গীতা ছুঁয়ে শপথ, ঋষি সুনককে কেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানল ব্রিটেন

Rishi Sunak: ঋষি-র কাছে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে, দেশের অর্থনীতিকে ফের শক্তিশালী করা।

প্রায় ২০০ বছর ভারত শাসন করেছিল ব্রিটিশরা। আর এবারে ব্রিটিশ শাসন করবেন একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। একাধিক রেকর্ড গড়ে যুক্তরাজ্যের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত শতকোটিপতি ঋষি সুনক। একসময়ের উপনিবেশ থেকে উঠে আসা অভিবাসী বংশোদ্ভূত হিসেবেও তিনি হলেন ব্রিটেনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন পার্টি কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এবং দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঋষি-র জয়লাভ ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি মোড়ঘোরানো ঘটনা। ঋষির বাবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও তারা থাকতেন পূর্ব আফ্রিকায়, এবং সেখান থেকেই তারা ব্রিটেনে এসে বসবাস শুরু করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-র পর ৪২ বছর বয়সি ঋষি হতে চলেছেন শিল্পোন্নত দেশগুলির জোট জি-৭-এর দ্বিতীয় অশ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রনায়ক। সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নাম লেখালেও সেই সময়ে লিজ ট্রাসের কাছে পরাস্ত হতে হয়েছিল ঋষি-কে। তবে মাস ঘুরতে না ঘুরতেই ভাগ্য পরিবর্তন হলো ঋষির। অক্টোবর মাসে কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্রিটেনের বর্তমান ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান নির্বাচিত হয়েছিলেন ঋষি। তাঁর এই কৃতিত্ব যে বিশ্বজুড়ে বহু মানুষকে চমকিত করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে অনেকেই ঋষি-র নির্বাচনে জয়লাভকে দীপাবলির পুরস্কার হিসেবে গণ্য করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। হিন্দু ধর্মের প্রতি তাঁর আস্থা এবং তাঁর স্ত্রী-র ভারতীয় নাগরিকত্ব এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হয়ে উঠেছে। বছরদুয়েক আগে দীপাবলিতে তিনি তাঁর তৎকালীন সরকারি আবাসন ১১ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাড়িতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে শিরোনামে উঠেছিলেন। সেই ঋষি আজ আবারও শিরোনামে। ‌আবারও তাঁর হাতে সরকারি আবাসন। তবে এবারে ১১ নম্বর নয়, ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাড়িটি হতে চলেছে তাঁর।

আরও পড়ুন: সশস্ত্র বিপ্লবী থেকে ঋষি, বিচিত্র জীবন ছিল অরবিন্দর! তাঁর জন্মদিনেই স্বাধীন হলো দেশ

জন্ম এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে উত্থান
ঋষি সুনকের জন্ম হয়েছিল ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডের বন্দরনগরী সাউদাম্পটনে। ঋষি-র বাবা পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মা একটি ফার্মেসি চালাতেন। ফলে প্রথম থেকেই অর্থের কোনও অভাব ছিল না তাঁর। নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উইনচেস্টার কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি। এরপর গ্র‍্যাজুয়েশনের জন্য তিনি চলে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন ঋষি। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতীয় ধনকুবের এবং আইটি কোম্পানি ইনফোসিস-এর প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণমূর্তির মেয়ে অক্ষতার। তারপরেই আলাপ পরিচয় থেকে সম্পর্ক প্রেমের দিকে গড়ায়। নারায়ণমূর্তি প্রথমে এই সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি জানালেও, পরে ঋষি-র লড়াই করার মানসিকতা দেখে মুগ্ধ হন শ্বশুর। বর্তমানে দু'টি কন্যাসন্তান রয়েছে এই দম্পতির।

২০০১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ঋষি সুনক মার্কিন বিনিয়োগ কোম্পানি গোল্ডম্যান সাকসে চাকরি করেছিলেন। পরে এই কোম্পানির দুটো হেজ ফান্ডের অংশীদার হয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে প্রথম উত্তর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার কাউন্টির রিচমন্ড এলাকা থেকে মেম্বার অফ পার্লামেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ব্রেক্সিট অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনকে বের করে আনার পক্ষে কাজ করেছেন তিনি। সেই সময় গণভোটের প্রচারণার সময় পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন এখন অনেক মুক্ত। ভবিষ্যতে ব্রিটেন আরও সমৃদ্ধ দেশ হবে।"

