কেমন হবে যদি মৃত্যুর পর আমরা গাছ হয়ে বেঁচে থাকি?

By: Writer in Residence

August 3, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google || গ্রাফিক ডিজাইনার অ্য‌‌‍‍না সিতেল্লির বিবৃতির নমুনা

গ্রাফিক ডিজাইনার অ্য‌‌‍‍না সিতেল্লি ছবি আঁকতেন গল্পের বই এবং বিভিন্ন বিজ্ঞাপন এজেন্সির জন্য। ইতালিতেই জন্মানো এবং বড় হয়ে ওঠা অ্য‌‌‍‍না ছিলেন  ছোটথেকেই অন্যদের থেকে একটু আলাদা। ভাবতে ভালোবাসতেন, চেনা দৃশ্যকে অন্যভাবে নিজের মতো করে সুন্দর ভাবে সাজাতে ভালোবাসতেন। গ্রাফিক ডিজাইনার হওয়ার পরে যখন সিনেমার সেট সাজাতেন বা আর্ট এজেন্সিতে কাজ করার সময় যখন পুতুলের ডিজাইন করতেন তখন তার কাজে ভাবনাচিন্তার সৌন্দর্য্যতার ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। যারা স্বভাবে আর পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা, অন্যরকম তাদের বন্ধুত্বও হয় তাদের মতোই মানুষদের সাথে। অ্য‌‌‍‍নার ও তাই হলো, আর্ট এজেন্সিতে কাজ করতে করতেই পরিচয় হলো রাউল ব্রেটজেলের সাথে। বয়সে বেশ খানিকটা ছোট রাউল ও ছিলেন পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার। স্বভাবে দু’জন একই ধরণের হওয়ায় মিশতে সময় লাগেনি বেশি। কিছু সময় পরেই তাদের আলাপ পরিণত হয় গাঢ় বন্ধুত্বে। দু’জনে মিলে ঘুরে বেড়াতেন অরণ্য-সমুদ্র-পাহাড়-মরুভূমি।

প্রকৃতির মাঝে থাকতে ভালোবাসতেন দু’জনেই, আর ভালোবাসতেন সবুজ। গাছ দু’জনকেই অদ্ভুত ভাবে টানতো। মরুভূমির দিকে তাকিয়ে দু’জনের মনের ভিতরটা হু-হু করে উঠতো। জঙ্গলে আগুন লাগলে, চোরা কারবারিরা বৃক্ষ ছেদন করলে, মানুষের প্রয়োজনে জঙ্গল কেটে ফেলা হলে দুজনের চোখ ছলছল করে উঠতো। পরিবেশকে ভালোবেসে বিভিন্ন পরিবেশ প্রেমী সংস্থার সাথে যুক্ত হন অ্য‌‌‍‍না এবং রাউল। নিযুক্ত হন বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যকর্মের সাথে। ধীরে ধীরে তারা লক্ষ্য করেন তারা যে কোম্পানিগুলোর হয়ে কাজ করেন, যেসব কোম্পানিগুলো তাদের মাসের শেষে মোটা মাইনে দেয়, তারা আসলে পরিবেশের ক্ষতি করে নিজেদের উৎপাদন এবং মুনাফা বৃদ্ধি করতে গিয়ে। তাই তারা একসাথে চাকরি ছেড়ে দিলেন। তৈরি করলেন নিজেদের সংস্থা। নিজেদের কোম্পানি। নিজেরাই ডিজাইন করতে শুরু করলেন এবং নিজেরাই বাজারে সেগুলো বিক্রি করতে শুরু করলেন। তাদের শিল্পসামগ্রীগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিবেশ বান্ধব হতো।

