রূপান্তরকামীদের আরাধ্য মোরগবাহন বহুচরা দেবী, অচেনার তালিকায় এক রহস্যময় সংযোজন

“সওদাগর কহে দেখ মাতাজি’র ছল/ পুরুষ নারী কিছু নয়, মানুষই আসল”

সুকথার কোনও কর নেই, আশ্বাসের কোনও মেয়াদ নেই। অর্ধনারীশ্বর বা মোহিনীর গল্পে হাততালি নেই, ছক্কা বা লেডিজ নেই। এসব যেখানে রয়েছে সেখানে কেবলই অন্ধকার গলি, মুখ টিপে হাসি, ঘৃণা আর মূলস্রোতে ফেরাতে হবে বলে খুচরো শব্দখরচ। মূলস্রোতটা যে কী, কারাই বা কেন মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল এ প্রশ্ন শতাব্দীর সেরা তার্কিককেও ঘোরে ফেলে দেয়। মানুষ হইল কী হইল না তা নয়, পুরুষ হইল নাকি নারী এই আবর্তে পড়ে রয়েছে আমাদের বিশ্বলোক। পুরাণকে যারা ইতিহাস বলে চালায়, তারা নিপাট ছাঁকনিতে সঠিক পুরুষ বা খাপের খাপ নারী চরিত্রগুলো তুলে তুলে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেনহিসেবে যাদের ফেলে রাখে তাদের গল্পগুলো জানা হয় না। জানা হয় না বলেই দীর্ঘকাল ধরে হিজড়ে সম্প্রদায়ের বা রূপান্তরকামীদের আরাধ্য দেবীও যে এই উপমহাদেশে পূজিত তার আখ্যান হালে পানি পায় না।

গুজরাতের মেহসানা জেলার বেচারাজি শহরে বহুচেরার মন্দির। বাহন মোরগ, এক হাতে বরাভয় মুদ্রা অন্য হাতে তরবারি। যৌনতা, লিঙ্গচ্ছেদ করে অন্য লিঙ্গপরিচয় গ্রহণ, নারীত্ব এবং পুরুষত্ব একই দেহে থিতু করা বা সহজ কথায় পেশায় হিজড়ে যারা তাঁদের ইষ্ট দেবতার স্থানে রয়েছেন বহুচরা বা বহুচেরা মাতা। গুজরাতের এলিট সম্পদ্রায়ের ঘরে জল বাতাসা না পেলেও একটা বড়ো গোষ্ঠীর মানুষের কাছে দেবীর মাহাত্ম্য অসীম, এবং ধর্ম নির্বিশেষে শিষ্য সংখ্যাও নেহাত অপ্রতুল নয়।


আরও পড়ুন-গুড়ের নাম নলেন কেন! আজকের বাঙালি কি কদর বুঝবে এই গুড়ের


হিজড়ে এবং রূপান্তরকামীদের দেবী বহুচরাকে নিয়ে যে গল্পটি সর্বাধিক প্রচলিত তাতে জানা যায় গুজরাতের চরণ বাপাল ও দেভালের কন্যা বহুচরা এবং তার বোনেরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাপিয়া নামের এক ডাকাত তাদের পথ আটকায়। নিজেদের ডাকাতদের হাতে অত্যাচারিত হওয়া ও ধর্ষণ হওয়া আটকাতে নাকি বহুচরা প্রথম তলোয়ার দিয়ে নিজের দুইখানি স্তন কেটে ফেলে। বহুচরার পথেই বাকি মেয়েরাও নিজেদের স্তন কেটে ফেলে। গল্প বলে, বহুচরা বাপিয়াকে পুরুষত্বহীনতার অভিশাপ দেয়।


“আট দেহ শুয়ে আছে ষোলোখানি স্তন/ মাটিতে লুটায়ে আছে ফুলের মতন/ ষোলোটি কদম্ব গাছ পরদিন ওঠে/ আটখানি পাহাড় সেইখানে ফুটে/ বাপিয়া ডাকাইত সহ যতেক পাষণ্ড/ পরদিন তাহাদের খসে যায় অণ্ড।” 
বহুচরার অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ বহুচেরাই বাতলে দেন, বাপিয়া সহ বাকি ডাকাতরা যদি মেয়েদের পোশাক পরে বহুচরার পুজো করে তার শরণাপন্ন হয় তবেই মুক্তি। 


