কলকাতার রাস্তার নামকরণের ইতিহাস- প্রথম পর্ব

By: Arunima Mukherjee

October 26, 2021

Share

চিত্রঋণ: গুগল

কলকাতা , মায়া জড়ানো এক পরিপাটি শহর। তাই তো তিলোত্তমার বুকে যারা একবার স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন তারা আর এই শহরের মায়া কাটিয়ে অন‍্য কোথাও যেতে পারে না। তবে আজকের এই মহানগরী এই কিছুদিন আগেও ছিল নিতান্ত এক অস্বাস্থ‍্যকর, বসবাস অযোগ‍্য এক জায়গা। সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতা তিনটি গ্ৰাম নিয়ে গড়ে ওঠা আজকের মেট্রোপলিটনের একদিকে ছিল নদী, তিনদিকে জলা আর বনভূমি। টুকরো টুকরো জায়গায় উঁচু জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো কিছু বসতি। শেয়ালদা তখন নিতান্ত এক লবণ হ্রদের পাশে গজিয়ে ওঠা উঁচু দ্বীপ। সে দ্বীপে নাকি রাজ করতো শেয়ালেরা। রাস্তাঘাট ছিল গ্ৰামের মতোই আঁকাবাঁকা। পলাশির যুদ্ধের পর মূলত কলকাতার পথঘাট উন্নতির কথা ভাবা হয় । সেইসময় কলকাতার রাস্তা সংস্করণের দায়িত্ব এসে পরে লটারি কমিটির  হাতে, উদ‍্যোগটি ছিল বেসরকারি। এরপর ১৮০৯ সালে লর্ড ওয়েলেসলির সময় সেই লটারি কমিটির সরকারি খাতায় নাম ওঠে।

এই কমিটি নগর উন্নয়নের জন‍্য  অনেক কাজ করলেও  ১৮৬৭ সালে এসেও কলকাতার পাকা রাস্তার সংখ‍্যা ছিল মোটে দুটো। শহরে তখন‌ও পুরসভা গড়ে ওঠেনি। উনিশ শতকের সাতের দশকের পর এই রাস্তা নির্মাণ কাজ এগোতে থাকে দ্রুতগতিতে। কলকাতা ক্রমে পরিণত হয় ‘মাকড়সা শহর’ বা ‘স্পাইডার সিটি’তে। সেইসময় থেকেই ব‍্যক্তির নামে রাস্তার নাম হ‌ওয়ার রেওয়াজ শুরু হয় আর সেখান থেকেই কলকাতার রাস্তার নাম নিয়ে ছোট্ট এক ইতিহাস তৈরি হয়ে যায় । চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক কলকাতার কিছু বিখ‍্যাত রাস্তা এবং জনপদের নামকরণের পিছনের ইতিহাস ।  

১. বাগবাজার:  উত্তর কলকাতার বাগবাজার একটি পুরানো স্থান। এই কারণেই হয়তো জায়গাটির নামকরণ নিয়ে মজবুত কোন তথ‍্য পাওয়া মুশকিল । অনেকে মনে করেছেন, ‘বাগ’ কথাটির অর্থ হল বাগান এবং ‘বাজার’ অর্থে আমাদের দৈনন্দিন জিনিস কেনার জায়গা– এই দুই মিলেমিশেই এসেছে ‘বাগবাজার’ শব্দটি। ইতিহাস ঘেঁটে দেখাও যাচ্ছে, বর্তমানে যেখানে বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজো হয় , সেইস্থানে ছিল এক বিশাল বাগান। বাগানের মালিক ছিলেন ক‍্যাপ্টেন পেরিন সাহেব। সেই হিসাবে আবার অনেকে বলতেন ‘পেরিন সাহেবের বাগান’। পরিপাটি করে সাজানো বাগানটি বিস্তৃত ছিল হুগলি নদীর ধার অবধি। কিন্তু এই বিলাসিতা বেশিদিন চলল না। একদিন বাগান উঠল নিলামে এবং ১৭৫২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিলামে সেই বাগান কিনলেন জন জেফানিয়া হল‌ওয়েল ২৫০০ টাকার বিনিময়ে। এরপরে আবার মাত্র তিন বছরের মধ‍্যেই বাগানটি হস্তান্তর হয় প্রথম ফোর্ট উইলিয়ামের অধ‍্যক্ষ ক‍্যারোলাইন ফ্রেডারিখ স্কটের নিকট। তিনি আবার বাগানে খুলেছিলেন একটি বারুদ তৈরির কারখানা এরপর তাঁর মৃত‍্যুর পর অগত‍্যা বাগানের দায় গিয়ে পরে কোম্পানির ঘাড়ে। বারুদ কারখানাও লাটে ওঠে। জোব চার্নকের শখের কলকাতার তৈরির বহু আগে থেকে এবং তার বেশ কিছু বছর পরেও গোটা সুতানুটি অঞ্চল ছিল বাজারের জন‍্য প্রসিদ্ধ । ফলে বাগবাজারের নামকরণের  পিছনে এই যুক্তি একেবেলা হেলাফেলা নয় । আবার, অনেক বলেন এই অঞ্চলে নাকি হুগলি নদীর একটি বাঁক আছে। বাঁকের তীরে বসা বাজার থেকেও এই অঞ্চলের নাম হয়ে থাকতে পারে বাগবাজার।

