মায়ের মৃত্যু সামলে মাঠে হাজির রেফারি, স্টেডিয়াম থেকে ধেয়ে এল তীব্র খিস্তি...

Portugal Football: পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের জন্ম আফ্রিকার মোজ়াম্বিকে। ইউসেবিও; লম্বা লম্বা পা, ল্যাগবেগে হাত আর বিষাদভরা দুটো চোখ।

গ্রিভস

পশ্চিমি দুনিয়ায় বল পায়ে তার মতো এত জোরে দৌড়তে সম্ভবত আর কেউ পারত না। বয়স কুড়ির কোঠায় পৌঁছবার আগেই ফুটবল মাঠে কয়েকশো গোল করে ফেলেছে। যখন তার পঁচিশ বছর হলো তখনও তাকে পেড়ে ফেলার মতো কোনও বজ্রবহ ডাঙশ আবিষ্কৃত হয়নি। ও তো নিছক বল নিয়ে দৌড়ত না, রীতিমতো বিস্ফোরকে ঠাসা ছিল তার খেলা, জিমি গ্রিভসের কথা বলছি, ব্যাটা আশপাশের সবাইকে ছাড়িয়ে এমন জোরে দৌড়ত যে রেফারিরা প্রায়শই ভুল করে অফ-সাইডের নিদান দিত। আর করবেই বা কী! কালো পোশাকের লোকগুলো তো ওর মতো দৌড়তে পারত না। তাই জিমি কোত্থেকে এসে যে ছোরাটা পিঠে গেঁথে দেবে, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করবে, তা তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। সব সময় দেখা যেত জিমি ঠিক বলের কাছে হাজির, কিন্তু কখন কীভাবে ও যে সেখানে পৌঁছল তা কেউ আদপেই দেখতে পেত না।

"আমি গোল করতে বেপরোয়া", জিমি বলত, "কোনওদিন গোল করতে না পারলে খুবই কষ্ট হয়।"

কিন্তু গ্রিভসের ভাগ্যদেবী ১৯৬৬-র বিশ্বকাপে তার জন্য সম্পূর্ণ হতাশাভরা এক চিত্রনাট্য রচনা করে রেখেছিলেন। বেচারা গোটা টুর্নামেন্টে একটা গোলও করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, হঠাৎ করে জন্ডিস ধরা পড়ায় ফাইনাল খেলতেও পারেনি।

বেকেনবাওয়ারের গোল

’৬৬-র বিশ্বকাপে জার্মানি খেলছিল সুইৎজ়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

উভ জ়িলা আর ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার একটা আক্রমণ তৈরি করছিল। জার্মান দলের এই দুই মক্কেল ছিল স্যাঞ্চো প্যাঞ্জা আর দোন কিহোতের মতো। তারা মাঠে নেমে অদৃশ্য মেশিনগানের ট্রিগারে হাত রেখে আগুন ছোটাত। সামনে-পিছনে, এদিকে-ওদিকে, গোটা মাঠ জুড়ে! একবার উভের পায়ে বল, তো পরমুহূর্তে বেকেনবাওয়ারকে বাড়িয়ে দিয়ে বলত, ‘ধর বে বলটা’। সেদিন দুই স্যাঙাতের কেরামতিতে সুইস রক্ষণ সম্পূর্ণ বধির হয়ে গেলে বেকেনবাওয়ার সুইৎজ়ারল্যান্ডের গোলকিপার এলসেনারের মুখোমুখি হলো। এলসেনার বাঁদিকে ঝাঁপিয়েছিল। কিন্তু বেকেনবাওয়ার নিজের আলম্বে স্থির থেকেই শরীরটা বাঁকিয়ে ডান দিকে বলটা ঠেলে দিয়ে গোল করল।

