ভারতের হিরে চোরাপথে ফ্রান্সে! হোপ ডায়মন্ড যেন অভিশাপ হয়ে এসেছিল ফরাসিদের কাছে

By: Sindhu Som

January 13, 2022

Share

এই সেই হিরে, শোভা পেয়েেছিল মেরি অ্যান্টেনিয়ের গলায়।

হিরে এক আশ্চর্য বস্তু। পৃথিবীর অন্ধকার গর্ভে কয়েক লক্ষ কোটি বছর লাগে এক একটি হিরের কেলাস তৈরি হতে। খনি থেকে যখন বেরোয় তখন তার মুখ মেঘাচ্ছন্ন। ধীরে ধীরে কয়েকশো বছরের ইতিহাস নানা ছাঁদ কেটে তাকে উজ্জ্বল করে তোলে। ইতিহাস মানেই যদিও দৃষ্টিকোণের ইতিহাস; তাই তার চোখ ধাঁধানো আলোয় খেলে যায় কিছু কিছু মিথ্যে গল্পের আলো ছায়াও। আবার সেই গল্পেরা কোথাও কোথাও ঢুকে পড়ে কিংবদন্তির পরিসরে। সে ঘুরে ফিরে সেই গল্পদের ছাড়া হিরের ঝকমকানি তেমন ছড়ায় না কখনও। এই রূপ, এই খ্যাতি, এই যুগের পর যুগ টিকে থাকা অভিশাপ তো বটেই, এর জন্য আবহমান কাল থেকে কত খুনোখুনি হয়ে আসছে। তবে হোপ ডায়মন্ডের অভিশাপের গল্প বড় মারাত্মক।

কার্টিয়ারের গল্পেরা

বহু হাত ঘুরে কার্টিয়ারদের হাতে যখন হিরেটি এসে পৌঁছচ্ছে, তখন তার নাম ‘হোপ ডায়ামণ্ড’ হয়ে গিয়েছে। ১৯১০ নাগাদ ইভালিন ওয়ালস্‌ ম্যাকলিন এবং এডওয়ার্ড ঘুরতে আসবেন ইউরোপ। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অত্যন্ত ধনী। এনাদের হিরেটা গছানোর ফিকির খুঁজছিলেন পেরি কার্টিয়ার। সে সময় তিনি এঁদের একটি গল্প শোনান। এক অভিশপ্ত হিরের গল্প। কার্টিয়ারের মতে, বহু শতক আগে তাভেরনিয়ে নামে এক ব্যক্তি ভারত থেকে একটি হিরে চুরি করে নিয়ে আসে ফ্রান্সে। এক সীতামূর্তির চোখ অথবা কপাল থেকে হিরেটি চুরি করা হয়েছিল। হিরেটা বিক্রির কয়েক দিন পর রাশিয়ার পথে তাভেরনিয়েকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে কয়েকটা জংলি কুকুর। হিন্দু দেবীর ভয়ঙ্কর অভিশাপ এই ফলতে শুরু করল।

হিরে খেল প্রথম প্রাণটি। এরপরে আরো কত মানুষকে যে খেয়ে ফেলবে হিরেটা, তার ইয়ত্তা নেই। নিকোলাস ফুকে এমন এক হতভাগ্য সেনাপতি। রাজকুমারী দে লাম্বালকে পিটিয়ে মেরেছিল উত্তেজিত ফরাসি জনতা। ষোড়শ লুই ও মেরি আন্তোনিয়েকে গিলোটিনে চড়ানো হয়। তুর্কির সুলতান আবদুল হামিদ কিনেছিলেন হিরেটা। তিনিও খোয়ালেন ক্ষমতা। সাইমন মন্থারাইডস্‌ নামে এক গ্রীক জহুরি খুন হয়ে যান। অবশেষে হেনরি থমাস হোপের নাতি, যাঁর নামে কিনা হিরের নাম হল ‘হোপ’, তিনি মরলেন কপর্দকশূন্য অবস্থায়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এক কাউণ্ট ও অভিনেত্রী এই হিরে কেনেন, মালিকানা তাদেরও খুব সুখের হয়নি।

