পা নেই, কোমর নেই, তবুও যুদ্ধজয়!

By: Amit Patihar

October 20, 2021

Share

চিত্রঋণ: গুগল

মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর যে যত্নের প্রয়োজন হয় তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বোঝা যায় আমেরিকার জিওন ক্লার্কের গল্প শুনলে। তার গর্ভধারিনী মা, জিওন পেটে থাকাকালীন কোনোরকম যত্ন তো নেননি সন্তানের, উল্টে দিনের পর দিন নিতে থাকেন বিভিন্ন ধরণের ড্রাগস। যার ফলাফল ভোগ করতে হয় জিওনকে। ‘কডাল রিগ্রেসন সিনড্রোম’ নামের এক দুর্লভ রোগের শিকার হন জিওন ক্লার্ক। কী এই রোগ? এই রোগে মানুষের কোমর থেকে নিচের দিকে বৃদ্ধি হয় না। অর্থাৎ, যার এই রোগ হয় তার জন্ম থেকেই কোমর এবং দু’টো পা তৈরিই হয় না। জিওনের ও জন্ম থেকেই দু’টো পা নেই, কোমর নেই, মানুষের শরীরের নিচের অংশে যা যা থাকা দরকার তার কিছুই নেই। জিওনের মা জিওনকে এই রূপে জন্মাতে দেখে জিওনকে আপন করেননি। তিনি জিওনকে পাঠিয়ে দেন শিশুবিকাশ কেন্দ্রে। জীবনের ১৬’টা বছর জিওন সেখানেই কাটান। তার অক্ষমতার জন্য তাকে কেউ আপন করে নিতে চাইতো না। সারাটা ছোটবেলা জিওনের কেটেছে অত্যাচারে, অবহেলায়, অনাদরে, ঘৃণার শিকার হয়ে। অবশেষে জিওনকে দত্তক নেন কিম্বারলি হকিন্স নামের এক মহিলা, যিনি সারা জীবন একটা সন্তানের খোঁজ করছিলেন। জিওনকে পেয়ে তার সেই খোঁজপূরণ হয় এবং ভালোবাসার চাতক হয়ে ঘুরতে ঘুরতে জিওনও অবশেষে এমন একটা আশ্রয় পায় যেখান থেকে ম্যাজিক দেখাতে শুরু করেন তিনি।

কোন ম্যাজিক? উত্তরটা হয়তো ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ম্যাজিক’ বললে ভুল হবে না খুব একটা। জিওন যখন ক্লাস টু’তে পড়তেন তখন থেকেই তার অদম্য জেদ। বিকলাঙ্গ হওয়ার পরেও জিওন বিশ্বাস করতেন তিনি আর পাঁচটা মানুষের থেকে কম কিছু নন।  তাই ক্লাস টু’তে পড়াকালীন স্কুলে তিনি ভর্তি হলেন কুস্তিতে। বছরের পর বছর ধরে কুস্তির প্রতিটা ম্যাচে জিওন হারতে থাকেন। স্কুলে বন্ধুদের অত্যাচারের শিকার হতে থাকেন, লকারে বন্ধ করে দেওয়া হতো তাকে, মারধোর করা হতো নির্মমভাবে। কিন্তু, জিওনের ছোট্ট থেকেই দু’টো পা না থাকলেও, ছিল অদম্য জেদ। ঈশ্বর তাকে পায়ের বদলে দিয়েছিলেন দৃঢ়তা, প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর খিদে। সব অত্যাচার সহ্য করে জিওন সেটাকে নিজের জেদে পরিণত করতে থাকলেন এবং একদিন কুস্তির ম্যাচ জিততে শুরু করলেন। যেদিন থেকে জিততে শুরু করলেন তারপর থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি জিওনকে। রাজ্যস্তরে  নিজের শ্রেণীর সেরা প্লেয়ার হিসাবে গণ্য হন জিওন এখন। 

কথায় বলে যে মানুষ অবহেলা, জেদ, আর চেষ্টার খড় মাটি দিয়ে গড়া তাকে ভাঙা সহজ কাজ নয়। জিওন ক্লার্ক নিজের ইঞ্চি ইঞ্চি গড়ে তুলেছেন অবিশ্বাস্য জেদ আর উত্তর দেওয়ার স্পর্ধা দিয়ে। তার বক্তব্যে, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই তাদের যারা এককালে আমাকে টর্চার করতো, বুলি করতো, অত্যাচার করতো, অপমান করতো। তাদের ছাড়া আমার ভিতরে এই জেদ, এই কিছু করে দেখানোর ইচ্ছা তৈরি হতো না’।