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের বয়স তখন কুড়ি, এটাই ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে তার প্রথম গোল। সেই বিশ্বকাপের পরে আরও চারটে বিশ্বকাপে সে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে, তা সে খেলোয়াড় হিসেবেই হোক বা কোচ হিসেবে, কোনওদিনই কিন্তু তৃতীয় স্থানের নীচে নামেনি। দু'বার বিশ্বকাপ হাতে নিয়েছে; ১৯৭৪-এ খেলোয়াড় হিসেবে আর ১৯৯০-এ কোচ হিসেবে। জার্মান ট্যাঙ্ক প্যাঞ্জারের শক্তিমত্তার উলটো রাস্তায় হেঁটে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার প্রমাণ করে দিয়েছিল নিছক জোরের চাইতে সৌন্দর্য অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে, ফুটবল মাঠে পায়ের সূক্ষ্ম কাজ হাউৎজ়ার কামানের চাইতে বেশি ধ্বংসাত্মক।
মাঝমাঠের রাজা বেকেনেবাওয়ারকে সবাই ‘কাইজ়ার’ বলেই ডাকত। যদিও রাজপ্রাসাদ থেকে বহুদূরে মিউনিখের এক শ্রমজীবী পরিবারে তার জন্ম। সে চিরকাল রক্ষণের দায়িত্বও সামলেছে আবার আক্রমণের ঝাঁঝও বজায় রেখেছে। যখন সে রক্ষণে খেলত, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ছিল অসম্ভব! একটা বলও গলত না, একটা মাছিও না, একটা মশাও না। আর যখন আক্রমণে যেত, আগেই বলেছি, ঘাসে আগুন জ্বেলে দিত।

আরও পড়ুন- “জয় অথবা মৃত্যু”! বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ফুটবলারদের টেলিগ্রাম করলেন মুসোলিনি

ইউসেবিও

তার রাস্তায় বসে জুতো পালিশ করার কথা, নয়তো চিনেবাদাম বেচত বা পকেটমারিতে হাত পাকাত। ছোটবেলায় সবাই তাকে ‘নিনগ্যেঁ’ মানে তুচ্ছ, নগণ্য বলেই ডাকত। বিধবা মায়ের সন্তান। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নিজের একগাদা ভাইয়ের সঙ্গে বস্তির ফাঁকা জায়গায় বল পেটাত।

কিন্তু ফুটবল মাঠে নামলেই সে এমন দৌড়ত যেন পুলিশে তাড়া করেছে কিংবা প্রবল খিদে পেয়েছে। এভাবেই মাঠে বল পায়ে এঁকেবেঁকে দৌড়তে দৌড়তে একদিন সে ইওরোপের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠল, তখন কতই বা বয়স তার, গোটা কুড়ি হবে। লোকের তার নাম দিয়েছিল ‘চিতা’।

১৯৬৬-র বিশ্বকাপে তার পায়ের ভেল্কিতে বিপক্ষ ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আর গোলের কথা কী বলব, অসম্ভব দুরূহ সব কোণ থেকে তার এক একটা গোল দেখে দর্শকদের উল্লাস থামতেই চাইত না, চতুর্দিকে তার জয়জয়কার তখন।

পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের জন্ম কিন্তু আফ্রিকার মোজ়াম্বিকে। ইউসেবিও; লম্বা লম্বা পা, ল্যাগবেগে হাত আর বিষাদভরা দুটো চোখ।

