সিপিআইএম মানে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, কার নামে এই রাস্তা! আসল ইতিহাসটাই ভুলল বাঙালি!

By: Debabrata Mondal

January 14, 2022

Share

আলিমুদ্দিন বললেই মনে পড়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসুদের কথা। কিন্তু কে এই আলিমুদ্দিন! তাঁকে কেউ মনেই রাখল না!

পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘আমার বাংলা’ রচনায় কল্লোলিনী তিলোত্তমাকে চিনে নিয়েছিলেন মোনা ঠাকুরের চোখ দিয়ে।কলকাতার সঙ্গে প্রথম মোলাকাতের পর মোনা ঠাকুরের কাছে কলকাতা হয়ে উঠেছিল ‘আজব’ শহর।কলের শহর কলকাতা।এখানে কল টিপলেই জল আবার কল টিপলেই আলো। ঘাড় গুঁজে অফিস যাওয়া আর বাড়ি ফেরার কলকাতা,দশটা পাঁচটার ব্যস্ত কলকাতা তার বুকে জমিয়ে রাখে হাজারো ইতিহাসের গপ্পো।দিবারাত্র অসংখ্য মানুষের ভিড়ে পদপিষ্ট হয় কল্লোলিনী তিলোত্তমার প্রকৃত ইতিহাস।আমরা কি তার হিসেব রাখি?

জানুয়ারির মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি। না এ বাজনা বাঙালির চিরাচরিত শারদোৎসবের নয়, এ বাজনা গণতন্ত্রের মহোৎসব ভোট উৎসবের। আর কিছুদিনের মধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে পুরোভোটের ফল। করোনাসুরকে থোড়ায় কেয়ার করে চলছে মিটিং মিছিল, ছুটছে কুকথার ফুলঝুরি।আর তাতেই গেল গেল রব তুলেছেন বাংলার নাগরিক সমাজ। লাল গেরুয়া অথবা সবুজ সবারই পাখির চোখ চন্দননগর, আসানসোল সহ আরো দুই কেন্দ্রের মসনদ। সবুজ নাকি গেরুয়া? কোন শিবির করবে কিস্তিমাত? নাকি হাল ফেরাতে লালকেই বেছে নেবেন আপামর জনসাধারণ তার উত্তর দেবে ভবিষ্যত।কিন্তু সুদীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ধরে যে ৩১ নং আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বসে বাম নেতারা রাজ্যের আট থেকে আশিকে দেখিয়েছেন দিনবদলের স্বপ্ন, ভোটের মুখে সেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের আড়ালে থাকা বিপ্লবী আলিমুদ্দিন সাহেবকে কি মনে রেখেছেন বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকা নেতা – নেত্রীরা? নাকি মসনদ দখলের লড়াইয়ের কাছে ফিকে হয়ে এসেছে ইতিহাসও?

সালটা ১৯০৫।রণক্লান্ত ভারতবাসী একটা নতুন দিন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।ইংরেজ বিরোধী বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের সর্বত্র।সেই সময় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ফলে বহু নেতা পুলিশি ধরপাকড়ে জেলে বন্দি।ইংরেজ সরকারের নির্মম অত্যাচারের তালিকা থেকে বাদ যাননি দেশের সাধারণ মানুষও।ইংরেজ সরকার প্রতিমুহূর্তে বুঝিয়ে দিতে চাই তারা শাসক ভারতবাসী শাসিত।

এমনই এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৯০৫ সালের ৬ই জুলাই কলকাতা প্রেস থেকে প্রকাশিত হলো একটি খবর – লর্ড কার্জনের চক্রান্তে ভাগ হতে চলেছে বাংলা।এই একটি খবরই তৎকালীন সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সমস্ত ভারতবাসীর ক্ষোভের আগুনে  ঘি ঢালার জন্য যথেষ্ট ছিল।সুরেন্দ্রনাথ তাঁর ‘ দি বেঙ্গলি ‘ পত্রিকায় লিখলেন – ” এটি একটি ভয়ঙ্কর জাতীয় দুর্যোগ।”রাস্তায় নামলেন রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্ব। এমনই এক পরিস্থিতিতে বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ গড়ে তুললেন ‘ মুক্তিসংঘ ‘ নামক  একটি গুপ্ত সমিতি। উল্লাসকর দত্ত,বারীন ঘোষ প্রমুখের সংস্পর্শে এসে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে উঠলেন হেমচন্দ্র।হেমচন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত গুপ্ত সমিতি ‘ মুক্তিসংঘ ‘ ১৯০৮ সাল নাগাদ নন্দলাল ব্যানার্জীকে হত্যা করে।এমনকি বিনয় – বাদল দীনেশ কর্তৃক সংঘটিত অলিন্দ যুদ্ধেও এই মুক্তিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে ছিল।

