বিধানচন্দ্র রায় থেকে জ্যোতি বসু, এই মডেলের ফিয়াট পছন্দ ছিল সকলেরই

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের তিন তারিখ ছিল পঞ্চমী। রাত ২.৩০। তিনজন যাত্রীকে নিয়ে ফিয়াট ১১০০ কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিল।

বাড়ির বয়স্করা যখন শুনলেন, তিনটি যুবক একটি ৬০ বছরের পুরনো গাড়ি চালিয়ে মাইসোর থেকে কলকাতা আসছে, তখন তাঁরা হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন। প্রতিবাদ করারই কথা। ৬০ বছরের পুরনো গাড়ি, তার ওপর রাস্তায় যদি বিগড়োয়, সে এক বিশাল ব্যাপার তাকে নিয়ে আসা। তাছাড়া, ২০৬১ কিমি পথ অতিক্রম করাও তো মুখের কথা নয়। তাঁরা নানা যুক্তি খাড়া করে তিনটি যুবককে নিরুৎসাহ করতে লাগলেন।

 

কিন্তু ভবি ভোলার নয়। যুবকদ্বয়ের নেতা পৃথ্বীনাথ ঠাকুর বললেন, কিছু হবে না, গাড়ি করেই তাঁরা ফিরবেন। মরদ কে বাত, হাতি কে দাঁত। বাড়ির সবাই ইষ্টনাম জপ করতে শুরু করলেন। কী ছেলে রে বাবা! এতটা পথ আসবে ওই পুরনো গাড়িতে! ২০১৯ সালে ফেডারেশন অফ হিস্টোরিক ভেহিকলস অফ ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে পৃথ্বীনাথ তাঁর ১৯৬৩ সালের ফিয়াট ১১০০ নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে গাড়িটি ট্রাকে করে ব‍্যাঙ্গালোরে পৌঁছয়। তারপর ১৪০ কিমি রাস্তা পার হয়ে মাইসোরে আসে। মাইসোরেই ওই প্রদর্শনীটি হয় ঠিক পুজোর আগে।

 

মাইসোরের সঙ্গে কলকাতার পরিচয় ও বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। মাইসোরের রাজা ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দর বন্ধু পরে শিষ্য। ফোনোগ্রাফ মেশিন তখন ভারতে সবে এসেছে। গুরু চলেছেন আমেরিকা, শিষ্যের খুব শখ হল, গুরুর গলাটা যন্ত্রে ধরে রাখার। শেষমেশ গুরু রাজি হলেন। মাইসোরের রাজাই প্রথম ভারতীয়, যিনি স্বামীজির কণ্ঠ রেকর্ড করে রেখেছিলেন। বিদেশ থেকে ফিরে স্বামীজি মাইসোরে বক্তৃতাও দেন। স্বামীজির দেহত্যাগের পরে সিস্টার নিবেদিতার অনুরোধে রাজা ব্যাঙ্গালোরে জমি দান করেন। সেখানে তৈরি হয় ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স, যার নাম ছিল টাটা ইন্সটিটিউট। জামশেদজি টাটা ছিলেন স্বামীজির বন্ধু। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের যেখানে ভারতীয় ছাত্ররা গবেষণা করবে।

 

আরও পড়ুন: ইংরেজদের হাত থেকে বাঁচতে যেতে হয়েছিল মাটির তলায়, এখনও চলা থামেনি সেই গাড়ির

 

পিছনে মাইসোরের রাজপ্রাসাদ। আর তারই সামনে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে এক বঙ্গসন্তান। তখন অনেক রাত। রাস্তা আলোয় আলোময়। বহু নামি-দামি গাড়ির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে ফিয়াট ১১০০ (ডবলু বি এফ ২০২)।



মাইসোরের সঙ্গে বাঙালির আরও যোগ আছে। প্রায় ১০০ বছর আগে মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ সেখানে যান। স্থানীয় কবির লেখা “কা য়ো শ্রী গৌরী” যেটি মাইসোর নেটিভ স্টেটের জাতীয় সঙ্গীত ছিল, সেই গানটি গুরুদেবকে আকৃষ্ট করে এবং সেই সুরের ওপর ভিত্তি করে তিনি লেখেন 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর'।

 

 

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের তিন তারিখ ছিল পঞ্চমী। রাত ২.৩০। তিনজন যাত্রীকে নিয়ে ফিয়াট ১১০০ কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিল। এর আগে মাইসোর রাজপ্রাসাদ, রাজভবন, বিধানসভা ভবন- সর্বত্রই সে ঘুরেছে। এবার পাড়ি দিতে হবে ২০৬১ কিলোমিটার পথ।

 

