মানবোত্তর পৃথিবী ও প্রাণীকুল

By: Satyaki Tat

November 24, 2021

Share

দার্শনিকরা আগেই বলেছিলেন, কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীরাও বললেন। কি? যে “Intelligent species are always self-destructive”, এত বুদ্ধিমত্তা একটা সময়ে একটা প্রজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবেই। এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডতে নাকি অনেক এমন গ্রহ থাকতে পারে যারা উন্নতির শিখরে পৌঁছে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাছাড়া সব কিছুরই একটা শেষ হয়। কোটি কোটি বছর ধরে রাজত্ব করা ডাইনোসরদের পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যেতে হয়েছে, আমাদের মানবজাতির জন্যেও তারিখ নিশ্চয়ই নির্ধারণ করা আছে।

আমাদের সূর্যের সময়কালও মোটামুটি বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে বার করেছেন। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি বছর পর সূর্যের শেষ অবস্থা শুরু হতে চলেছে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় আমাদের পৃথিবী নিশ্চিত ভাবেই মৃত হবে।

না, আমি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পরে কখনো লিখব। যেটা বলছিলাম সেখানে ফেরা যাক। আমি কথা বলতে চাই, বা লিখতে চাই মানবজাতি এবং মানবজাতি উত্তর পৃথিবীকে নিয়ে।

1989 সালে বিল ম্যাককিবেন তার “The End Of Nature” বইটি প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেন এবং আমাদের জাতির ও পৃথিবী ভবিষ্যৎ নিয়ে তার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই রকম একটি বই লেখেন ডেভিড ওয়ালেস-ওয়েলস নামক এক লেখক। নাম “The Uninhabitable Earth”।  এই বই দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে, কিন্তু একটা জায়গায় তাদের ছোট্ট একটা ভুল হয়। আমাদের পৃথিবী আরো কয়েক হাজার কোটি বছর বাঁচবে, তার মধ্যে নিশ্চিত ভাবে আরও হাজার কোটি বছর বেঁচে থাকবে প্রকৃতি, আমাদের জলবায়ু, আমাদের “Natural world & atmosphere”। মানুষের বিলুপ্তি তার অনেক অনেক আগে হতে চলেছে। সে যত রকম সম্ভাবনাই আপনি কল্পনা করে নিতে পারেন। পরমাণু যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, ভয়ংকর দূষণ, ভূমিকম্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বা গ্রহাণুর আগমন, সূর্য যতদিন না নিজের “Supernova” প্রক্রিয়া শুরু না করছে ততদিন গাছ এই পৃথিবী থাকছেই, থাকছে আমাদের বায়ুমণ্ডলও।

এই গ্রহে প্রকৃতি প্রাণের স্পন্দনকে ঠিক রক্ষা এবং লালন পালন করবে। সত্যি বলতে, মানবজাতি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর বাকি প্রাণীজগত অনেকটা ভালো ভাবেই বাঁচবে। ওই কথায় বলেনা, কারোর পৌষমাস তো কারোর সর্বনাশ!

আমাদের বংশলতিকায় একেবারে শুরুতে আসে হোমিনিডস যারা আজ থেকে প্রায় এক কোটি সত্তর লক্ষ বছর আগে এই পৃথিবীর বুকে বিরাজ করত। তখন পৃথিবীর অবস্থা এখনকার মত ঠিক ছিলোনা। অক্সিজেন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমন্বয় ছিল আলাদা। তার পর আস্তে আস্তে জলবায়ুর এক পরিবর্তন হয়, পৃথিবী ঠান্ডা হয়, এবং আমাদের পূর্বসুরীরা তার পুরো ফায়দা তোলেন, এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মানবসভ্যতা। এই প্রসঙ্গে আরো একটা কথা বলা প্রয়োজন। হোমিনিডস থেকে হোমো সেপিয়েন্স হয়ে ওঠা এবং সেই থেকে আজকের আধুনিক যুগের মানুষ, এর মাঝে লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আমরা শুধু কয়েক হাজার বছরের কথা জানি, তার মধ্যেও এমন কিছু রহস্য আছে যা উদ্ঘাটন করা এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখনও আমরা বুঝিনি ঠিক কী ভাবে কী প্রযুক্তি দিয়ে পাহাড় কেটে অমন স্থাপত্য নির্মাণ হতো, কিভাবে স্টোনহেন্জে অমন কান্ড করতে সক্ষম হয়েছিলো মানুষ।

