বারাসাতের ৫০০ বছর পুরোনো এই কালীবাড়ির সঙ্গে জড়িত আছে রঘু ডাকাতের নাম !

By: Sourish Das

November 5, 2021

Share

বহু পুরনো সময় থেকেই অবিভক্ত বাংলাদেশে ডাকাতির সঙ্গে কালীপুজোর এবং তন্ত্রসাধনার একটা আলাদা যোগাযোগ রয়েছে। বহু বছর ধরেই ডাকাতরা কালীপুজো করে আসেন। আগেকার দিনে যারা ডাকাত ছিলেন তারা ডাকাতি করতে যাবার আগে কালী পূজা করতেন বলে শোনা যায়। তবে তাদের পূজার রীতিনীতি আলাদা রকমের ছিল। আজকের যেরকম আধুনিক পুজোর রীতিনীতি রয়েছে তার থেকে বেশ কিছুটা আলাদা ভাবে পূজা করতেন ডাকাতরা। কিছু জনশ্রুতির দৌলতে সেই ইতিহাসের কিছু কিছু তথ্য আমরা এখনো জানতে পারি। বাংলার বুকে বহু পিঠস্থান নির্মাণে বাংলার পুরনো দস্যু এবং ডাকাতদের বেশ কিছু অবদান রয়েছে বলে জানা যায়।

 

পুরনো ইতিহাস ঘাটলেও ডাকাত দলের সঙ্গে কালীপুজোর কিছু ঘটনা জানা যায়। এই বাংলায় কালী পূজার সূচনাও বেশকিছু ডাকাতের হাত ধরেই। বর্তমানে বাংলায় বেশ কিছু জায়গায় বেশকিছু কালীবাড়ির অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেও সবথেকে বেশি রয়েছে ডাকাত কালীবাড়ি। কলকাতায় এবং কলকাতার আশেপাশে যে কয়টি ডাকাত কালীবাড়ি জনপ্রিয়তার মধ্যে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় হলো পূর্ণদাস রোডে ডাকাত কালীবাড়ি এবং বারাসাতের মধ্যমগ্রামের ডাকাত কালীবাড়ি।

 

যে কয়টা জায়গার কালীপুজো সবথেকে জনপ্রিয় তার মধ্যে অন্যতম হলো উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত। কালীপুজোর কথা উঠলেই সবার আগে আমাদের মনে বারাসাতের নাম ভেসে আসে। সারাবাংলায় সবথেকে জনপ্রিয় দুর্গাপুজো যেমন কলকাতায়, তেমনি সবথেকে জনপ্রিয় কালীপুজো সবথেকে জনপ্রিয় বারাসাতে। বারাসাতের কিছু নামকরা কালী পূজার মধ্যে অন্যতম হলো কেএনসি রেজিমেন্টের মত ক্লাব। কিন্তু বারাসাতে একটা কালিবাড়ি রয়েছে যাতে প্রায় ৫০০ বছর ধরে পূজিতা হন মা কালী। আর সেই কালিবাড়ির সঙ্গে জড়িত রয়েছে রঘু ডাকাতের নাম। আগেকার দিনে ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাতের নামে বারাসাতের মধ্যমগ্রামে রয়েছে একটি ডাকাত কালীবাড়ি। সেই ডাকাত কালী বাড়ির কিছু গা ছমছমে ইতিহাস নিয়েই আজকের আলোচনা।

 

উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে এই ডাকাত কালীবাড়ি অবস্থিত। মধ্যমগ্রামের বাদু রোড এর উপরে এই ডাকাত কালীবাড়িটি অবস্থিত। ডাকাত কালীবাড়ি নাম শুনলেই কেমন একটা গা ছমছমে ভাব আসে। আর এই মন্দিরের সঙ্গে যে ডাকাতের নাম জড়িয়ে রয়েছে তিনি হলেন ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাত। ৫০০ বছর ধরে একটানা এই কালীবাড়িতে মা কালীর পুজো হয়ে আসছে নিয়মনিষ্ঠা ভরে। এই কালীবাড়িতে একটি বটগাছতলাও আছে যা এই কালীবাড়িকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

 

শোনা যায়, কালিবাড়ির এই বটগাছতলা ছিল ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাতের একমাত্র আস্তানা। বিভিন্ন রাজবাড়ী থেকে ডাকাতি করে রঘু ডাকাত এখানেই আসতেন সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে। তিনি ছিলেন কালী ভক্ত। তিনি যখন ডাকাতি করতে যেতেন তার আগে মা কালীর কাছে মানত করে যেতেন। তখন থেকেই এই কালীবাড়িতে পুজো হয়ে আসছে মা কালীর। তবে, বর্তমানে মন্দির বলতে রয়েছে ওই একটি বটগাছ। এই মন্দিরে কোন বিগ্রহ দেখা যায় না। বর্তমানে ওই বটগাছের গোড়াটাকে পুজো করা হয় মা কালীর বিগ্রহ হিসেবে।

 

