বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য এবং টেরাকোটা

By: Writer in Residence

August 3, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google || বাংলার ভাস্কর্য

বাঙালি মানেই ভ্রমণপিপাসু, কেউ সমুদ্রের টানে চলে যাচ্ছেন পুরী, দীঘা, কেউ বা পাহাড় খুঁজতে চলে যান উত্তরে। আবার কেউ সুযোগ বুঝে ঘুরে আসেন নিজের আসে পাশের বিভিন্ন জায়গায় দুদিনের জন্য। বাংলা শিল্পের রাজ্য, ইতিহাসের খনি। এখানে মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারী থেকে শুরু করে রয়েছে বীরভূমের শান্তিনিকেতন, পুরুলিয়া থেকে নদীয়া, বাঁকুড়া আরও কত জায়গা। আজ আমাদের আলোচ্য টেরাকোটা মন্দির। কী এই টেরাকোটা? কীভাবে তৈরি এই শিল্প! এর গুরুত্বই বা কী! আসুন জেনে নিই।

বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া জেলার একটি বহু প্রাচীন, ঐতিহ্যপূর্ণ, স্থাপত্যের শহর। এখানকার ঐতিহ্য, গর্বের সংস্কৃতি, উজ্জ্বল স্থাপত্য এবং পোড়ামাটির গল্পগুলি মানুষকে নিজের দিকে টেনে আনে। ইতিহাস থেকে জানা যায় দশম মল্লরাজা জগৎমল্ল তাঁর রাজ্য বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত করেন। বাংলায় সেই সময় পাথরের সরবরাহ সীমিত ছিল, যে কারণে পোড়ামাটির তৈরি ইট দিয়ে বাংলার শ্রমিক শ্রেণী নিজেদের যাবতীয় ভিটে, বাড়ি তৈরির কাজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের নাম তারা দেন টেরাকোটা।

বিষ্ণুপুরে একের পর এক বহু মন্দির এই টেরাকোটা দিয়ে তৈরি, বর্তমানে এখানকার মাটির মূর্তি, বাসন সারা ভারত বিখ্যাত। যদিও বিষ্ণুপুর শুধু টেরাকোটা নয়, বালুচরি শাড়ির জন্যও বিখ্যাত।বিষ্ণুপুর নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই শুরু করতে হয় ৯৯৭ সালে তৈরি দুর্গা মন্দির দিয়ে, যার নাম মৃন্ময়ী মন্দির। যদিও এই মন্দির টেরাকোটায় তৈরী নয়, কিন্তু  এটি বাঁকুড়ার তথা বিষ্ণুপুরের সবচেয়ে পুরোনো মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম। রাজা জগৎমল্ল নিজের রাজত্ব কালে এই মন্দির স্থাপন করেছিলেন। বাংলার অন্যতম প্রাচীনতম দুর্গা পূজা এটি। ঘট স্থাপনের পরে যথাক্রমে বড়ো ঠাকুরানী, মেজো ঠাকুরানী এবং ছোট ঠাকুরানি উপাসনার মধ্য দিয়ে এখানকার উৎসব শুরু হয়। মহাষ্টমী-সন্ধিপূজা এর পবিত্র মুহূর্তে একটি কামান নিক্ষেপ করা, সবজী বলি দেওয়া হয় এই মন্দিরের অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য।

এরপর আসে রাসমঞ্চ, টেরাকোটা ইটের তৈরি এই প্রাচীনতম মন্দিরটি রাজা বীরহাম্বির আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভারতের সমস্ত শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক স্থাপত্য গুলির পাশাপাশি থাকার দাবী রাখা এই মঞ্চটি আদতে কোনও মন্দির নয়। রাজা বীরহাম্বির এটিকে তৈরি করেছিলেন হালফিলের মিউজিয়াম মডেলের মতো করে। সারা বিষ্ণুপুরে যে সমস্ত পুজোর মন্দির ছিল তার মূর্তি এখানে এনে রাখা হতো বাৎসরিক রাস উৎসবের সময়। এই মন্দিরটি চওড়ায় প্রায় ৮০ ফুট এবং লম্বায় ৪২ ফুট, মন্দিরের ওপরে থাকা ত্রিভুজাকৃতির জন্য একে অনেকটা পিরামিডের মতো দেখতে। মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার কাজ, সম্মুখে বাগান রয়েছে। বলা হয়, সারা দেশের সমস্ত ইটের তৈরি ভাস্কর্যের মধ্যে এটিই সবচেয়ে পুরোনো।

এরপর আসে জোড়বাংলা মন্দিরটি, মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ দেব ১৬৫৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মন্দিরটি আদতে একচালা, দুটি মন্দির পাশাপাশি যার একটি ছাদ বা চূড়া।  বিষ্ণুপুরের অন্যান্য মন্দিরগুলোর মতই এর দেওয়াল জুড়ে টেরাকোটার কাজ। এর সাথে সাথে রঘুনাথ সিংহের সময়ই আনুমানিক ১৯৪৩ সালে শ্যাম রাই মন্দির তৈরি হয়েছিল, যেটি পাঁচ চূড়া মন্দির হিসেবেও খ্যাত। শিল্প এবং তার দক্ষতার দিক থেকে এই মন্দিরটি বিষ্ণুপুরের সবচেয়ে আলোচ্য মন্দির গুলির একটি। এর দেওয়ালে রামায়ণ-মহাভারতের বহু ঘটনা চিত্রিত, রাম রাবণের যুদ্ধ, ঐরাবত এর ওপর বসে থাকা ইন্দ্র, রাধা কৃষ্ণের প্রেম এই রকম অনেক ছবিই ওই দেওয়াল গুলিতে পাওয়া যায়।

