এই সেই ‘বিষাক্ত বাগান’, যার গাছদের স্পর্শ করলেই বিপদ

By: Arunima Mukherjee

October 1, 2021

Share

চিত্রঋণ : Google

“…সে কান্তিবাবুর বারণ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ছুটে গিয়ে সেপ্টোপাস-এর তিনটি শুড়ের একটিকে আঁকড়ে ধরল।

তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আমার রক্ত জল হয়ে গেল।

তিনটে শুঁড়ই একসঙ্গে বাদশাকে ছেড়ে দিয়ে অভিকে আক্রমণ করল। আর অন্য চারটি শুঁড় যেন মানুষের রক্তের লোভেই হঠাৎ সজাগ হয়ে লোলুপ জিহ্বার মতো লকলক করে উঠল…”

সত্যজিৎ রায় রচিত ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ গল্পটি আজও আমাদের মনের গভীরে এক বিস্ময়ের জন্ম দেয়। গল্পে উল্লিখিত বিভিন্ন গাছ কিংবা জঙ্গলগুলি নেহাতই এক কল্পনা বলে আমাদের মনে হয়। কিন্তু এরকম এক বাগান সত্যিই পৃথিবীর বুকে বিরাজ করছে যা একশোরও অধিক এরকম বিষাক্ত গাছ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল আজ থেকে বহু বছর আগে, যা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা। আজ সেই বিষাক্ত গাছের বাগানের কথাই বলব।   

সাতশো বছর আগে পারসি পরিবার বসবাস করতেন উত্তর ইংল্যান্ডের অ্যালেনউইক দুর্গ-তে (Alnwick castle) বলে রাখা ভাল এই দুর্গটাই জনপ্রিয় সিনেমা হ্যারি পটারের প্রথম এবং দ্বিতীয় খণ্ডে জাদুর বিদ্যালয় ‘হগওয়াটস’ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে ওখান থেকেই জন্ম হয় অ্যালেনউইক গার্ডেনের। এই বাগানের কাহিনি শুরু হয় ১৭৫০ সালে উত্তর ইংল্যান্ডের প্রথম রাজার হাত ধরেই। পৃথিবীর বুকে অবস্থিত এই বিষাক্ত বাগান সূচনালগ্নে আর পাঁচটা সাধারণ বাগান হিসাবেই নির্মিত হয়েছিল। তৃতীয়বারে যিনি এই সিংহাসনে বসেন, তিনি বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে গাছের বীজ সংগ্রহ করে নিজের মত বাগানটি সাজাতে সক্ষম হয়েছিলেন। শোনা যায়, চতুর্থ রাজা নাকি বাগানটি আবার সাজিয়েছিলেন ইতালিয় আদবকায়দায়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বাগানটিতে তার নিজের রূপ হারায় এবং সাধারণ মানুষের খাবার জোগানোর উদ্দেশ্যে এক কৃষি ভূমিতে পরিণত হয়। এরপর থেকেই  পরিচর্যার অভাবে একসময় বাগানটি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। অবশেষে, ১৯৯৫ সালে রালফ পারসি তাঁর বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর পুরনো রীতি অনুযায়ী সিংহাসনের অধিকারী হন। সেইসময় তিনি এবং তাঁর স্ত্রী জেন পারসি পুনরায় বাগানটি নতুন করে তৈরি করার কথা ভাবেন। প্রথমে গোটা বাগান জুড়ে গোলাপ গাছ লাগানোর কথা ভাবা হয়েছিল। বাগানটিকে পুনরুদ্ধার করার উদ্যোগ মূলত নিয়েছিলেন জেন পারসিই। তিনি বেলজিয়ামের খ্যাতনামা দুই নকশাকার জ্যাকিস এবং পিটার হুইটসকে নিয়োগ করেন। সেইসময় এই বাগান পুনরায় সংস্কারের জন্য ৪২ লক্ষ পাউন্ড খরচা হয়।

