আরএসএস-এর শতবর্ষপূর্তি, যে স্ট্র্যাটেজিতে ভর করে চলছে ঘুঁটি সাজানো

By: Gautam Roy

January 13, 2022

Share

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কেন্দ্রে বিজেপি সরকার তৈরির অল্প সময়ের ভিতরেই বিজেপির মস্তিষ্ক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে একটি  বৈঠকের আয়োজন করে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সেই সমন্বয় বৈঠকে সঙ্ঘ পরিবারের প্রায় দুই ডজন সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলেন। একটা বড় পরিধির মধ্যে মোদি সরকারের নীতি এবং কৌশলের সঙ্গে সঙ্ঘের মতাদর্শের সমন্বয় যদি এই বৈঠকের একটি উদ্দেশ্য হয় তবে সামাজিক ভাবনার আড়ালে তাদের যে মূল রাজনৈতিক আদর্শ, অর্থাৎ রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন, মোদি সরকারের চলার পথে সেই আদর্শের বীজ বুনে দেওয়াই ছিল সেই সমন্বয় বৈঠকের প্রধান উদ্দেশ্য (বিস্তারিত ভাবে এই বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয় ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ, ‘Top BJP ministers attend RSS meet, Opposition questions govt’s accountability–এই শিরোনামে) ।

সেই বৈঠকের শেষে আরএসএস-এর শীর্ষ নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রী-সহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার প্রথম সারির মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাদা আলাদা ভাবে কথাও বলেছিলেন। অতীতেও যদি দেখি, কেন্দ্রে যখনই বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার এসেছে, তখনই কিন্তু আরএসএস নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রী-সহ অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে অতীতে এই ধরনের সমন্বয়ী বৈঠক করেছে। সেই বৈঠকে সঙ্ঘের মতাদর্শ সরকার কী ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে- সেই বিষয়ে বিশ্লেষণ আলাপ- আলোচনা হয়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল, অটলবিহারী বাজপেয়ীর জামানায় এই ধরনের সমন্বয়ী বৈঠক ছিল একটা রুটিনমাফিক বিষয়। কিন্তু ফারাক হল, বাজপেয়ী জামানায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপির ছিল না। মোদি জামানায় আছে। তাই মোদি ক্ষমতায় আসবার প্রায় পনেরো মাসের মাথায় যে বৈঠকটি সঙ্ঘ করে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব সব দিক থেকেই ছিল বিশেষ ইঙ্গিতবাহী।

আসলে একুশ শতকের সূচনাপর্ব থেকেই আরএসএস-এর পাখির চোখ ২০২৫ সাল, তাদের শতবর্ষপূর্তি। আর সেই সময়ের ভিতরে রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের রূপান্তর গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই লক্ষ্যপূরণের উদ্দেশে একুশ শতকের প্রথম ভাগে সঙ্ঘের টার্গেট ছিল তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি সঙ্ঘীয় ভাবধারার বাইরে বন্ধুবৃত্তকে আরও বিস্তৃত করা। সেই সময়ে চন্দ্রবাবু নাইডু, জয়রাম জয়ললিতা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীন পট্টনায়ক, এমনকী একটা সময় পর্যন্ত ফারুক আবদুল্লা (ফারুক পুত্র ওমর কিছুদিন বাজপেয়ী মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন), প্রফুল্ল মোহন্ত প্রমুখকে বিজেপি-র বৃত্তে এনে তাদের রাজ্যে সঙ্ঘের বিস্তার ঘটানোর কাজটি আরএসএস করেছিল খুব ভালো ভাবেই। লক্ষ্য করবার বিষয় হল এইসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের রাজ্যগুলি ধরে হিসেব করলে অসম ছাড়া অন্য কোনও জায়গাতেই ভোট রাজনীতিতে আজও বিজেপি খুব একটা সাফল্য পায়নি। কিন্তু আরএসএস-এর যে সামাজিক কাজের আড়ালে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রসার, সেটা এইসব রাজ্যে অত্যন্ত সুচারুভাবেই সম্পাদিত হয়েছে।

