বাংলার প্রথম মহিলা জমিদার

By: Arunima Mukherjee

September 18, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google


আঠারো শতকে যখন ভারতের বেশিরভাগ মহিলারা দিনযাপন করতেন পর্দার আড়ালে , বাড়ির অন্দরমহল‌ই ছিল তাদের দৈনিক আনাগোনার স্থান , সেইসময় রাণী ভবানী বিরাজ করেছেন রাজশাহীর জমিদাররূপে । বাংলার প্রথম মহিলা জমিদার রাণী ভবানীর কাহিণী বলবো আজ ।

     রাণী ভবানী জন্মগ্ৰহণ করেছিলেন বগুড়া জেলার তৎকালীন আদমদিঘী থানাধীন ছাতিয়ান নামক গ্ৰামে। জন্ম সাল ১৭১৬ । পিতা আত্মারাম চৌধুরী ছিলেন ছাতিয়ানার জমিদার , মাতার নাম জয়দুর্গা । শৈশবকাল থেকেই প্রজাহিতৈষী মনোভাব প্রকাশ পায় এই জমিদার কন‍্যা  মধ‍্যে । খুবই অল্প বয়সে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় নাটোরের জমিদার রমাকান্তের সঙ্গে । নাটোরের জমিদার জঙ্গলে শিকার করতে গেলে , তাঁর ভবানী দর্শন হয় । জমিদার দৃঢ় সংকল্প করে তিনি এই মেয়েকেই বিয়ে করবেন । অন‍্যদিকে আত্মারাম জমিদার হলেও তাঁর প্রতিপত্তি রমাকান্তের মতো  ছিল না । ফলে তিনি এই বিয়েতে সম্মতি জানান । তবে নাটোরের জমিদারের কাছে ভবানী তিনটি শর্ত রেখেছিলেন । এক,  বিয়ের পর তাঁকে একবছর পিতৃগৃহে থাকতে দিতে হবে। দুই , এলাকার দরিদ্র মানুষদের জমিদান করতে হবে । তিন , বাবার জমিদারি ছাতিয়ানা থেকে নাটোর অবধি রাস্তা বানিয়ে তা লালসালু দিয়ে ঢেকে দিতে হবে , যার উপর দিয়ে তিনি শ্বশুরবাড়ি যাবেন । বলা বাহুল্য,  রমাকান্ত এই তিনটি শর্ত‌ই মেনে নিয়েছিলেন ।

     মুর্শিদকুলী খাঁয়ের সময় রাজশাহী জমিদারির পত্তন হয় । রাজশাহী জমিদারির আদিপুরুষ ছিলেন জনৈক কামদেব রায় । তিনি ছিলেন পুঠিয়ার জমিদার দর্পনারায়ণের অধীন লস্করপুকুর পরগণার অন্তর্গত বরাইহাটির তহসিলদার । কামদেবের তিনপুত্র রামজীবন , রঘুনন্দন ও বিষ্ণুরাম – এর মধ‍্যে রঘুনন্দন ছিলেন সর্বাপেক্ষা সম্ভবনাময় ও উদ‍্যোমী পুরুষ । যদিও রঘুনন্দনের উত্থানের পিছনে জমিদার দর্পনারায়ণ এবং নবাব মুর্শিদকুলী খাঁয়ের যথেষ্ট সক্রিয় ভূমিকা ছিল । পুঠিয়ার জমিদার জাহাঙ্গীরনগরে ( বর্তমানে ঢাকা ) নিজের প্রতিনিধি হিসাবে রঘুনন্দনকে নিযুক্ত করেন । ঢাকায় সেইসময় বাংলার নবাবের সঙ্গে সুবাহদার আজিম-উস-শানের বিবাদ চলছিল । রঘুনন্দন নবাবের পক্ষ নিলে তিনি তাঁর বিশেষ বিশ্বাসভাজনে পরিণত হন । ১৭০৬ সালে রঘুনন্দন প্রথম নিজের ভাই রামজীবনের নামে রাজশাহীতে একটি জমিদারির বন্দোবস্ত করাতে সক্ষম হন । এরপর আর এই পরিবারকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি । রামজীবনের দক্ষতা এবং বিচক্ষণতার জন‍্য একের পর এক অংশ রাজশাহী জমিদারির সাথে যুক্ত হতে থাকে । ক্রমে রামজীবন এক বিশাল এলাকার জমিদার হয়ে ওঠেন । বলো হতো , বর্ধমান জমিদারির পর দ্বিতীয় বৃহৎ জমিদারি ছিল রাজশাহীর । শোনা যায় , এই জমিদারির আয় ছিল ৫২লক্ষ টাকা।

