কম সময়ে সঞ্চয় দ্বিগুণ করতে চাইলে বিনিয়োগ করুন পোস্ট অফিসের এই স্কিমগুলিতে

By: Sourish Das

December 21, 2021

Share

ভারতীয় পোস্ট অফিসে সঞ্চয়ের স্কিমগুলিতে ঝুঁকি তো নেইই আকর্ষণীয়ও বটে। ছবি ট্যুইটার থেকে নেওয়া।

আপনি কি কোনও রকম ঝুঁকি ছাড়াই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে চান? তাহলে আপনাদের সাহায্য করতে রয়েছে পোস্ট অফিসের বিভিন্ন মাসিক বিনিয়োগ স্কিম। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা সবসময়েই মনে করেন পোস্ট অফিস হলো সবথেকে জনপ্রিয় কিছু ঝুঁকিবিহীন সেভিংসের জায়গার মধ্যে একটি। এখানে যে কোনও বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন এবং ভবিষ্যতে একটা সময় পরে ভালো একটা পরিমাণ টাকা তুলতে পারবেন, তার সঙ্গেই পাবেন বেশ মোটা অঙ্কের সুদও।

পোস্ট অফিসের বেশির ভাগ স্কিমই মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।  আয়কর আইনের ৮০সি ধারা অনুযায়ী, যে টাকা আপনি পোস্ট অফিসে সঞ্চয় করেন, তার উপরে আপনি আয়কর ছাড়েরও সুবিধা পেতে পারেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে। 

শুধুই  মান্থলি ইনকাম স্কিম, এছাড়াও পোস্ট অফিস আপনাকে পোস্ট অফিস সেভিংস স্কিম, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা, সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড, কিষান বিকাশ পত্র, ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট স্কিমের মতো একাধিক স্কিম এবং বিনিয়োগের পথ প্রদান করে থাকে যা আপনার ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। চলুন পোস্ট অফিসের এরকমই কিছু জনপ্রিয় পাঁচটি স্কিম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক, যেখানে আপনি টাকা বিনিয়োগের সুবিধা তো পাবেনই, সঙ্গেই পাবেন ভবিষ্যতে সুরক্ষাও।

১. সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা –

দেশের সকল কন্যা সন্তানদের জন্য ভারতীয় পোস্টাল সার্ভিস এবং ভারত সরকার এই সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা নিয়ে এসেছে। এই সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার মাধ্যমে দেশের সকল কন্যা সন্তানের জীবনযাত্রার মান সুন্দর করাই মূল লক্ষ্য। মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য যদি কোনও পরিবার টাকা সঞ্চয় করতে চায়, তাদের জন্য এই সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা সবথেকে ভালো একটি বিনিয়োগের স্কিম।

এই যোজনায় পোস্ট অফিসের তরফ থেকে সব থেকে বেশি সুদ দেওয়া হয়। প্রতি বছরে ৭.৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হয় এই সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা অ্যাকাউন্টে। এই সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় যদি আপনি টাকা রাখেন তাহলে ৯ বছরের মধ্যে আপনার টাকা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এই যোজনার সর্বাধিক সময়কাল অ্যাকাউন্ট খোলার দিন থেকে সর্বাধিক ২১ বছর, বা প্রাপ্তবয়স্কা কন্যার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত। সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা অ্যাকাউন্টে আপনি ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবেন একটি অর্থবর্ষে। তবে এই স্কিমে আপনি এক বছরে যতবার ইচ্ছা টাকা ডিপোজিট করতে পারবেন।

আরও পড়ুনওয়ার্ক ফ্রম হোমে বিরক্ত? এই বাস্তু টিপসগুলি আপনাকে করে তুলবে আবার চনমনে

আপনার মেয়ের বয়স যদি ১০ বছরের কম হয় তাহলে আপনি অভিভাবক হিসেবে আপনার মেয়ের নামে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। কোনও একজন কন্যা সন্তানের নামে পুরো ভারতে একটি মাত্র অ্যাকাউন্ট খোলা যেতে পারে। সেই কন্যার যতদিন না পর্যন্ত ১৮ বছর বয়স হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত অভিভাবককে এই অ্যাকাউন্ট সামলাতে হবে। মেয়ের বয়স ১৮ বছর হয়ে গেলে অথবা মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করে গেলে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা সম্ভব। তবে, ৫ বছরের লক ইন পিরিওড এখানে থাকছে। কিন্তু তার আগেও আপনি এই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে পারেন যদি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার মারা যায় অথবা, আর্থিক কোনও সমস্যা হয়। 

২. পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড –

পোস্ট অফিসের বেশকিছু লাভজনক যোজনার মধ্যে অন্যতম হলো পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড যোজনা। এই পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড পোস্ট অফিস অ্যাকাউন্টের সর্বাধিক সময়কাল ১৫ বছর এবং বর্তমানে প্রতি অর্থবর্ষে ৭.১ শতাংশ করে সুদ দেওয়া হচ্ছে এই পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড অ্যাকাউন্টে। সেই হিসেবে দেখতে গেলে ১০ বছরের মধ্যে আপনার টাকা দ্বিগুণ হয়ে যাবে যদি আপনি পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড স্কিমে বিনিয়োগ করেন। এই ধরনের অ্যাকাউন্ট ১৫ বছর পর্যন্ত চালু রাখা যাবে। অ্যাকাউন্ট ম্যাচিওর হয়ে গেলে আপনি পুরো টাকা তুলে নিতে পারেন, অথবা ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্টের মত আরো ৫ বছরের জন্য চালিয়ে যেতে পারেন। 

তবে জানিয়ে রাখি, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড কিন্তু টাকা ডিপোজিট করার দিক থেকে একটু অন্যরকম স্কিম। যদি আপনি পোস্ট অফিসে পিপিএফ অ্যাকাউন্ট খোলেন, তাহলে আপনি একটি অর্থবছরে ৫০০ টাকা থেকে ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ডিপোজিট করতে পারেন। তবে, এই একাউন্টে আপনি টাকা জমা করতে পারবেন একসাথে অথবা নির্দিষ্ট কিছু ইন্সটলমেন্টে। যতবার ইচ্ছা টাকা ডিপোজিট করার সুবিধা প্রত্যেকটি পোস্ট অফিস আপনাকে দেবে না। তাই যে পোস্ট অফিসে এই ধরনের অ্যাকাউন্ট খুলতে চান সেখানে আগে এই অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নেবেন।

যে কোন সাধারণ ব্যক্তি এই ধরনের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, তবে তাকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে। একজন ব্যক্তির নামে সারা ভারতের যেকোনো পোস্ট অফিসে শুধুমাত্র একটি অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হবে। একই ব্যক্তির নামে যদি দ্বিতীয় অ্যাকাউন্ট খোলা থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে। পোস্ট অফিস পিপিএফ অ্যাকাউন্টে লোন নেওয়ার সুবিধাও থাকছে। তবে সে ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট অন্ততপক্ষে এক বছরের পুরনো হতে হবে। 

দ্বিতীয় অর্থবর্ষের শেষের দিক থেকেই আপনি লোন নিতে পারবেন পোস্ট অফিস থেকে। আপনার দ্বিতীয় অর্থবর্ষে শেষে আপনার অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স যে রকম থাকবে তার ২৫ শতাংশ টাকার আপনি লোন গ্রহণ করতে পারবেন। একটি অর্থবর্ষে আপনি কেবল মাত্র একটি লোন গ্রহণ করতে পারবেন। দ্বিতীয় লোন গ্রহণ করার আগে আপনাকে প্রথম লোন সম্পূর্ণরূপে শোধ করতে হবে। যদি আপনি লোন গ্রহণের ৩৬ মাসের মধ্যে লোন শোধ করে দেন তাহলে আপনাকে ১ শতাংশ সুদ দিতে হবে। আর যদি ৩৬ মাসের মধ্যে আপনি লোন শোধ করতে না পারেন তাহলে ৬ শতাংশ করে সুদের হার আপনাকে দিতে হবে। 

আরও পড়ুন-দশটা-পাঁচটার চাকরি থেকে বিশ্বসুন্দরীর মঞ্চে, মানসা বারাণসী যেন চিররহস্যময়ী…

৩. সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম 

৬০ বছর বয়সের উর্ধ্বে ভারতের যেকোনো প্রবীণ নাগরিক পোস্ট অফিসে সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। এছাড়া যদি আপনি অবসরপ্রাপ্ত কোন সিভিলিয়ান হন তাহলে আপনার জন্য এই অ্যাকাউন্ট খোলার বয়স ৫৫ হয়ে যাবে। অথবা যদি আপনি ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের যেকোনো পদে কর্মরত থাকেন তাহলে আপনার জন্য এই বয়সসীমা হবে ৫০। এছাড়াও আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম এর মধ্যে। 

