শ্বেতাঙ্গদের দেশে গিয়ে কিভাবে ‘মাদার অফ ইন্ডিয়া’ হয়েছিলেন, অমৃতসরের এই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি

By: Sourish Das

September 14, 2021

Share

চিত্রঋণ : https://www.berkeleysouthasian.org/kala-bagai.html

কালা বাগাই, এই কথাটি শুনে প্রায় কেউই কিছুই বুঝছেন না হয়তো। অনেকে হয়তো মনে করছেন, এই নামের সাথে আমাদের সম্পর্ক কিরকম? কিন্তু না, কালা বাগাই নামটির সঙ্গে কিন্তু ভারতের একটি গর্ব জড়িত। বলতে গেলে পাশ্চাত্যের দেশে ভারতের প্রথম কিছু কীর্তিমানের মধ্যে একটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কালা বাগাই। ক্যালিফোর্নিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় শহর বার্কলেতে কালা বাগাইয়ের নামে একটি রাস্তাও আছে, কালা বাগাই রোড। কিন্তু হঠাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাস্তার নাম এরকম কেন? কে আসলে এই কালা বাগাই?

ভারতীয় বংশদ্ভুত এক নারী হলেন এই কালা বাগাই। কিন্তু শুধু নারী না, বরং তাকে মহীয়সি নারী বলাটাই বেশি প্রাসঙ্গিক এবং যুক্তিগ্রাহ্য। ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে একটি অদ্ভুত যোগসূত্র তৈরী করেছিলেন এই নারী। দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে ছিনিয়ে নিয়েছেন ভারতীয়দের অধিকার। যে যুগে আমেরিকার মতো একটি প্রথমে বিশ্বের রাষ্ট্রে প্রায় প্রতিদিন পদলাঞ্চিত হতে হতো ভারতীয়দের, সেই সময় একটি গোটা রাষ্ট্রের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে নেমে গিয়েছিলেন এই কালো চামড়ার ভারতীয়। আর এই অসম লড়াইয়ের জন্যই আজকে আমেরিকাতেও নিজেদের জায়গা পেয়েছে কালো চামড়ার মানুষেরা। তার এই লড়াইয়ের জন্যই একটা তথাকথিত সাদা চামড়ার দেশকে মাথা নত করে মানতে হয়েছিল কালো চামড়ার মানুষরাও ‘মানুষ’। আজকে আলোচনা হবে সাদা চামড়াকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া কালা বাগাই ওরফে ‘মাদার অফ ইন্ডিয়া’কে নিয়েই।

শ্বেতাঙ্গদের দেশে গিয়ে কিভাবে 'মাদার অফ ইন্ডিয়া' হয়েছিলেন, অমৃতসরের এই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি

চিত্রঋণ : https://www.berkeleysouthasian.org/kala-bagai.html

সালটা ১৯১৫, তখন ভারত সম্পূর্ণরূপে ইংরেজদের কবলে। দেশাত্মবোধের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে প্রত্যেক ভারতীয়র মনে। এই সময়, একটি ভারতীয় পরিবার তাদের সন্তান সন্তদি নিয়ে পাড়ি দিলো সুদূর মার্কিন মুলুকে। মার্কিন নাগরিকরা তখন নিজেদের গায়ের চামড়ার রঙেই মাতোয়ারা, মাটিতে পা না পড়ার মতোই অবস্থা। আর তার সাথেই প্রাত্যহিক কর্মাদির মধ্যে একটি, বাদামি বা কালো চামড়ার মানুষদের তাচ্ছিল্য করা।

আজকের যুগ অনেকটাই আলাদা, কিন্তু আগেকার দিনে এরকমটা ছিল না। ১০০ বছর আগে ভারতীয় এবং কালো চামড়ার মানুষদের বরং আরো বেশি ঘৃণার চোখেই দেখা হতো। এরকমই একটি ঘৃণার শিকার হয়েছিলেন কালা বাগাই। শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার ‘অপরাধে’ তাকে আমেরিকায় নিজেদের কেনা বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, বলতে গেলে তিনি তার পরিবার, তার সন্তান নিয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এই অপমানের প্রতিশোধ তিনি নিয়েছিলেন, নিজের অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে। একটি গোটা কমিউনিটিকে পরিচিতি দেওয়ার পিছনে তার অবদান ছিল প্রচুর। বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়ে স্বামীর মৃত্যুও তাকে টলাতে পারেনি। কিন্তু, যে শহর তাকে একদিন তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই শহরেই আজকে একটি আস্ত রাস্তা তার নামেই নামাঙ্কিত।