সেসময় শক্ত অভিবাসন নীতি প্রণয়ন করার সপক্ষে কথা বলেছিলেন ঋষি। তিনি বলেছিলেন, "যদিও আমি বিশ্বাস করি যথাযথ অভিবাসন নীতি দেশের জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনক। তবে সীমান্ত রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই কাজ করতে হবে।" ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে'র সরকারে ঋষি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের জুনিয়র মন্ত্রী। পরে বরিস জনসন ক্ষমতা নেওয়ার পরে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিফ সেক্রেটারি হয়ে ওঠেন। তবে বরিস জনসনের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ ২০২০ সালে পদত্যাগ করেন এবং ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অর্থমন্ত্রী হয়ে যান ঋষি সুনক।

তবে ২০২২ সালে করোনাভাইরাস লকডাউন ভেঙে পার্টি করা এবং তা নিয়ে মিথ্যে কথা বলার অভিযোগে যখন পার্টিগেট কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত বরিস জনসন, ঠিক সেই সময় অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন ঋষি সুনক। সেই সময় তাঁর পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে বরিস জনসনের সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়। বরিস জনসনের সমর্থকরা তাঁর বিরুদ্ধে সুযোগসন্ধানী হওয়ার অভিযোগ আনলেও সুনক বলেছিলেন, শুধুমাত্র নৈতিক কারণে তিনি সেই সময় সরকার থেকে সরে যান।

তবে বরিস জনসনের পদত্যাগের পরেই নেতৃত্বের নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ওঠেন ঋষি সুনক। প্রচারণায় নিজেকে চৌখস একজন আর্থিক ব্যবস্থাপক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। প্রচারণার প্রধান বার্তা ছিল, ব্রিটিশ অর্থনীতি যেখানে প্রবল সংকটের মধ্যে রয়েছে এবং করোনাভাইরাসের কারণে যেখানে ব্রিটিশ অর্থনীতি কার্যত স্তব্ধ, সেই জায়গায় তাঁর প্রধান কাজ হবে এই স্তব্ধ অর্থনীতির সমাধান খুঁজে বের করা। তবে শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনের ভোটে তিনি লিজ ট্রাসের কাছে পরাজিত হন। তবে সরকারের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটে আর্থিক খাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিতর্কের মুখে পড়ে যান লিজ। ফলে ঘরে বাইরে প্রচণ্ড চাপে পড়ে অবশেষে গত সপ্তাহে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। এরপরই আবার নেতৃত্বের ব্যাপারে তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেন ঋষি। আর এবারে কার্যতা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের নেতা নির্বাচিত হয়ে যান তিনি। মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রিটেনের ৫৭তম প্রধানমন্ত্রী এবং ১৮১২ সালের পর থেকে সবথেকে কমবয়সি প্রধানমন্ত্রী।

হিন্দু ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা
ব্রিটেনে বসবাস করলেও, সর্বদা হিন্দু ধর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অটুট। ২০১৯ সালে একটি সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, "আমার বাবা-মা এদেশে এসে বসতি গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং, এমন একটা প্রজন্ম এদেশে রয়েছে যাঁদের জন্ম এ দেশে হলেও তাঁদের বাবা মায়ের জন্ম অন্যত্র। আমি যদি আমার সাংস্কৃতিক প্রতিপালনের কথা বলি তাহলে, আমি সপ্তাহ শেষে শনিবার মন্দিরে যাই। আমি নিজে একজন হিন্দু, এবং এটা আমি কখনই অস্বীকার করতে পারি না। তবে একই সঙ্গে আমি সেন্টেসের ম্যাচের দিন মাঠেও গিয়েছিলাম। আমি দুটো কাজই করেছি, সবই করেছি।"

ভগবৎ গীতা পড়ে শপথগ্রহণ
ঋষি ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম অর্থমন্ত্রী যিনি নিজের ধর্মকে সম্মান করতে কোন সংকোচ বোধ করেননি। তিনি যখন প্রথমবার পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন সেই সময় তাঁর হাতে ছিল ভগবৎ গীতা। সেই সময় তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন, "আমি এখন ব্রিটেনের নিবাসী। তবে আমার ধর্ম হিন্দু। আমার ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভারতীয়। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমি নিজে একজন হিন্দু এবং আমার সংস্কৃতি এবং আমার পরিচয় সবকিছুই হিন্দু।"