অবশ্য গবেষক রিচার্ড কারিন পরবর্তীতে দেখাবেন, কার্টিয়ারের বেশিরভাগ গল্পেই জল অত্যন্ত বেশি; কোথাও স্রেফ জলকেও ইতিহাস বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন ভদ্রলোক। ইভালিন ম্যাকলিন তাঁর স্মৃতিকথা ‘ফাদার স্ট্রাক ইট রিচ’-এ লিখেছিলেন, কার্টিয়ারের গল্প বলার ঢং ছিল অসাধারণ। “পাঠকেরা ক্ষমা করবেন কিনা জানি না, কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের যাবতীয় খুনখারাপি যে হিন্দু দেবীর কোপেই হয়েছিল—সে সকালে আমি তাও বিশ্বাস করেছিলাম।”

 

 

আদতে তাভেরনিয়ে

এ তো গেল গছানোর তাগিদে বলা গল্প। আসলে এই তাভেরনিয়ে বলে কেউ ছিলেন কি? ছিলেন বৈ কি। এবং এই তাভেরনিয়েই যে প্রথম হিরেটি ফ্রান্সে নিয়ে আসেন–এও সত্যি। ১৬৪০ থেকে ১৬৭০-এর পর্যন্ত এই পর্যটক ও গল্প-বলিয়ে, খোদ একজন জহুরিও তিনি, পৃথিবী ছেঁচে ফেলেছিলেন নানান রত্নের খোঁজে। 

সময়টা ১৭৬৬ সাল। তাভেরনিয়ের খবর পেলেন ভারতের গোলকোণ্ডা রাজ্যের কল্লুর খনি থেকে কিছু অদ্ভুত রঙের হিরে উঠেছে। খবর পেয়েই তাভেরনিয়ে সেই পাথর গুলো কিনে ফেললেন। ঠকেননি। তার মধ্যেই ১১২ ৩/১৬ ক্যারেটের যে নীলাভ হিরেটি ছিল—অমন পাথর ইতিপূর্বে তাঁর হাতে আসেনি কখনও। মেজাজ ফুরুফুরে। দেখা মাত্রই চিনে গিয়েছিল জহুরি চোখ–এ হিরে তাকে বিখ্যাত করবে, রাজা তো খুশি হবেনই। ১৭৬৮-তে ফ্রান্সে পৌঁছলেন। রাজা তখন চতুর্দশ লুই। অভিযানের গল্প দারুন জমবে, উপরন্তু যদি কিছু রত্নটত্ন কেনা যায়–এই ভেবে তিনি ডেকে পাঠালেন তাভেরনিয়েকে। সেদিন তাভেরনিয়ের কাছ থেকে ৪৪টি বড় আকারের ও ১১২২টি ছোট আকারের হিরে কিনেছিলেন রাজা। এতদিন হিরের নাম ছিল তাভেরনিয়ে ব্লু। কেনা মাত্র রাজ-জহুরির কাছে হিরেটা পাঠালেন পালিশ করার জন্য। বছর দুয়েক কাজ করার পর সেই জহুরি যখন রাজাকে হিরেটা দিলেন তখন তার আকার অনেকটাই ছোট, ৬৯ ক্যারাটের কাছাকাছি, কিন্তু ত্রিকোণ আকৃতি রয়ে গিয়েছে তখনও। উজ্জ্বল নীল ছটায় রাজসভা ভরে গিয়েছিল সেদিন। রাজার ক্রাভাট পিনে জায়গা হল হিরেটার। এরপরে তার নাম ফরাসি রাজার নীল হিরে, অথবা দ্য ফ্রেঞ্চ ব্লু।

বলা বাহুল্য, তাভেরনিয়েকে নোবেল করে দেওয়া হয়, এবং কুকুরে তাকে ছিঁড়ে খাওয়া তো দূর, ৮৪ বছর অবধি বেঁচেছিলেন ভদ্রলোক। বহু খণ্ডে স্মৃতিকথাও লিখে গিয়েছেন। ভাগ্য ফিরে গিয়েছিল তাভেরনিয়ের। তবে মারা যান তিনি রাশিয়াতেই—ওইটুকু কার্টিয়ার সত্যি বলেছিল।