আসল ঘটনাটা শুরু তারও কিছুটা আগে। ১৮৯২, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরে জন্মদিন কালা বাগাইয়ের। একটি সাধারণ ভারতীয় পরিবারে জন্ম। তাদের পরিবারের জীবন যাপনের ধারাও ছিল একদম সাধারণ। পেশায় ব্যবসায়ী স্বামী বৈষ্ণদাস বাগাইয়ের সঙ্গে বিবাহের পর থেকেই তার জীবনের আসল কাহিনীর সূত্রপাত। ১৯১৫, পেশওয়ার থেকে স্ত্রী, ও সন্তান নিয়ে আমেরিকায় ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন বৈষ্ণদাস। সেখানকার উপকূলীয় এলাকায় একটা ব্যবসাও শুরু করে দেন। কিন্তু তারপরেই শুরু সমস্যা। আর্থিক দিক থেকে না বরং সামাজিক কিছু বিকৃতির হেতু।

যাইহোক, ব্যবসা শুরু হলো, লাভের মুখও দেখলেন বৈষ্ণদাস, সবকিছু ঠিক যাচ্ছিলো। কিন্তু একটাই ভুল করে ফেললেন তিনি, বাড়ি কিনে। এতো বড়ো পরিবারকে রাখার জন্য একটা আমেরিকার বর্কলে অঞ্চলে একটা বাড়ি কিনে ফেললেন বৈষ্ণদাস। কিন্তু এই বাড়িটি কেনাই তাদের কাল হলো। বাড়িতে ঢুকতে যাওয়ার আগেই তাদেরকে আটকে দিলো তাদের প্রতিবেশীরা। কারণ, এলাকাটি তথাকথিত সাদা চামড়ার মানুষের এলাকা। এখানে কালো চামড়ার মানুষ থাকলে তাদের সমস্যা। এই কারণেই রাস্তা আটকে ঘেরাও। এমনকি শারীরিক নির্যাতনের শিকার পর্যন্ত হয়েছিলেন বাগাই দম্পতি। প্রাণ হাতে করে পালিয়ে সেদিন বেঁচে গেলেও দুর্ভাগ্য তাদের পিছু ছাড়েনি। আমেরিকার মতো একটি প্রথম বিশ্বের দেশেও যে সাম্প্রদায়িকতার এরকম একটি রূপ আছে সেটা হয়তো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি বাগাই দম্পতি। কিন্তু এই সব সমস্যাকে দুরে ঠেলে দিয়ে নিজের স্বামী নিজের সন্তানদের জন্য বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন তিনি।

তবে, তার মধ্যে একটা অদ্ভুত রকমের শক্তি ছিল। তিনি সকলকে নিজের কথার মাধ্যমে, নিজের মিতব্যয়ী অথচ মিশুকে স্বভাবের মাধ্যমে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে জানতেন। আর তার এই অদ্ভুত ক্ষমতাই তাকে অন্যান্যদের থেকে করেছিল আলাদা। এক জার্মান পরিবারের হাতে নিজের সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব দিয়ে তিনি শুরু করলেন তার আসল সংগ্রাম। শুরু করলেন বিদেশের রীতিনীতি, সেখানকার আদব-কায়দা, সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়ার যাত্রা। রান্নার হাত ভালো থাকার কারণে, অনেকের কাছেই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলেন। ভারতীয় রান্না খাইয়ে অনেক বিদেশিদের নিজের বন্ধু তৈরী করলেন। স্বামীর ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামের কাজেও তিনি ছিলেন একেবারে যোগ্য সহধর্মিনীর মতো পাশে দাঁড়িয়ে। স্থানীয় সাদা চামড়ার মানুষদের সঙ্গে আলাপ পরিচিতি তৈরী করে একটা আলাদা কমিউনিটি গঠন করলেন।

ছেলেরাও বড়ো হতে শুরু করলো। আবারো যেন মনে হচ্চিল, সব বেশ ভালো চলছে, এভাবেই চলবে। কিন্তু না। কথায় আছে ভালো সময় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। সেরকমটাই হল বাগাই পরিবারের সঙ্গে। প্রায় ২ বছর আগের হওয়া বর্কলে এলাকার ঘটনা যখন তারা প্রায় ভুলতে বসেছেন, সেই সময় আমেরিকা সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় পুরো আপাদমস্তক নড়িয়ে দিলো বাগাই পরিবারকে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করলো, আমেরিকায় বসবাসকারী সমস্ত ভারতীয় এবং সাদা চামড়ার মানুষদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হবে।

এই একটা রায় বিদেশে বসবাসকারী বহু ভারতীয় পরিবারকে একেবারে সমূলে উৎপাটিত করে দিয়েছিল। প্রকৃত অর্থে, সাম্প্রদায়িকতার যে নগ্ন চেহারা বছর কয়েক আগে বর্কলে দেখিয়েছিল, সেই সাম্প্রদায়িকতার উপরেই সীলমোহর দিল খোদ সেই দেশের শীর্ষ আদালত। প্রবাসী ভারতীয়রা তখন আশ্রয়হীন। তারা যে দেশে এতদিন থেকে এসেছে সেই দেশ তাদেরকে প্রতিখ্যান করল। তাদের কোনো থাকার জায়গা নেই, তাদের কোনো নিজের দেশ নেই, নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখা, মাথা গোঁজার মত একটা জায়গা নেই।