এরকমভাবেই চলছিল। কিন্তু দৃশ্যপট বদলে গেল হঠাৎ করেই একটা বিকালে। সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরতি পথে অ্য‌‌‍‍না আর রাউল গেছিলেন এক সমাধিক্ষেত্রে। সমাধিক্ষেত্রে প্রবেশ করার পথেই ওঁরা দেখলেন এক সদ্যপ্রয়াত ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করার প্রক্রিয়া চলছে। শোকে বিহ্বল আত্মীয় পরিজনদের কান্নায়, চোখের জলে থমথম করছে আশপাশটা। ওঁরা গিয়ে দাঁড়ালেন। আরেকটু পরেই কফিনের ওপর মাটি ফেলা হবে। শেষবারের মতো দেখার জন্য  আত্মীয় পরিজনেরা ভিড় করে ঠেলাঠেলি করছেন। ওদিকে মৃত ব্যক্তির কন্যা, কফিনের ভিতরে একটা হাত ঢুকিয়ে রেখেছেন যাতে কফিনের ঢাকনা বন্ধ না করা যায়, আর সে আরেকটু সময়ের জন্য দেখে নিতে পারে তার বুকের সবথেকে কাছের মানুষটাকে। এই দৃশ্য দেখে ওঁরা আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না, সমাধিক্ষেত্রের আলুথালু অগোছালো ভাঙাচোরা পথ দিয়ে হাঁটা লাগালেন দু’জনে। রাস্তার দু’পাশ জুড়ে সারি সারি সমাধিক্ষেত্র, অযত্নে, আগাছায়, নোংরায় ভরা। শুকনো ফুল, চিল শকুনের ফেলে যাওয়া হারের টুকরো, শ্যাওলার স্যাঁতস্যাঁতে ভরা চারপাশ। আচ্ছা প্রিয়জনরা মৃত্যুর পর কি এমনই একটা জায়গায় থাকতে চান? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো রাউলের মাথায়। এই সমাধিক্ষেত্র, এখানে দিনের বেলায় যত কান্না, রাতে ততটাই নিস্তব্ধতা, অযত্ন, অপরিচর্যায় ভর্তি বিশ্রামাগার। এটাই কি আমি চাই আমার মৃত্যুর পর?

ভাবতে ভাবতে সেদিনই রাউলের মাথায় এলো পরিকল্পনাটা। সবার প্রথমে অ্য‌‌‍‍নাকেই জানালেন। শুনেই অ্য‌‌‍‍না লাফিয়ে উঠলেন আনন্দে, ‘অসাধারণ, অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য, পৃথিবী বদলে যাবে…’

পরের দিনই অফিসের দায়িত্ব কর্মচারীদের দিয়ে দুজনে মনোনিবেশ করলেন গবেষণায়। দেশ বিদেশ জুড়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের সাথে যোগাযোগ করেন, সাহায্য নেন। দুজনের পরিকল্পনার কথা শুনে বিজ্ঞানীরাও চমকিত হন। অনেক অভিনন্দন আর শুভেচ্ছার সাথে তাঁরা এটাও জানান এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে গেলে অনেক বাধা বিপত্তি আসবে, কিন্তু হার মানলে চলবে না। এরপর কেটে গেছে প্রায় বছর দশেক। অ্য‌‌‍‍না আর রাউল ধীরে ধীরে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেছেন নিজেদের স্বপ্নের দিকে।

■ ক্যাপসুলা মুন্ডি:

সময়টা ছিল ২০০৩। প্রতিবছরের মতো সেইবারেও ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো ‘সালোন ডেল মোবাইল’। নামিদামি বড় বড় কোম্পানিরা নিজেদের ঝাঁ চকচকে স্টলে সাজিয়ে রেখেছিল মূল্যবান কফিন। খুব ভিড় সেসব স্টলে। উল্টোদিকে অ্য‌‌‍‍না আর রাউলের ছোট্ট সাদামাটা চাকচিক্যবিহীন স্টলে কোনও দুর্মূল্য কফিন ছিল না। ছিল সাদা এবং বালি রংয়ের কিছু ডিম্বাকৃতি পাত্র। কেউ তাকাচ্ছিল, কেউ দেখছিলো না। হঠাৎই একজন ক্রেতা ডিম্বাকৃতি পাত্রগুলোর দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করেন, ‘ওগুলো কী? ফুলদানি? ফুল রাখা যাবে?’