পরবর্তীতে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি খুব সৌভাগ্যবান ছিলেন যে, বড় হওয়ার সময় তাঁকে খুব একটা বর্ণবাদী আচরণের মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু একটি ঘটনার কথা তিনি ভুলতে পারেননি কখনই। "ছোট ভাই এবং বোনকে নিয়ে একদিন আমি বেরিয়েছি। সেই সময় আমার অল্প বয়স, হয়তো বছর ১৫ হবে। আমরা একটি ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম। সেখানে কিছু লোক বসেছিল। তারা প্রথম আমাদের লক্ষ্য করে 'পি' শব্দটি ছুঁড়ে দিয়েছিল। ওই শব্দ এবং ঘটনাটা সেদিন আমার ভীষণ গায়ে লেগেছিল। আমি এখনও তা ভুলতে পারিনি। তবে, এখনকার ব্রিটেনে এমনটা ঘটবে এটা আমি বিশ্বাস করি না।"

আরও পড়ুন: ক্রিকেট-দুনিয়ায় আজও বিতর্কিত ‘মানকরিং’ আউট! কোন ইতিহাস রয়েছে আড়ালে

বিতর্ক
মনে করা হয়, ব্রিটিশ এমপি-দের মধ্যে তিনি অন্যতম একজন ধনী ব্যক্তি। তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্ন সময় তাঁর দলের ভেতর থেকে প্রশ্ন উঠেছে প্রাইভেট স্কুলে পড়া এবং কোটিপতি ঋষি অর্থনৈতিক সংকটে পড়া সাধারণ মানুষের দুর্দশা কতটা অনুধাবন করেন সেই নিয়ে। গত মে মাসে ঋষি সুনক এবং তাঁর স্ত্রী-র কর দেওয়ার হিসেব নিয়ে বিতর্ক ওঠে। চাপের মধ্যে, তাঁর স্ত্রী বলতে বাধ্য হন, বিদেশে করা আয় থেকে তিনি ব্রিটেনে কর দেবেন।

সামনে চ্যালেঞ্জ কতটা?
ঋষির কাছে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে, দেশের অর্থনীতিকে ফের শক্তিশালী করা, ওই কারণেই চলে যেতে হয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ট্রাসকে।‌ পদত্যাগ করে তিনি এটাও বলেছিলেন, ব্রিটেনের অর্থনীতি ফের নিজের জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি কিছুই করতে পারেননি। বর্তমানে দেশের যা আর্থিক পরিস্থিতি, তাতে কনজারভেটিভ পার্টি তাঁকেই যোগ্য লোক বলে মনে করছে, এমনটা আগেও বলেছিলেন ঋষি। ব্রিটেনে এই মুহূর্তে যেহেতু কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে, তাই কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। সেই কারণে দলের পাশে থাকতে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ছুটি বাতিল করে দেশে ফিরেছিলেন বরিস জনসন। কিন্তু, শেষ হাসি হাসলেন সেই ঋষিই।

নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঋষি যদি নিজের দলের মধ্যে দ্রুত ঐক্য ফিরিয়ে আনতে না পারেন এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হন তাহলে নির্বাচনের দাবি আরও জোরালো হবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ‌নেতা নির্বাচনের এই দলীয় প্রতিযোগিতার মধ্যে পরিচালিত জনমত সমীক্ষায় বারবার দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ ভোটার কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে থাকেন। ‌সেক্ষেত্রে যদি, ঋষি ব্যর্থ হন তাহলে নির্বাচনের পুরো বিষয়টা জনগণের হাতে চলে যেতে পারে। ফলত, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের যে এখনই ইতি ঘটছে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। আগাম নির্বাচনের পথে একমাত্র বাধা এখন কনজারভেটিভ পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কা। সমস্ত জনমত সমীক্ষাতেই লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টির থেকে অনেকটা এগিয়ে। তাই নতুন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনকের কাছে লড়াইটা যে এতটা সহজ হবে না, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

More Articles