হিন্দু মুসলমান, বর্ণহিন্দু বনাম দলিত – এই বিভাজনের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বিহার, তামিলনাডু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, অসম ইত্যাদি রাজ্যে সঙ্ঘের কাঙ্খিত সাফল্য অনেকখানিই অর্জন করতে পেরেছে। আর যে রাজনীতিকদের কথা বলা হল, তাঁরা জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষিত ধরেই হোক আর আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্র ধরেই হোক, বিজেপির কঠিন- কঠোর সমালোচনা করলেও, সেইসব রাজনীতিকেরা কিন্তু আরএসএস সম্পর্কে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেননি। ওই রাজ্যগুলিতে বিরোধী যে কোনও রাজনীতি নানাভাবে শাসকের দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হলেও আরএসএস-র কোনও কার্যক্রমই এতটুকু বাঁধার মুখোমুখি হয়নি।

আরও পড়ুন-‘কায়স্থ,আমিষাশী’— স্বামীজিকে অপমান করতে কখনও পিছপা হয়নি বাঙালি

আরএসএস-এর মূল লক্ষ্য যদি কেউ মনে করে থাকেন কেন্দ্রে একক ক্ষমতায় বিজেপির সরকার তৈরি করা, তাহলে তিনি আরএসএস-কে জানতে বা বুঝতে খুব  ভুল করেছেন। আরএসএস-এর এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো, নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির একক ক্ষমতায় ভারত সরকার পরিচালনার সুযোগে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ,যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানকে বদলে ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। মুসলমান-সহ যেসব জন্মসূত্রে হিন্দু চিরন্তন ভারতের বহুত্ববাদী চেতনায় বিশ্বাস করে,সমন্বয়ী ভাবধারাকে লালন করে-তাঁদের সকলেরই হয় নাগরিকত্ব হরণ, নতুবা তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা।

বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে ২০০৪ সালে ‘৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে যে বদল আনা হয়েছিল, এনআরসির  প্রথম ধাপ ছিল সেটা। সংসদের ভিতরে  এনআরসি-র দাবি স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেইদিন জানিয়েছিলেন। সেই সংশোধিত নাগরিত্ব আইনকে আরও  হিন্দুত্বমুখী করে সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতাকে আরও তীব্র করে ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্রের আরও একটা পদক্ষেপ হিসেবে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদে থিতু করাই আরএসএস-এর লক্ষ্য তা সকলেই জানেন। ওয়ালটার অ্যান্ডারসন এবং শ্রীধর ডি ডামলে ‘মেসেঞ্জারস অব হিন্দু ন্যাশানালিজম’ নামক গ্রন্থে বলতে চাইছেন আসলে এই পদক্ষেপের কৌশল নির্ধারণই ছিল সেই সমন্বয়ী বৈঠকের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

বিজেপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠনে সমর্থ করে তোলার ক্ষেত্রে সঙ্ঘের থেকে সঙ্ঘ পরিবারের অর্থাৎ সঙ্ঘের নানা বর্ণের শাখা সংগঠনগুলির প্রভাব এবং ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। অ্যান্ডারসন-ডামলে মনে করছেন, তাই  মোদি সরকারের সঙ্গে প্রথম সমন্বয়ী বৈঠকে সঙ্ঘের শীর্ষকর্তারা সঙ্ঘ পরিবারের বিস্তার ঘটানোর উপরে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।আর সঙ্ঘ পরিবারের বিস্তারে কোনও প্রশাসনিক প্রতিবদ্ধকতা তো দূরের কথা, প্রশাসন যেন সব ক্ষেত্রে এই বিস্তারে সাহায্য করে,তার নির্দেশিকাও সঙ্ঘ মোদি সরকারের উপরে জারি করে। এই সমন্বয়ী বৈঠকের সূত্র ধরেই গোটা ভারত জুড়ে  বিজেপির দৃশ্য-অদৃশ্য যেসব বন্ধু আছে, কৌশলগত কারণে, যেসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিজেপির প্রকাশ্যে ঝগড়া আছে, অথচ আরএসএস-এর একটা ভালো বন্ধুত্ব আছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এমনও মনে করে, এইসব দল এবং সেই দলগুলি পরিচালিত রাজ্য সরকারের উপরেও সঙ্ঘ পরিবারের বিস্তার ঘিরে পরামর্শের ছলে আরএসএস-এর পক্ষ থেকে নির্দেশ জারি করা হয়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সমন্বয়ী বৈঠকের পর কিন্তু ওড়িশা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ,বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যে সঙ্ঘের নানা বর্ণের শাখা সংগঠনগুলির ব্যাপক বিস্তার ঘটতে থাকে। বিভিন্ন সেবামূলক কাজের আড়ালে সঙ্ঘের এই শাখা সংগঠনগুলি বিভাজনের রাজনীতিকে তীব্র করে তুলে কোথাও ভোট রাজনীতিতে বিজেপিকে সরাসরি সাহায্য করে। আবার অনেক জায়গাতেই বিজেপির অদৃশ্য বন্ধুদের সাহায্য করে হিন্দুরাষ্ট্র গঠনে আরএসএস-এর যে কর্মসূচি, হিন্দু- মুসলমানে বিভাজন, দলিত, আদিবাসী, তপশিলি জাতি- উপজাতিদের সঙ্গে বর্ণহিন্দুদের সংঘাত, সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে ঘৃণা এইগুলিকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে। সেই সঙ্গে আর একটি টার্গটকে আরও তীব্র করে তোলে আর এস এস। আদর্শগত ভাবে তাদের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শত্রু কমিউনিস্টদের প্রতিহত করা। অ্যান্ডারসন-ডামলে মনে করছেন ওই বৈঠকে বাজপেয়ী জামানার সঙ্গে মোদি জামানার মৌলিক পার্থক্যের উপরে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল।

তাঁরা মনে করেন, এই মৌলিক ফারাকের বিষয়টা যাতে প্রশাসন সামাজিক দিকের সবকটি স্তরে পৌঁছে দেয় সেদিকে সরকারকে সচেষ্ট হতে ওই সমন্বয়ী বৈঠকে পরামর্শের আদলে নির্দেশ দিয়েছিল সঙ্ঘ। মোদির আগমার্কা সাম্প্রদায়িক চেহারার নিরিখে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের প্রশ্নে বাজপেয়ীকে ‘ ভিতু’ প্রকৃতির মানুষ বলে যাতে হিন্দুত্ববাদী শিবিরের ভূমিস্তরের মানুষ মনে না করেন, কৌশলগত কারণেই সেদিন তেমন অভিনয় করেছিলেন বাজপেয়ী

এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, ২০১৩ সালের শেষ দিক থেকেই বিজেপিতে যে কৌশলগত কারণেই লালকৃষ্ণ আডবাণী কোনঠাসা হচ্ছিলেন, ‘১৪ র লোকসভা ভোটে বাজপেয়ী জামানার দ্বিতীয় ব্যক্তি আডবাণীর বদলে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মোদিকে তুলে ধরা হলো- এগুলি সবটাই ছিল সঙ্ঘের গেমপ্লান। তাই ওই সমন্বয়ী বৈঠকে বাজপেয়ী- মোদির ফারাক বোঝাবার জন্যে সমস্ত শাখা সংগঠন এবং প্রশাসনের ভূমিস্তরকে সক্রিয় হতে সঙ্ঘ নির্দেশ দিলেও আডবাণীকে ঘিরে আরএসএস একটা কথাও বলেনি।কারণ, আরএসএস-এর কাছে ভোটশিকারী হিসেবে উগ্র হিন্দুত্বের মোদি অনেক বেশি আকর্ষক ছিল। যেমন এখন ধীরে ধীরে মোদির থেকেও স্বঘোষিত ‘যোগী’ আদিত্যনাথ ওরফে অজয় বিশোয়াত সঙ্ঘের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কি না- তাই নিয়ে ইতিমধ্যেই তথ্যভিজ্ঞ মহলে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

More Articles