আমরা বিজ্ঞানীদের মারফত জানতে পারি যে আমাদের পৃথিবীর এমন এমন স্থানে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় যেখানে মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা তো দূর, পা ফেলাও সম্ভব নয়। সেই সব প্রাণীরা আজ আমাদের মানুষের জন্যে উপযুক্ত পরিবেশে বেশ কষ্ট করেই থাকে। তবে ওই যে বলছিলাম, কারোর পৌষ মাস…..যাকগে, পৃথিবী যখন মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে তখন তারা পাবে পায়ের তলায় জমি। রাজত্ব করবে পৃথিবীতে। হয়েতো তাদের সহাবস্থান করতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে।

প্যালেওঅন্টোলজি অনুসারে এক একটি প্রজাতি সাধারনত কুড়ি লক্ষ বছর বাঁচতে পারে এই পৃথিবীর বুকে। হোমো সেপিয়েন্সের বয়স মাত্র তিন লক্ষ। সুতরাং হাতে সময় আছে, মানে যদি আমরা সময়ের পুঁজিকে সম্মান করতে চাই আর কি। যখন আমাদের এবং আমাদের জীবনের সাথে যুক্ত থাকা সব প্রজাতি নিঃশেষ হয়ে যাবে, জীবন পুনর্জন্ম নেবে সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই। তবে ঠিক কিভাবে, তার কোনোভাবেই ভবিষ্যৎবাণী করা সম্ভব নয়।

“Familiar themes can recur after mass extinctions, revisited by evolution the way one jazz musician might echo another jazz musician’s riff”.

আমরা যদি গত কয়েক গণবিলুপ্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস ঘাঁটি, তাহলে দেখা যাবে যে নতুন ভাবে যখন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে তখন তা ঠিক তার পূর্বপুরুষ বা পূর্বসুরীদের পথ ধরে বেড়ে ওঠেনি। তাদের ছাপ অবশ্যই থেকেছে, কিন্তু এমন ভাবেই যে তা নির্ণয় করতেও অনেক কাল ঘাম ছুটেছে বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু ওই, জিন বা DNA এর ছাপ থেকে গিয়েছে, সেই সাথে থেকে গিয়েছে কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন গন্ডারদের শিং দেখে মনে পড়ে ট্রাইসেরাটপস দের।

আমাদের বিলুপ্তির পর যখন নতুন ভাবে প্রাণের সঞ্চার ঘটবে, তখন তাদের বিবর্তন কিভাবে হবে তা অনেকটা নির্ভর করবে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তিতে কতটা চিরকালের মতো অতীত হবে। তবে এটা বলাই যায়, তা আরও অনেক বৈচিত্র্যময় এবং জটিল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

দুটো সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলা যাক, একটা ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের পৃথিবী শীতল, একটা ক্ষেত্রে উষ্ণ। পরেরটা হওয়ার সম্ভাবনাই আজ থেকে দশ হাজার পর বেশি, তাও, ধরে নিন। শীতল হলে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীর অনেক বড় হওয়ার কথা, ঠিক যেরকম ছিল Ice Age এ। আর উষ্ণ যদি হয় তাহলে হওয়ার কথা ঠিক উল্টো। তথ্য সূত্রে পেয়ে যাবেন কেনো এরম লিখছি। ভাবুন, এক সময়ে ঘোড়ার আকৃতি ছিল একটি ছোট্ট সারমেয়র মত! আমাদের শরীরে উত্তাপের প্রভাব বিরাট।

“The Earth After Us” বইটিতে Jan Zalasiewicz এবং Kim Freedman একেবারে নতুন ধরণের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উত্থানের সম্ভাবনা দেখছেন। সেই সম্ভাবনাময় পৃথিবীতে তারা মনে করছেন উত্থান হবে তাদেরই, যারা ইতিমধ্যেই অনেকটা বিস্তৃত, মানুষের ওপর নির্ভরশীল কিন্তু মানুষকে ছাড়া বাঁচবে।