বহুচরা দেবীকে ঘিরে এই ধরনের গল্প রয়েছে আরও। কাহিনি অনুযায়ী, এক রাজা পুত্র কামনায় বহু মানত করার পরে তার এক পুত্র জন্মায়, কিন্তু জন্ম থেকেই তার যৌনাঙ্গ বিকৃত। এই রাজার পুত্র পরে বহুচেরা দেবীকে স্বপ্নে দেখেন। যেখানে দেবী নাকি তাকে নিজের যৌনাঙ্গ কেটে ফেলে মহিলাদের পোশাক পরে দেবীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে নির্দেশ দেন। বহুচেরার আশীর্বাদের গল্পে অবশ্য শুধুই হিজড়ে হওয়ার কাহিনি নেই, অদ্ভুতভাবে রয়েছে রূপান্তরণের গল্প, রূপান্তরিত দেহে সন্তানধারণের সম্ভাবনার কথাও।


তেজপাল নামে এক সওদাগরের গল্পে পুরুষের সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা না থাকার আক্ষেপের উত্তরে দেবীর আখ্যান বলে, “তেজপাল করজোড়ে জানাল আকুতি/ দেবী কন তুমি বাছা হয়ে আছো কোতি।” কোতি হয়েও সংসারে টিকে থাকতে হলে দেবীর শরণাপন্ন হওয়াই মূল নিদান, তাই “বাহিরে পুরুষ-চিহ্ন অন্তরে জেনানা” হলে বহুচেরার নির্দেশ, “পুরুষ-চিহ্ন মোরে উৎসর্গ করিও/ পুরুষের বাস ছাড়ি স্ত্রীবাস পরিও।” কাস্ট্রেশন বা লিঙ্গচ্ছেদ এবং পেশায় হিজড়ে হয়ে জীবনধারণের গল্প বহুচেরা দেবীর আখ্যানে রয়েইছে। রয়েছে নিজের সন্তানহীনতাকে অন্যের সন্তানকে ভালোবেসে আশীর্বাদে বদলে দেওয়া। “নাই তন্ত্র নাই মন্ত্র বাজাইবা ঢোল/ জয় জয় মাতাজি কি এই হল বোল।/ পৃথিবীর যত শিশু জানিও তোমার/ দিল মাঝে ভালোবাসা রাখিও অপার।” 


কিন্তু দিলে ভালোবাসা রাখাটাই যথেষ্ট কি? গর্ভের প্রতি পিতৃতন্ত্রের অসীম প্রত্যাশা। সুতরাং পুরুষের রূপান্তরিত নারী দেহে শারীরিক ভাবে সন্তানের জন্ম দেওয়ার কথাও গল্পে এসেছে। নিজের লিঙ্গচ্ছেদ করেও তেজপাল স্বপ্ন দেখে, “একদিন মাতা আসি দেখন স্বপনে/আশা আমি পূর্ণ দেব যাহা আছে মনে/ সওদাগর দেখে এক আশমানি আলো /কী আশ্চর্য সওদাগরের দেহে ঢুকে গেল।” শুধু ঢুকে গেল না, স্তনের গঠন এবং স্ফীত উদরের পাশাপাশি নাকি “দুই মাস পরে তার অরুচি হইল/ তিনমাস পরে মুখে খাট্টা উঠিল।”


বহুচরাকে একজন রাজকন্যা রূপেও দেখা হয়েছে গল্পে। যেখানে তার স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তার। প্রতি রাতেই জঙ্গলে বেরিয়ে যেতেন ‘মেয়েদের মতো’ এই পুরুষ। স্বামীর পিছনে গিয়ে একদিন অন্য এক পুরুষের সঙ্গে তাকে যৌনতা করতে দেখেন বহুচেরা। বহুচেরা সেখানেই স্বামীর লিঙ্গচ্ছেদ করেন এবং এই ধরনের মানুষরা তার পুজো করলে নিরাপদে থাকবে এই বিষয়টিও নিশ্চিত করেন। 


বহুচেরার বাহন মোরগ। বিশ্বাস অনুযায়ী মোরগের ডাক মানুষের ঘুম ভাঙায়, নতুন দিনের সূচনা ঘটায় অর্থাৎ নিজের ভেতরে থাকা দ্বিতীয় সত্ত্বাকেও জাগায়। নিজের শরীর এবং মনের দ্বন্দ্ব রূপান্তরকামীদের কাছে যে গভীর সংকট তার মধ্যেকার নতুন যাপনকে গ্রহণের চিহ্ন হিসেবেই মোরগ। মোরগ নিষ্পাপ চেতনার প্রতীক হিসেবে বহুচেরার বাহন হলেও বিজ্ঞানে মুরগিদের আপনা থেকেই যৌন রূপান্তরণের বিষয়টিও সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ। মোরগ মুরগিদের মধ্যে আপনা থেকেই লিঙ্গ বদলে যাওয়ার ঘটনাটি অস্বাভাবিক না।