তেকাঠির অভিশাপ

সে মাঠে নেমে গোল সামলাত। তার মুখ যেন ছেনি-বাটালিতে কুঁদে বানানো কিন্তু গালভরা বসন্তের ক্ষত। তার দু'হাতের বিশাল আর গিঁট পাকানো থাবায় সে গোলের জালে একেবারে নাটবল্টু এঁটে তালা মেরে দিত। সেইসঙ্গে পায়েও ছিল গোলার মতো তেজ। ব্রাজ়িলের যত গোলকিপার দেখেছি, তাদের মধ্যে এই মাঙ্গার মতো আর কাউকে মনে পড়ে না। একবার মন্তেভেদিয়োতে দেখেছিলাম মাঙ্গা গোল-কিক থেকে গোল ভরে দিয়েছিল। নিজের বক্সের মাথার কাছে বল বসিয়ে শট নিল, বিপক্ষের কেউ ছুঁতেও পারল না, বলটা সোজা গিয়ে গোলে ঢুকল। সে তখন প্রচুর আক্ষেপ নিয়ে উরুগুয়ের নাসিওনাল ক্লাবে খেলছিল, থুড়ি প্রায়শ্চিত্ত করছিল। সেসময় ব্রাজ়িল ছেড়ে অন্য কোথাও খেলা ছাড়া তার আর গত্যন্তর ছিল না। ’৬৬-র বিশ্বকাপের কথা মনে নেই! ব্রাজ়িল সেবারের অসম্মানজনক হারের পর প্রায় মুখ লুকিয়ে দেশে ফিরেছিল আর জাতীয় বিপর্যয়ের কাটাছেঁড়া করে বলির পাঁঠা করা হয়েছিল মাঙ্গাকে। মাঙ্গা একটা মাত্র ম্যাচ খেলেছিল। যদিও সেদিন তার একটা ভুলও হয়েছিল। সে অনুমানের ভুলে বাইরের দিকে বেরিয়ে এসেছিল এবং তার পক্ষে যেটা আরও ক্ষতিকর হয়েছিল তা হলো পর্তুগাল একেবারে ফাঁকা গোল পেয়ে জালে বল জড়িয়ে দেয়। ব্যাপারটা এমন কেচ্ছার আকার নেয় যে তারপর বহুদিন পর্যন্ত গোলকিপারের ভুলে গোল খেলে তাকে ‘মাঙ্গিরাদাস’ বলা হতো।

আপনাদের নিশ্চয় মনে পড়বে ১৯৫৮-র বিশ্বকাপের কথা। সেবার আরহেন্তিনার হারের দায় গিয়ে প্রায় একইভাবে পড়েছিল আমাদেও কারিসোর উপর। সে বেচারাকেও প্রচুর মূল্য চোকাতে হয়েছে। তারও আগে ’৫০-এ মারাকানায় ব্রাজ়িলের হারের সব দায় গিয়ে পড়েছিল মোয়াসির বারবোসার উপরে। ১৯৯০-এ জার্মানির বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলা কলম্বিয়াকে টুর্নামেন্টের বাইরে ছিটকে দিয়েছিল ক্যামেরুন। আফ্রিকার ক্যামেরুনের শেষ গোলটা হয়েছিল কলম্বিয়ার গোলকিপার রেনে ইগিতা [হিগুয়েতা]-র নির্বুদ্ধিতার জন্য। ইগিতা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বল পায়ে মাঝমাঠ অব্দি চলে গিয়েছিল, কিন্তু সেখানে গিয়ে আর বেশিক্ষণ বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। ইগিতার এই গোল ছেড়ে বেরিয়ে এসে আক্রমণে যাওয়া কলম্বিয়ার সমর্থকেরা খুবই পছন্দ করত, কিন্তু পরাজিতের দলে কে আর থাকতে চায়? যারা তার নামে আগে জয়ধ্বনি দিত এখন তারাই তাকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে চাইল।

আবার ১৯৯৩-এ বুয়েনস আইরেসে ইগিতাকে ছাড়াই কলম্বিয়া আরহেন্তিনাকে ৫-০ হারাল। এমন লজ্জার হারের পর কাউকে তো একটা দোষারোপ করতে হবে। কে আর দায়ভাগী হবে? কেন সেই লোকটা, যে গোলের নীচে দাঁড়িয়েছিল! সুতরাং সের্খেই গয়কোচিয়া যাবতীয় মূল্য চোকাল। এর আগের তিরিশটা ম্যাচে আরহেন্তিনা হারেনি এবং সব ম্যাচেই গয়কোচিয়া ছিল অনবদ্য। কিন্তু সেদিন কলম্বিয়ার গোল উৎসবের পর, পেনাল্টি ঠেকানোর জাদুকর গয়কোচিয়া শুধু তার সুবিখ্যাত ‘সন্ত গয়কো’ ডাকনামটাই হারাল তাই নয়, দলে জায়গাও হারাল। তার অনেক ভক্ত তাকে আত্মহত্যা করতেও পরামর্শ দিয়েছিল।

