স্বস্তিকা ——- ভারতের ঐতিহ্যযাত্রী

By: Anasuya Sen

September 24, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের বিখ্যাত কবিতা “আমরা বাঙালি”-র সেই পংক্তি-টি মনে পড়ে?

“আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়,
সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্য্যের পরিচয় |”

একটা যুগ ছিল যখন এই বঙ্গভূমিতে বাস করতেন অনেক সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও উন্নতিকামী মানুষ। তাঁরা আমাদেরই পূর্বপুরুষ। “থাকব না কো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে | কেমন করে ঘুরছে মানুষ,
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।”(কাজী নজরুল ইসলাম).…… এইরকম সঙ্কল্প নিয়ে তাঁরা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলেন | তাঁদের বিখ্যাত নৌবহর ও প্রাচীন বন্দরগুলির কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য | বারাসাতের কাছে যে চন্দ্রকেতুগড়, তা কোনও এক সময় ছিল বিখ্যাত বন্দর।চন্দ্রকেতুগড় ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে। আই আই টি -খড়্গপুর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ‘সন্ধি’ নামক একটি গবেষক গোষ্ঠীর পর্যবেক্ষন অনুযায়ী বন্দর-নগরটি গড়ে উঠেছিল বিদ্যাধরী নদীর ধারে।এভাবেই তাঁরা আবিষ্কার করে চলেছেন ভারতের ঐতিহ্যের শিকড় | পারস্য উপসাগর অতিক্রম করে, শ্যাম-কম্বোজ ছাড়িয়ে চদ্রকেতুগড়ে এসে দাঁড়াতো ফোয়েনিশিয়ান বাণিজ্যতরী, ‘নীল’ সংগ্রহ করতে | সেই বাণিজ্যতরী আবার ভেসে যেত কালিকট ছুঁয়ে দক্ষিণ ভারত ও গুজরাটের সমুদ্রপথে | এভাবেই বাঙালির বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে | আর তারই হাত ধরে প্রাচীন ভারতের অকুতোভয় বণিকদল, জ্ঞানপিপাসু মানুষেরা, ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় দেশে-দেশে কালে-কালে ছড়িয়ে পড়েছেন। আমাদের ব্রাহ্মী, খরোষ্টি, পালি ভাষা পৌঁছে গেছে আদিসপ্ত গ্রাম, মোগলমারি, মুর্শিদাবাদের গোলমাটি, চন্দ্রকেতুগড়ের সাথে সাথে ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের’ ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তেও | মেলামেশার এই ধারাপথে মৈথিলী, মাগধী, পারসি ইত্যাদি ভাষারও কিছু কিছু রূপান্তর হয়েছিল | এভাবে ভারতীয়রাও পৌঁছে যেত মধ্য ইউরোপ, রোম, গ্রিস, ইজিপ্ট সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে।কিন্তু তারপর এক সময় ইতিহাসের পটপরিবর্তন হয়।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয় , “মূলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, ভারতবর্ষ চলে গেল দূরে। হিন্দুর সমুদ্রযাত্রা হলো নিষিদ্ধ, হিন্দু আপন গন্ডীর মধ্যে নিজেকে কষে বাঁধলে, ঘরের বাইরে তার যে এক প্রশস্ত আঙ্গিনা ছিল,সেকথা সে ভুললে,কিন্তু সমুদ্রপাড়ের আত্মীয় তাকে সম্পূর্ণ ভুলতে পারল না। পথে ঘাটে পদে পদে মিলনের নানা অভিজ্ঞান চোখে পড়ে | কিন্তু সেগুলির সংস্কার হতে পায়নি বলে কালের হাতে সেই সব অভিজ্ঞান কিছু গেছে ক্ষয়ে, কিছু বেঁকেচুরে, কিছু গেছে লুপ্ত হয়ে |” (রবীন্দ্ররচনাবলী, ১০ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৩০-৬৩১) |

কবিগুরুর এই উপলব্ধি অত্যন্ত সজীব | সাগরপারের সেই আত্মীয়তা তা অতীতে ভারতবর্ষ পেয়েছিল, তার আন্তরিকতার উত্তাপ আজও বিদ্যমান।সে কারণেই বোধ হয় আমাদের মঙ্গলঘটে যে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা হয় তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে আজও সজীব হয়ে আছে | নববর্ষের শুভ প্রভাতে যে লক্ষীদেবী আমাদের ঘরে ঘরে পূজিতা হন, তিনি শ্রীদেবীরূপে পূজিতা হচ্ছেন থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ায় ও কম্বোডিয়ায়। আমাদের দেশে চৈত্র সংক্রান্তির সময় যেমন চড়ক পুজোপার্বন হয়, ঐ সব দেশে বসন্ত উৎসবের ধাঁচে সংক্রান্তির সময় ‘সংক্রান’ পালন করা হয়।