সঙ্গেই এই মন্দিরে পুজো করার বেশ কিছু নিয়ম-নীতি রয়েছে। এই মন্দিরে কোন পুরোহিতের প্রবেশ নিষেধ। ঈদে পুজো করতে হয় তাহলে মন্দিরের বাইরে প্রতিমা রেখে পুজো করতে হবে। সেইমতো প্রত্যেক অমাবস্যায় এবং কালীপুজোর দিন সারারাত ধরে কালী মায়ের পুজো করা হয় এই ডাকাত কালীবাড়িতে। প্রথম দর্শনে এই বাড়িটিকে পোড়ো বাড়ি কিংবা ভুতুড়ে বাড়ি হিসাবে মনে হলেও বাদু কাজীপাড়া অঞ্চলের এই কালীবাড়িকে ঘিরে অসংখ্য জনশ্রুতি এখনো ঘোরাফেরা করে।

 

রঘু ডাকাতের আরাধ্যা কালীমূর্তি এখন আর এই বাড়িতে না থাকলেও রঘু ডাকাতের সঙ্গে জড়িত বটগাছকেই কালীমূর্তি হিসেবে পূজা করা হয়। কথিত আছে, একটা সময় দলবল নিয়ে এই বটগাছতলায় আস্তানা গেড়েছিলেন রঘু ডাকাত। কালীভক্ত হবার কারণে তিনি ওই বটগাছ তলায় একটি অষ্টধাতুর কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মূর্তিটি কে পুজো করে ডাকাতি করতে যেতেন রঘু ডাকাত। স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে শোনা যায়, একটা সময় নাকি সামন্ত রাজাদের লেঠেল বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন রঘু ডাকাত। সেই সময়ের আগে তলোয়ার দিয়ে ওই কালী মূর্তি ভেঙে দিয়েছিলেন রঘু ডাকাত নিজেই।

 

পরবর্তীতে ওই ভাঙ্গা মূর্তিতেই তিনি পূজা করতেন। দীর্ঘ বেশ কয়েক যুগ ধরে ওই ভাঙ্গা মূর্তিতে কালী পূজা করতেন তার বংশধররা। পরবর্তীতে ওই পূজা চালিয়ে যান এলাকার বাসিন্দারা। তবে, বছর কয়েক আগে হঠাৎ করেই ওই মন্দির থেকে রঘু ডাকাতের সেই কালি বিগ্রহটি চুরি হয়ে যায়। তারপর থেকে এলাকার বাসিন্দারা ওই বটগাছকে কালী মায়ের মূর্তি হিসেবে পুজো করে আসছেন। মন্দিরের সম্পূর্ণ অংশটাকে ইতিমধ্যেই ঘিরে ফেলেছে ওই বটগাছটি। মন্দিরের ছাদ আটকে আছে শুধুমাত্র বটগাছের শক্ত শক্ত ঝুরিগুলির জন্য।

 

যশ হোক কিংবা আম্ফান, শত বাধা-বিপত্তি আসলেও মন্দিরের ছাদের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। একটা ইটও খসে পড়ে যায়নি ওই মন্দিরের ছাদ থেকে। স্থানীয়রা বলেন, ওই বট গাছের ঝুরি এমন ভাবে নেমে এসেছে যে দেখে মনে হয় ওটা মা কালীর দুটো পা। মন্দিরের ভিতরে একটি ছোট্ট আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া, এই মন্দিরে অনেকেই মানসিক করে যায়। মানসিকের অসংখ্য সুতো যেন সেই দেওয়ালের রং পরিবর্তন করে দিয়েছে। রঘু ডাকাতের আস্থানা হওয়ায় একটা সময় এই এলাকা দিয়ে বিকেলের পরে আর কেউ যেতেন না, আর এখন ওই জায়গাটি হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী কালিবাড়ী, যেখানে মানসিক করে বহু মানুষের মনের বাসনা পূর্ণ হয়েছে। বর্তমানে, রঘু ডাকাতের আস্থানা থেকে পরিবর্তিত হয়ে এই বাড়িটি হয়ে উঠেছে বারাসাতের বিখ্যাত ডাকাত কালীবাড়ি।

 

অনেকেই এই পোড়োবাড়িতে, থুড়ি কালীবাড়িতে আসিম ফটোশুট করতে। আবার অনেকে বাদু রোডে পিকনিক করতে আসলে এই জায়গাটা ঘুরে যান। এই জায়গার আশেপাশে কিছু রাজবাড়ী, বাগানবাড়ি এবং একটি বিখ্যাত পুকুর রয়েছে যার নাম মাকড়সা পুকুর। স্থানীয় মানুষ রঘু ডাকাতের এই কালিবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। যে কেউ এই কালিবাড়ির একেবারে ভিতরে প্রবেশ করে যেতে পারেন না। পুরোহিতের প্রবেশ এই কালীবাড়িতে নিষেধ। তবে এই মন্দিরের ভেতরে যদি পুজো দিতে হয় তাহলে বাইরে একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে যেখানে আপনাদের পুজো দিতে হবে। পুরোহিত যদি আসতে চান তাহলে ওই মন্দিরে পুজো দিতে হয়। অনেকেই এই কালী বাড়ির ইতিহাস জানতেন না। তাই চাইলে আপনিও কালীপুজোর দিন অথবা বছরের অন্য যেকোনো দিন একবার গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন রঘু ডাকাতের এই কালিবাড়িতে।

তথ্যসূত্র

  • https://bengali.news18.com/news/local-18/north-24-parganas-kali-puja-2021-history-of-barasat-dakat-kalibari-at-barasat-north-24-parganas-683197.html

More Articles

error: Content is protected !!