৫০ বছর ধরে গাছের জন্য লড়াই চালাচ্ছেন এই বৃদ্ধ

By: Sourish Das

October 22, 2021

Share

চিত্রঋণঃ গুগল

বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ে বর্তমানে চিন্তিত গোটা বিশ্ব। প্রাচ্য থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য, সব জায়গাতেই একাধিক আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এ বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরোধিতায়। ‘গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান’-এর মত কথাগুলি একেবারে বুনিয়াদি স্তর থেকে শেখানো হচ্ছে। কিন্তু, এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেকদিন আগে থেকেই। এই যাত্রার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভারতের হিমালয় অঞ্চলে শুরু হওয়া আন্দোলন চিপকো মুভমেন্ট। বর্তমানে একটা স্কুলপড়ুয়াও জানে, হিমালয়ের চিপকো এবং গারোয়াল উপত্যকায় অরণ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দাবিতে শুরু হয়েছিল চিপকো আন্দোলন। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সুন্দরলাল বহুগুণা। আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগে পরিবেশের সুরক্ষার দাবিতে বন নিধনের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছিলেন ভারতের বহু সাধারণ নাগরিক।

চিপকো আন্দোলন হল এমন একটি আন্দোলন যা রাজনীতির সঙ্গে পরিবেশকে মিশিয়ে দিয়েছিল। এই আন্দোলনের অন্যতম দাবী ছিল পাহাড়ের সম্পদ ব্যবহারের উপর স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে চিপকো আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে গাছ কাটার বিরুদ্ধে নয়, বরং গাছ এবং অরণ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যাদের দায়িত্ব, তাদের সংগ্রাম এটা। একটা সময় ছিল যখন গাড়োয়াল অঞ্চলের বনজ সম্পদ উত্তরপ্রদেশের সমতলের কাঠ শিকারিরা লুট করতো। ঠিকাদারের মোড়ক নিয়ে নানা জায়গা থেকে এই গাছ কাটার ঠিকা গ্রহণ করে দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক অনন্য লুট করতো। এই সমস্ত লুটেরা ঠিকাদারদের হাত থেকে অরণ্যকে রক্ষা করা ছিল এই চিপকো আন্দোলনের মূল দাবি।

তবে, সুন্দরলাল বহুগুনা ছাড়াও এই আন্দোলনের আরও কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে একজন হলেন সমাজকর্মী এবং পরিবেশকর্মী ধুম সিং নেগি। এই চিপকো আন্দোলন কেন শুরু হয়েছিল, কোন ঘটনা এই আন্দোলনকে আরও  বড় মাত্রায় নিয়ে যেতে পেরেছিল, সব নিয়েই আজকে আলোচনায় ধুম সিং নেগি।

তিনি বলেন, “গাছ হল মানুষের সবথেকে বড় বন্ধুদের মধ্যে একটি। কিন্তু, অনেক মানুষ এমন আছেন যাঁরা এই গাছকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। আর এই বিষয়টি আজকের নয়। ১৯৭৩ সালেও এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের বনদপ্তর উত্তরাখণ্ডের চামলী জেলার অঙ্গু গাছের নিলাম করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এই গাছ কিনেছিল এলাহাবাদের এটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি সাইমন। ওই ধরনের গাছের কাঠ অত্যন্ত শক্তিশালী, অথচ অত্যন্ত নরম। তাই, সাইমন কোম্পানি পরিকল্পনা নিয়েছিল, ওই কাঠ ব্যবহার করে খেলার জিনিস এবং বিভিন্ন দামি আসবাবপত্র তৈরি করবে।

কিন্তু এই ধরনের গাছের কাঠ লাঙল চষার জন্য ব্যবহার করে এসেছে সেখানকার বাসিন্দারা। এই ধরনের গাছের কাঠ যেহেতু শক্তিশালী অথচ নরম, তাই লাঙলের ক্ষেত্রে এই কাঠ ব্যবহার করলে গবাদিপশুর আঘাত লাগে না। গ্রামের বাসিন্দারা এই কাঠ ব্যবহার করে যুগের পর যুগ ধরে চাষের কাজ চালিয়ে এসেছে। গ্রামের বাসিন্দারা কখনোই এই গাছ ধ্বংস করতে চায় না। তারা সব সময় চায়, এই গাছ যাতে আরও বেশি পরিমাণে তৈরি হোক। কিন্তু বনদপ্তরের এই সিদ্ধান্ত রীতিমতো নাড়িয়ে দিয়েছিল সেখানকার বাসিন্দাদের। কোম্পানির বুলডোজার এবং কাটার যখন গাছ কাটতে আসে, তখন ওই গাছগুলিকে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরেন এলাকার সাধারণ মানুষেরা। ওই গাছগুলি হল তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম সম্বল।”

সেখান থেকেই শুরু হয় এই চিপকো আন্দোলন। যার অন্যতম একজন মুখ ছিলেন ধুম সিং নেগি। উত্তরাখণ্ডের তেহরি গারোয়াল অঞ্চলের পিপালেথ গ্রামের বাসিন্দা ধুম সিং নেগি ছিলেন একজন শিক্ষক। পুরো গ্রাম তাকে গুরুজি হিসেবে চিনতো। তিনি একাধারে একজন সমাজকর্মী, একজন পরিবেশ কর্মী এবং একজন শিক্ষক। সমাজকর্মী এবং পরিবেশ কর্মী সুন্দরলাল বহুগুণা, বিজ্ঞানী তারক মোহন দাসের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। তার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন চে গুয়েভারা।

