প্যালেস্টাইনের স্বীকৃতি ও ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা: আদতে রাজনৈতিক প্রহসন?

Palestine Recognition and Trump’s Peace Plan: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন— সবাই জানে যে ইজরায়েলি দখল আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের কারণে তারা মুখ খোলে না।

প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া বা ট্রাম্পের তথাকথিত 'শান্তি পরিকল্পনা'— দু’টিই আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রহসন। এই মতই প্রকাশ করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্যালেস্টাইন ইস্যু যত পুরনো, ততই জটিল। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে যেভাবে পশ্চিমা দেশগুলো এই প্রশ্নে দ্বৈত নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে স্বাধীন প্যালেস্টাইন যেন আজ শুধুই দূরের স্বপ্ন।

১৯৮৮ সালে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলেও, বাস্তবে সেই রাষ্ট্র আজও কাগজেই বন্দি। পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব জেরুজালেম— এই তিনটি অঞ্চল নিয়ে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলেও, ইজরায়েলি দখল ও পশ্চিমা নীরবতা মিলে সেটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের একাধিক দেশ, বিশেষত ইউরোপের কয়েকটি দেশ, প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি কূটনৈতিক প্রদর্শনীর বেশি কিছু নয়। প্রকৃত অর্থে কোনো বাস্তব পরিবর্তন ঘটেনি। ইজরায়েলি সেনা আগ্রাসন যেমন ছিল, তেমনই আছে।

২০১৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন তথাকথিত 'Deal of the Century' অর্থাৎ শতাব্দীর সেরা শান্তি পরিকল্পনা। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলেন, এটি আসলে ছিল ইজরায়েলকেই আরও শক্তিশালী করার এক কৌশল। এই পরিকল্পনায় প্যালেস্টাইনিদের জন্য ছিল না কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা, বরং ছিল ইজরায়েলি দখলের বৈধতা। পূর্ব জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজোলিউশনের সরাসরি লঙ্ঘন।

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের চাপ, হামাসের শর্ত : গাজায় শান্তি ফিরবে?

প্যালেস্টাইন ইস্যুতে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলির নীরবতা আজ এক ধরনের অপরাধে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন— সবাই জানে যে ইজরায়েলি দখল আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের কারণে তারা মুখ খোলে না। জাতিসংঘের প্রস্তাবও কাগজে রয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালের সীমান্তে ফিরে যাওয়া বা বসতি স্থাপন বন্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলি আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

ব্রিটেনের কথা বলা যাক। ব্রিটেন যেমন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে আবার ইজরায়েলকে অস্ত্র রফতানি করছে— এই দ্বিমুখী নীতি বিষয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। অক্সফ্যাম ও ক্যাম্পেন এগেনস্ট আর্মস ট্রেড (Campaign Against Arms Trade)-এর মতো সংস্থা বলেছে, এই নীতি 'অনৈতিক' এবং 'ভণ্ডামি'। চলতি বছর অগাস্ট মাসে ব্রিটেন থেকে ইজরায়েলে প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার গুলি, ট্যাংকের যন্ত্রাংশ, শটগান-রাইফেল, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরক-সহ বড় পরিমাণ অস্ত্র পাঠানো হয়েছে। ব্রিটেন সরকারের দাবি— কিছু অস্ত্র রফতানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়। তবে তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক লাইসেন্স এখনও রয়েছে, এবং অস্ত্র রফতানি বন্ধের কোনো বড় পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না।

গাজায় মানবিক সাহায্যের নামে মৃত্যুর মিছিল নতুন নয়। খাবার, জল আর ওষুধের আশায় হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ কেন্দ্রের সামনে ভিড় করছেন। কিন্তু সেই কেন্দ্রগুলিতেই গুলি করা হচ্ছে, বোমা ছোড়া হচ্ছে, এতেই অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। অভিযোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত সংস্থা (Gaza Humanitarian Foundation) গাজায় সাহায্য বিতরণের কাজ করছে, কিন্তু বাস্তবে সেই ত্রাণই পরিণত হয়েছে ভয়াবহতার উৎসে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইজরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ত্রাণের নামে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চাইছে।

শুধু তাই নয়, গাজায় ইজরায়েলের সামরিক দখল ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি কোম্পানি মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট (গুগলের মূল সংস্থা) ও অ্যামাজন ইজরায়েলকে তাদের ক্লাউড ও এআই-সুবিধা দিয়ে সহায়তা করছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে গাজার নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, রাখা ও নজরদারিতে। এছাড়া বড় বিনিয়োগকারীরা এসব সংস্থায় ব্যাপক অর্থ লগ্নি করছে যা অবৈধ দখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মদত দিচ্ছে বলে অভিযোগ। প্রতিবেদনে এসব কোম্পানিকে ইজরায়েলের অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

১৯৬৭ থেকে ২০২৫! যেভাবে গাজায় বারবার নিশানা করা হচ্ছে সাংবাদিকদের

এখন প্যালেস্টাইনিদের জীবনে শান্তি মানে কেবলই কল্পনা। পশ্চিম তীরে প্রতিদিন বাড়ছে ইজরায়েলি চেকপয়েন্ট, বসতি ও দেওয়াল। গাজায় খাবার, জল, ওষুধ— সব কিছুরই সংকট। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি বারবার বলেছে— এই অবরোধ একপ্রকার সমষ্টিগত শাস্তি। কিন্তু তবুও বিশ্ব নীরব। কারণ, ইজরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার মূল ভিত্তি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সমাজ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেবে না, ততদিন কোনো শান্তি সম্ভব নয়। শুধু মুখে সমাধান বললেই হবে না— প্রয়োজন নৈতিক অবস্থান। ইউরোপীয় দেশগুলির প্যালেস্টাইন স্বীকৃতি যদি সত্যিই অর্থবহ হত, তবে তারা ইজরায়েলি পণ্য বয়কট করত, বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করত। কিন্তু তা তারা করেনি। তাই এই স্বীকৃতি আজ এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

প্যালেস্টাইন আজও এক অসম যুদ্ধের ময়দানে। তাদের স্বপ্ন— স্বাধীন রাষ্ট্র, মুক্ত ভূমি, শান্তিপূর্ণ জীবন সবই যেন আন্তর্জাতিক কূটনীতির লাল ফিতেতে জড়িয়ে আছে। ট্রাম্পের 'শান্তি পরিকল্পনা' কিংবা ব্রিটেনেরর 'স্বীকৃতি দেওয়া'—দু’-টোই আসলে বিশ্বের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যতদিন এই দ্বিচারিতা চলবে, ততদিন প্যালেস্টাইনিদের স্বাধীনতার গল্প রয়ে যাবে শুধু ইতিহাসের এক অসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে।

More Articles