সময়ের স্রোত ধরে হিরের যাত্রা

চতুর্দশ লুইয়ের প্রপৌত্র, পঞ্চদশ লুই মারা যাবার পরে ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসবেন। তার রানির নাম ছিল মেরি অ্যান্টেনিয়ে। ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস যাদের জানা তারা জানেন, ১৭৯১ সালে ফরাসি বিপ্লবের  সময় ফ্রান্স ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন দুজনেই। ধরা পড়লে, উন্মত্ত জনতা তাদের গিলোটিনে চড়ায়। ততদিন অবধি হিরে ছিল রাজপ্রাসাদেই। কিন্তু সে বছর, ১২ থেকে ১৬ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে বারংবার প্রাসাদ লুঠ হয়। হিরেটিও যে খোওয়া গিয়েছে, তা নজরে আসে ১৭ তারিখ। যদিও রাজকোষের বেশির ভাগ মাল উদ্ধার হয়েছিল, হিরেটি পাওয়া যায়নি।

১৮১৩ নাগাদ লণ্ডনে ৪৪ ক্যারাটের একটি নিল হিরের খোঁজ মেলে আবার। তা ড্যানিয়েল এলিয়াসন নামে এক জহুরির হাতে আসে ১৮২৩-এ। এই হিরেটিই দ্য ফ্রেঞ্চ ব্লু কিনা তাই বহু বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস, দ্য ফ্রেঞ্চ ব্লু যাতে লোকে চিনে ফেলতে না পারে, তাই নতুন করে হিরাটি পালিশ করা হয়। ইংলণ্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ এই হিরা কিনে নেন এলিয়াসনের কাছ থেকে। কিন্তু তাঁর কর্জ ছিল বিশাল পরিমাণে। মারা যাওয়ার পর সেই ধার শোধ দিতে হিরেটিকেও বিক্রি করে দিতে হয়।

ফাইন আর্ট এবং রত্নের সংগ্রাহক হোপ অ্যাণ্ড কো-এর হেনরি ফিলিপ হোপ হিরেটা কেনেন ১৮৩৯-এই, অথবা এক দু বছর আগে। অচিরেই লোকে হিরেটাকে হোপ ডায়ামণ্ড বলে ডাকতে শুরু করল। হোপ সাহেব অকৃতদার। সেই বছরই হোপ সাহেব মারা যান। হিরে তখন গেল তার জেষ্ঠ ভাইপো হেনরি থমাস হোপের কাছে। ১৮৬২-তে ৫৪ বছর বয়সে হোপ মারা গেলে তার প্রপৌত্রদের মধ্যে দ্বিতীয় জেষ্ঠ ফ্রান্সিস হোপ হিরেটি উত্তরাধিকারে পান হিরেটি। যদিও তার পদবি হোপ ছিল না, ১৮৮৭ সালে তিনি ‘হোপ’ পদবী গ্রহণ করলেন। ‘হোপ’ বংশের মধ্যেই রয়ে গেল হোপ ডায়ন্ড। কিন্তু তার ছিল জুয়ার হাত। সর্বস্বান্ত হয়ে ১৮৯৮ নাগাদ তিনি কোর্টের কাছে হিরেটা বেচার অনুমতি চাইলেন, কিন্তু ভায়েরা আপত্তি করায় অনুমতি দিল না কোর্ট। শেষে ১৯০১ সালে বারংবার অ্যাপিলের পর মিলল সেই অনুমতি।

মে ইয়োহে

এই সময় সাইমন ফ্র্যাঙ্কেল নামে এক আমেরিকান জহুরি এটি আমেরিকায় নিয়ে এলেন। পেরি কার্টিয়ারের কথা মেনে নিলে এরপরের কয়েক বছরে বহু হাতবদল হয়েছে হিরেটির, সুলতান, অভিনেত্রী, রাশিয়ান কাউণ্ট—শেষমেশ পেরির হাতে এল হিরে। মিসেস ইভালিন কার্টিয়ারকে ইতিমধ্যেই গল্প ছলে জানিয়েছেন দুনিয়ার যত অভিশপ্ত জিনিস তার ক্ষেত্রে খুব শুভ হয়ে যায় প্রায়শই। ব্যাস। আর যায় কোথা। ইভালিনের কাছে এই হিরে ছিল তাঁর মৃত্যুর শেষ অবধি। এরপরে ১৯৪৯ সালে ফের হিরেটা কেনেন নিউইয়র্কের জহুরি হ্যারি উইনস্টন। জর্জ সুইৎজার তখন দ্য স্মিথসোনিয়ানে কাজ করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি আমজনতার জন্য ইউনাইটেড স্টেটে একটা জাতীয় রত্ন-সংগ্রহশালা করেন, পৃথিবীর প্রথম রত্ন মিউজিয়াম। বহুদিন ধরে উইনস্টনকে এই ব্যাপারে বোঝানোর পর, অবশেষে তিনি রাজি হন। ১৯৫৮ সালের ১০ই নভেম্বর, একটি নাম না লেখা বাদামী বাক্স ২.৪৪ ইউ এস ডলারের একটি স্ট্যাম্প গায়ে ডাক মারফত এসে পৌঁছায় দ্য স্মিথসোনিয়ানে। তখন থেকে ‘ন্যাশনাল জেম অ্যাণ্ড মিনারেল কালেকশন’-এ হিরেটি রয়েছে। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম সংগ্রহশালাগুলির অন্যতম। এলিটদের জিম্মা থেকে বেরিয়ে আমজনতার হয়ে গিয়েছি হিরেটি। তার নিল ঔজ্জ্বল্য এখনও বিন্দুমাত্র কমেনি।