অ্য‌‌‍‍না উত্তরে বলেন, ‘না। ফুলদানি নয়। ওই পাত্রগুলো থেকে ফুল জন্মাবে তবে মালিকের মৃত্যুর পর…’। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় জমে যায় ওঁদের স্টল কে ঘিরে। চমকিত প্রত্যেকে জানতে চান এটা কী করে সম্ভব?

অ্য‌‌‍‍না আর রাউল উত্তরে জানান, ‘ওই ডিম্বাকৃতি পাত্রগুলোর নাম ‘ক্যাপসুলা মুন্ডি’। ক্যাপসুলা অর্থাৎ বীজ এবং মুন্ডি অর্থাৎ পৃথিবী। সম্মিলিত অর্থ পৃথিবীর বীজ। এই ডিম্বাকৃতি ক্যাপসুলা মুন্ডি আসলে একটি জৈব কফিন যেটা তৈরি হয়েছে বায়োপ্লাস্টিক দিয়ে। আর এই বায়োপ্লাস্টিক তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন গাছপালার স্টার্চ থেকে।’

উত্তর শুনে নড়েচড়ে বসেন সমস্ত ক্রেতারা। একধরণের হৈচৈ পড়ে যায় তাদের মধ্যে। কী আসলে এই ক্যাপসুলা মুন্ডি? কীভাবে কাজ করে? জৈব কফিনটাই বা কী?

সেদিন যে দু’ধরনের ক্যাপসুলা মুন্ডি অ্য‌‌‍‍না আর রাউল জনতাকে দেখিয়েছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল ছোট এবং আরেকটি বেশ খানিকটা বড়ো। ছোট আকারের পাত্রে রাখা হবে  মৃত মানুষের চিতাভস্ম এবং বড় আকারের পাত্রগুলোতে শবদেহ।

ছোট আকারের পাত্রগুলোতে মৃত মানুষের ছাইভস্ম ঢালা হবে। সেই ছাইয়েই মিশে থাকে কার্বোনেট, পোড়া হাড়ের গুঁড়ো, লবণ, চুন, সোডিয়াম, সালফার ইত্যাদি। এই ছোট ক্যাপসুলা মুন্ডির মাথায় থাকা একটি ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে তার ভিতরে মৃত মানুষের ছাই ঢেলে তা পুঁতে দেওয়া হবে মাটিতে। এবং তারপর তার ঠিক ওপরে লাগানো হবে কোনও গাছের বীজ বা চারা। কোন গাছের বীজ বা চারা লাগানো হবে তা সিদ্ধান্ত নেবে মৃতের আত্মীয়রা। আস্তে আস্তে ক্যাপসুলা মুন্ডি থেকে পৌষ্টিক উপাদান সংগ্রহ করে বীজ বা চারাগাছটা বড় হয়ে উঠবে।

কেমন হবে যদি মৃত্যুর পর আমরা গাছ হয়ে বেঁচে থাকি?

ছবি সৌজন্যে: Google || গ্রাফিক ডিজাইনার অ্য‌‌‍‍না সিতেল্লির বিবৃতি

অন্যদিকে বড় ক্যাপসুলা মুন্ডিতে মৃত মানুষটার হাত পা গুটিয়ে ঠিক যেভাবে মায়ের পেটে ভ্রূণ আকারে এসেছিলেন তিনি সেভাবেই যত্ন সহকারে বসিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে সমেত ক্যাপসুলা মুন্ডিটি মাটির নিচে পুঁতে তার ঠিক ওপরে বসিয়ে দেওয়া হবে বীজ বা চারাগাছ। ধীরে ধীরে মাটিতে থাকা অণুজীবেরা মাটির বুকেই গলিয়ে দেবেন মাটির সন্তান কে। তাঁর পচা দেহ থেকে পৌষ্টিক উপাদান সংগ্রহ করে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে ছোট্ট চারাগাছটি। তারপর একদিন ওই মৃত মানুষটি সত্যি সত্যি বিশাল বড় গাছে পরিণত হবেন।