আরও পড়ুন- ফাইনালের আগেই ট্রফি গেল চুরি! কাপ খুঁজে বিশ্বকাপের নায়ক হয়েছিল এক কুকুর…

পেনারলের সোনালি দিন

১৯৬৬-তে আমেরিকা আর ইওরোপের চ্যাম্পিয়ান দু'টি ক্লাব, পেনারল আর রিয়াল মাদ্রিদ দু'বার পরস্পরের মুখোমুখি হয়। কেতাদুরস্ত ড্রিবল করে ছবির মতো ফুটবল খেলে পেনারল। দু'বারই তারা ২-০ গোলে জেতে। অথচ তাদের জার্সিগুলোও সেভাবে ঘামে ভেজেনি।

গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে পেনারল তার পূর্ববর্তী দশকের বিশ্বসেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের হাত থেকে রাজদণ্ডটা কেড়ে নেয়। দু'বছরের মধ্যে দু'বার আন্তর্মহাদেশীয় কাপ জিতে নেয়, আমাদের মহাদেশে সেরা হয় তিনবার।

বিশ্বসেরা দলটা মাঠে নেমেই বিপক্ষের খেলোয়াড়দের জিগ্যেস করত, ‘কী রে, আর একটা বল এনেছিস তো ? এটা কিন্তু আমাদের।’

মাজ়ুরকেভিচের গোলে বলের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। মাঝমাঠে সুন্দরীতমাকে মেনে চলতে হতো ‘খুড়ো’ গোনসালভেসের কথা। সামনের দিকে স্পেনসার আর হোয়ার পায়ে পায়ে সে গুনগুন করে গান ধরত, আর ‘পেপে’ সাসিয়ার নির্দেশে জাল ফুটো করে দিত। কিন্তু তাই বলে ভাববেন না রহস্যময়ীর জীবনে বিশেষ বৈচিত্র্য ছিল না। পেদ্রো রোচা যখন তাকে সামনে-পেছনে হাওয়ায় ভাসাত, সেই আমোদে বলের আহ্লাদ দেখে কে!

রোচার গোল

১৯৬৯-এর কথা বলছি। লা প্লাতার এস্তুদিয়ান্তের সঙ্গে খেলছিল পেনারল।

মাঠের একেবারে মাঝমধ্যিখানে রোচাকে দু'জন বিপক্ষের খেলোয়াড় ঘিরে রেখেছিল। মাতোসাস যখন তার দিকে বলটা বাড়াল তখন রোচা এস্তুদিয়ান্তের গোলের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়েছিল। সে ডান পায়ে বলটাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে পুরো এক পাক ঘুরে নিল, তারপর বলটাকে অন্য পায়ে চালান করল। এতেই এচেকোপার আর তাভেরনা, যে দু'জন তাকে ঘিরে ধরেছিল, তারাও গেল ছিটকে। তারপর সে তিনবার থমকে থমকে দৌড়ে গিয়ে বলটা স্পেন্সারকে পাস করে নিজে আরও সামনের দিকে এগিয়ে গেল। ফিরতি পাসটা তার কাছে উড়ে এল অর্ধবৃত্তের মধ্যে। সে বুকে বলটা নিয়ে মাদেরো আর স্পাদারোর রক্ষণ চুরমার করে বল মাটিতে পড়ার আগেই তীব্র একটা ভলি মারল। গোলকিপার ফ্লরেস বলটা দেখতেই পায়নি।

পেদ্রো রোচা ঘাসের মধ্যে বিষাক্ত সাপের মতো পিছলে-পিছলে যেত। ফুটবলটা খেলত প্রাণের আনন্দে, সে আনন্দও ছিল ভীষণ সংক্রামক; শুধু খেলার আনন্দেই মাঠে নামা, গোল করার আনন্দে খেলে যাওয়া। বল পায়ে সে যা চাইত তাই করতে পারত। আর বলও তার প্রেমিককে বিশ্বাস করত মনেপ্রাণে।

আরও পড়ুন- ফুটবলার না হোর্ডিং! জুতোর ফিতে বাঁধার নামে আসলে ব্র্যান্ড দেখাতেই চান খেলোয়াড়রা?

