রাশিয়ার পরমাণু বিস্ফোরণ, ভুগল এই শহরটি- প্রথম পর্ব

By: Sourish Das

October 23, 2021

Share

চিত্রঋণ: গুগল

তারিখটা ১৯৪৯ সালের ১২ অগস্ট, কাজাকাস্তানের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় শহর সেমিপালাতিনোস্কের বাসিন্দারা হঠাৎ করেই তীব্র ভূমিকম্পের সঙ্গে বিকট একটা আওয়াজ শুনে রীতিমতো চমকে গেলেন। মুহূর্তেই পশ্চিমাকাশে দেখা গেল দৈত্যাকার মাশরুম সদৃশ একটি মেঘ। স্থানীয় বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হল, এটা একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমারোহ। সম্প্রচারটি অবশ্যই মিথ্যা হলেও, ওইদিনের পর থেকেই কাজাকাস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওই শহরের মানুষের জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে গেল। এই ঘটনাটির চার বছর আগে, ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই, নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে একদল পরমাণু বিজ্ঞানী প্রথমবারের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে পৃথিবীতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটালেন। সূচনা করলেন একটি নতুন ইতিহাসের। আজ অবধি পৃথিবীতে যে ক’টি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছিল তার মধ্যে দু’টি বাদে বাকি সব ক’টি পরীক্ষামূলক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল কাজাকাস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সেমিপালাতিনোস্ক শহরেই। যদিও এই বিস্ফোরণের পিছনে সম্পূর্ণ ‘হাত’ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের।

শক্তিমত্তার যুগে নিজেদের সামরিক অভ্যুত্থানের পরিচয় দেওয়ার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন যথেচ্ছ ব্যবহার করেছিল এই সেমিপালাতিনোস্ক টেস্ট সাইটের। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে এই পরীক্ষাকেন্দ্রটির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু, এই শক্তি প্রদর্শনের মাঝখানে ওই পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশের জনগণের ক্ষতির কথা বরাবরই এড়িয়ে গিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে যখন জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তখন থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কাজ শুরু সোভিয়েত ইউনিয়নের।

হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে বিস্ফোরণের পরবর্তীতে এটা বোঝা গিয়েছিল যে, পারমাণবিক অস্ত্র ভবিষ্যতের সামরিক শক্তিমত্তার প্রধান নির্ণায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এরকম অবস্থায় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বকে নিজের শক্তিমত্তার জানান দিয়ে দিয়েছে, সেই সময়ে নড়েচড়ে বসল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন প্রধান জোসেফ স্ট্যালিন সিদ্ধান্ত নিলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সোভিয়েত ইউনিয়নকে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের বলে বলিয়ান করবেন। শোনা যায়, এর জন্য তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নবাসীদের গণবলি দিতেও রাজি ছিলেন। তবে এই গণবলির ঘটনা আদতে ঘটল কাজাকাস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সেমিপালাতিনোস্ক টেস্ট সাইটে। তবে, এই টেস্টিং সাইট তৈরি করতে তাকে সাহায্য করেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর লাভরিন্তি বেরিয়া। ১৯৪৩ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে পরমাণু বিজ্ঞানী ঈগর কুর্চতভের নেতৃত্বে নিজস্ব পারমাণবিক প্রকল্প শুরু করলো। এবং তখন থেকেই এই প্রকল্পের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিলেন লাভরেন্তি বেরিয়া। 

১৯৪৫ সালে আগস্ট মাসে যখন হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তারপরেই এই কাজের গতি ত্বরান্বিত হতে শুরু করল। পারমাণবিক বোমায় ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামসহ একাধিক তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে তৈরি হল একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। কিন্তু, সমস্যাটা তখন হয়ে গেল যখন এই বোমা তৈরীর কাজ সম্পূর্ণ। যত্রতত্র তো আর পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়, তাই দরকার একটা টেস্ট সাইট। এরই ধারাবাহিকতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার বেছে নিল কাজাকিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১৮,৫০০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত সেমিপালাতিনোস্ক অঞ্চলটিকে। এই পরীক্ষা কেন্দ্রটির আরো একটি নাম রয়েছে, যা হলো পলিগন। যাত্রা শুরু হল কাজাকাস্তানের সেমিপালাতিনোস্ক পারমাণবিক বোমা টেস্ট সাইটের। 

