সোনার খোঁজে সাহিত্যিকের মরণঝাঁপ! জ্যাক লন্ডন যেন বিভূতিভূষণের ‘শংকর’

By: Sindhu Som

January 3, 2022

Share

১৮৯৮ সালে চিলকুট ট্রেইলে একদিন। লাইব্রেরিজ, স্পেশাল কালেকশন

১৮৯৭-র ১৭ই জুলাই। সিয়্যাটলের বন্দরে ‘পোর্টল্যাণ্ড’ এসে লেগেছে তখন সবে। সকাল সকাল অতি সাধারণ জলখাবার খেয়ে অতি সাধারণ দিন শুরু করা আর চার পাঁচটা মানুষ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কিছু। সমুদ্রের উপর রোজের মতোই উড়ে যাচ্ছে পেলিকান। সমস্ত শান্ত। ঝড়ের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। অথচ  পোস্ট-ইন্টেলিজেন্সারের এক সাংবাদিক থেকে থেকেই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। ব্যাপারখানা কী?  মাসদুয়েক আগেই জাহাজে চেপে প্রথমবার লণ্ডনে পৌঁছেছে ড্রাকুলা, ব্রাম স্টোকারের উপন্যাসে উড়াল দিয়ে। একই বছর। কাকতালীয়? নাকি ভবিষ্যৎদ্রষ্টার নিদান ফলে যাওয়ার আখ্যান? সেই বছরই আমেরিকার এক বন্দরে জাহাজে করে এসে পৌঁছল আরেক প্রাগৈতিহাসিক রক্তচোষা। ড্রাকুলার মতো সেও এসেছে ছদ্মবেশে। এক বিশেষ অসুখ, অথচ মানুষে দেখছে সৌভাগ্য। জাহাজীরা রীতিমতো আক্রান্ত। সে সৌভাগ্যের খবর ভেসেছে হাওয়ায়। আরও কিছুদিন পরে একে লোকে নাম দেবে ক্লউণ্ডিসাইটিস; কিন্তু তা আসতেও তখনও ঢের ঢের দেরি। ইতিমধ্যে ‘পোর্টল্যাণ্ডে’ চড়ে সেই সাংবাদিক দেখে এলেন খবরটা সত্যি কিনা। ভুল নেই, ভুল নেই। চারিদিকে তখন মন্দা চলছে। এই মন্দার বাজারে এমন একটা খবর। এ তো হাতে সোনা পাওয়ার মতো ব্যাপার। না না, মতো আবার কি। সোনাই তো। টন দুয়েক সোনায় জাহাজের পেট-ভার। এসেছে কানাডার উত্তর পশ্চিম থেকে। এই ভারের আন্দাজ ধীর ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে লোকটির মনে। এ খবর কেমন গরম করে ফেলবে বাজার, তা আন্দাজ করা মোটেই শক্ত না ঝানু সাংবাদিকের পক্ষে। হলও তাই। “গোল্ড। গোল্ড। গোল্ড। গোল্ড।” জগৎ-জোড়া খবরের কাগজে হেডলাইনের সে কি চেঁচামেচি। নিজেকে সংযত করতে পারলেন না সাংবাদিক, ‘সৌভাগ্য দোড়গোড়ায় বন্ধুরা!’ প্রবল আবেগ আর আত্মবিশ্বাসে লিখে ফেললেন, ‘আর মন্দা নয়।’ তাঁকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায় না, উত্তেজনার মুহূর্তে জ্বর টের পায় না তেমন মানুষ। এই আখ্যানের জন্মদোষেই তো ক্লণ্ডিসাইটিসের আরেকটি নামই সোনার জ্বর–’দ্য গোল্ড ফিভার’।

ডানদিকে তৎকালীন ডওসন এবং বাঁদিকে জ্যাক লণ্ডন—লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, জ্যাক লণ্ডন কালেলশন, দ্য হাণ্টিংটন লাইব্রেরি, সান মারিনো, ক্যালিফোর্ণিয়া