. গ্ৰে স্ট্রিট: এইটি কলকাতার প্রথমে পাকা রাস্তা। উত্তর কলকাতার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের উপর এই রাস্তা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ। এই রাস্তার নামকরণ হয় ইংল‍্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্লস আর্ল গ্ৰে’র নামানুসারে। এই রাস্তার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটুকরো ছবি। আলিপুর বোমা মামলায় ১৯০৮ সালের ৮মে ঋষি অরবিন্দ যে বাড়ির থেকে গ্ৰেফতার হন, সেই বাড়িটি ছিল এই রাস্তাতেই। তাই এই রাস্তার নাম পরে বদলে রাখা হয় ঋষি অরবিন্দ সরণি।

. হাতিবাগান: এই স্থানের নামকরণের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে নবাব সিরাজদৌল্লার ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণের কাহিনি । ১৭৫৬ সালে যখন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ইংরেজদের মোক্ষম শাস্তি দেওয়ার জন‍্য ৫০ হাজার সৈন‍্য নিয়ে কলকাতা আক্রমণ করেন তখন নবাবের হাতিদের রাখা হয়েছিল এই অঞ্চলের কোন এক বাগানে । সেই ঘটনা থেকে এই অঞ্চলের নাম হয় হাতিবাগান ।  

. সোনাগাছি: সোনাগাছি মানেই রাতপরীদের হাতছানি। এই অঞ্চলের নারকরণের কাহিনি শুনলে অবাক হতে হয়। এই অঞ্চলের নাম হয় সোনাউল্লাহ গাজী মানে পিরের নাম অনুসারে। এই অঞ্চলে তাঁর একটি মাজার ছিল । এই জায়গা আগে দুটি নামে বিভক্ত ছিল, যথা– সোনাগাছি এবং রূপোগাছি । বিশেষত নিম্নবর্গীয় মানুষদের যাতায়াত ছিল সেই জায়গায় কিন্তু তাও দুইটি নামের মধ‍্যে দিয়ে গমনকারী খরিদ্দারের আর্থিক বৈষম‍্য ফুটে ওঠে ।

. কুমোরটুলি: পলাশির যুদ্ধে কোম্পানির জয়লাভের পর পুরস্কার হিসাবে তৈরি হল শোভাবাজার রাজবাড়ি। শুরু হল দুর্গাপুজো। সেইসময় কৃষ্ণনগর থেকে একদল কুমোরকে নিয়ে আসা হয় মূর্তি গড়ার কাজে। তাদের রাজবাড়ির কাছাকাছি থাকার ব‍্যবস্থাও করে দেওয়া হল। ক্রমে সময়ের সঙ্গে সেই পাড়া থেকেই কুমোরটুলি গড়ে উঠল।

. বনমালী সরকার স্ট্রিট: এই রাস্তার নাম হয় পাটনার প্রথম দেওয়ান বনমালী সরকারের নাম অনুসারে। পরে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘ডেপুটি ট্রেডার’ পদলাভ করেছিলেন। ১৭৪০ সালে থেকে ১৭৫০সালের মধ‍্যে কুমোরটুলিতে এক বিশালাকার বাসস্থান স্থাপন করেছিলেন।

. উল্টোডাঙা: বিধাননগর বা উল্টোডাঙা। এই অঞ্চলে বিদ‍্যাধরী নদীর খাল ছিল যা এখন মজে গিয়েছে। এই খালের পাশেই নৌকা বা ডিঙিগুলিকে উল্টে রাখা হতো তাতে আলকাতরা মাখানোর জন‍্য। অনেকে আবার বলে, সারিবাঁধা ডিঙিগুলোর উপর দিয়ে নাকি লোকে পারাপার করতো। এই ঘটনা থেকেই উল্টোডাঙা নাম হয়। পরবর্তী সময়ে ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের নাম অনুসারে এই রাস্তার নাম হয় বিধান রোড ।

তথ্যসূত্রঃ

১। শ্রীপান্থ রচিত ‘কলকাতা’

২। http://www.charpoka.org/2019/06/07/naming-history-of-kolkata-roads/

৩। http://www.banglaworldwide.com/post/kolkata-street-name-history

 

 

 

 

More Articles

error: Content is protected !!