এই পারমাণবিক গবেষণা গতি বৃদ্ধি করার জন্য প্রতি চার বছরের মাথায় এই পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটাতে শুরু করল সোভিয়েত ইউনিয়ন। মাত্র চার দশকে এই টেস্ট সাইটে ৪৫৬টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৩ সালে ১১৬টি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল মাটির উপরিভাগে, যার ফলে বায়ুমন্ডলে বোমার তেজস্ক্রিয়তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে শুরু করলে ১৯৬৩ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার মাধ্যমে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষাস্থল ভূগর্ভে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ভূগর্ভের টানেলে বোমা বিস্ফোরণ করানোর কারণে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ কমলেও, একেবারে যে শুন্য হয়ে গিয়েছিল তা নয়। এর ফলে, শক্তিমত্তার লড়াইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের কাছে নিজের মান রাখতে পারলেও, এই সফলতার পাহাড়প্রমাণ মূল্য দিতে হয়েছিল কাজাকাস্তানের ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। 

সাধারণত, পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণস্থল হিসেবে একেবারে জনমানবশূন্য কোন একটি অঞ্চল নির্ধারণ করতে হয়। বিস্ফোরিত বোমার তেজস্ক্রিয় তা কতদূর যেতে পারে তা আগে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই সময়ে কাজাকাস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের ব্যাপারে কোনরকম ভ্রুক্ষেপই করেনি। বরং বলতে গেলে, মানবদেহে বোমার প্রভাবের পরীক্ষার অসৎ উদ্দেশ্যে কাজাকাস্তানের ওই অঞ্চলের যাযাবর বাসিন্দাদের অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

এই শহরের বাসিন্দা ভ্যালেন্তিনা নিকনচিক এখনো ভুলতে পারেন না ১৯৫৩ সালের ১২ আগস্টের একটি ঘটনা। তখন তিনি বাড়ির বাইরে খেলা করছিলেন। হঠাৎ করেই, তার কানে একটা আকাশ ফেটে পড়ার মতো শব্দ আসে। ওই শব্দের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিলো যে, ভ্যালেন্টিনা রীতিমতো হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। আদতে সেই গগনবিদারী শব্দটি এসেছিল পলিগন টেস্ট সাইট থেকে। কিন্তু ঐদিন পলিগনে যে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছিল সেটা কোন সাধারণ পারমাণবিক বোমা ছিল না, সেটা ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রথম তাপীয় পারমানবিক বোমা, যার ক্ষমতা ছিল হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত লিটিল বয় থেকে ২৫ গুণ বেশি। তবে শুধু ক্ষমতায় না, মানবদেহে এই পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ছিল সব থেকে বেশি। বাতাসের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তেজস্ক্রিয়তা খুব সহজে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৫৬ সালের একটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের ঘটনা এই তেজস্ক্রিয়তা পলিগন এর থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উষ্ট কামেনগর্সক শহর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ওই শহরের ৬০০ জন বাসিন্দাকে তেজস্ক্রিয়তাজনিত অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত করতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের রিপোর্ট সম্পূর্ণরূপে ধামাচাপা দিয়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার।

পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের ফলে উদ্ভূত তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব সুদূরবিসারী। মানবদেহের কোষ থেকে শুরু করে মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রুণ পর্যন্ত এই তেজস্ক্রিয়তার কারনে নষ্ট হতে পারে। কাজাকাস্তানের ওই অঞ্চলে বিস্ফোরণের সময় আশেপাশে গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে যারা যারা তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের মধ্যে বহু মায়েদের সন্তান বিকলাঙ্গ জন্ম হয়েছিল। এমনকি তাদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত এর পরিমাণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে গর্ভবতী মায়েদের দেহে যতটা তাড়াতাড়ি এই তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ততটা কিন্তু অন্যদের দেহে এতটা লক্ষ্য করা যায় না। সোভিয়েত সরকারের তরফ থেকে কাজাকাস্তানের পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়তার ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বটে, কিন্তু তাদের রিপোর্ট কোনদিনই প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

More Articles

error: Content is protected !!