বিতর্কের বাইরে রইল না গাঁধীর চশমাও

By: Mahadyuti Chakraborty

October 2, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে : inscript.me

মহাদ্যুতি চক্রবর্তী: রোগে ভুগে নয়, আততায়ীর গুলিতে ইষ্টনাম উচ্চারণ করতে করতে তিনি ইহজীবন শেষ করতে চান। সাক্ষী থাকবেন তাঁর চিরঅনুগত মৃদুলা বেন গাঁধী তথা মনু। মহাত্মার এই অভিপ্রায় মনুর ডায়েরিতে লেখা আছে। ঘটনাচক্রে হলও তাই। ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮, দিল্লির বিড়লা ভবনে ভগবদ্‌গীতা পাঠ শুনে দিন শুরু করেন গাঁধী। তার পর অশক্ত শরীরে কিছুক্ষণ কিছু লেখালিখি করেন। স্নানশেষে তাঁর ওজন নেওয়া হয়। দেখা গেল, ওজন ৪৯.৭ কেজি। বয়স তখন ৭৮। সেদিন বিকেলে দু’জন দেখা করতে এলে মনুবেনকে মহাত্মা বলেন, “ওদের বলে দাও যে, যদি আমি বেঁচে থাকি, তা হলে আজ সন্ধের প্রার্থনাসভার পরে ওদের সঙ্গে দেখা হবে।” 
 
গান্ধী যেন কালঘড়ির ডাক শুনে ফেলেছেন। বুঝতে পারছেন মৃত্যু আসন্ন। শুধু প্রহর গুনছেন।  অবশেষে মৃত্যু এলো। প্রার্থনাসভায় ভিড় ঠেলে খাকি পোশাক পরা এক জন যুবক  এগিয়ে আসেন গাঁধীর দিকে।  সকলে হতচকিত হয়ে যায় চার বার গুলির আওয়াজে। দেখা যায় বুলেট সরাসরি বুকে বিঁধেছে, গাঁধী লুটিয়ে পড়েছেন মাটিতে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ভারতভূমি। গাঁধীর মুখনিসৃত শেষ বাক্য ছিল, হে রাম!
 
বলা বাহুল্য, গাঁধীর ধারণায় যিনি রাম তিনি আজকের ভারতে বহুচর্চিত রাম নন। বরং গাঁধীর রাম একটি ব্যাপক অভিঘাতপূর্ণ শব্দ। তিনি নিজেই বলেছেন, আমার রাম বা আমরা যে রামের ভজনা করি, তিনি দশরথপুত্র অযোধ্যার রাজা ঐতিহাসিক রাম নন। আমাদের রাম সনাতন, অদ্বিতীয়।.এই রাম সকলের। 
 
গাঁধী নিজেকে ‘সনাতন হিন্দু’ বলে দাবি করতেন। কিন্তু সহনশীলতা ছিল তাঁর মর্মের অলংকার। গাঁধী বলতেন, হিন্দুত্বের সঙ্গে মুসলমানী,খ্রিস্টানির কোনও বিরোধই নেই। গাঁধীকল্পিত রামরাজ্য আসলে এক প্রকৃত  সুশাসনের প্রতিশ্রুতি যেখানে নাগরিকদের কোনও ফার্স্ট এবং সেকেন্ড ক্লাস নেই। গাঁধী বিশ্বাসও করতেন, প্রতিটি ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বাঁচতে হবে একে অন্যের থেকে শিখে, একে অন্যের সঙ্গে সহাবস্থান করে। অন্যদিকে, একদা গাঁধীভক্ত নাথুরাম মনে করেছিল, গাঁধীর আদর্শগত স্থিতিস্থাপকতা, সহনশীলতা আসলে সনাতন হিন্দুধর্মের ক্ষতি করছে। নাথুরাম তো গাঁধীকে হত্যা করলেন। কিন্তু গাঁধী কি আদৌ মারা গেলেন?  বা, ফিকে হলেন? 
 
