক জায়গায় বসলেই দুলতে থাকে। হঠাৎ কখনও চেয়ার-টেবিলে উঠে নিজেই কোনও জিনিস পাড়তে গিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত লাগে। কোথাও কেটে বা ফেটে গেলেও তার ভ্রুক্ষেপ থাকে না। 

অটিজমের মোকাবিলায় সমন্বয় বজায় রাখুন, পাবেন সুফল, বলছে সমীক্ষা

চিত্র ঋণ : Google

পাঁচ বছরের নীলাঞ্জনা,বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। সে সব কথা আগে বলত কিন্তু এখন যেন অনেক কথা ভুলে যাচ্ছে বড় হওয়ার সাথে সাথে; সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে চায় না; কখনই কারাের চোখের দিকে চেয়ে কথা বলে না, প্রায়শই অকারণে হাত তালি দেয় অথবা শরীরটাকে অস্বাভাবিক রকমের বাঁকাচোরা করতে থাকে, একইরকম ভাবে এরকম আচরণ করে একটানা অনেক সময় ধরে। 

উপরের তিনজন শিশুর মধ্যে লক্ষ্য করলেই বােঝা যাচ্ছে তাদের ব্যবহার এবং সামাজিক আচরণ স্বাভাবিক নয়। এই ধরণের ঘটনা কিন্তু সংখ্যায় খুব একটা কম নয় প্রায় প্রতি ১০০০ (এক হাজার) শিশুর মধ্যে ৬ – ৭ জন, সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। ওই সমীক্ষাতেই পাওয়া তথ্যসূত্রে দেখা গিয়েছে সেরিব্রাল পলসি (C.P.বা Cere bral Palsy) বা ডাউনস সিন্ড্রোম (Down’s Syndrome) -এর থেকেও এই রােগের সংখ্যাটা বেশি, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা যথেষ্ট কম। শিশুদের এই ধরণের অসুখকে অটিজিম (Autism) বলে।

অটিজিম (Autism) কি ? এই সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসক সুপর্না বসু মল্লিক জানাচ্ছেন–

শিশুদের বৃদ্ধিজনিত (Developmental) সমস্যা যা বােঝা যায় সাধারণত ১/২ (দেড়) বছর থেকে ৩ বছরের মধ্যে যেখানে শিশুটি দেরিতে অথবা অস্বাভাবিকভাবে কথা বলে বা ওই ধরণের অঙ্গভঙ্গিতে অন্যের সঙ্গে সংযােগ স্থাপন করে। তার সামাজিক ব্যবহারও অন্য শিশুদের মত নয়। 

এই ক্ষেত্রে প্রশ্ব ওঠে কখন অটিজিম সন্দেহ করবেন ? চিকিৎৎসক অরিন্দম বিশ্বাসের পরামর্শ

১) 12 মাস বয়সের মধ্যেও যদি শিশুটি কোনও রকম মুখে শব্দ না করে।

২) 12 মাস বয়সের মধ্যেও আঙ্গুলের ইশারায় বা হাবেভাবে কিছু চায় না |

৩) 16 মাস বয়সের মধ্যেও একটাও শব্দও উচ্চারণ করে না। 

৪) 24 মাস বয়সের মধ্যে দু’টো শব্দের কোনও বাক্য গঠন করতে পারে না।

৫) ২৪ মাসের মধ্যে তার কথা কিছুই বােঝা যাচ্ছে না।

৬) স্থির ভাবে কোনও জিনিসে মনােনিবেশ করতে পারছে না। [

৭) যে কোনও বয়সে এমনটা যদি হয় যা বলতে শিখেছিল বা সামাজিকতা শিখেছিল তা যেন ক্রমশঃ ভুলে যাচ্ছে। 

অটিজিম রােগটির ব্যপ্তি কতটা ?  চিকিৎসক সঞ্জয় সূদের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী

মনে করা হয় প্রতি ১১০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এই রােগে আক্রান্ত ; তবে অধুনা রােগ নির্ণয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ধরা হচ্ছে প্রতি ৮৮ জনে ১ জন শিশু আক্রান্ত। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সমীক্ষায় জানানো হচ্ছে প্রতি ৩৮ জন শিশুর যারা স্কুলে যাচ্ছে তাদের ১ জন এই রােগে আক্রান্ত, নয়া দিল্লির অন্য একটা হিসাব বলছে ২৫০ জনে ১ জন এই সমস্যায় প্রভাবিত। ছেলেদের মধ্যে প্রবণতা মেয়েদের থেকে প্রায় চার গুণ।। 

অটিজিম আক্রান্ত শিশুদের লক্ষণগুলি কি কি ? সমীক্ষায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাঃ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন–

ক) সংযােগস্থাপনে সমস্যা । (i) কথা না বলা ( Non-verbal) – তার নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। কখনও যেন মনে হয় সে শুনতেই পাচ্ছে না, যদিও কানে শুনতে তার কোনও অসুবিধা নেই। বাচ্ছাটা কখনও অন্যকে বােঝাতে পারে না সে কি চাইছে। তার প্রয়ােজনীয় জিনিস বড়দের কাউকে হাত ধরে টেনে এনে চাইতে থাকে অথচ মুখে চাইতে পারছে না। সে যে জিনিসটা চাইছে তার দিকে আঙ্গুল না দেখিয়ে সে তার বাড়ানাে হাতের দিকেই চেয়ে থাকে। 