একটা ইশারামাত্র, সত্য আর  গুজব মিলেমিশে গিয়ে শুরু হল বিশ্বের বৃহত্তম সোনার খোঁজ। জাহাজের খবরটা ছড়িয়ে পড়ার হপ্তাখানেকের মধ্যে দেখা দেখা গেল বন্দরে বন্দরে মানুষ থিকথিক করছে। হাজারে হাজারে সব বেরিয়ে পড়েছে ক্লউণ্ডাইকের উদ্দেশ্যে। আকছার শোনা যাচ্ছে সেখানে সোনা ছড়িয়ে থাকে ইতিউতি, যত ইচ্ছে কুড়িয়ে নাও, ভরার মতো যথেষ্ট পকেট থাকলেই হবে। অবলীলায় সে সব গিলছেও লোকে। অথচ কোথায় যাচ্ছে, সেখানকার আবহাওয়া কেমন, খাদ্যসরবরাহের ব্যবস্থা কী—এসব নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। যত প্রবৃত্তি ঠেলে ওঠে, ‘ব্যবস্থারা’ সেই ঝড়ে কোথায় উড়ে যায়। আজ ড্রয়িংরুমের আরামে বসে ভাবতে অবাক লাগলেও সেদিন প্রায় এক লক্ষ লোক প্রকৃতির হিংস্রতম প্রান্তরগুলি পায়ে হেঁটে, হাতে তৈরি নৌকায় পেরোতে চেষ্টা করেছিল। দুনিয়ার কাছে এরা তখন স্ট্যাম্পিডারস্‌ নামে পরিচিত। ডওসন শহরের আশেপাশে সোনার খনির খোঁজে ঘুরে চলেছে সব মত্তপ্রায়। দু’মাসেরও বেশি সময়কাল ধরে চলা সে অপরিকল্পিত সেই অভিযান এতটাই বিপজ্জনক ও কষ্টকর হয়ে উঠেছিল, যে লক্ষাধিকের মধ্যে জীবিতের সংখ্যাটা শেষ অবধি গিয়ে মাত্র তিরিশ হাজারে ঠেকে। এই রাশ রাশ জ্বরাক্রান্ত মানুষের দলে ভিড়ে গিয়েছিল ওকল্যাণ্ডের এক বছর একুশের যুবক। শক্ত-সমর্থ এই যুবক আর কেউ নন, বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক জ্যাক লণ্ডন।

একদিন যিনি বিশ্বজোড়া জ্যাক লণ্ডন নামে বিখ্যাত হবেন। তাঁর সব থেকে বিখ্যাত বই ‘কল অব দ্য ওয়াইল্ড’ অনূদিত হবে ১০০টিরও বেশি ভাষায়, তিনি এই যাত্রাপথে লাখো লোকের সঙ্গী এসব তখন হয়তো কেউ ভাবেনি। জন্মের সময় কিন্তু লন্ডনের নাম ছিল জন গ্রিফিথ চেনি। ১৮৭৬ সালে সান-ফ্রান্সিস্কোতে এক পরিযায়ী জ্যোতিষী (উইলিয়াম চেনি) ও সঙ্গীত-শিক্ষিকার (ফ্লোরা ওয়েলম্যান) ঘরে জন্মান জন। বাপ ছিলেন উড়ুক্কু স্বভাবের। এক জায়গায় তার মনই টিকত না, তায় আবার সন্তানের বন্ধন। দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন উইলিয়ম, আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন স্ত্রী ও শিশু জনকে নিয়তির হাতে ঠেলে দিয়ে। ফ্লোরা মানসিক ও শারীরীক ভাবে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলত ছোট্ট জনের শৈশব কাটতে থাকে একটা ভাঙা চোরা ঘরে ভার্জিনিয়া প্রেণ্টিস নামক এক আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলার তত্ত্বাবধানে। প্রচণ্ড অভাবে, বাপ মায়ের থেকে দূরে। মায়ে পোয়ে দেখা হবে আরও কয়েক বছর পর, ফ্লোরা তখন আমেরিকার সিভিল ওয়ারের প্রাক্তন সৈন্য জনৈক জন লণ্ডনকে বিয়ে করেছেন। ঠিক তার পরপরই পরিত্যক্ততার অতীত ঝেড়ে ফেলতে নিজের নাম আমূল বদলে ফেলবেন জন। পারিবারিক পদবি লণ্ডনের আগে নিজেই বসিয়ে নেবেন ‘জ্যাক’।