মাইসোর থেকে ব্যাঙ্গালোর। সেখান থেকে রাজামন্দরী হয়ে ভুবনেশ্বর। উড়িষ্যার রাজধানী থেকে সোজা স্বর্ণ চতুর্ভুজ ধরে কলকাতা। বলতে যত সোজা, গাড়িটি চালানো ততটাই কঠিন। পৃথ্বীনাথের কথায়, “এতটা পথ এলাম একবারের জন্যও ইঞ্জিনের স্টার্ট রাস্তায় বন্ধ হয়নি, টায়ার ফাটেনি বা অন্য কোনও সমস্যা হয়নি। পুরনো গাড়ি, তাই ওকে সম্মান দিলে ও নিরাপদেই গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।"

 

 

ফিয়াট উত্তর কলকাতার দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিটের শতাব্দীপ্রাচীন বাড়িতে এসে পৌঁছল। সেদিন সপ্তমী। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা। দু'-দিনের কিছু বেশি সময়ে এই অযান্ত্রিক অতিক্রম করেছে দু'হাজার কিলোমিটার পথ। বাড়ির সবাই খুব খুশি। যাক বাবা! ঘরের ছেলেরা নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরে এসেছে।

 

কলকাতাতে পৃথ্বীনাথের নিত্যসঙ্গী ফিয়াট ১১০০। তালসারি, নদিয়া, শান্তিনিকেতনে সে বহুবার গেছে। এবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এই বছর অক্টোবর মাসে হিমালয়ান র‍্যালিতে যাওয়ার। নয়ডা থেকে আরম্ভ করে দুর্গম পথ অতিক্রম করে আবার নয়ডাতেই ফিরে আসবে। পৃথ্বীনাথের বিশ্বাস, ফিয়াট অনায়াসে এই রাস্তা পার হয়ে যাবে।

 

একসময় এই ফিয়াট ১১০০ কলকাতাতে প্রচুর দেখা যেত। ১৯৫০-এর শেষ থেকে ১৯৭০-এর মাঝামাঝি অবধি। 'দেয়া নেয়া' সিনেমাটা মনে আছে? এলাহাবাদের বিখ্যাত ব্যবসায়ী বি.কে. রায়ের একমাত্র ছেলে প্রশান্ত স্বপ্ন দেখে গায়ক হওয়ার। কলকাতাতে অডিশনের ডাক পেল। বাবা কিছুতেই আসতে দেবেন না। শেষে নিজের ফিয়াট গাড়িটি বিক্রি করে চলে এল কলকাতায়। উত্তমকুমার অভিনীত ছায়াছবিটি এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয়। দূরদর্শনে দেখালে বাড়ির সকলে টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে আঠার মতো বসে থাকে।

 

এই মডেলের ফিয়াট গাড়ি খুব পছন্দ ছিল ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের। তাঁর যত প্রিয় ছাত্র ছিল, সকলকে তিনি অনুরোধ করতেন, ইটালিয়ান গাড়িটি ক্রয় করতে। পোদ্দাররা ছিলেন ফিয়াটের ডিস্ট্রিবিউটর, জ্যোতিবাবুকে তাঁরা একটি ফিয়াট গাড়ি ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন। অভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় ফিয়াট ১১০০ ব্যবহার করেছেন দীর্ঘদিন।

 

পৃথ্বীনাথবাবু এই গাড়িটি কেনেন ২০১৮ সালে। দক্ষিণ কলকাতা নিবাসি পি.কে. চ্যাটার্জি এই গাড়িটি কেনেন ১৯৬৩ সালে। ১৯৭০-এর শেষ দিক থেকে গাড়িটির ব্যবহার কমে যায়। ২০১৩ সালে চ্যাটার্জিবাবু মারা যান আর গাড়িটিকে দেখার কেউ থাকে না। গাড়িটি প্রায় তিন বছর বসে ছিল। পৃথ্বীনাথবাবু গাড়িটি কেনার পরে ইতালি থেকে প্রয়োজনীয় কিছু পার্টস আমদানি করেন, কারণ এখানে সেগুলো পাওয়া যায় না। বিখ্যাত গাড়ির রেস্টোরার, সম্প্রতি লোকান্তরিত রাহুল সরকারের তত্ত্বাবধানে ও যত্নে ফিয়াট আবার নতুন জীবন ফিরে পায়।

 

পৃথ্বীনাথের ভাষায়, "গাড়িটি এয়ার-কন্ডিশনড নয়, পাওয়ার স্টিয়ারিং নেই, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মাটি কামড়ে চলে।" ছোট গাড়ির রাজা ফিয়াট ১১০০ দেখতে রাজকুমার আর চলে তার মর্যাদা নিয়ে। সাদা আর সবুজ হুডের কম্বিনেশন কালারে ফিয়াট ১১০০ যেখানেই যায়, শ্রদ্ধা আর মর্যাদা আদায় করে। সে এক বিরাট সময়ের সাক্ষী। সময়ের নানা ওঠাপড়া সে দেখেছে, এখনও দেখছে আর নিশ্চয়ই আরও অনেকদিন সে কলকাতার রাস্তায় নিজস্ব ছন্দে ছুটে বেড়াবে।

More Articles