উপবাসী শৈশব

By: Anasuya Sen

September 22, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

‘ডুগ-ডুগ, ডুগ-ডুগ, ডুগ-ডুগ, ডুগ-ডুগ……’বেজে চলেছে ডুগডুগি।আর তালে তালে নেচে নেচে খেলা দেখাচ্ছে একটি রোগা-পাতলা বালিকা। পরনে মলিন বসন। কটা চুলের দুটি বিনুনী পিঠের ওপর ঝুলছে। দুচোখের কাজল ধ্যাবড়া করে প্রায় কান পর্যন্ত টানা।দুগালে লাল রঙ মাখা।গলায় আঁটা পুঁতির মালা।এই সামান্য সাজ-সজ্জা নিয়ে একটি বছর আটেকের মেয়ে শারীরিক কসরৎ দেখিয়ে চলন্ত ট্রেনের কামরার ভিতর যাত্রীদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যদি কেউ খুশী হয়ে দু-পাঁচ টাকা দেন! এমনি করে এক বেলার খোরাক জুটে যেতে পারে,যদি ভাগ্য সুবিধের হয়। একটু দূরে বসে ডুগডুগিটা যে বাজাচ্ছে, সে বালিকাটির মা। তার কোলে একটি ছ-মাসের শিশু,পরনে ততোধিক মলিন বসন।আধপেটা খাওয়া শীর্ণ চেহারা। কণ্ঠের সমস্ত শক্তি জল করে ঠেলে চটুল হিন্দী গানের সুর তলার চেষ্টা করছে। সুর, তাল, ছন্দ এলোমেলো হয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। যেমন ভেঙ্গে পড়েছে তাদের জীবনের সুর-তাল-ছন্দ আর তার সঙ্গে আশা ও স্বপ্ন।

নাহ্, তাদের ভাগ্য সুবিধের হয় না। তাই আধ-পেটা খেয়েও, খেলা দেখাতেই হয়। কখনও মুষ্টিবদ্ধ উর্দ্ধবাহুর ভেতর দিয়ে পুরো শরীরটা চালিয়ে দিয়ে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছে। দেখে মনে হয় যেন হাড়-গোড় বলে কিছু নেই, শরীরটাকে যেমন খুশী যেকোনও দিকে দোমড়ানো যায় অনায়াসে।কখনও ট্রেনের মাঝখানে ঝুলন্ত হ্যান্ডেলে ধরে ভল্ট দিচ্ছে। দেখে যাত্রীদের হৃদকম্প হয়, একটু বেসামাল হলেই চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে পড়তে পারে!

ট্রেন যাত্রীরা কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে তাদের দু-পাঁচ টাকা দেন। এখানে কোথা থেকে এসেছে আর কোথায় বা থাকে, এসব কথা কেউ জানতেও চায় না তাদের কাছে।

এদের দেখতে দেখতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কবিগুরুর ‘বিসর্জন’ নাটকে ভিখারিনী অপর্ণার গান……………

“ওগো পুরবাসী,
আমি দ্বারে দাঁড়ায়ে আছি উপবাসী।।
হেরিতেছি সুখমেলা, ঘরে ঘরে কতো খেলা,
শুনিতেছি সারাবেলা সুমধুর বাঁশী।।
চাহিনা অনেক ধন,রব না অধিক ক্ষণ,
যেথা হতে আসিয়াছি সেথা যবো ভাসি—“

অভাবের তাড়নায়, দুমুঠো ভাতের আশায় ঐরকম ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে তাদের বাবা-মায়েরা দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ভেসে বেড়ায়। দেশের বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে তাদের খেলা ও কসরৎ দেখতে পাওয়া যায়। ইদানীং করোনার প্রাদুর্ভাবে রুজি-রোজগার হারানো সময়ে তাদের কিঞ্চিৎ বেশিই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