(ii) কথা বলা (verbal) – কথা শিখতে ও বলতে দেরী হচ্ছে। কিছু কিছু শব্দ বা কথা বলতে পারছিল আগে কিন্তু এখন ক্রমশঃ তাও ভুলে যাচ্ছে। একই শব্দ বা একই কথা বারে বারেই বলে চলেছে। তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় “তােমার নাম কি ?” সেও বলবে “তােমার নাম কি?” সে হয়ত কিছু বলতে শিখেছে কিন্তু একদমই কথা ঢালিয়ে যাবার ক্ষমতা হচ্ছে না। কখনও দেখা যাচ্ছে ‘‘আমাকে বলতে গিয়ে সে “তােমাকে” বলছে । 

খ) সামাজিক সংযোগস্থাপনে সমস্যা? 

তার দিকে চেয়ে হাসলে সে প্রত্যুত্তরে হাসছে না। চোখের দিকে তাকিয়ে কখনই কথা বলতে আগ্রহী নয়। তার সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে অভ্যস্ত নয় বরঞ্চ একা একাই খেলতে ভালােবাসে। কোনও কাজেই বড়দের সাহায্য নিতে চায় না। বােকা বােকা শূণ্যে তাকিয়ে থাকে প্রায়শই, শুধুমাত্র নিজের পছন্দের জিনিসের দিকেই তাকিয়ে থাকে। যেন নিজস্ব একটা জগতে সে বিচরণ করে। পরে একটা খেলনা রাখা হছে – বাচ্ছাটা খেতে পাচ্ছে – অথচ সে দিকে আগ্রহ নেই। বড়দের আচরণ দেখেও নকল করতে চায় না। 

গ) অস্বাভাবিক ব্যবহার : স্বাভাবিক পড়াশােনায় তার মন নেই। পারিপার্শ্বিক অবস্থায় বা কোনও বিপদের সম্মুখীন হয়েও সে যেন অবিচল থেকে যায় – একটা ছুটন্ত গাড়ীর সামনেও সে আপন ইচ্ছাতেই ছুটে যায় অথবা আগুনের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে অথবা বিপদের কথা তার মাথাতেই থাকে না। তাকে উপহাস করলে বা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করলে সে যেন গুরুত্বই দেয় না। অনেক সময়েই অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে, যেমন হাততালি দিচ্ছে তাে দিচ্ছেই, পা দোলাচ্ছে তাে দোলাচ্ছেই। সে অন্যের সঙ্গে কোনও রকম খেলাধূলা করতে চায় না। কোনও খেলনা পেয়েও নয়। বেশীর ভাগ সময়ই খেলনা ছুঁড়ে ফেলে নয়ত আছড়ে ভেঙে ফেলে। নকল করে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে অভ্যস্ত নয়। প্রায়ই দেখা যায় ছােটো ছােটো কোনও বস্তুকে একই ভাবে, একইরকমে সাজাতে থাকে বারে-বারেই। কখনও কখনও এই সমস্ত বাচ্ছারা ভীষণ ছটফটে, সব সময় ছুটে চলেছে নিজস্ব ভঙ্গিতে, নিজস্ব ভাবনায়। প্রত্যেকদিনে একই রুটিন ধরে চলে – পরিবর্তন করলেই বাধা দেয় – পারিপার্শ্বিক অবস্থা পাল্টালেই বিরক্ত হয়। ঘ) অটিজিম বাচ্ছাদের মধ্যে এটাও কখনও কখনও দেখা যায় ।আঙ্গুলের ওপর ভর করে চলতে থাকে, সব জিনিসই মুখে দেয়, কামড়ে জিনিস নষ্ট করে; কখনই আঘাতে যেন ব্যথা অনুভব করে না। সব জিনিসে গন্ধ শুকতে থাকে। শব্দ শুনলেই কানে দু’হাত চেপে ধরে যেন শব্দ পছন্দ করছে না, কোনও আলাে জ্বলতে দেখলে যেন ঘাড় বেঁকিয়ে অন্যভাবে আলাের দিকে তাকায়। খাবার। সময় যেন কতকগুলাে নির্দিষ্ট জিনিসই খেতে চায়। কেউ কেউ সব সময় লাফাতে থাকে অথবা শুধুই ঘুরপাক খেতে থাকে। 

যৌথ প্রচেষ্টা বা teamwork -এর ভিত্তিতে বাবা-মায়েরা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে ও চিকিৎসকদের পরামর্শে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের সাহায্যে একমাত্র এই Autism আক্রান্ত শিশুদের অন্তত ভাল রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ এই রোগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সারা জীবনের অসুখ। জানাচ্ছেন মনরোগ বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রনীল রায়।

তথ্য্যসূত্র – অটিজম সংক্রান্ত সামাজিক সমস্যার সমীক্ষা -উত্তরণ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা

চিকিৎসকদের মতামত – প্রশ্নের ভিত্তিতে প্রতিবেদকের নেওয়া। 

 

 

 

More Articles