ধুম সিং নেগির কথায়, ভারতের সবথেকে বড় অহিংস আন্দোলনের মধ্যে একটি ছিল উত্তরাখণ্ডের চিপকো আন্দোলন। এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছিল, কিভাবে অহিংসার মাধ্যমেও শক্তি প্রদর্শন করা যায়। প্রথমে উত্তরপ্রদেশের তেহরি গাড়োয়াল অঞ্চলে  শুরু হলেও খুব তাড়াতাড়ি সারা রাজ্যে এই আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। শুধুমাত্র উত্তরাখণ্ড কেন, ভারতের আরো বিভিন্ন রাজ্যে এই চিপকো আন্দোলনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। যারা বনাঞ্চলে থাকেন, তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের বনদপ্তর। বহু মানুষ নিজেদের কাজ হারাতেন, অনেক মানুষকে না খেয়ে মরতে হতো, অনেকের বাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হত। বনাঞ্চল ধ্বংস করলে শুধু মানুষ নয়, ক্ষতি হয় পরিবেশের, শুরু হয়ে যায় বিশ্ব উষ্ণায়ন। পরিবেশ দূষণ থেকে শুরু করে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট, সব কিছুই ঘটে এই বন নিধনের জন্য।

প্রথমে শুধুমাত্র বনাঞ্চলের বাসিন্দাদের বনের উপরে অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও এই আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক যুক্তিও ছিল বটে। বিজ্ঞানী তারক মোহন দাস এই আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে ছিলেন, ৫০ বছর কিংবা তার বেশি পুরনো কোন গাছ কিভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারে। যদি কোন গাছ কাটা হয় তাহলে হয়তো ৩ শতাংশ সুবিধা মেলে। কিন্তু যদি সেই গাছকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলে ৯৭ শতাংশ সুবিধা দেয় সেই একটি গাছ।

এই বার্তা নিয়েই চিপকো আন্দোলনকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন ধুম সিং নেগি। তিনি একটা সময়ে একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু, চতুর্দিকে চলতে থাকা এই অরাজকতার প্রতিবাদ করার জন্য তিনি নিজের শান্তির চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে সমাজের জন্য কাজ করতে নেমে পড়েন। ৫০ এর দশকেই তিনি নিজের সরকারি স্কুলের চাকরি ছেড়ে সমাজকর্মী হিসেবে সর্বোদয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। তিনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। ধুম সিংয়ের বাড়িতে একটা বিশাল লাইব্রেরী রয়েছে যেখানে বিশ্বের নানান ধরনের বইয়ের একটা খনি রয়েছে। এমনকি তিনি নিজেও একটি বই রচনা করেছিলেন যার নাম দিয়েছিলেন, ‘ মিট্টি, পানি অউর ব্যার’।

এই বইয়ে তিনি উত্তরাখণ্ডের মানুষজনের বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়াও, চিপকো আন্দোলনের মূল মন্ত্র এবং এই আন্দোলনের মূল ভাবনা উঠে এসেছে তার এই বইয়ে। এই বই আমরা চিপকো আন্দোলনের বেশ কিছু স্লোগানের উল্লেখ পেয়েছি। এই বইয়ের মাধ্যমে ধুম সিং নেগী উল্লেখ করেছেন, এই চিপকো আন্দোলনে আমাদের যুবসমাজের যুক্ত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। যদি যুবসমাজ সামনে এগিয়ে আসে, তাহলে এই আন্দোলন সফল হবে। ধুম সিং এই বইয়ে লিখেছেন, “ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। গাছ এবং বনাঞ্চলের প্রতি মানুষের ভাবমূর্তি পাল্টাচ্ছে। বর্তমানে মানুষ বনাঞ্চলের সম্মান করছেন। সেখানকার আসল রসদগুলিকে সঠিকভাবে সুরক্ষিত রাখছেন। এই সময়টা এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করার সবথেকে ভালো সময়।”

“আজকের যুগের মানুষ যদি এই আন্দোলনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তাহলেই এই আন্দোলন আদতে সফল হবে। আপনি যেই হন না কেন, আপনি সবসময় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকবেনই। এবারে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করুন এবং গাছকে শ্রদ্ধা করুন।”, বললেন ধুম সিং নেগি।

দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তিনি কাজ করছেন সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। অস্পৃশ্যতা থেকে শুরু করে বন-নিধন সমস্ত ক্ষেত্রেই তার একটা অবদান আছে। তার এই অবদানের জন্যই তাকে যমুনালাল বাজাজ ফাউন্ডেশন এর তরফ থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। ২০১৮ সালে কাকে ভূষিত করা হয় ‘যমুনালাল বাজাজ অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং কন্ট্রিবিউশন ইন দ্য ফিল্ড অব কনস্ট্রাক্টিভ ওয়ার্ক ফর ২০১৮’ পুরস্কারে। এছাড়াও, তাঁর কাজের জন্য আজীবন অনেক জায়গা থেকে অনেক পুরস্কার তিনি পেয়েছেন।

More Articles

error: Content is protected !!