এরপর আসে বিষ্ণুপুরের আরেক জোড় মন্দির, রাজা গোপাল সিংহ দেবের আমলে তৈরি এই মন্দিরটি প্রধানত মাকড়া পাথরে তৈরি। এর দেওয়ালে আঁকা কাজগুলি চুন সুরকি দিয়ে অঙ্কিত হয়েছে। বিষ্ণুপুরের আরেকটি বিখ্যাত মন্দির হল মদনমোহন মন্দির, এটি আনুমানিক ১৬৯৪ সালে মল্ল রাজা দুর্জন সিংহর আমলে তৈরি করিয়েছিলেন টেরাকোটা দিয়ে। মন্দির তৈরীর প্রায় ১০০ বছর পর একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই মন্দির বিপুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর একে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং বিষ্ণুপুরের যে ক’টি হাতেগোনা ঐতিহাসিক মন্দির আজও সক্রিয়, এটি তাদের মধ্যে একটি।

বিষ্ণুপুরের আরো একটি বিখ্যাত জায়গার লালগড় এবং লালবাঁধ। রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ দেব লালবাঈ এর প্রেমে পড়েন এবং এই সময় স্ত্রীর ক্রোধের স্বীকার হয়ে রাজা খুন হন। যদিও মতের ফারাক রয়েছে এই তথ্যের ওপর। কিন্তু অনেকে বলেন এই ঘটনার পর লালবাঈকে তাঁর পুত্র সমেত রাজদরবার এবং প্রজারা লালগড়ের জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলেন। যদিও এই ঘটনা ছাড়াও আরও অনেক গল্প এই অঞ্চলের লোকমুখে বা বিবৃত বিভিন্ন বই থেকে জানা যায়। যেমন রাজা বীর সিংহ ১৬৫৮ সালে পোকাবাঁধ, শ্যামবাঁধ, কালিন্দীবাঁধ, যমুনবাঁধ, গনতাতবাঁধ, কৃষ্ণবাঁধ এবং লালবাঁধ নামে সাতটি হ্রদ তৈরি করেছিলেন। এই বাঁধ গুলির আনুমানিক তৈয়ারি হয়েছিল ১৬৫৮ সালে। পানীয় জল ও নিজের রাজ্যকে শত্রুবিপদ থেকে রক্ষা করাই ছিল এই হ্রদ গুলি তৈরির আসল কারণ। রঘুনাথ সিংহই নাকি লালবাঈ এর নামে এই হ্রদ গুলির একটি খনন করে করেন, পরবর্তী কালে যার নাম লাল বাঁধ হয়ে যায়।

ষাঁড়েশ্বর এবং শৈলেশ্বর নামে দু’টি মন্দির মহাদেবকে উৎসর্গ করে তৈরি হয়েছিল বিষ্ণুপুরের একটু দূরে। মাকড়া পাথরের তৈরি এই মন্দিরগুলি তে দেউল শৈলীর স্থাপত্যের সুন্দর নিদর্শন পাওয়া যায়। এই স্থানটি শিবরাত্রি ও গাজন উৎসবের জন্য বিখ্যাত। নির্দিষ্ট সময়ে এখানে নেমে আসে তীর্থ যাত্রীদের ঢল। আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন বিষ্ণুপুরের স্থানীয় যাদুঘর। যাঁরা প্রত্নতত্ত্ব, শিল্প এবং ইতিহাস ভালবাসেন, তাদের এখানে অন্তত একবার আসতেই হবে। এছাড়া দলমাদল কামান, গড় দরজা, নন্দলাল ও রাধাগোবিন্দ মন্দির, রাধামাধব ও কালাচাঁদ মন্দির, রাধেশ্যাম ও লালজী মন্দির, গুম ঘর এই ধরনের কয়েকশো জায়গা নিয়ে ভরে রয়েছে বিষ্ণুপুর। দলমাদল কামান টি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে বিষ্ণুপুরকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তৈরি করা হয়ে ছিল, যার সেই সময়কার খরচ ছিল এক লক্ষ টাকার ওপরে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের সময় কামানটি অর্ধেক মাটির নীচ থেকে উদ্ধার করা হয়। বলা হয় মল্ল রাজারা প্রথম থেকে শাক্ত ধর্মাবলম্বী ছিলেন, অর্থাৎ কালীর উপাসক। কিন্তু রাজা বীরহাম্বির প্রথম মদনমোহন দেবকে নিজের রাজ্যে স্থাপন করেন। ১৭১২ সালের পর কোনও এক সময় বহিঃশত্রুর আক্রমণের ভয়ে মল্লরাজ গোপাল সিংহ দেব মদনমোহনের পূজা করেন। এবং সেই পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে মদনমোহন দেবতা সেই রাতে দলমাদল কামান নিয়ে রাজ্য রক্ষা করেন। এরপর থেকে বিষ্ণুপুরে মদনমোহনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আনুমানিক ১৭০০ সালের পর থেকে টেরাকোটার প্রচলন তুঙ্গে পৌঁছে যায়।

 

কিন্তু যেমনটা শুরুতেই বলা হল, এই জায়গার খ্যাতির কারণ শুধু মাত্র টেরাকোটা নয়, এখানকার বালুচরী, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, অন্যান্য মন্দির এবং মিথ বা লোকমুখে প্রচলিত গল্প আপনাকে রোমহর্ষক ইতিহাসে নিয়ে চলে যাবে যে কোনও মুহূর্তে। তাই আগামী তে কখনও ছোট্ট একটা ট্রিপে যাওয়ার কথা মাথায় এলে আপনার তালিকায় বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর কে অবশ্যই যোগ করতে পারেন।

More Articles

error: Content is protected !!