‘স্বস্তি’ থেকে ‘স্বস্তিকা’। ‘স্বস্তি’ এই সংস্কৃত শব্দটির অর্থ প্রশান্তি এবং কল্যাণ। তারই প্রতীক ‘স্বস্তিকা’ চিহ্ন | শুভ নববর্ষ থেকে শুরু করে গণেশ পূজো, লক্ষীপূজো, দুর্গাপূজো, কালীপূজো ইত্যাদি যে কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে পূজাস্থানে এবং পূজাগৃহের দ্বারপ্রান্তে একটি জলপূর্ণ ঘট দেওয়া হয়, তার ওপড় একটি আম্রপল্লব ও শীষযুক্ত ডাব অপরিহার্য | আর সেই ঘটে ও ডাবের গাত্রে অবশ্যই ঘৃতামিশ্রিত সিন্দুরের প্রলেপ দিয়ে আঁকা থাকা চাই একটি ছোট চিহ্ন ……যেন একটি ছোট শিশু বসে আছে তার মাথা, দুইহাত আর দুইপা নিয়ে | এই চিহ্নই পরিবর্তিত হয়ে কোথাও বিংশ শতাব্দীর জার্মানির নাৎসি দলের প্রতীকের আকৃতি পেয়েছে | যেন একটি যোগ চিহ্ন যেখানে সরলরেখাগুলির প্রান্তভাগ বাঁক নিয়েছে জ্যামিতির সমকোনের মতো | এই স্বস্তিকা চিহ্ন একান্ত ভাবেই ভারতবর্ষের সৃষ্টি, একান্তভাবেই মানবজাতির জন্য সনাতন ভারতীয় কল্যাণ ভাবনার মুর্ত প্রকাশ। ভাবতে অবাক লাগে সনাতন ভারতবর্ষের একটি মঙ্গল-চিহ্নকে বিশ্বের মানুষ কীরকম সাদরে গ্রহণ করেছে ; এবং তার ধারা কেমন অপ্রতিহত ভাবে আজও বয়ে চলেছে ।

আজও যখন বঙ্গভূমিতে নববর্ষ উৎসবের উদযাপন হয়, তখন আসামে হয় বিহু উৎসব, থাইল্যান্ডে হয় সংক্রান, বার্মায় হয় থিনগুমিন | সব যেন এক সুরে বেজে ওঠে | ভারতবর্ষ সত্যিই এক ঐতিহ্যময় পরম্পরার দেশ | স্বামী বিবেকানন্দ তাই বলেছেন ……. “আমাদের মাতৃভূমির প্রতি জগতের ঋণ অপরিসীম। যখন আমি আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিহাস পৰ্য্যালোচনা করি, তখন সমগ্র পৃথিবীতে এমন আর একটা দেশ দেখতে পাই না, যে দেশ মানবমনের উন্নতির জন্য এত কাজ করেছে।…. ভারতের প্রভাব চিরকাল পৃথিবীতে নিঃশব্দ শিশির পাতের মতো সকলের অলক্ষ্যে সঞ্চারিত হয়েছে অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুলগুলি ফুটিয়ে তুলেছে।” (আমার ভারত, আমার ভারত —- স্বামী বিবেকানন্দ)

এই নিঃশব্দ শিশিরপাত, ভারতীয় সভ্যতাকে বহুদূর প্রসারিত করেছে। থাইল্যান্ডের সম্বোধনের ভাষা ‘স্বাদিখা’ আর বালি-দেশের সম্মোধনের ভাষা ‘সু-অস্তি’ (যেটি স্বস্তি শব্দের সন্ধিবিচ্ছিন্ন রূপ)। এতো ভারতের স্বস্তিকার-ই ভাষান্তরিত রূপ |

থাইল্যান্ড-সহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির ওপর দক্ষিণ ভারত এবং পূর্ব ভারতের প্রভাব খুব প্রবল। বহু যুগ আগে কিছু তামিল ব্রাহ্মণ এবং কিছু পূর্বদেশীয় ব্রাহ্মণ থাইল্যান্ডে এসে পৌঁছেছিল। তাঁরাই বহন করে নিয়ে গেছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতি ও লোকাচার। তাই সেই সব দেশে রাজার অভিষেকের সময় ভারতের পাঁচটি নদীর জল উপাচার হিসেবে লাগে। ইতিহাস সাক্ষী, থাইল্যান্ডের উপর কম্বোজের হিন্দু রাজাদের রীতিমত প্রভাব ছিল।

সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য কামনায় সে সব দেশেও হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা করা হয় নিষ্ঠাভাবে…… বিশেষ করে লক্ষীদেবীর বা শ্রীদেবীর।ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে, কম্বোডিয়ায়, লাত্তাস ধানজমিতে ‘শ্রী’ রুপী লক্ষীর পূজা হয়। ঐসব দেশে তিনি শ্রীতাণ্ডুলি বা ধান্যরানীরূপে পূজিতা হন |

তাই বিস্ময় -বিমুগ্ধ মানসপটে দেখি যে শ্যাম, কম্বোজের প্রান্তরে ভারতলক্ষীকে দেখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.……কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সেই ভারতলক্ষী আজও সাদরে আরাধিতা। সৈয়দ মুজতবী আলির ভাষা ধার করে বলতে হয় সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে |

 

তথ্য সূত্র : লেখক এর নিজস্ব সংগ্রহ

More Articles

error: Content is protected !!