ট্রোফি হান্টিং – মনুষ্যত্বের নিষ্ঠুরতম নিদর্শন

By: Amit Patihar

September 20, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

এই পৃথিবীর সব থেকে উন্নততম প্রাণী বা জীব হলো মানুষ। মানুষের থেকে শক্তিশালী এই গোলার্ধে আর কেউ নয়। তো এহেন উন্নত প্রাণী মানুষের সাথে এই গোলার্ধের বাকি জন্তু জানোয়ারদের সম্পর্ক কেমন? মনুষ্যত্বের ইতিহাসের একদম শুরুর দিকের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে এই সম্পর্ক ছিল লড়াইয়ের। লড়াই বেঁচে থাকার, লড়াই ক্ষুধা নিবারণের। সোজা কথায় তখন মানুষের সাথে পশুদের সম্পর্ক ছিল শিকার এবং শিকারীর। এরপর সময় বদলেছে, মানুষ যত উন্নত হয়েছে, তত বদলেছে এই সম্পর্কের সমীকরণ। মানুষরা জন্তু জানোয়ারদের ভালোবাসতে শিখেছে, সংরক্ষণ করতে শিখেছে। নিজে বটগাছের মতো দাঁড়িয়ে থেকে ছায়া দিতে শিখেছে। কিন্তু বর্তমানে মানুষের সাথে পশুদের সম্পর্কের সমীকরণ কি এই একটাই? উত্তরটা হলো না। এখনও রাস্তার কুকুরদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, বিড়াল রাস্তা কাটলে মানুষ এগোতে ভয় পায়, লোকালয়ে বাঘ বা চিতা ঢুকে পড়ল পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, অন্ত্বসত্বা হাতির মুখে আনারসের মধ্যে বোমা ঢুকিয়ে খেতে দেওয়া হয়, জঙ্গল কেটে ফেলা হয়, পশুদের বাসস্থান খাদ্য কেড়ে নেওয়া হয় ইত্যাদি। কিন্তু আজ আমরা যে বিষয়ে কথা বলবো, মানুষের সাথে পশুদের সম্পর্কে তার থেকে খারাপ নিদর্শন আর দুটো নেই। ট্রোফি হান্টিং।

■ ট্রোফি হান্টিং কী?

ট্রোফি হান্টিং - মনুষ্যত্বের নিষ্ঠুরতম নিদর্শন

চিত্রঋণ : Google

মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য জঙ্গলে বসবাসকারী পশুদের শিকার করার পদ্ধতিকে বলা হয় ট্রোফি হান্টিং। শিকারের পর মৃত পশুটিই হলো শিকারীর ট্রোফি। তার চামড়া, দাঁত, মাথা, শিং এসব আলাদা করে শিকারীকে ট্রোফি হিসাবে দেওয়া হয়। এবং বাকিটা মাংস বা খাদ্য হিসাবে খেয়ে ফেলা হয়। এখনও অবধি গোটা বিশ্ব জুড়ে প্রায় ১২ লাখ পশুদের প্রাণ নেওয়া হয়েছে ট্রোফি হান্টিংয়ের নামে। বছরে হিসাব করলে, প্রায় ৭০০০০ পশুদের প্রাণ নেওয়া হয় এই মনরঞ্জক পদ্ধতির মাধ্যমে। অর্থাৎ দিনে প্রায় ২০০টি জংলী প্রাণীর প্রাণ যায়, মানুষকে মনোরঞ্জিত করতে। ইদানিংকালে সোশ্যাল মিডিয়া তে ট্রোফি হান্টিং প্রথার বিরুদ্ধে নিন্দের ঝড় উঠেছে। কিন্তু তাও এই শিকার পদ্ধতি এবং শিকারীদের থামানো বা লজ্জিত করা যাচ্ছে না। কারণ? কারণ এটা লিগ্যাল বা আইনত। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনলেন।

■ বিশ্বের কোন কোন দেশে ট্রোফি হান্টিং লিগ্যাল?

নিউজিল্যান্ড, নামিবিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ক্যানাডা, মেক্সিকো, জিম্বাবোয় এই দেশগুলো ট্রোফি হান্টিংয়ের প্রধান ধারক ও বাহক। সাউথ আফ্রিকা বিশ্বের সবথেকে বড় হান্টিং ইন্ডাস্ট্রি। আমেরিকান ট্রোফি হান্টারদের এক বিপুল পরিমাণ অংশ সাউথ আফ্রিকা আসেন হান্টিংয়ের জন্য। ট্রোফি হান্টিং প্রথার জনক একভাবে সাউথ আফ্রিকাকেই বলা যেতে পারে। একটি সার্ভের মাধ্যমে জানা গেছে ২০০৮ সালে সাউথ আফ্রিকা হান্টিং ট্যুরিজমের মাধ্যমে প্রায় ১৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জন করেছে।

■ কোন কোন পশু শিকার হিসাবে সব থেকে বেশি জনপ্রিয়?