■ কাঠের কফিন না ক্যাপসুলা মুন্ডি? :

অ্য‌‌‍‍না আর রাউল জানান মানুষের মৃত্যুর পর ব্যবহৃত কফিন তৈরির জন্য রোজ কাটা পড়ে লক্ষ লক্ষ গাছ। এইভাবে মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে মৃত্যু হয় গাছেদেরও। ফাঁকা হয়ে যায় অরণ্য। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, ক্যাপসুলা মুন্ডি বানাতে গেলে গাছ তো কাটতেই হয় না উল্টে মানুষ মৃত্যুর পর প্রকৃতিতে গাছ হয়ে থেকে যান। এছাড়াও কফিন তৈরি করতে লাগে বিভিন্ন প্লাস্টিক, পলিথিন, ধাতু এবং বিষাক্ত রং যা প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর। কফিনের ওপর একটা সমাধিক্ষেত্র এর ওপর স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে লাগে সিমেন্ট, বালি, কংক্রিট, পাথর ইত্যাদি। যে সৌধ ভবিষ্যতে মাটিতে বৃষ্টির জল ঢুকতে দেয় না। উল্টোদিকে ক্যাপসুলা মুন্ডি পরিবেশ বান্ধব। একদিন হাজার হাজার ক্যাপসুলা মুন্ডি মিলে তৈরি করবে ঘন অরণ্য। সেই অরণ্যে খেলবে রোদ-মেঘ-কুয়াশা-প্রজাপতি-পাখিদের দল।

■ ক্যাপসুলা মুন্ডি আজ :

অ্য‌‌‍‍না এবং রাউলের দেখা স্বপ্ন আজ প্রায় সফল। আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সারা পেয়েছেন তাঁরা। লোকজন প্রচুর পরিমাণে কিনছেন ক্যাপসুলা মুন্ডি। অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। তবে দুঃখের ব্যাপার একটাই, তাদের নিজেদের মাতৃভূমি ইতালিতে আজও ক্যাপসুলা মুন্ডি ছাড়পত্র পায়নি।

■ স্বপ্ন তবুও রঙিন :

বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ভাবে ক্যাপসুলা মুন্ডির বিরোধিতা হলেও, তার নিজের দেশ এখনও এই প্রজেক্টকে ছাড়পত্র না দিলেও, ৫৭ বছরের অ্য‌‌‍‍না তবুও স্বপ্ন দেখেন, আজ থেকে বছর কুড়ি পর তার সন্তান সন্ততিদের গাড়ি এসে থামবে ঘন সবুজ পাহাড়ী অরণ্য প্রান্তে। কিছুটা দূরেই রডোডেনড্রন গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন অ্য‌‌‍‍না, আর তার বন্ধু রাউল হয়তো পাইন গাছ হয়েই থাকবেন পাশেই। সবুজে মোড়া সে অরণ্যে তার সন্তানরা এসে দাঁড়াবেন রডোডেনড্রন গাছটার নীচে, জড়িয়ে ধরবেন অ্য‌‌‍‍নাকে, চুমু খেয়ে বলবেন ‘মম, উই মিস ইউ সো মাচ’। সবটুকু শুনতে পারবেন অ্য‌‌‍‍না। আবেগে গলা ভারী হয়ে আসবে তার। বাতাসের ছুঁয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি কিছু ঝরা পাতা আর ফুল ছড়িয়ে দেবেন সন্তানদের গায়ে।  পাশ থেকেই পাইন সেজে দাঁড়িয়ে থাকা রাউল দেখবে এর সবটুকু। আর ডালে ডালে তারা একে অন্যকে ছুঁয়ে দিয়ে বলবে, ‘আমরা পেরেছি অ্য‌‌‍‍না…’

 

Source:

More Articles

error: Content is protected !!