ইঁদুরদের সেই তালিকায় একেবারে শীর্ষস্থান দিয়েছেন তাঁরা। কিছু ইঁদুরের প্রজাতি মানুষের ওপর খুব নির্ভরশীল হলেও অনেক প্রজাতি আছে যারা নয়, যারা খুব সঙ্গবদ্ধ এবং কঠিন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। হতেই পারে, যে আজ থেকে দশ হাজার বছর পর তারা হাতির মত বড় চেহারার তৈরি হল। হতেই তো পারে, তাই না? বা কিছু প্রজাতি গড়ে উঠবে একেবারে চিতাবাঘের মত? শক্তিশালী, দ্রুত? বা সমুদ্রে ডলফিনের মত? হলে খুব অবাক হওয়ার জন্যে আপনি আমি থাকব না।  আপাতত আপনার সৃজনশীল মননকে উন্মুক্ত করে যতোটা ভাবতে পারেন ভেবে নিন। ভেবে দেখুন, এটা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা বেশি যে সেই সব প্রজাতিরা মানুষের মত বা তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমত্তার মালিক হবে? গড়ে উঠবে চেতনা? যেমন ধরুন কাক বা ডলফিনের এক বিশাল সাম্রাজ্য?

হতেই পারে ভবিষ্যতের সেই দিনগুলিতে বুদ্ধিমত্তার জন্যে বড় মস্তিষ্ক থাকার প্রয়োজন হবেনা। এমনিতে এখনই তার দরকার পড়ছেনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার জাল বিস্তৃত করে ফেলেছে বহুদূর, আর তার শেষ কল্পনা করা তার সৃষ্টিকর্তাদের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছেনা। কেউ ভয় পাচ্ছেন, কেউ আবার খুব উৎসাহিত।

এত গেলো উদ্ভাবনী বুদ্ধিমত্তার কথা, যারা নিজেদের বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে আত্ম সচেতন। ভাবুন, যদি মৌমাছি বা পিপড়েরা তাদের সঙ্গবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতার বিষয়ে সচেতন হয়? কখনো ভেবে দেখেছেন এই প্রাণীকুলের সমাজ চেতনার কথা? যদি ভেবে দেখেন, একটুও বাড়িয়ে বলছিনা খুব লজ্জা পেতে পারেন। এবার ভাবুন, ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন লাগতে পারে যেখানে একটি রোবট, মৌমাছির দল এবং পিপড়েরা একসাথে পৃথিবীতে রাজত্ব করছে, আর ইতিহাস খুঁড়ে মানবজাতির শাপশাপান্তর করছে!! মনে রাখা দরকার, এই দুই প্রাণী আমাদের বর্তমান বাস্তুতন্ত্রের জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমাদের বিভিন্ন কার্যকলাপের জন্যে এদের যথেষ্ট পরিমাণে বেগ পেতে হয়। আজ যদি মৌমাছিরা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে মানবজাতির ঘোর বিপদ। কিন্তু মানুষেরা যদি বিলুপ্ত হয়? ওদের কিছু যায় আসবেনা, বরং ভালই হবে।

দিনের শেষে এটা বোঝা খুব প্রয়োজন যে, আমরা মানুষেরা প্রকৃতির খুব সামান্য একটা অংশ মাত্র। যাদের দায়িত্ব ছিল পুরো বস্তুতন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, অন্যান্য প্রাণীদের সাথে সহাবস্থান করা। দুঃখের বিষয়, আগুন জ্বালতে শেখার পর থেকেই আস্তে আস্তে তা কমা শুরু করে,  স্টিম এঞ্জিন আবিষ্কার করার পর তা বিলুপ্ত হয়। আজ এমন একটা কঠিন পর্যায়ে আমরা দাঁড়িয়ে, যেখানে নিজেদের বাঁচাতেই বাকি প্রাণীকুলদের প্রতি সহমর্মিতা নিয়ে দেখার সময় এসে পড়েছে। নাহলে যতদিন বেঁচে থাকবেন, ডানা মেলে দিন নিজের কল্পনার পাখির। ভবিষ্যৎের পৃথিবী বড়ই সম্ভাবনাময়, শুধু তাতে আমাদের আর জায়গা নেই 🙂

তথ্যসূত্র:

  • https://www.science.org/doi/10.1126/science.270.5244.2012
  • https://www.floridamuseum.ufl.edu/science/earliest-horses-show-past-global-warming-affected-mammal-body-size/
  • https://www.livescience.com/24916-animal-size-versus-climate.html
  • https://www.science.org/doi/10.1126/sciadv.1601430

More Articles

error: Content is protected !!