সিংহ, হাতি, চিতা, গন্ডার এবং Cape Buffalo এই পাঁচটি পশু শিকার হিসাবে সবথেকে জনপ্রিয় এবং খরচ সাপেক্ষ। শিকারীরা সাধারণত চায় আকারে বড় পশুদের শিকার করতে এবং তারপর তাদের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে গর্বে বুক ফোলাতে ফোলাতে ছবি তুলতে। তাই যে শিকার যত আয়তনে বড়ো বা যাকে শিকার করা যত কঠিন, তাকে শিকার করার মূল্য ও তত বেশি।

বিগত ২০ বছরে প্রায় ৭৮০০০ সিংহ শিকার হয়েছে ট্রোফি হান্টিংয়ের। সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০১৭ সালের একটি সার্ভে অনুযায়ী প্রিডেটর বিডিংয়ের মাধ্যমে বন্য সিংহদের ক্যাপটিভিটিতে ব্রিড করিয়ে জন্ম দেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার সিংহ শাবকদের। তাদের খাঁচার ভিতর রেখে খাওয়ানো হচ্ছে, পালন করা হচ্ছে দিনের পর দিন এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর তাদের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে শিকার করার জন্য। এরপর ট্রোফি হান্টিংয়ের সময় সিংহরা তাদের বিপদ বুঝতে না পেরে পরিচিত গাইডের সান্নিধ্য পেতে নিজেরাই এগিয়ে আসছে অহিংস ভাবে। ফলস্বরূপ মৃত্যু বরণ করতে হয়। এই মৃত্যু আসলে জংলী প্রাণের মৃত্যু নয়, এই মৃত্যু হলো বিশ্বাসের মৃত্যু। মানুষকে বিশ্বাস করে মৃত্যুবরণ করার এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও তা গ্রাহ্য করা হয় না, কারণ এটি লিগ্যাল। এবং প্রত্যেকটি সিংহ শিকারের জন্য শিকারীরা খরচ করে প্রায় ৫৫০০০ মার্কিন ডলার।

■ ট্রোফি হান্টিং কেন এখন একটা রমরমা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে?

কারণ ২০১৫ সালের একটি সার্ভে অনুযায়ী গোটা বিশ্বজুড়ে ট্রোফি হান্টিং থেকে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেভিনিউ হয়। যে টাকা দিয়ে ওই দেশগুলোর বন্য প্রাণী সংরক্ষণের কাজ কর্ম করা হয়। কিন্তু বাস্তবে যার অর্ধাংশও খরচ করা হয় না বন্যপ্রাণীদের সংরক্ষণে।

আমেরিকার সাফারি ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল বা SCI বিশ্বের ধনী ধনী শিকারীদের উৎসাহিত করে সবচেয়ে দামি প্যাকেজ ওয়ালা প্রাণীদের শিকার করতে।

■  কিছু আশ্চর্য্যজনক তথ্য :

  1. বিগত দুই দশকে প্রায় ৭৮০০০ মাউন্টেন সিংহ শিকার করা হয়েছে।
  2. জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং টেডি রুজভেল্টের মতো বড় বড় মানুষের নাম ট্রোফি হান্টিংয়ের সাথে জড়িত। এরা ট্রোফি হান্টিং সাপোর্ট করেন এবং নিজের শিকার করেওছেন।
  3. মেক্সিকোর মতো দেশের ট্রোফি হান্টিং থেকে পাওয়া রেভিনিউ প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
  4. একটা ২১ দিনের সিংহ শিকারের প্যাকেজ বিক্রি করা হয় ৫২৫০০ থেকে ৭০০০০ মার্কিন ডলারে।
  5. গুগলে সার্চ করলে makemyhunt.com নামক একটি ওয়েবসাইট পাওয়া যায় যেখান থেকে পছন্দ মতো প্যাকেজ নিয়ে শিকার করা যায়।

২০১৭ সালে ‘ট্রোফি’ নামক একটি ডকুমেন্টারি ফিল্মে দেখানো হয় বন্যপ্রাণীদের পণ্য হিসাবে ব্যবহার করার ভয়ঙ্কর ফলাফল কী হতে পারে। মনুষ্য জন্মে বন্য প্রাণীদের প্রভাব, বাস্তুতন্ত্রে তাদের অবদান সমস্ত কিছু সম্পর্কে ডিটেলসে আলোচনা করা হয় এই ডকুমেন্টরি তে।

প্রতিবছর হাজার হাজার প্রাণীকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হচ্ছে মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য। খেলা হচ্ছে মনুষ্যত্ব নিয়ে। খেলা শেষে ট্রোফি হিসাবে থাকছে কাটা মাথা, গা থেকে খুলে নেওয়া চামড়া, মাথার শিং এবং কখনও কখনও মৃত প্রাণীর গোটা শরীরটাকে টাঙিয়ে রাখা হচ্ছে দেওয়ালে। এত নৃশংস, এত জঘন্য, এত বিবেকহীন একটা পদ্ধতিকে লিগ্যাল করা হয়েছে শুধুমাত্র ব্যবসার কারণে। মনুষ্যত্বের মৃত্যুর এর থেকে উজ্জ্বলতম উদাহরণ বোধহয় আর দুটো নেই।

 

সোর্স :

১. https://www.indiatoday.in/education-today/gk-current-affairs/story/killing-animals-as-trophy-shocking-facts-about-trophy-hunting-1375145-2018-10-25

২. হ য বায়োলজি।

More Articles