মুদ্রাস্ফীতির নিট ফল ? আপনি কমাবেন বাড়তি খরচ, রুজিতে টান পড়বে অনেকের

By: Susen

September 14, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

সাক্ষর সেনগুপ্ত: চলতি বছরের (২০২১) এপ্রিল থেকে জুন এই আর্থিক ত্রৈমাসিকের তুলনায় জুলাইয়ে খানিকটা কমেছে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ। কিন্তু এর পরেও দেশের মুদ্রাস্ফীতির প্রবনতা নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কায় আছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞরা। কারণ ভোগ্যপন্য সূচক আগের (১৬১.৩০ – ১৬২.৫০) আগের তুলনায় বেড়েছে। রয়টারের তরফে পেশ করা সর্বশেষ একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছিল, গত জুন মাসে ভারতে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৬.৫৮ শতাংশ। আর এই মুদ্রাস্ফীতি বিগত সাত মাসের মধ্যে সব থেকে বেশি। জুলাইয়ে অবশ্য খানিকটা কমে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫.৫৯ শতাংশ। এই সমীক্ষাটির জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার মোট ৩৭ জন অর্থনীতিবিদের মতামত নিয়েছিল। যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই মুদ্রাস্ফীতির এই প্রবনতায় ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে যেতে পারে বলে মনে করছেন। মে মাসে দেশের পাইকারি মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৬.৩০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে এই হারে মুদ্রাস্ফীতির নিট ফল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।

ভবিষ্যতে এই প্রবনতা কি কমতে পারে? মুদ্রাস্ফীতির হার খানিকটাৈ কমলেও নিশ্চিন্ত নন অভিরূপ সরকারের মত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। মুদ্রাস্ফীতির এই অস্বাভাবিক হারে কারণ খুঁজতে গিয়ে জ্বালানির দাম-বৃদ্ধিকেই মূলত দায়ী করছেন অভিরূপবাবু। তাঁর কথায়, সমস্যাটাকে চিহ্নিত করতে গেলে মুদ্রাস্ফীতির থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিপদটাকেই সামনে আনতে হবে। অবশ্য এটা সত্যি গত মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। কিন্ত ২০২০ সালে যখন লকডাউনের জেরে পরিবহন ক্ষেত্র কার্যত বন্ধ সেই সময় যদি জ্বালানির উপরে নেওয়া করের পরিমাণ কেন্দ্রের সরকার কিছুটা কমাতে পারত তাহলে এই নাভিশ্বাস ওঠা পরিস্থিতি তৈরি হত না। আইএসআই-এর বিশিষ্ট অধ্যাপক অভিরূপবাবুর মতে দেশের আর্থিক সমস্যাটিকে অর্থনীতির পরিভাষায় stagflation হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। অর্থাৎ বদ্ধ জলার মত আর্থিক ক্ষেত্র নিশ্চল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। অথচ মুদ্রাস্ফীতিও বেড়েই চলেছে। ভবিষ্যতের জন্য এই রোগের দাওয়াই ? খুঁজতে নারাজ তিনি। কারণ তাঁর মতে, অতিমারীর আগে থেকেই আর্থিক ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। কেন্দ্রের সরকার যদি তখনই ব্যবস্থা নিত তাহলে এই হারে মুদ্রাস্খীতি তৈরি হত না।

চাহিদা আর যোগানের ফারাকের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতির হারের কারণ হিসাবে একইভাবে জ্বালানির দামকেই কাঠগড়ায় তুলছেন আর এক অর্থনীতিবিদ কুণাল কুণ্ড। দেশের প্রথম সারির এক অর্থনৈতিক দৈনিককে কুণালবাবু জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ করের বোঝা চাপানোর জেরে ক্রমশই উর্ধ্বমুখী তেলের দামই হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতির এই পরিনতির মূল কারণ। যার প্রভাবে সরাসরি পরিবহন খরচও অনেকটাই বাড়ছে। সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ। গত মে মাস থেকে দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে কমবেশি ৩০ শতাংশ। অবিলম্বে প্রশাসনিক স্তরে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এব্যাপারে ব্যবস্থা না নিলে অসুখ আরও গভীরে পৌঁছে যেতে পারে বলে তাঁর মত বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

অবশ্য কিছুটা পরিমাণ মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির পক্ষে ততটা বিপজ্জনক নয় বলে মনে করেন বহুজাতিক সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত বাসুদেব রাউত। আর্থিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সিঙ্গাপুর নিবাসী বাসুদেববাবুর বিশ্লেষণ, ইউরোপের বেশ কিছু দেশে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু উন্নত অর্থনীতির ওই সব দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবনতা একেবারেই না থাকায় আর্থিক ক্ষেত্রে চাহিদাও বাড়ে না। যার ফলে অর্থনীতিতে আর নতুন করে উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হয় না। এদিকে ভারতের মত দেশে এই অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়ার কারণ তাঁর মতে চাহিদা আর যোগানের তফাত আর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া। করোনা আবহের আগে থেকেই কাজের জগতের পরিসর বাড়ানো গেলে এহেন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা অনেক সহজ হত, মনে করেন তিনি।