এতকিছুর পরেও কীভাবে এই বাগান এক বিষাক্ত বাগানে পরিণত হল, এবার আসা যাক সেই কথায়। জেন  প্রথমে এই অ্যালেনউইক গার্ডেনকে এক ঔষধী গাছের বাগান হিসাবে প্রস্তুত করার কথাই ভেবেছিলেন। তাঁর এই মতের পরিবর্তন ঘটে যখন তিনি ইতালি ভ্রমণে যান। সেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে মেডিসি পরিবারের সঙ্গে, যাঁরা তাঁদের সুন্দর বাগানকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে তাঁদের শত্রুদের হত্যা করতেন। এই মেডিসি পরিবারের ইতালির রেনেসাঁতে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল এবং তিনশোরও অধিক বছর এই পরিবার ইতালির রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই প্রভাবশালী পরিবারের শত্রুর অভাব কখনও ঘটেনি। এই পরিবার পাদুয়া অঞ্চলে এক বিস্তীর্ণ ভূমি জুড়ে নানান বিষাক্ত গাছের বাগান তৈরি করেছিল যা তাঁদের শত্রুপক্ষকে বিনাশ করতে সহায়তা করত।  এই ঘটনা জেনকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এছাড়াও তিনি মনে করেন, যদি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই হয় তাহলে এমন কিছু তৈরি করতে হবে যা  ইংল্যান্ডের অন্যান্য বাগানগুলির থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হবে, তাই তিনি অন্যরকম কিছু তৈরির কথা ভাবেন। আবার অন্যদিকে তিনি এটাও মনে করতেন যে, বিশ্বে অবস্থিত বোটানিক্যাল বাগানগুলিতে কেবলমাত্র বিভিন্ন ঔষধি গাছের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে কিন্তু প্রাণনাশক গাছগুলি সম্পর্কে মানুষের এখনও বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই। বিশেষ করে শিশুদের মনে গাছ সম্পর্কে এক আগ্রহ তৈরি করার ইচ্ছা তাঁর মধ্যে ছিল। এই চিন্তাধারা থেকেই অ্যালেনউইক গার্ডেন আবার নতুনরূপে জন্ম নেয়। বাগানের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাণঘাতী একাধিক বিষাক্ত গাছ সংগ্রহ করে তৈরি করা হয়  এই বিষাক্ত বাগান। শোনা যায়, যারা এই গাছগুলি সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই গাছগুলিকে  আনার পথেই গাছগুলি থেকে নিঃশেষিত বিষাক্ত বাষ্পে জ্ঞান হারান। ২০০৫ সালে জেন একশোরও বেশি গাছ সংগ্রহ বাগানে আনেন।

এবার আসা যাক, এই বাগানে অবস্থিত কিছু বিষাক্ত গাছের কথায়। এই বিষাক্ত গাছগুলি তাদের নানান রঙের পাপড়ি দিয়ে অতি সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে পারদর্শী। আপনাদের মনে পরতে পারে  গল্পটির কথা যেখানে গাছটির নিজের খাদ্যকে তার প্রতি আকৃষ্ট করত এক বিশেষ ঘ্রাণের দ্বারা, এ যেন তারই এক প্রতিচ্ছবি। বাগানে অবস্থিত অতি সাধারণ গুল্ম গাছগুলিও অত্যন্ত বিষাক্ত। এখানে অবস্থিত মঙ্কসহুড (Monkshood) গাছটি যে কোন মানুষের মূহুর্তে মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। ডাতুরাস বা ডেভিল ট্রাম্পেট (Daturas or Devils Trumpets) গাছটি মানুষের চিরনিদ্রার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাগানে অবস্থিত সুন্দর ড্যাফোডিল আপনারকে তার দিকে অতি সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু জানবেন এই ড্যাফোডিল আর পাঁচটা সাধারণ গাছের মত নয়, আদৌতে তারাও যথেষ্ট বিষাক্ত। এই বাগানে অবস্থিত খুব সাধারণ দেখতে ফুল কিংবা শাক-সব্জিও মানুষের জীবনে বিপদ ডেকে আনতে সমানভাবেই সক্ষম। ম্যানচিলিন নামের গাছটি মানুষের দৃষ্টি চিরতরে কেড়ে নিতে সক্ষম। আবার এমন অনেক গাছও রয়েছে, যাদের ছোঁয়ামাত্রই তা ত্বক পুড়িয়ে দিতে পারে।

এই বাগানটিতে প্রবেশের জন্য বিশেষ ধরনের পোশাকের ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শকদের পরতে হয় গ্লাভস এবং মাস্ক। বাগানে ঢোকার নিয়মাবলী হিসাবে প্রথমেই বলে দেওয়া হয় কোন গাছকে ছোঁয়া কিংবা কোনও গাছের ঘ্রাণ নেওয়া যাবে না। বিশেষ গাইডের ব্যবস্থা থাকে যারা দর্শকদের বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচয় করায়। এত সুরক্ষা গ্রহণের পরেও অনেক দর্শকই জ্ঞান হারান। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বছরে প্রায় ৬০০০০০০ মানুষ এই অ্যালেনউইক ক্যাসেল এবং এই বাগানটির চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য আসেন।

 

তথ্য সূত্রঃ

More Articles

error: Content is protected !!