পরিবেশ ও নিজেকে বাঁচাতে নজর দিন বাতিল হওয়া মোবাইল, কম্পিউটার. ল্যাপটপে

By: Susen

September 18, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

সুসেন: বাড়িতে অনেকদিন ধরে খারাপ হয়ে পড়ে আছে অন্তত তিনটি স্মার্ট ফোন। না, যেগুলি সম্ভবত আর কোনওদিনই কাজে লাগবে না।। কিন্তু কলকাতার একটি প্রথম সারির কলেজের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা ডঃ বসু এখনও ঠিক করে উঠতে পারছেন ফোনগুলির কি বন্দোবস্ত করবেন? সম্প্রতি অবশ্য শহরে কয়েকটি সংস্থার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে যারা ই-ওয়েস্ট রিসাইক্লিংয়ের কাজ করে। কিন্তু নানা ব্যস্ততার ফাঁকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে ওঠাও একটা সমস্যা। একই অসুবিধার মুখোমুখি ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা আইটি বিশেষজ্ঞ পূষণ চ্যাটার্জি বা মুম্বাইয়ে বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত অভিষেক রায়। ডিজিটাল যুগে বাস করছি আমরা। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ট্যাবের এখন আকছাড় ব্যবহার হয়। এর ফলে কাগজের ব্যবহার অনেকটাই কমেছে। তার জেরে হয়তো খানিকটা কমেছে গাছ কাটার সংখ্যাও। কিন্তু, পরিবেশে এক নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ‘ডিজিটাইজেশন’-এর হাত ধরে ইলেক্ট্রনিকস দ্রব্যের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ধরনের বর্জ্য পদার্থ যাকে আমরা ই-বর্জ্য বলছি। পুরনো, ব্যবহারের অযোগ্য ইলেক্ট্রনিকস দ্রব্যকে ‘ই-ওয়েস্ট’ বা ইলেক্ট্রনিকস বর্জ্য বলা হয়। জেট গতির জমানায় যা এক অনাহুত বিপদ।

প্রতিদিন বৈদ্যুতিন দ্রব্যের নিত্যনতুন মডেল বাজারে আসার ফলে পুরনো জিনিসগুলি আর তেমন ভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। তার ফলে দ্রুত গতিতে বাড়ছে বৈদ্যুতিন বর্জ্যের পরিমাণ। পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের উদ্যোগে ২০১৬ সালে খ্যাতনামা মার্কেট রিসার্চ সংস্থা আইএমআরবি-কে দিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। ওই সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে শুধু এরাজ্যেই ই-ওয়েস্টের পরিমাণ হতে পারে ৭১২৫ মেট্রিক টন। যা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজির গবেষক সোহম সেনগুপ্তের কথায়, ” বৈদ্যুতিন বর্জ্যে থাকে তামা, অ্যালুমিনিয়াম, সোনা, রুপো, প্যালাডিয়াম, প্লাটিনাম, নিকেল, টিন, লেড (দস্তা), লোহা, সালফার, ফসফরাস, আর্সেনিক, রোডিয়াম প্রভৃতি। পরিবেশের সঙ্গে এগুলি মিশলে তা যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারে।” জৈবরসায়নের অধ্যাপিকা ডঃ তিস্তা দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন, এই ই-বর্জ্যে থাকা অ্যান্টিমনি মৌলটির কারণে চোখ, ত্বক, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার তার সঙ্গে থাকা বিসমাথ থেকে শ্বাসকষ্ট, ত্বকের ক্ষতি, অনিদ্রা, হতাশা, হাড়ের যন্ত্রণা প্রভৃতি বাড়ে। ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু ফুসফুসের ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, পাকস্থলীর সমস্যা, আলসার, অ্যালার্জি প্রভৃতির জন্য দায়ী। বেশি পরিমাণে দেহে আসলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