    ১৭২৪ সালে রঘুনন্দন অপুত্রক অবস্থায় মারা যান । ১৭৩০সালে রামজীবন‌ও পরলোক গমন করেন । রামজীবনের মৃত‍্যুর আগেই তিনি রমাকান্তকে দত্তক নেন এবং সমস্ত জমিদারি তাঁর নামে লিখে দিয়ে যান । মাত্র ১৮বছর বয়সে রামকান্ত রাজশাহীর জমিদারি লাভ করেন । রমাকান্ত জমিদার হলেও তিনি ছিলেন ধার্মিক প্রকৃতির মানুষ । তাই বিবাহের পর রাজশাহীর জমিদারি সামলাতেন রাণী ভবানী , তাঁকে সাহায‍্য করতো বিশ্বস্ত এবং দক্ষ দেওয়ান দয়ারাম । রমাকান্তের জমিদারিকালীন বিঘ্ন ঘটায় রামজীবনের ছোট ভাই বিষ্ণুরামের পুত্র দেবীরাম । এই চক্রান্তের জন‍্য রমাকান্ত কিছুদিন জমিদারিচ‍্যুত‌ও হয়েছিলেন । অবশেষে দয়ারামের প্রচেষ্টায় আলিবর্দী খানের দপ্তর থেকে জমিদারির সনদ ফিরিয়ে আনা হয় ।  ১৭৪৮ সালে রমাকান্তের জীবনাবসান ঘটে । রাণী ভবানী তিন সন্তানের জন্ম দিলেও তাঁর দুই পুত্র সন্তান অতি শৈশবেই মারা যায় , এক কন‍্যা তারাসুন্দরী জীবিত ছিলেন । শোনা যায় তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌল্লা তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। রমাকান্ত মৃত‍্যুর আগে ভবানীকে আদেশ দিয়ে যান এক পুত্র দত্তক নিতে । সেই মতো রমাকান্তের মৃত‍্যুর পর রাণী পুত্র রামকৃষ্ণকে দত্তক নিয়েছিলেন ।

   ১৭৪৮ সালে রাজশাহী জমিদারির সমুদয় কর্তৃত্বের অধিকারী হন রাণী ভবানী । তিনি যখন জমিদারির সিংহাসনে বসেন সেইসময় এবং তার আগের কিছু সময় ধরে সমগ্ৰ ভারত তথা বাংলার রাজনীতি বিশেষ টালমাটাল অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল । এইসময় তাঁর জমিদারি সন্নিহিত এলাকায় ঘটতে থাকে ইতিহাসের পালাবদলের ঘটনা ।  ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত‍্যুর পর দিল্লি সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে শুরু হয় । এইসময় দিল্লির মসনদ নিয়ে যেমন দিল্লিতে দ্বন্দ সংঘাত দেখা যায় , অন‍্যদিকে বাংলার রাজনীতিতেও চরম অস্থিরতা দেখা যায় । শুরু হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র । সুতানুটিসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে অবৈধভাবে জমিদারেরা জমি দখল করে কুঠি নির্মাণ করছিলেন অন‍্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশে অবাধ বাণিজ‍্য শুরু করে । দিল্লি থেকে নিত‍্যনতুন ফরমান নিয়ে এসে তারা তার প্রয়োগ ঘটাতে থাকে বাংলায় । এসময় বাংলায় উত্তর প্রান্তে শুরু হয় মারাঠা আক্রমণ আবার দক্ষিণ পূর্বাংশে চলেছিল ফিরীঙ্গি ও মগধের জলদস‍্যুতা । বাংলা যে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছিল , একথা বলার অবকাশ থাকে না । এইরকম প্রতিকূল এক পরিস্থিতির মধ‍্যেও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চার দশক জমিদারি পরিচালনা করেছিলেন।