জ্যাক লণ্ডন—পিক্টোরিয়াল প্লেস লিমিটেড, আলামি।

 সম্ভবত শৈশবের ঘরের অভাববোধ বাইরের প্রবল নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল লেখকের মনে। ‘বাহির’ বলে যে চৌহদ্দি, তার প্রতিটি কোণে আন্তরিকতা ও জীবনের রসদ খুঁজে বেড়িয়ে ছিলেন লণ্ডন। ভাগ্যের পরিহাসে যে বাবার জন্ম পরিচয় ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন কৈশোরে, তার যাপনের ছায়া জ্যাক খুব একটা এড়িয়ে যেতে পারেননি। সারাটা জীবন যাযাবরের মতো কাটানো এই লেখকের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা খুব বেশিদিনের নয়। বছর চোদ্দ বয়সেই স্কুলছুট, এবং নানা রঙের পেশার জীবন বেছে নেওয়ার শুরু ঠিক এই মোড়েই। তখন সান-ফ্রান্সিস্কো খাড়িতে বেড করে করে ঝিনুকের চাষ হত। পাহারার কড়াকড়ি ছিল, তবে তার মধ্যেই ঝিনুক ডাকাতি হত ক্রমাগত। ধরা পড়লে জেল অনিবার্য। বছর পনেরোর জ্যাক ভিড়ে গেলেন এইরকমের একটি ‘ওয়েস্টার পাইরেট’-দের দলে। এই দলেই মদ আর ঝগড়ায় হাত পাকিয়ে ফেললেন রীতিমতো। শঠে শাঠ্যং, পুঁজির দুনিয়ার ডিপ্রেশনকে কলা দেখিয়ে প্রায় একই সঙ্গে সরকারি ফিশ-পেট্রলের কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলেন জ্যাক। ১৮৯৩ সালে খুলল দূর সমুদ্রের দরজা। দক্ষ খালাসি হিসেবে একেবারে সোফি সাদারল্যাণ্ডে জাপান হয়ে উত্তরে। ডাকাতির ঘেরাটোপ খুলে গেল বিপুল জলরাশির বুকে, যেন মহাকালের সম্মুখীন হল সান-ফ্রান্সিস্কোর সেই ছোট্ট ছেলেটি প্রথমবার। এরপরে নিজের মাত্র চল্লিশ বছরের জীবনকেই অভিজ্ঞতা বুনে বুনে একটা গোটা সমুদ্র করে ফেললেন তিনি। কক্সেই আর্মিতে সোশালিস্ট আন্দোলন করে জেল খাটা থেকে উদবাস্তু পরিচয়ে বস্তিতে কাটান দীর্ঘ সময়—সবই লণ্ডন মৌতাতে নিয়েছেন।

 

১৮৯৮-এ অভিযানের একটি ম্যাপ, উইকিমিডিয়া কমনস্‌

১৮৯৬ সালে ক্লওণ্ডাইক অঞ্চলে ডওসন শহরের র‍্যাবিট ক্রিক খনিতে উঠল সোনা। তারপরেই সেই জ্বর। বছর তিনেক লাগাতার। লউণ্ড্রির কাজটা ছেড়ে দিয়ে জ্যাক সে সময় ঝাড়া হাত পা। যাওয়ার ইচ্ছে প্রবল, কিন্তু রেস্তোঁ নেই। কোনও রকমে টিকে থাকাই দুঃসাধ্য সে বাজারে, তায় অভিযানের রসদ পাবেন কোথায়? মসিহা হয়ে এলেন জ্যাকের সম্বন্ধী জেমস্‌। জেমস্‌ শেপার্ডও যে খুব একটা পয়সাকড়িয়ালা লোক, তা না; তবে ওঁর স্ত্রীর বন্ধক দেবার মতো একখানা বাড়ি ছিল। ব্যস। দুজনে মোটা ফারের কোট, টুপি, বরফের জুতো, পেল্লাই মোটা দস্তানা, তাবু, কম্বল, বরফের কুড়ুল, খোঁড়াখুঁড়ির যন্ত্রপাতি, রান্নাবান্নার জন্য একখান স্টোভ, নৌকো এবং কেবিন বানানোর যন্ত্রপাতি আর এক বছরের খাবার—মানে যা যা কেনা যায় আর কি, কিনে ফেললেন। জ্যাকের নিজের বলতে ছিল মিল্টন আর ডারুইন কয়েক খণ্ড।