তাহলে রোগের ওষুধ কি? ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতির অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে মোকাবিলার ক্ষমতা কি কেন্দ্রীয় সরকারের আছে? সে সব কৌতুহল মেটানোর আগে অন্য একটি গুরুতর সমস্যার দিকে আলোকপাত করছেন এবিপি ওয়েব-এর কনসালটিং এডিটর সুপর্ন পাঠক। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন বিজনেস এডিটর সুপর্নবাবুর বক্তব্য, করোনার প্রথম ঢেউ দেশের গ্রামীন অর্থনীতিতে ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিন্ত কোভিড-19 এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের করাল গ্রাস দেশের বিস্তীর্ন গ্রামাঞ্চলকেও চরম সমস্যার মুখে ঠেলে দিয়েছে। অবশ্য অভিরূপ সরকারের মতে, দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ঠিক থাকায় গ্রামীন কৃষি উৎপাদনে ততটা ছাপ ফেলতে পারেনি অতিমারী। সহজ কথায় মুদ্রাস্ফীতির সমস্যাটিকে বোঝাতে সুপর্নবাবু টেনে আনছেন দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রসঙ্গ। যদি আপনাকে খাওয়াদাওয়া, ওষুধপত্র বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনের জন্যই উপার্জনের বড় অংশ খরচ করতে হয় তাহলে আপনি মাসে দুটি সিনেমা দেখলে বা সপ্তাহান্তে একবার Zomato বা Swiggy অ্যাপ ব্যবহার করে খাবার আনালে এখন থেকে সেসব বন্ধ করে দিতে পারেন। ওটিটি প্ল্যাট্যফর্মে সাবস্ক্রিপশন থাকলে সেটি আর রাখবেন না। রাণী রাসমণি সিরিয়ালেই কাজ চালিয়ে নেবেন। আর আপনার মত অনেকেই যদি একইসঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত নিতে থাকে তাহলে বেড়ে যাওয়া মুদ্রাস্ফীতির ওই ভয়ঙ্কর প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশের অর্ধনীতিতে। রুজিতে টান পড়বে আরও বহু মানুষের।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অজিতাভ রায়চৌধুরীর আশঙ্কা, মুদ্রাস্ফীতির এই বৃদ্ধির হার আরও বেশ কয়েক মাস বজায় থাকতে পারে। কারণ, সমস্যাটি তৈরি হচ্ছে যোগানের দিক থেকে। যোগা্ন শৃঙ্খল অনেক ক্ষেত্রেই কার্যত বিপর্যস্ত। আর বিপুল চাহিদার সামনে যোগানের এই সমস্যা আরও বেড়েছে দফায় দফায় জারি হওয়া লকডাউনের জেরে।

অবশ্য মুদ্রাস্ফীতির সমস্যা মেটাতে জ্বালানির পাশাপাশি ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়েও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন Institute of Development Studies -এর অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর শুভনীল চৌধুরী। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভনীলবাবুর মন্তব্য জ্বালানির দাম বৃদ্ধি হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতির কারণ আর ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়া তার নির্মম পরিণতি। তাঁর দাবি, অবিলম্বে জিএসটি কর কাঠমোর আওতাভুক্ত হোক পেট্রল-ডিজেল। অর্থনৈতিক নানা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত শুভনীলবাবু জানাচ্ছেন পরিশোধনের পর জ্বালানির দাম কোনওমতেই ৪০-৪৫ টাকার বেশি হতে পারে না। আর তার উপর সর্বোচ্চ হারে জিএসটি চাপলেও তা মানুষের নাগালের বাইরে যাবে না। আর এই ব্যবস্থাটুকু নিলেই কমবে পরিবহন খরচ যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমতে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। অবশ্য বিষয়টি রাজনীতির কারবারিদের আওতাভুক্ত বলে সমস্যা যে সহজে মেটার নয় তাও মেনে নিচ্ছেন বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই দেশে জ্বালানির কর-কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাতে গেলে কেন্দ্রৃ-রাজ্য সব পক্ষকে একমত হতে হবে। আর সেটা সম্ভব হলেই খুঁজে পাওয়া যাবে মুদ্রাস্ফীতি নামের জটিল অসুখটিকে সারানোর যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি। বাঁচবে দেশ, রক্ষা পাবেন আমজনতা।

তথ্যসূত্র – The Economic Times, E paper, 8th July, 2021, Livemint Web Portal

অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রায় সব কটিই এই প্রতিবেদকের নেওয়া, কুণাল কুণ্ডর মতামত The Economic Times থেকে সংগৃহিত।

More Articles

error: Content is protected !!