এই অ্যাকাউন্টের ন্যূনতম ডিপোজিট অ্যামাউন্ট ১০০০ অথবা ১০০০ এর গুণিতক হতে হবে। সর্বাধিক আপনারা ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জামাতে পারবেন এই অ্যাকাউন্টে। যদি কোনভাবে অতিরিক্ত কোনো টাকা জমা হয়ে যায়, তাহলে অতিরিক্ত টাকা তৎক্ষণাৎ সেই ব্যক্তির পোস্ট অফিস সেভিংস অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেওয়া হবে। তার সঙ্গেই, এই অ্যাকাউন্টে যদি আপনি টাকা সঞ্চয়  করেন তাহলে আয়কর আইনের ৮০সি ধারা অনুযায়ী আপনি আয়করের কিছু সুবিধা পাবেন। এই ধরনের সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে  আপনাকে ৭.৪ শতাংশ করে সুদ দেওয়া হবে। ৯ বছরের মধ্যেই আপনার টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তবে, যদি আপনার একটি অর্থবর্ষে সুদের পরিমাণ ৫০,০০০ টাকা থেকে বেশি হয়ে যায় তাহলে কিন্তু আপনাকে আয়কর দিতে হবে। আয়করের পরিমাণ টাকা কেটে নিয়ে বাকি টাকা আপনার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেওয়া হবে।

এই অ্যাকাউন্ট সঠিক ভাবে ম্যাচিওর হবে অ্যাকাউন্ট খোলার ৫ বছর পরে। ম্যাচুরিটির আগে যদি অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করা হয় তাহলে কিছু পরিমাণ টাকা বাদ যেতে পারে। যদি অ্যাকাউন্ট ১ বছরের আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে আপনাকে কোন সুদ পেমেন্ট করা হবেনা। ১ বছর থেকে ২ বছরের মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হলে ১.৫ শতাংশ টাকা কাটা যাবে। ২ বছর থেকে ৫ বছরের মধ্যে বন্ধ করা হলে ১ শতাংশ টাকা কাটা যাবে। 

৪. কিষান বিকাশ পত্র 

বর্তমানে যদি আপনি পোস্ট অফিসে কিষান বিকাশ পত্র অ্যাকাউন্ট খোলেন তাহলে ৬.৯ শতাংশ করে সুদ দেওয়া হবে পোস্ট অফিসের তরফ থেকে। ১০ বছর ৪ মাসে আপনার টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ হবে এই অ্যাকাউন্টে। ১০০০ টাকা দিয়ে আপনাকে প্রথমে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং তারপরে ১০০ টাকার গুণিতক অ্যামাউন্ট আপনাকে ডিপোজিট করতে হবে। এই ধরনের সেভিংস অ্যাকাউন্টের কোন রকম সর্বাধিক টাকা জমা করার মাত্রা নেই। তবে এই অ্যাকাউন্ট খোলার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আপনাকে এই একাউন্ট খোলার জন্য একটি বিশেষ অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম জমা দিতে হবে। আর এই অ্যাকাউন্টে অবশ্যই একজন বিশ্বাসযোগ্য ‘অথরিটি’ প্রয়োজন হবে। কিষানবিকাশ পত্র অ্যাকাউন্ট খুলতে চাইলে সরাসরি আপনার কাছের পোস্ট অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং সেখানকার ফর্ম জমা দেওয়ার পদ্ধতি দেখে নিন। 

৫. ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট স্কিম 

১০ বছরের মধ্যে আপনার জমা দেওয়া টাকা দ্বিগুণ করতে হলে আপনি ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট স্কিমে আপনার টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন। এই সার্টিফিকেট স্কিম মূলত চালু করা হয়েছে সমস্ত ভারতীয় নাগরিকের জন্য। ন্যূনতম ১০০০ টাকা দিয়ে আপনি অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন এবং তারপর সময়ে সময়ে ১০০ টাকার গুণিতকে আপনি টাকা জমা দিতে পারবেন এই ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট স্কিমে। যদি এই সার্টিফিকেট স্কিমে আপনি টাকা জমা করেন তাহলে আপনি আয়কর আইনের ৮০সি ধারা অনুযায়ী আয়করে ছাড় পাবেন। এই যোজনার অন্তর্গত আপনি একাধিক অ্যাকাউন্ট আপনার নামেই খুলতে পারবেন। তবে এই অ্যাকাউন্টের ম্যাচিউরিটি পিরিওড কিন্তু ৫ বছর। তবে এই পোস্ট অফিস অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়ার কোনও সর্বাধিক লিমিট নেই।

More Articles