ডওসন—উইকিমিডিয়া কমনস্‌

আলাস্কা পর্যন্ত জাহাজে। তারপর টিংক্লিট ক্যানো-তে করে ডিয়া ফিয়র্ডে আরো ১০০ মাইল। এখান থেকে কুখ্যাত চিলুকট পথের শুরু। শুরুতেই কী পরিমাণ খাটনি তার একটু বিবরণ দেওয়া যাক। যাবতীয় সরঞ্জাম প্রথমে জড়ো করা হল আলাস্কার সমুদ্রতীরে। ট্রেইলটা শুরুতেই এতটা খাড়াই যে ঘোড়া বা খচ্চর নিয়ে ওঠা যায় না। কাজেই বাইশ সেণ্ট প্রতি পাউণ্ড দরে টিংক্লিট কুলিদের হাতে ট্রেইলের উপরে পাঠানো হল ৩০০০ পাউণ্ড মাল, বাকি নিজেরটা নিজেকেই বইতে হবে। বহু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, জ্যাক নিজে প্রায় এক টন মাল বয়েছিলেন। শুনতে অবাক লাগলেও এই পরিমাণ সেই পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত সাধারণ। সব মাল ওঠাতে মাত্র এক মাইলের এই পথে প্রত্যেক অভিযাত্রীকে পিঠে ১০০ পাউণ্ডের ব্যাগ নিয়ে ওঠানামা করতে হয়েছিল বার বিশেক। এক মাইল চড়াই এগোতে চল্লিশ মাইল পাড়ি দিতে হয়েছিল প্রত্যেককে। তারপরে শুরু হল বীভৎস পাঁক আর পাথুরে রাস্তা। মাঝে মাঝেই পড়ে থাকা গাছ বেয়ে খরস্রোতা নদী ডিঙিয়ে যেতে হত। বেশ কয়েকজন পা পিছলে পড়ল গিয়ে জলে। পিঠে ওই  ভার। কে যে কোথায় তলিয়ে গেল, আর হদিস মিলল না। ডিয়া থেক মাইল নয়েক আসার পর যন্ত্রণাটা পেড়ে ফেলল শেপার্ডকে। তাকে সেখান থেকেই ফিরতে হল। প্রচণ্ড বৃষ্টি ঠেলে এগিয়ে চলেন জ্যাক। ‘লাইক আর্গাস অব দ্য এন্সিয়েণ্ট টাইম’ নামে লণ্ডনের ছোট গল্পে একটি চরিত্র ছিল টারওয়াটার। এই সময় বাস্তবেই এক টারওয়াটারের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। সে নাম জ্যাক আর পাল্টাননি। ছেলেটি জ্যাকের দলের জন্যে রান্নাবান্না করে দিত। এই সময়ের একটি বিখ্যাত ছবিতে ২৪ জন স্বর্ণসন্ধানীর মাঝে জ্যাককেও দেখতে পাওয়া যায়।

১৮৯৮ সালে চিলকুট ট্রেইলে একইদিনে ৬৫ জন অভিযাত্রী মারা যায়—ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন লাইব্রেরিস, স্পেশাল কালেকশন