গাঁধী গবেষকদের একটা বড় অংশ বলেন, গোটা দেশে যখন অস্থিরতা, হিংসার বাতাবরণ, বিষের বাষ্প, তখন নিজের অস্তিত্বকে, আদর্শকে চিরপ্রতিষ্ঠা দিতে গাঁধীর নিজেরই এমন মৃত্যু কাঙ্খিত ছিল।  জীবিত গাঁধীর চেয়ে মৃত গাঁধী অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে জাতিকে নতুন করে আষ্টেপৃষ্টে জুড়লেন। তাঁর  মৃত্যুতে ভাত চড়েনি কোনও ঘরে। জাতির চোখের জলেই পুনর্জন্ম হয়েছে গাঁধীর। চর্চা শুরু হয়েছে তার চিন্তন নিয়ে। সেই চর্চা আজ নতুন ডিসকোর্সের জন্ম দিয়েছে। 
 
প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে গাঁধী জন্মান। আমাদের বিবেকের মৃত্যুতে, সাম্প্রদায়িক হিংসার, ভাতৃহত্যার রণাঙ্গনে, শঠতা আর আইপিএল-এর নিদ্রিত ভারতে গাঁধী রোজ জেগে থাকেন। আজ আর গাঁধী কোনও ব্যক্তি নন, তিনি এক বোধের নাম, যে বোধের সঙ্গে তোমার চিন্তার ফারাক থাকতে পারে কিন্তু গাঁধীকে তুমি অস্বীকার করতে পারবে না। 
 
কিন্তু গাঁধী আমরা কতটা রাখতে পারলাম, সে প্রশ্নও আসে। ৫ মার্চ, ২০০৯ সালের দুপুরবেলা নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে নিলামে বিক্রি হয়ে যায় মহাত্মা গাঁধীর বিখ্যাত চশমাখানি। ক্রেতা এক ভারতীয়। এবং, তাঁর নামটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য-  বিজয় মাল্য। ‘মাল্য কিনে নিলেন গাঁধীর চশমা’ এমন একটি শিরোনাম মিডিয়ার ব্যবসার জন্য আদর্শ হতে পারে হয়তো, কিন্তু, তা একটি অনিবার্য প্রশ্নেরও জন্ম দেয়। একটু জটিল প্রশ্ন। গাঁধীর মতামতে যতটা গাঁধী রয়েছেন, গাঁধীর জীবনদর্শনে যতটা গাঁধী রয়েছেন, সেই একই পরিমাণ ‘গাঁধী’ কি তাঁর চশমাটির (যাকে, তাঁর জীবনদর্শনের একটি অন্যরকম ‘প্রতীক’ হিসেবেও ভাবা হয়ে থাকে।) মধ্যেও রয়েছেন? যেহেতু, তা শেষমেশ একটি বস্তুই, তাই কোথাও গিয়ে পুঁজিবাদের কাছে মাথা নত করে ফেলাই কি তার ভবিতব্য?
 
গাঁধী চশমাটি কিনেছিলেন বিলেতে আইন পড়ার সময়। কর্নেল এইচ এ শ্রী দিওয়ান নবাবকে এই চশমাটি গাধী দেন ১৯৩০ এর দশকে। তিনি নাকি বলেছিলেন  এই চশমা তাঁকে ভারতদর্শন বুঝতে শিখিয়েছে।
 
এ কথা ভাবতে তো খারাপ লাগে যে, গাঁধী যে চশমা দিয়ে ভারতকে দেখলেন, তার আত্মাকে দেখলেন, সেই চশমার মালিক হলেন  এমন ব্যক্তি, যিনি ঘটনাচক্রে দেশের অন্যতম বড় ঋণখেলাপি এবং পলাতক। উল্লেখ থাকুক যে, ভারত সরকার এই নিলাম বন্ধের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও সেই চশমা নিলাম আটকাতে পারেননি। 
 
আজ ২ অক্টোবর ২০২১, যে রণরক্ত সফলতার দোলাচলের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভারতরাষ্ট্র, তাতে বারবার মনে হয় আমাদের আসলে ফেরত চাই গাঁধীর চশমাখানি। ভারত ভুলপথে চলেছে তা চোখে আঙুল দিয়ে বোঝাতে পারে গাঁধীর চোখজোড়াই।
 
তথ্য সূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

More Articles