সাধারণত স্ত্রী মুরগির শরীরের বাঁদিকে একটিই কর্মক্ষম ডিম্বাশয় থাকে। যদিও ভ্রূণ হয়ে থাকার সময় সমস্ত পাখিরই দেহে পুরুষ এবং স্ত্রী দুই যৌনাঙ্গই থাকে। মুরগির জিনগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হলে তা কেবল বাঁদিকের ডিম্বাশয়টিরই বৃদ্ধি ঘটায়। কিন্তু অসুখজনিত কোনও কারণে মুরগির বাঁদিকের ডিম্বাশয়টি কর্মক্ষমতা হারালে ডানদিকের অন্য সুপ্ত যৌনাঙ্গগুলি বৃদ্ধি পেতে পারে। সেখানে থেকে অ্যান্ড্রোজেন ক্ষরণ হতে পারে যা পুরুষ বৈশিষ্ট্যগুলির নির্ধারক। কিন্তু এক্ষেত্রে মুরগি বহিরাঙ্গে মোরগ হলেও, জিনগতভাবে সে স্ত্রীই। 


বহুচরার বাহন মোরগ বিষয়ে একটি অন্য অনুষঙ্গ (মিথ) মেলে ইতিহাসে। সুলতান দ্বিতীয় আলাউদ্দিন (খুনি আলাউদ্দিন নামে পরিচিত) গুজরাতের রাজধানী পাটান দখল করে নেন এবং হিন্দু মন্দির ধ্বংস করতে থাকেন। সিধপুরের রুদ্রমালা ধ্বংসের পর বহুচরা মন্দিরের দিকে এগোন আলাউদ্দিন। পথমধ্যে প্রচুর মোরগ ছিল, অর্থাৎ বহুচেরার বাহন। কথিত আছে, আলাউদ্দিনের সেনারা সেই মোরগদের ধরে খেয়ে ফেলে। একটি মাত্র মোরগ প্রাণ বাঁচিয়ে পালায়। রাতে সেই মোরগের ডাক শুনে সৈন্যদের পেট চিরে বাকি মোরগরা বেরিয়ে আসে। সৈন্যদের মৃত্যু দেখে বিধ্বস্ত আলাউদ্দিন বহুচেরার মন্দিরে যান ক্ষমা চাইতে এবং মন্দির না ভাঙার প্রতিশ্রুতিও দেন। সেই মোরগদের নিয়ে কামালিয়া জাতি তৈরি করেন বহুচরা। যারা নিজেদের প্রথা অনুযায়ী মুখের একাংশে গোঁফ রাখেন এবং উলটো দিকের হাতে চুড়িও পরেন। অর্থাৎ একই দেহে পুরুষ আবার নারীর সামাজিক চিহ্নিতকরণ বা কাস্ট্রেশনকে নেপথ্যে রেখে শরীরী সাজে বদল এনে নিজের শিষ্য বাড়ানোর গল্প অটুট। হিন্দু ও মুসলমান দুই ধর্মেরই কিছু মানুষ কামালিয়া জাতির এই প্রথা মেনে চলেন। 


ট্রান্সজেন্ডার অধিকার আন্দোলন যে পথে এগোতে চায়, বারে বারে সন্তান, যৌনতা আর পিতৃতন্ত্রের পরিচিত গল্পগুলো এসে আন্দোলনের পথ বিভ্রান্ত করে। দেবদেবীকে সামনে রেখে যে ক্ষমতায়নের গল্প শোনানো হয় তার নেপথ্যেও একইভাবে পিতৃতন্ত্রেরই বিশাল ছায়া। রূপান্তরণ আসলে ইচ্ছার নাম, যে ইচ্ছার কিন্তু সামাজিক লিঙ্গপরিচয়ের ধার ধারার কথাও না। অথচ গোঁত্তা খেতে খেতে আন্দোলন কোথাও বিবাহ আর সন্তানকেন্দ্রিকতা থেকে বেরোতে পারে না। বহুচরার পাঁচালি তেজপালের রূপান্তরিত দেহে পুত্রসন্তানেরই জন্মের গল্প লেখে। আর ইচ্ছের গল্প যারা লিখছেন তাঁদের সফরটাই ইতিহাস হবে একদিন, মানুষের ইতিহাস। 

 

ঋণ- হলদে গোলাপ; স্বপ্নময় চক্রবর্তী

More Articles

;