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হাতে বানানো নৌকা করে ইউকোন নদীতে প্রায় ৫০০ মাইল উত্তরে ভেসে গিয়েছিলেন অভিযাত্রীরা। চারিদিকে ধু ধু বরফ। নদী-নালা-হ্রদ—সমস্ত জমতে শুরু করে এরপর। জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে হেঁটে ফেরা দুঃসাধ্য। বরফের মধ্যেই মরে কাঠ হয়ে পড়ে থাকতে হবে। খোঁজ দ্রুত শেষ করার জন্য মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুম নিজেদের বরাদ্দ করল তারা। সোনার খোঁজ আর মেলে না। এ এক আশ্চর্য আলেয়া। ফোঁটামাত্র সম্ভাবনাকেও ফেলে আসতে মন সরে না। খুঁটিয়ে দেখতে হয় সবই। শেষ পর্যন্ত বহু যুদ্ধ করে অক্টোবরের ৯ তারিখ ডওসন শহর থেকে আশি মাইল দূরে শীতের করাল মুখব্যদান মাথায় অভিযানে ক্ষান্ত দেয় জ্যাকের দলটি। সেখানে একটি পুরনো কেবিন মেরামত করে বিগ জিম ও অন্যান্যরা থেকে যায়। এই সব কেবিনের কাহিনী পরবর্তীতে নিজের ‘দ্য গোল্ড রাস’ চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলবেন চ্যাপলিন তাঁর নিজস্ব অনবদ্য ভঙ্গীতে। জ্যাক একা হেণ্ডারসন ক্রিক পেরিয়ে নৌকা করে ফিরে আসেন ডওসন শহরে। ডওসনের তখন ধুঁকছে। হাজার পাঁচেক আগন্তুক সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। রীতিমতো খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। নোংরায় ভরে গিয়েছে শহর। এখানেই ‘কল ওব দ্য ওয়াইল্ডের’ জজ মিলারের সঙ্গে আলাপ। লুই এবং মার্শাল দুই ভাই আশ্রয় দেন জ্যাককে। তাদের বাবা ছিলেন সাণ্টা ক্লারায় বেশ ধনী একজন জজ্‌। তাঁকে কেন্দ্র করেইফুটে উঠবে উপন্যাসের চরিত্রটি। এবং এই কেবিনেই খুব দোস্তি হয় আরেক জ্যাকের সঙ্গে, ১২০ পাউন্ডের সেণ্ট বার্ণার্ড আর স্কচ কুলির মিক্স ব্রিড, সে এক বিশাল কুকুর। উপন্যাসে সেইই ‘বাক’ হয়ে উঠবে। সারা জীবনের সাহিত্যের রসদ পাওয়া জ্যাকের শাপে বর। আরও ছয় হপ্তা মতো সেখানে থেকে গিয়েছিলেন লেখক।

মার্শাল বণ্ড, অলিভার এইচ আর লা ফার্গে, লেম্যান আর কোল্ড এবং স্ট্যানলি পিয়ার্স, সঙ্গে সেই ‘বাক’ ওরফে জ্যাক। ছবির ওপরে লণ্ডনের সই—জ্যাক লণ্ডন কালেলশন, দ্য হাণ্টিংটন লাইব্রেরি, সান মারিনো, ক্যালিফোর্নিয়া

সোনার খোঁজে ব্যর্থ হয়েছিলেন বটে, কিন্তু লণ্ডনের লেখক হবার বাসনার আঁতুড় সেই অভিযান। নানা বর্ণময় চরিত্রেরা তাঁর বুনোটে হানা দিয়েছে আজীবন। সেই সব ছায়াদের সারি আজও এক পেট খিদে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় পাঠকের মনের আনাচেকানাচে। মাত্র চল্লিশটা বছর। জ্যাক সেই মূর্তিমান উদাহরণ। মাত্র চল্লিশটা বছর যথেষ্ট হাজার হাজার খিদেকে অমর করে দেওয়ার জন্য, নির্মাণ থেকে নির্মাণে, নানান বর্ণের, শ্রেণির হাহাকার  মহাকালের বুকে খোদাই করার সেই স্পর্ধাটুকুই প্রয়োজন। যে স্পর্ধা রক্তচোষা সোনার লোভ থেকে ছেঁকে নিতে পারে বাঁচার যন্ত্রণা, অমর করে রাখে তাকে পাতার পর পাতায়, যে স্পর্ধা জীবনকেও ক্রমে বুনোট করে তোলে, অশান্ত ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ এক বুনন, যার সীমারেখাটুকু কালের খেয়ালে কবেই ধুয়েমুছে গিয়েছে।

 

তথ্যঋণ-

“Jack London, Klondike Gold Rush | Literary Traveler.” 2006. July 13, 2006.

Magazine, Smithsonian, and Richard Grant Harder Grant. n.d. “Gold Fever। Deadly Cold! And the Amazing True Adventures of Jack London in the Wild.” Smithsonian Magazine.

“Wolf Man: Why the Life of Jack London Was as Wild as His Books.” National Geographic. February 17, 2020.

More Articles