   এক বিশাল সম্পত্তির মালিকানা তাঁর হলেও রাণী ভবানী অতি অনাড়ম্বর জীবনযাপনে বিশ্বাসী ছিলেন । তাঁর দানশীলতা এবং প্রজাহিতৈষী মনোভাবের জন‍্য তিনি প্রজাদের মধ‍্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেন । তিনি বাংলায় শত শত মন্দির , চিকিৎসালয় , সরাইখানা, অতিথিশালা নির্মাণ করেন । প্রজাদের জলের কষ্ট দূর করার জন‍্য তিনি অসংখ‍্য পুকুর ও দীঘি খনন করেন । দাতব‍্য চিকিৎসালয় এবং অবলা পশুপাখিদের সুরক্ষার জন‍্য তিনি মুক্ত হস্তে দান করে গেছেন । ১৭৫৩ সালে তিনি ভারতের বেনারসে একটি শিবমন্দির স্থাপন করেন । তিনি কাশীতে ভবানীশ্বর শিব ও দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুন্ড , কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় খনন করেন । বাংলার তীর্থযাত্রীদের কথা ভেবে হাওড়া থেকে কাশী অবধি সড়কপথ নির্মাণ করেন । যা ভবানী রোড এবং পরবর্তীতে বেনারস রোড নামে বিখ‍্যাত ছিল । বর্তমানে এটি বোম্বে রোডের অন্তর্ভুক্ত । এছাড়াও মুর্শিদাবাদের নিকট ভাগীরথী নদী তীরবর্তী অঞ্চলে তিনি ১০০টি শিবমন্দির নির্মাণ করেছিলেন যা কালের প্রবাহে ধ্বংসপ্রায় । তিনি নাটোর থেকে ভ‌ওয়ানিপুর পর্যন্ত ‘রাণী ভবানীর জাঙ্গাল’ নামে একটি রাস্তা নির্মাণ করেন । এইসমস্ত কাজের জন‍্য প্রজারা তাঁকে মহারাণী ভবানী তকমায় ভূষিত করে । পলাশির যুদ্ধের সময় তিনি কোম্পানির বিপক্ষে লড়বার জন‍্য সিরাজদৌল্লাকে সৈন‍্য প্রেরণ করেছিলেন । হল‌ওয়েলের লেখা জানা যায় তিনি নবাবের কোষাগারে বার্ষিক প্রায় ৭০ লক্ষ সিক্কা রূপি রাজস্ব দিতেন । দিল্লির কাছে থেকে ১৭৬৫সালে কোম্পানি বাংলার রাজস্ব আদায়ের দেওয়ানি লাভ করলে তারাও রাজশাহী জমিদারির প্রতিপত্তি সম্পর্কে অবগত হয় এবং জমিদারিতে কোনরকম হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকে । ব্রিটিশ গবেষক ও সার্ভেয়ার ও’ম‍্যালি বলেছেন , রাণী ভবানী মোট ৩৮০টি প্রার্থনালয়, অতিথিশালা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন । কোম্পানির আমলে উত্তরবঙ্গে রেল যোগাযোগ বাস্তবায়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন । ব্রাহ্মণদের তিনি জমি দান করেছিলেন ।

    ১৭৮৮ সালে চল্লিশ বছরের রামকৃষ্ণকে তিনি জমিদারি হস্তান্তর করে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন এবং কন‍্যাসহ বড়নগরে বাস করতে থাকেন । ১৭৯৫ সালে ৭৯বছর বয়সে তাঁর মৃত‍্যু হয় ।

 

তথ্য সূত্রঃ  

 

More Articles