পরবর্তী সময়ে গুপ্ত সমিতিটি ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ারস’ নামে পরিচিত হয়।হেমচন্দ্র উল্লাসকর দত্ত বারীন ঘোষ বা বিনয় বাদল দীনেশের আড়ালে বারংবার চাপা পড়ে যায় বিপ্লবী সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদের নাম। স্মৃতি বড়ো বিশ্বাসঘাতক – বাঙালি মনে রাখেনি সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদ ওরফে মাস্টার সাহেবকে।

সালটা ১৮৮৪। ঢাকার আকাশ জমাদার লেনে জন্ম সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদের।একরত্তি বয়স থেকে লড়াই ছিল আহমেদের রক্তে।প্রবল দারিদ্র্যকে জয় করতে একসময় বিরামহীন লড়াই করেছেন সংসার সীমান্তে।আহমেদ সাহেবের আর্থিক দৈন্যদশা একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে আর্থিক সঙ্কটে এফ.এ পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর।দিন গুজরানের জন্য এরপর তিনি শুরু করলেন টিউশন পড়ানো।জীবনের প্রতিটি বাঁকে এই নীরব লড়াই যেন ধীরে ধীরে তৈরি করে ফেলেছিল ভবিষ্যতের সৈনিককে।ততদিনে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ঢেউ সর্বত্র আছড়ে পড়েছে সমগ্র বঙ্গে।ইংরেজ সরকারের অত্যাচারের গ্রাফ তখন ঊর্ধ্বমুখী।অন্যদিকে একই সময়ে দু বেলা দু মুঠো অন্ন সংস্থান করা দায় হয়ে উঠেছে মাস্টার সাহেবের,বাধ্য হয়ে নিতে হয়েছে কালেক্টরের চাকরি।কিন্তু তিনি যে স্বাধীনতা যুগের অগ্নিপুরুষ, তাঁর পায়ের তলায় সর্ষে।ফলে জীবনের বাঁধাধরা ছকে কোনোদিনই অভ্যস্ত হতে পারেননি তিনি। আত্মগোপন করে চালিয়ে গিয়েছেন একের পর এক ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ।হেমচন্দ্র ঘোষ ছিলেন মাস্টার সাহেবের সতীর্থ।বস্তুতপক্ষে।কিছুদিনের মধ্যেই হেমচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গুপ্ত সমিতিতে যোগদান করলেন মাস্টার সাহেব।তারপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলে শীর্ষস্থানীয় নেতা – নেত্রীরা যখন পুলিশের জালে সেই সময়ই শাসকের লালচোখকে পরোয়া না করে অসংখ্য স্থানীয় যুবককে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করেন মাস্টার সাহেব। তিনি ছিলেন একজন অক্লান্ত কর্মী।

আরও পড়ুন-বাংলা থেকে বিশ্ব- ইতিহাসের ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা যা আজও ভুলতে পারেনি কেউ

দিনের পর দিন আত্মগোপন করে ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার পরেও পুলিশ টিকি ছুঁতে পারেনি মাস্টার সাহেবের।সেই সময় অসংখ্য হিন্দু – মুসলিম যুবকের অবাধ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল মাস্টার সাহেবের আখড়া।কুস্তি লাঠি এবং অসিচলনায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন মাস্টার সাহেবের ছাত্ররা। এমনকী গুপ্ত বিপ্লবী দলগুলিকে সাহায্য করতে আলিমুদ্দিন সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন স্বদেশী ডাকাত দলও।

১৯২০ সালে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই অক্লান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীর।পরবর্তীকালে তারই নাম অনুসারে কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ হয় আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।যেখানে আজ অবস্থিত সিপিএমের রাজ্য সদর দপ্তর। রাজ্যে বেজেছে পুরভোটের দামামা।ভোটের বাজার সরগরম শাসক – বিরোধী তরজায়।আজকের সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিবিদরা কি মনে রেখেছেন মাস্টার সাহেবদের? নাকি ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের কাছে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন মাস্টার সাহেবরা? ইতিহাস ভুলে বর্তমান প্রজন্ম কি ব্যস্ত ঝাঁ চকচকে প্রচার আর  টুম্পার হাত ধরে ব্রিগেড ভরাতে? উত্তর অমিল। আসলে ভোট যে বড়ো বালাই।

More Articles