জনমদুখিনি মা

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষের দিকে ইকুয়েডরের কবি হোর্হে এনরিকে আদিউম দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরলেন। কিতো শহরে ফিরেই তিনি সেখানকার বাধ্যতামূলক লৌকিকতার খাতিরে স্টেডিয়ামে হাজির হলেন অউকাস ক্লাবের খেলা দেখতে। সেদিনের খেলাটা অউকাসের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাই স্টেডিয়াম একেবারে উপচে পড়ছিল।

সেই ম্যাচের রেফারির মা সেদিন সকালেই গত হয়েছিলেন। তাই খেলা শুরুর আগে একমিনিট নীরবতা পালন করা হল। গ্যালারিতেও সবাই উঠে দাঁড়াল, একমিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা স্টেডিয়াম। তারপর কেউ একজন সেদিনের রেফারির দৃষ্টান্তমূলক খেলোয়াড়ি মানসিকতার প্রশংসা করে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করল। সকালে মাতৃবিয়োগের পর বিকেলে মাঠে গিয়ে ম্যাচ খেলানো তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! একেবারে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কালো পোশাকের মানুষটি মাথা ঝুঁকিয়ে উপস্থিত জনতার অকুণ্ঠ অভিবাদন গ্রহণ করল। এইসব কাণ্ড দেখে আদিউম তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তিনি খানিকক্ষণ চোখ পিটপিটিয়ে সব দেখলেন, তারপর নিজের হাতেই চিমটি কেটে ভাবতে থাকলেন কোন দেশে এসে পড়ছেন কে জানে! সব এত বদলে গেছে নাকি? আগে খেলার মাঠে রেফারিকে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ ছাড়া আর কোনও সম্বোধনে ডাকার কথা কেউ ভাবতই না!

যাইহোক, খানিক পরে ম্যাচ শুরু হলো। ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় অউকাস গোল করতেই গোটা স্টেডিয়ামে যেন প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ হলো। কিন্তু রেফারি অফ সাইডের নিদান দিয়ে গোলটা বাতিল করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারির মনোভাবও একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে যত রাগ গিয়ে পড়ল রেফারির মৃত জননীর উপর এবং গ্যালারি নিজস্ব ছন্দে ছিৎকার করে উঠল : "শালা, শুয়োরের বাচ্চা!"

রুমাল কখনও কাঁদে না

ফুটবল ম্যাচকে রূপকার্থে যুদ্ধ বলার একটা চল আছে বটে, কিন্তু কখনও কখনও রূপকের খোসা ছাড়িয়ে ফুটবল সত্যিকারের যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। তখন ‘সাডেন ডেথ’ আর নিছক কোনও মীমাংসাহীন ম্যাচের নাটকীয় ফলাফলে পৌঁছনোর রাস্তা থাকে না। মৃত্যুর ছায়া পড়ে চরাচরে। আজকাল তো ফুটবলের উন্মাদনা পুরনো দিনের ধর্মোন্মাদদের কাণ্ডকারখানা কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদ অথবা রাজনৈতিক অন্ধতার জায়গা নিয়ে নিয়েছে। ধর্মীয় উন্মত্ততা, জাতীয়তাবাদের ফোঁসফোঁসানি কিংবা রাজনৈতিক প্যাঁচ-পয়জারের মতো ফুটবলও উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিতে পারে। ফুটবলের নামে অবলীলায় ঘটে যায় হাড় হিম করা সব ঘটনা।

অনেকে বলে ফুটবলের ভূত সওয়ার হলে নাকি মুখ দিয়ে ফেনা ওঠে, কথাটা অন্ধ ভক্তের প্রমত্ততা খানিকটা চিনিয়ে দেয় বৈকি। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সমালোচকও মানবেন যে হিংসার ছুরি শুধু ফুটবল মাঠেই চমকে উঠছে এমনটাও সত্যি নয়। খুব বেশি হলে চোখের জলের জোয়ারে রুমাল ভেসে যেতে পারে। রুমাল তো আর কাঁদে না!

