আসলে কে সান্তা ক্লজ, সত্যিই আসবেন আজ রাতে?

By: Amit Pratihar

December 24, 2021

Share

আজ রাতে গরিবের ভাঙা ঘরে কি পা রাখবেন সান্তা?

গোটা পৃথিবীর একটা বড় অংশ জুড়ে বড়দিন মানেই সান্তা ক্লজ এলেন বলে। লাল রঙের পোশাক, চোঙা আকৃতির লম্বা টুপি পরা, সাদা চুল-দাড়িওয়ালা, কাঁধে লম্বা এক ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক বৃদ্ধ যাঁর প্রধান কাজই হল যিশুর জন্মদিনে হরেক কিসিমের মানুষজনকে উপহার বিতরণ করা, যাদের যা প্রয়োজন তা পূরণ করা। কিন্তু আজও বহু মানুষ যে প্রশ্নের জবাব খুঁজে হয়রান, তা হল কে এই সান্তা? কোথা থেকে এলেন এই শশ্রুগুম্ফশোভিত পুরুষ,  কেনই বা ঘুরে ঘুরে বাচ্চাদের মাঝে উপহার বিতরণ করেন তিনি? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ যাঁকে আমরা সান্তাক্লজ নামে চিনি, তার নেপথ্যে আছে এক লম্বা কাহিনি। 

জনশ্রুতি বলছে, ২০০০ বছর আগের কথা, আনুমানিক চতুর্থ শতকে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের মায়রা ( যার বর্তমান নাম তুর্কি) অঞ্চলে নিকোলাস নামে এক বিশপ ছিলেন। সাম্প্রতিক কালে  একটি হাড়ের মাইক্রোস্যাম্পেল কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সান্তা কোনও গল্পকথা নয়। সান্তা ছিলেন। ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তাঁর জন্ম।  তাঁর পিতা ছিলেন সেই অঞ্চলের সব থেকে ধনী ব্যক্তি। পিতার অকস্মাৎ মৃত্যুর পর তরুণ বয়সেই নিকোলাস পিতার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারি হন। অল্প বয়সেই নাকি এত সম্পত্তির মালিক হয়ে যান নিকোলাস যে চিন্তা শুরু করেন, কী করা যায় প্রয়োজনাতিরিক্ত এত সম্পত্তির! নিকোলাস মানুষ হিসাবে খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। দয়ার্দ্র হৃদয় যুবা তাই নাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, নিজের বাকিটা জীবন তিনি অসহায়দের সাহায্য করেই কাটাবেন। 

কথিত আছে, নিকোলাস একবার তাঁর অঞ্চলের এক গরিব লোকের সংস্পর্শে আসেন যাঁর তিনটি কন্যা ছিল। তার মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেলেও, সেই গরিব বাবা কিছুতেই মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না পণের অর্থ, স্বর্ণ অলংকার জোগাড় করতে পারছিলেন না বলে। নিকোলাস সেই খবর জানতে পারেন, এবং ঐ পরিবারকে গোপনে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন । তিনি একদিন একটা কাপড়ের ব্যাগে স্বর্ণ অলংকার এবং বেশ কিছু টাকা ভরে গভীর রাতে বেরোলেন ওই গরিব পরিবারের উদ্দেশ্যে। গরিব লোকটির বাড়িতে চিমনির নীচে যেখানে চিমনির গরমে কাপড় শুকোতে দেওয়া ছিল, সেখানে ওই সোনার ব্যাগটি রেখে দিলেন নিঃশব্দে। পরদিন ওই ব্যাগটি পেয়ে পরিবারের সক্কলের খুশির কোনো সীমা রইল না। শীঘ্রই বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল ধুমধাম করে।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ের বয়স হতেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল যখন, তখন ওই মেয়েদের গরিব বাবা ভাবলেন কী ভাবে ওই দয়ালু ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়! এবং এরপর ছোট মেয়ের বিয়ের বয়স হলে তিনি রোজ রাতে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলেন চিমনির পাশে। হঠাৎ এক রাতে নিকোলাসকে সোনার ব্যাগ দেওয়ার সময় দেখে ফেললেন তিনি। নিকোলাসকে একটু চেপে ধরতেই তিনি স্বীকার করলেন যে তিনিই লুকিয়ে সোনার ব্যাগ ফেলে রেখে যেতেন। দরিদ্র লোকটির কাছে নিকোলাস বিষয়টি গোপন রাখতে অনুরোধ করলেন। কারণ নিকোলাস চাইতেন না তাঁর দানের কথা লোকেদের কানে যাক। মহম্মদের কথা মনে পড়বে বহু ধর্মপ্রেমীর। কথিত আছে মহম্মদও বলতেন, ডান হাত দিয়ে দানের খবর বা হাতও যেন না জানতে পারে।