মিথ, মিথ্যে নাকি…

কার্টিয়ারের বহু বিকৃতি কারিন তুলে ধরলেও প্রশ্ন কিছু থেকেই যায়। অবশ্যই ফরাসী বিপ্লব এই অভিশাপের ফল নয়। কিন্তু এই নীল সম্মোহিনী হিরের মালিকদের মধ্যে বেশিরভাগই মারা গিয়েছেন হিরে জিম্মায় নেওয়ার অল্প দিনের মধ্যেই। নেহাতই কাকতালীয়? হতেও পারে। তবে মুখে মুখে ফেরা গল্পে অভিশাপের ব্যাপারটা রয়েই গিয়েছে। ইভালিন ম্যাকলিনের পরিবারের কাহিনী আরো আশ্চর্য। হিরের উপর এতটাই টান জন্মে গিয়েছিল যে হিরেটা সর্বক্ষণ পরে থাকতেন তিনি।

 

 

কার্টিয়ারকে বলেছিলেন বটে, অভিশপ্ত জিনিস তার ক্ষেত্রে গুডলাক চার্ম হিসেবে কাজ করে, কিন্তু বাস্তবিক হিরেটা যেন সহ্য করতে পারল না তাঁর পরিবার। এরপরেই ম্যাকলিনের বড় ছেলে ভিনসন কার-অ্যাক্সিডেণ্টে মারা গেল মাত্র নয় বছর বয়সে। ম্যাকলিনের মেয়ে ২৫ বছর বয়সে আত্মহত্যা করে। এবং ১৯৪১ সালে ম্যাকলিনের স্বামী সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে যান। হয়তো হিরে না কিনলেও এমনটা হত, হয়তো বা হত না। আজ আর বলার উপায় নেই। কিন্তু দ্য স্মিথসোনিয়ানে ‘হোপ’ আসার পর তারা বহু আপত্তিকর চিঠি পায়, কাগজেও এই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হ. প্রচুর। এদের মূল বক্তব্য ছিল, এই অভিশপ্ত পাথর কোনও সরকারি সংস্থার কাছে থাকা নাকি সমস্ত দেশের জন্য অশুভ। তেমন কিছু হয়নি। তবে লক্ষণীয়, ধনকুবেরদের হাতেই এই হিরে অভিশপ্ত থেকেছে, সাধারণের কাছে এর অভিশাপ কাজ করেনি কোনওদিন। তত ক্ষমতা একটুকরো পাথরের কোনোদিনই হবে না।

তথ্যঋণ-

“From Golconda To France: The Billion-Year-Old Legend of the Hope Diamond.” 2021. Only Natural Diamonds. November 10, 2021. 

“Is the Hope Diamond Really Cursed?” n.d. ThoughtCo. Accessed December 14, 2021. 

“Kollur Mine.” 2021. In Wikipedia. 

“The 4th Largest Diamond Ever Has Just Been Uncovered.” 2020. Only Natural Diamonds. November 12, 2020. 

 Kurin, Richard. “Hope Diamond: The Legendary History of a Cursed Gem.” New York NY: Smithsonian Books, 2006. 

Patch, Susanne Steinem. “Blue Mystery: The Story of the Hope Diamond.” Washington D.C.: Smithsonian Institution Press, 1976. 

Tavernier, Jean Baptiste. “Travels in India.” Translated from the original French edition of 1876. translator Valentine Ball in two volumes, London: Macmillan and Co., 1889.

Walsh McLean, Evalyn. “Papers.” Library of Congress Online Catalog 1,099,330. Washington DC, U.S. Library of Congress

More Articles