উড়িষ্যার উপকূলবর্ত্তী একটি গ্রামে ঐরকম দুটি ছেলে-মেয়েকে দেখা গেল তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে।উপজাতি পরিবারটি ছত্তিসগড় থেকে এসেছে। মেয়েটির দশ বছর বয়স।একটি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ত। পড়াশুনোর পাঠ চুকে-বুকে গেছে। এখন মাথার ওপর লম্বালম্বি সাজানো তিনটি ঘটি অবিচল রেখে দুহাতে ধরা একটি লাঠি আর পায়ের তলায় সাইকেলের চাকার বাতিল হওয়া বেড় রেখে,কমকরে ১০ফুট উচ্চতায় এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত শক্ত করে বাঁধা মোটা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার অবাক করা ভারসাম্য দেখাচ্ছে। আশা, গ্রামের ছেলে-বুড়ো খুশী হয়ে দশ-বিশ টাকা দেবে। মেয়েটির ছোট ভাইটির বয়স সাত। সে সবে মাত্র প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল। তার পড়াশুনোর ওখানেই ইতি হয়ে গেছে। সেও দিদির মতো দড়ির ওপর হাঁটার খেলা দেখাচ্ছে। খেলার সময় তাদের বাবা জনপ্রিয় হিন্দী গান বাজায় আর তাদের মা উৎকন্ঠিত চিত্তে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে টান-টান বাঁধা দড়ির ওপর হাঁটতে থাকা সন্তানের ওপর। বাছা আমার বেঁচে থাকুক, পড়ে গিয়ে হাড়-গোড় না ভাঙ্গে, পঙ্গু না হয়ে যায়!

খেলার সময় বাবা ঢোল বাজায়, মাঝখানে জিজ্ঞাসা করি…..”তুই এরকম ঝুঁকির খেলা দেখাচ্ছিস কেন?” মেয়েটি বড় হয়েছে তো, উত্তর দেয় – “পেটের দায় গো! তোমরা দোয়া করো, দশ-বিশ টাকা দাও। নয়তো একটু চাল দাও।” মেয়েটির বাবা তখন খেলা দেখতে জড়ো হওয়া মানুষদের বলে ……..”বাবা, তোমরা মেয়েটাকে দোয়া করো। কিছু দাও, তবে খেতে পাবে!”

Child and Adolescent Labour (Prohivison and Regulation Act) অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও শিশুকে কোনো পেশায় নিয়োগ করা,(সেটি পারিবারিক পেশা হলেও) আইন বিরুদ্ধ কাজ ও অপরাধ | শিশু-শ্রম নিরোধক ও নিয়ন্ত্রণকামী এই আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী কোনও কিশোর অথবা কিশোরীকে কোনও প্রকার ঝুঁকিপ্রবণ কর্মে নিয়োগ করা আইনতঃ নিষিদ্ধ |

কিন্তু ঐ মেয়েটির বাবা-মা তাতেই খুশী। একটা গ্রামে খেলা দেখিয়ে প্রায় ২৫০টাকা রোজগার হয়। যে গ্রামে তারা আস্তানা গাড়ে। সেখানে তাঁবুতে রাত্রিবাস করে। তাদের ছেলে-মেয়েরা কিন্তু জানেনা যে National Child Labour Project নাম একটি সরকারি প্রকল্প আছে যার লক্ষ্য হলো আইন বিরুদ্ধ ভাবে কর্মে নিযুক্ত শিশুদের উদ্ধার করা এবং পুনর্বাসন দেওয়া। এই প্রকল্পের নির্দেশ অনুসারে প্রতিটি জেলাস্তরে কর্মরত শিশুদের চিহ্নিত করতে হবে। তার জন্য নিরন্তর পর্যবেক্ষন চালাতে হবে। সেই সব চিহ্নিত শিশুদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করতে হবে এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ দিতে হবে,যাতে করে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সম্মানজনক কাজ করে উপার্জন করতে পারে |

উড়িষ্যার গ্রামে খেটে খাওয়া ঐ শিশুদুটি কিন্ত শিক্ষা-মন্ত্রকের নির্দিষ্ট করে দেওয়া বিনা পয়সার শিক্ষা, স্কুল-ইউনিফর্ম ও মধ্যাহ্নের আহার কিছুই পায়নি। মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত যে জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প (MGNREGA) আছে, তার দ্বারা গ্রামাঞ্চলের বেকার ও দরিদ্র মানুষদের জন্য সারা বছরে কমপক্ষে ১০০ দিনের উপার্জনশীল কাজের নিশ্চয়তা থাকার কথা। কিন্তু উপজাতি সম্প্রদায় ভুক্ত ঐ শিশুদুটির বাবা-মা ঐ ‘মনরেগা'(MANREGA) প্রকল্পের সুবিধাও পায়নি | তাই তারা কর্মহীন অবস্থায় ছত্তিসগড় ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। তাদের কথায় ……. “এই খেলা দেখানো আমাদের পারিবারিক পেশা। তবে এ কাজ আমরা ছেড়ে দিতে পারি যদি নিয়মিত কাজ পাই, আর বেঁচে থাকার মতো মজুরি পাই |”