আরও পড়ুন-রান্নাঘরে যাত্রা শুরু, আজ ঠাঁই লাখো দেশবাসীর হৃদয়ে, ভিকো-র লড়াইটাকে স্যালুট

কিন্তু নিকোলাসের এই গোপন কর্ম বেশিদিন চাপা রইল না। অঞ্চলের যে কোনও মানুষের বিপদের দিনে নিকোলাস গোপনে উপহার দিয়ে তাঁদের বিপদ থেকে উদ্ধার করতে শুরু করলেন এবং যথা সময়ে ধরাও পড়তে লাগল। এ’ভাবেই লোকেদের  মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো নিকোলাসের এই মহৎ কাজের খবর। নিকোলাস সব্বার মধ্যে প্রিয় হয়ে উঠলেন এবং এভাবেই নিকোলাস হয়ে উঠলেন সেন্ট নিকোলাস, আজকের কথকতায় সান্তা ক্লজ। নিকোলাসের এই মহান কাজের ধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, যারা কোনোভাবে সাহায্য বা উপহার পেতেন তারাও অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে লাগলেন, আর সান্টার নামে উপহার দিতে লাগলেন। এবং নিজেদের আত্মপরিচয় গোপন করলেন স্যান্টার লাল-সাদা পোশাকের আড়ালে।

অচিরেই দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন সেন্ট নিকোলাস। লোকমুখে ঘুরতে লাগলো তাঁর নাম। তাঁর গুণগানে ছেয়ে গেল শহরের অলিগলি থেকে রাজপথ পর্যন্ত। শোনা যায় এক সরাইখানায় তিন মৃত শিশুকে প্রাণ দিয়েছেন প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন সান্তা। আবার এও শোনা যায়, মাঝদরিয়ায় ডুবন্ত জাহাজের নাবিক প্রাণ পেয়েছে সান্তার কল্যাণে। আর এই জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে নেমে আসলো নিকোলাসের জীবনে। তুরস্কের সম্রাট ডায়াকলেটিয়ান সান্টাকে মায়রা থেকে বিতাড়িত করেন এবং নিজের কারাগারে বন্দি করেন । মনে করা হয় ৩৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর সেখানেই মৃত্যু হয় সেন্ট নিকোলাসের।

তাঁর হাড়ের নমুনাটি আমেরিকার ইলিনয়ের ‘সেন্ট মার্থা অব বেথানি চার্চ’-এর ধর্মযাজক ফাদার ডেনিস ও’নিলের কাছ থেকে থেকে পাওয়া যায়। তিনি আবার সেটি পেয়েছিলেন ফ্রান্সের লিয়ঁ শহর থেকে। ক্রমেই প্রমাণিত হয় সান্টা কোনও গল্পকথা নয়।  সেই কোন ১৮৯৭ সালেই দ্য সান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে সাংবাদিক ফ্রান্সিস ফারসেলাস লিখেছিলেন, “হ্যাঁ সান্তা ক্লজ আছে। আজ থেকে হাজার বছর, দশহাজার বছর পরেও তিনি শিশুহৃদয়ের সব মানুষকে আনন্দ দেবেন।”

আজ এই মহামারী পার করে মনে হয় যে মানসিকতা আজ আমাদের দাঁড় করায় পথে পড়ে থাকা অসহায় পরিবারদের পাশে, যে মানসিকতা আমাদের অচেনা ব্যক্তির প্রয়োজনে রক্ত দান করায়, যে মানসিকতা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী করা অনুদান পৌঁছে দেয় বন্যা কবলিত এলাকায়, যে মানসিকতায় আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, একে অপরের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়ি, একে অপরকে আরও জড়িয়ে জড়িয়ে থাকি, তার নামই সান্তা। ধন্যবাদ সান্তা, আপনি যেতে যেতে এমন একটা ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন এই বসুন্ধরার চৌদিকে, যার নাম ভালোবাসা।

More Articles