পরিবেশ ও নিজেকে বাঁচাতে নজর দিন বাতিল হওয়া মোবাইল, কম্পিউটার. ল্যাপটপে

চিত্রঋণ : Google

চিকিৎসক পার্থসারথি ভট্টাচার্য অনা একটি সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, কোবাল্ট থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও চোখ। থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যাজমা প্রভৃতির জন্যও কোবাল্ট দায়ী। ই-বর্জ্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিকর উপাদান হল মলিবডেনাম। অস্থি বিশেষজ্ঞ চন্দ্রশেখর কুণ্ডর বক্তব্য, এটি থেকে হাত, পা, হাঁটু, কনুই প্রভৃতি অঙ্গে ব্যথা সৃষ্টি হতে পারে। বহু ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যে লেড বা সিসা ব্যবহার হয়। এই উপাদানটি জীবজগৎ ও পরিবেশের পক্ষে সবচেয়ে ক্ষতিকর। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ শান্তনু বসুমল্লিকের মতে, এই উপাদানটি কোনও ভাবে দেহে প্রবেশ করলে মস্তিষ্ক, কিডনির যথেষ্ট ক্ষতি হতে পারে। দেখা দিতে পারে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও। সন্তান উৎপাদন ও ধারণক্ষমতার বিশেষ ক্ষতি হয় আবার শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশও ব্যাহত হতে পারে সিসার কারণে। এ ছাড়াও বহু ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যে টিন ব্যবহার করা হয়। টিন থেকে ত্বক ও চোখের চুলকানি, মাথার যন্ত্রণা, বদহজম, শ্বাসকষ্ট ও মূত্রাশয়ের রোগ দেখা দেয়। ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যে অনেক সময় নিকেলের প্রলেপ লাগানো হয়ে থাকে। এই নিকেল থেকে ফুসফুস, নাক, প্রস্টেট প্রভৃতি অঙ্গে ক্যানসার সৃষ্টি হতে পারে। জানাচ্ছেন ক্যানসার চিকিৎসক সুবীর গাঙ্গলী। হৃৎপিণ্ডের অনিয়মিত গতির জন্যও নিকেলকে দায়ী করা হয়ে থাকে।

শুধু আমাদের শরীরেই নয়, ই- ওয়েস্ট-এ থাকা ধাতব উপাদান মাটি ও ভূ-গর্ভস্থ জলকেও দূষিত করে। পরিবেশবিদ সোমশুভ্র দাশগুপ্তের বক্তব্য, ক্যাডমিয়ামের প্রভাবে গাছেদের বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে ইকো সিস্টেমের খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমস্যা মেটাতে হলে প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনার (ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট)। যার মাধ্যমে একমাত্র ই-বর্জ্য পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাবকে অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। ডঃ দাশগুপ্তের পরামর্শ, ধাতব এবং অধাতব যে উপাদানগুলি ই-বর্জ্যে থাকে তা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলাদা করে সেগুলিকে নতুন করে ব্যবহার করা যেতে পারে। এজন্য ই-বর্জ্য জমা ও বাছাই করে স্তূপ আকারে রাখা হয়। তার পরে ভেঙে বা গলিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এই পদ্ধতিতে ঝুঁকিও রয়েছে। ই-বর্জ্য পদার্থ গলানোর সময় বাতাসে প্রচুর দূষিত গ্যাস মেশার আশঙ্কা থাকে। এই ডাই-অক্সিন মানবদেহে ক্যানসার রোগের সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া বর্জ্য পদার্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ডিএনএ-র গঠনে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ কাজলকৃষ্ণ বনিকের। তিনি জানাচ্ছেন, বৈদ্যুতিন দ্রব্যের কেসিং-এর মধ্যে থাকা পলিভিনাইল ক্লোরাইড পরিবেশের ক্ষতি করে। ফলে ঠিক পদ্ধতি অবলম্বন না করলে এই বর্জ্যের প্রক্রিয়াকরণও বড় ধরনের বিপদ ডেকে নিয়ে আসে।

ই-বর্জ্য পদার্থ নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতি নেওয়া যায়। সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ সুমন মিত্রের মতে, প্রথমত, যন্ত্র ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখা। এতে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব বেশি দিন ধরে ব্যবহার করা যাবে। গুরুত্ব দিতে হবে পুরনো জিনিসের ব্যবহার বাড়ানোর উপরে। একই যন্ত্র একাধিক কাজ করবে এমন মাল্টিপারপাস ইলেক্ট্রনিকস যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে পারলে ভাল হয়। একই চার্জারে সব সংস্থার সব মডেলের মোবাইল চার্জ করা যায়, এমন চার্জারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি। আইনের মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিকস পণ্যের উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে রিসাইকেলিং বা পুনরুৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলায় উৎসাহিত করতে পারলে ভাল হয়। ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ আর নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

সবশেষে আশার কথা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং বেসরকারি সংস্থাগুলি ক্রমশ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগী হচ্ছে। বিভিন্ন মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বিক্রয়কারী সংস্থাগুলি পুরনো যন্ত্র সংগ্রহ করে তা রিসাইক্লিং-এর ব্যবস্থা করেছে। এটা জরুরি, পরিবেশবিদ ডঃ দাশগুপ্তের কথায়, এখন থেকে সচেতনতা না বাড়ালে ভবিষ্যতে ই-বর্জ্য দৈনন্দিন জীবনে একটি অভিশাপে পরিণত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য প্রতিবেদকের নেওয়া

More Articles

error: Content is protected !!