১৯৬৯-এ হন্ডুরাস আর এল সালভাদোরের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেল। মধ্য আমেরিকার পুচকে দুটো গরিব দেশ বুকের ভেতর বহুদিন ধরেই একে অপরকে অবিশ্বাস করার হাজারও কারণ জমাচ্ছিল। প্রায় প্রতিটি সংকটে এই দুটো দেশ ইন্দ্রজালের মতো অ্যাব্রাকাড্যাব্রা বলে দোষটা অপরের ঘাড়ে ঠেলে দেয়। হন্ডুরাসে কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না? কী করে হবে, এল সালভাদোরের লোকগুলো সব ঢুকে পড়েছে না এদেশে! ওরাই তো সব কাজ গিলে খাচ্ছে। এল সালভাদোরে খাদ্য সংকট? কেন হবে না, হন্ডুরাস তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি? দুটো দেশই বিশ্বাস করত তার প্রতিবেশী দেশটি তাদের জাতশত্রু। দু'দেশেই দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী শাসন এই ভুল চিন্তার আগুনে ক্রমাগত ঘৃতাহুতি দিয়ে চলে এসেছে।

ফুটবলের যুদ্ধ নামে বিখ্যাত এই লড়াইয়ে আগুনের ফুলকি ছুটতে ছুটতে দাবানলটা লাগে তেগুসিয়ালপা আর সান সালভাদোরের ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোতে। সমস্যা বহুগুণ হয় ১৯৭০-এর বিশ্বকাপের আগে প্লে-অফ ম্যাচের সময়। ঝামেলা চলছিলই, কিছু চোট-জখম, প্রাণহানির ঘটনাও ছিল। এক হপ্তা পরে দুই দেশ সমস্ত রকম সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন করল। হন্ডুরাস প্রতিবেশী দেশের দশলাখ চাষাভুষো মানুষকে দেশ থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়াল। এতদিন তারাই সেদেশের জমি-জোতে চাষবাস করত। পালটা এল সালভাদোরের ট্যাঙ্ক সীমান্ত পেরিয়ে হন্ডুরাসের মাটিতে ঢুকল।

যুদ্ধ চলেছিল এক সপ্তাহ ধরে এবং অন্তত চার হাজার লোক সেই যুদ্ধে মারা যায়। মার্কিনিদের স্কুল অব আমেরিকা নামক প্রতিবিপ্লবী বানানোর কারখানায় তৈরি হওয়া দু'দেশের স্বৈরশাসক, যারা সরকারের নাম জাল করে যুদ্ধ চালাচ্ছিল, প্রতিনিয়ত পারস্পরিক ঘৃণার অস্ত্রে শান দিচ্ছিল। তেগুসিয়াল্পায় স্লোগান উঠছিল, ‘হন্ডুরাস জাগো, যদি কিছু না পাও তো হাতে শক্ত করে একটা লাঠি ধরো। পিটিয়ে মারো হারামিগুলোকে’। আবার সান সালভাদোরে ঝঙ্কার উঠছিল মুহুর্মুহু, ‘অসভ্য জানোয়ারগুলোকে উচিত সবক শেখানোর সময় এসে গেছে’। বুঝে দেখুন, জমি আর যুদ্ধের ভাগ্যবিধাতাদের এক ফোঁটা রক্তপাতও হলো না বরং জাতীয়তাবাদের নামে একই রকম ভাগ্যবিড়ম্বিত দুই দেশের উলুখাগড়ার প্রাণ গেল আকছার।

 

More Articles