গত ৯ই আগস্ট কেন্দ্রীয় শ্রমদফতরের উপমন্ত্রী শ্রী রামেশ্বর তেলী তথ্য পরিবেশন করে জানান যে, শিশু-শ্রম থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কিন্তু সারা দেশে কতজন শিশু এখনও আইন বিরুদ্ধ ভাবে শ্রমিকের খাটনি করছে, তার হদিস কিন্তু সেই তথ্যে পাওয়া যায়না।

লোকসভার কংগ্রেসী সদস্য শ্রী বিষ্ণু প্রসাদের এক প্রশ্নের উত্তরে উপমন্ত্রী লিখিত বিবৃতি দিয়ে সভাকে অবহিত করেন …….. ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বছরে কত কতজন শিশুকে আইন বিরুদ্ধ কর্মক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিশু-শ্রম নিরোধক প্রকল্পের অধীনে যে কাজ সমাধা হয়েছে তাতে ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে উদ্ধার ও পুনর্বাসন পেয়েছে ৪৭৬৩৫ শিশু | ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে সংখ্যাটি বেড়ে হয়েছে ৫০২৮৪ ; ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে সংখ্যাটি আরও বেড়ে হয়েছে ৫৪৮৯৪ এবং ২০২০-২১ অর্থবর্ষে সংখ্যাটি ততোধিক বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫৮২৮৯ |

আমাদের দেশে ‘রাইট টু এডুকেশন ফোরাম’ নামে একটি গোষ্ঠী আছে, যারা দেশের শিশু-কিশোর-যুবাদের শিক্ষার অধিকার ও সুযোগপ্রাপ্তির বিষয়ে আন্দোলন করেন ও জনসচেতনতা প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন | গোষ্ঠীর Coordinator (দায়িত্বপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী) শ্রী রঞ্জন মিত্র অবহিত করেন যে ২০১১ সালের জনগণনার হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশের শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ছিলল ১কটি ১ লক্ষ। তাঁর মতে….. “সঠিক উপায়ে দেশের শিশু শ্রমিকদের চিহ্নত করা উচিত এবং তার তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। তাদের অধিকাংশই তফশিলীজাতির, তফশিলী উপজাতি এবং অনগ্রসর শ্রেণী ভুক্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বিদ্যালয় শিক্ষার সুবিধার অওতাতেই আসতে পারে না। তারা শিক্ষালাভে বঞ্চিত থাকে এবং তার ফলে তাদের ভবিষৎ বিপন্ন হয় |”
তাঁর মতে……. “আইন চালু হওয়ার পর থেকে বিগত ১ দশকে ‘Right to Education Act’ -এর সঠিক প্রয়োগ হয়নি। তার ওপর ইদানীং করোনা রোগের প্রাদুর্ভাবে পরিস্থিতির চাপে চালু হওয়া ‘Online Education’ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আড়া-আড়ি বিভাজন সৃষ্টি করেছে। গ্রামীণ এবং দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারীই দুর্লভ হয়ে উঠেছে। এই ধরণের বঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীরা তো উপার্জনের জন্য কাজ খুঁজে নেবেই। সরকারে উচিত এই সব গ্রামীণ হতদরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইন্টারনেট যোগাযোগের সুবিধা দেওয়া। এই সমস্যার সর্বাপেক্ষা ভাল সমাধান হলো, করোনা রোগ নিয়ন্ত্রণের বিধি মেনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্কুলগুলি খুলে দেওয়া।

আন্তর্জাতিক শ্রম-সংস্থা এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিগত জুন মাসে। প্রতিবেদন অনুসারে ২০২০ সালের শুরুতে পৃথিবীতে কমপক্ষে ১৬ কোটি শিশু শ্রমিক ছিল যার মধ্যে বালিকার সংখ্যা ৬.৩ কোটি এবং বালকের সংখ্যা ৯.৭ কোটি | যার অর্থ বিশ্বে প্রতি ১০জন শিশুর মধ্যে একজন শিশু শ্রমিক।প্রতিবেদনে মত ব্যক্ত করা হয়েছে যে, দেশে দেশে সরকারগুলির উচিত এই শিশুশ্রমিকদের পরিবারগুলির দারিদ্র ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূরীভূত করা এবং শিশু গুলির অবৈতনিক ও উন্নতমানের শিক্ষা-লাভের ব্যবস্থা করা |

 

তথ্য সূত্র : সংবাদপত্র

More Articles

error: Content is protected !!