জিওন এখন একজন জনপ্রিয় মোটিভেশনাল স্পিকার, ব্যবসায়ী, অভিনেতা, লেখক, কুস্তিবিদ এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস হোল্ডার। শেষেরটা শুনে একটু চমকে উঠলেন তো? গিনেস বুকে জিওনের নাম কী করে এলো? সাম্প্রতিককালে জিওন গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস দ্বারা আয়োজিত ‘হাতে ভর দিয়ে দ্রুততম ২০ মিটার হাঁটা’ বিভাগে বিশ্বরেকর্ড করার চেষ্টা করেন জিওন। তাঁর কোচ বাচ রেনল্ডস। যিনি নিজে একজন অলিম্পিক স্বর্ণ পদকজয়ী এবং গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অধিকারী, তিনি জিওনকে প্রশিক্ষণ দেন। মাসের পর মাস ধরে জিওন নিজেকে তৈরি করেন এই বিশ্ব রেকর্ড গড়ে তোলার জন্য। এবং অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কিছুক্ষণের ওয়ার্ম আপের পর জিওন উপস্থিত হন স্টার্টিং লাইনের সামনে। বাঁশি বেজে ওঠার পর ধনুক থেকে বেরোনো তীরের মতো দু’হাতে ভর দিতে দিতে এগিয়ে যান জিওন নিজ লক্ষ্যে। ২০ মিটারের দূরত্ব হাতে ভর দিয়ে পার করতে জিওন ক্লার্ক সময় নেন মাত্র ৪.৭৮ সেকেন্ড। যা দু’টো পা থাকা মানুষের জন্যেও সহজ নয় খুব একটা। তৈরি হয় বিশ্বরেকর্ড। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় নাম ছেপে যায় ছোটবেলা থেকে অবহেলিত, লাঞ্ছিত, দু’টো পা না থাকা একজন বিকলাঙ্গ মানুষের, যিনি নিজেকে বিকলাঙ্গ মনেই করেন না। জিওন ক্লার্কের।

আমরা রাস্তায় কত মানুষ দেখি যাদের হাতের আঙুল নেই, হয়তো একটা হাত নেই কিংবা একটা পা দুর্বল অথবা শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ভিক্ষা করতে। ‘ভিক্ষা কেন করছো?’, জিজ্ঞেস করলে প্রত্যুত্তরে শুনতে পাই, ‘ভগবান আমাকে পঙ্গু করে জন্ম দিয়েছে বাবা, কী করে খাব?’। জিওন ক্লার্ক সারাটা জীবন বিকলাঙ্গ মানুষদের জন্য, বিকলাঙ্গ মানুষদের কাছে একজন আইডল হয়ে থাকতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর দিকে তাকিয়ে শক্তি পান তাঁরই মতো মানুষেরা। যেন তাঁরা নিজেকে দুর্বল না ভাবেন। যেন তাঁরা কারও কাছে হাত পেতে বেঁচে না থাকেন। জিওন ক্লার্ককে ভবিষ্যতের লক্ষ্যের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি অলিম্পিকে যেতে চাই, আমি প্যারাঅলিম্পিকে যেতে চাই। আমি মাইকেল ফেলপস-এর থেকে বেশি স্বর্ণপদক জিততে চাই অলিম্পিকসে, গোটা পৃথিবীকে নিজেকে চেনাতে চাই আমি’। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তাঁর ইন্টারভিউ দেখতে দেখতে, গায়ে কাঁটা দেয় তার জীবনের কাহিনী তার নিজের মুখে শুনতে শুনতে, তার যন্ত্রণার কথা জানতে জানতে, গায়ে কাঁটা দেয় যখন দেখি একটা কোমর-বিহীন, দু’টো পা-বিহীন এইটুকু একটা ছোট্ট উচ্চতার মানুষ জিমের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে শরীরের কসরত করছেন রোজ দু’বেলা। ফুলে উঠছে তার এই চওড়া ছাতি, হাতের মাংসপেশি, পেটের ওপর থাক থাক করে সাজানো সিক্স প্যাক, আর খোলা পিঠের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটা কালচে রঙের ট্যাটু, যাতে জিওন ক্লার্ক লিখে রেখেছেন ‘NO EXCUSE’…

জিওন ক্লার্ক একজন অনুপ্রেরণার নাম, লড়াইয়ের নাম, হার না মানা এক সৈনিকের নাম, শরসজ্জায় শুয়েও বিপক্ষ শিবিরের ত্রাসের নাম জিওন ক্লার্ক। এই পৃথিবীতে জিওন ক্লার্কদের সংখ্যা বাড়তে থাকুক। 

More Articles

error: Content is protected !!