এইরকম অবস্থায় দাঁড়িয়ে, অধিকাংশ মানুষই ভেঙে পড়েন। তেমনভাবেই ভেঙে পড়েছিলেন কালা বাগাইয়ের স্বামী বৈষ্ণদাস। প্রতিদিনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু কিছু এমন মানুষ থাকেন, যারা একেবারে অন্য ধাতুতে গড়া। তাদের অভিধানে ম্রিয়মাণতা, বশ্যতা স্বীকারের মতো শব্দের উল্লেখ নেই। মেরুদন্ড শক্ত রেখে চোখে চোখ রেখে লড়াই করা তাদের চরিত্রের বিশিষ্টতা। সেরকমই একজন মানুষ ছিলেন এই কালা বাগাই।

স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে না পড়ে, বরং বর্ণবিদ্বেষের এই গোঁড়ামির বিরুদ্ধে একটা গোটা রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন তিনি। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পরবর্তীতে আরো একবার বিবাহ করলেন তিনি। এবারের পাত্র, আরেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত সমাজকর্মী মহেশ চন্দ্র। নিজের ছেলেদের আমেরিকার কলেজে পড়াশোনা করালেন। কিন্তু, ততদিনে নিজেকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে নিয়েছেন তিনি। ইংরেজি আদব-কায়দা এবং তাদের রীতিনীতি শেখার জন্য ভর্তি হন নাইট স্কুলে। তাদের ভাষা, তাদের ব্যবহার, তাদের পোশাক আশাক, সবকিছুকেই আপন করে নিয়েছেন। তবে যেটা, তথাকথিত সাদা চামড়ার মানুষদের মধ্যে ছিল না, সেটা ছিল এই কৃষ্ণাঙ্গ নারীর মধ্যে। নিজের আচার ব্যবহার এবং কথার মাধ্যমে কিভাবে অন্যকে নিজের ভাবধারায় দীক্ষিত করতে হয়, সেটা তিনি বেশ ভাল করে জানতেন। বহু সংখ্যক গুনগ্রাহী নিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কালো চামড়ার মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন তিনি।

অবশেষে গোটা একটা সাদা চামড়ার দেশ হার মানে এই কালো চামড়ার নারীর কাছে। ১৯৪৬ সাল, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান লুস সেলার আইন নিয়ে এসে ঘোষণা করে দিলেন, এবার থেকে কালো চামড়ার মানুষেরাও আমেরিকার নাগরিক হতে পারবেন। আর কোনরকম বাধা থাকল না। বর্ণ বিদ্বেষের বঞ্চনা এবং লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে জিতে গেলেন কালা বাগাই। কালো চামড়ার মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই অসম লড়াইয়ে পুরোধা নেত্রী ছিলেন এই কালা বাগাই। তার এই কর্মকান্ডের জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের আবেগের কথা মাথায় রেখে সিটি কাউন্সিল ক্যালিফোর্নিয়া শহরের একটি রাস্তার নাম কালা বাগাইয়ের নামে নামাঙ্কিত করে।

আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার উদ্বাস্তুদের নিয়ে তিনি আজীবন নিজের কাজ করে গেছেন। একদিকে যখন গান্ধিজি নেতাজীরা দেশের মানুষকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করছেন, সেই একই সময়ে সাদা চামড়ার দেশে কালো চামড়ার মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লড়াই করছেন কালা বাগাই। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের একটা অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন কালা বাগাই। যে বর্কলে শহর তাকে একদিন শারীরিক নির্যাতন করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই শহরের বুকেই আজ একটি রাস্তা তার নামে নামাঙ্কিত।

তার লড়াইটা শুধুমাত্র নিজের জন্য ছিল না। বরং তিনি লড়াই করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জন্য। তার লড়াইয়ের জন্যই হয়তো আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মসনদে বারাক ওবামাকে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু আজকেও কোথাও না কোথাও যেন সাদা চামড়ার মানুষদের মধ্যে কালো চামড়ার মানুষদের জন্য একটা পুঞ্জিভূত ঘৃণা থেকে গিয়েছে। কিছুদিন আগে ঘটা জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড যেন এই বিষয়টা বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাই, হয়তো আজকেও প্রয়োজন কালা বাগাইয়ের মতো একজন শান্ত-ধীর মস্তিষ্কের মানুষের, যিনি আবারো সাদা চামড়ার মানুষের দম্ভকে ভেঙে চুরে চুরমার করে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করবেন বাদামি ও কালো চামড়ার মানুষের অধিকার। ‘মাদার অফ ইন্ডিয়া’ জয়ধ্বনির মাঝেই শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে সূচনা করবেন উলগুলানের!

Content source – 

More Articles