তুলো শুষে নিয়েছে যে 'সাগর'!

সাগর নাকি হৃদ ? নাম নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে ভৌগোলিক তথ্যে একসময়ের বিরাট প্রাকৃতিক জলাধার আরল সাগর এখন প্রায় অস্তিত্বহীন। তাকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা হলেও কূটনৈতিক প্রাচীরে সেই চেষ্টা আটকে আছে।

পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলো চাষের কারণে এই আরল সাগর বা আরল হ্রদ একসময় জল সংকটে পড়ে। ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। ১৯৬০ সালে এটি দুনিয়ার ৪র্থ বৃহত্তম হ্রদ হিসেবে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ৬৭ হাজার বর্গ কিলেমিটার আয়তনের বিশাল এই জলাশয়ের ৭০ শতাংশ শুকিয়ে গেছে। আরল সাগরের অবস্থান কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের সীমান্তে। গবেষণায় উঠে এসেছে এর বয়স প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন বছর।

সোভিয়েত তখন আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ক্রেমলিন বনাম হোয়াইট হাউসের হিমশীতল লড়াই চলছে। বিশ্ব বাজারে তুলো উৎপাদনের শিরোপা ধরে রাখতে মরিয়া সোভিয়েত। বিরাট বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন যেমন তেমনি নিজস্ব চাহিদা। এই কারণে তুলো চাষের উপর বড়সড় নজর দিল সোভিয়েত। ১৯৬০ এর দশকের ঘটনা। সেই তুলোর যোগান ধরে রাখতে আরল সাগরের জলের দুই প্রধান উৎস আমু দরিয়া ও সির দরিয়া নদীর জল ব্যবহার করা শুরু হলো।

তুলো শুষে নিয়েছে যে 'সাগর'!

চিত্রঋণ : Google

অবশ্য এর ঠিক আগে পঞ্চাশের দশকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মিশরের রাজনৈতিক পরিবর্তন বিরাট আলোড়ন ফেলে দেয়। সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মিশরের ক্ষমতা দখল করলেন গামাল আব্দ এল নাসের। তিনি ক্ষমতা দখল করেই বিখ্যাত সুয়েজ খালকে মিশরের রাষ্ট্রীয় সম্পদ বলে অধিগ্রহণ করেন। এর জেরে বিশ্বে আলোড়ন ছড়ায়। ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যাওয়ায় মিশরের পাশে দাঁড়ায় সোভিয়েত। চেকশ্লোভাকিয়ার ( বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র) সঙ্গে মিশরের বিখ্যাত অস্ত্র চুক্তিতে সোভিয়েত ভূমিকা নেয়।  মিশর তার গুরুত্বপূর্ণ ফসল তুলোর বিনিময়ে সমপরিমাণ মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব দেয়। সোভিয়েত রাজি হয়। এর থেকেই বোঝা যায় তুলোর প্রয়োজন সোভিয়েতের কতটা।

মিশরের তুলোয় সোভিয়েতের চাহিদা মিটবে না। অতএব শুরু হলো নিজের তুলো উৎপাদনে জোর দেওয়া। বিরাট কলেবর নিয়ে সোভিয়েত শাসকরা ইউরোপ থেকে মধ্য এশিয়া ও একেবারে আফগানিস্তানের সীমানায় হাজির। আজকের কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান তখন সোভিয়েত অধীন প্রদেশ। সেখানেই তুলোর চাষ হবে। সরকারের অনুমতি মিলতেই শুরু হলো তুলো চাষ।  সোভিয়েত সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, আমু দরিয়া এবং সির দরিয়ার জল তুলো ক্ষেতে সেচের জন্য ব্যবহার করা হবে। নদীর জল টেনে এনে তুলো চাষের জমিতে ফেলা শুরু হলো।

প্রাকৃতিক বিস্ময় আরল সাগরের মূল দুই জল প্রবাহে ভাটা পড়তে শুরু করে। অন্য দিকে তুলো চাষ রমরমিয়ে চলতে থাকে। তুলোর টানে আরল সাগর যে বিপদের মুখে তা বুঝেও বোঝেনি সোভিয়েত সরকার।  আমু ও সির দরিয়া নদীর জলস্তর নামতে থাকে। সেই ধাক্কায় আরল সাগরের জলের ঘাটতি শুরু হতে থাকে। বাড়তে থাকে নুনের পরিমান। এর ফলে আরল সাগরের ভূ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে বড়সড় ধাক্কা লাগতে শুরু করে।

১৯৬০ সালের পর থেকে  বিশাল হ্রদের জল দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা অন্য প্রদেশে চলে যেতে থাকেন। ধীরে ধীরে মরে যেতে থাকে আরল সাগর। এ যেন প্রাকৃতিক তুলো শুষে নিল বিরাট জলসম্ভার!

সোভিয়েত লুপ্ত হয় নব্বই দশকে। আরল সাগর তীরের কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান দুটি স্বাধীন দেশ তৈরি হয়।  ১৯৯৭ সালে দেখা যায়  দুই দেশের সীমান্তে আরল সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ জল শুকিয়ে গেছে। পরিবেশবিদরা আরল সাগরের করুণ পরিণতি দেখে চিন্তায় পড়েন।  আরল সাগর বিপর্যয় এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।১৯৯৭ সালে দেখা যায়  দুই দেশের সীমান্তে আরল সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ জল শুকিয়ে গেছে। পরিবেশবিদরা আরল সাগরের করুণ পরিণতি দেখে চিন্তায় পড়েন।  আরল সাগর বিপর্যয় এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।

তুলো শুষে নিয়েছে যে 'সাগর'!

চিত্রঋণ : Google

আরল সাগর বাঁচাতে একজোট হন কাজাখ ও উজবেক নেতৃত্ব। ২০০৩ সালে কাজাখস্তান সরকার  বাঁধ নির্মাণ করে নদীর জল আরাল সাগরের দিকে প্রবাহিত করার উদ্যোগ নেয়। ২০০৫ সালে বাঁধ নির্মাণের পর কাজাখ অঞ্চলের দিকে পড়া আরল সাগরের অংশে জলের স্তর বাড়ে। মাছ চাষ শুরু হয়।

এবার উজবেকিস্তানের পালা। তারাও নিজেদের অংশে বাঁধ দিয়ে আরল সাগরের জলস্তর বাড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হয়।উজবেকিস্তানের দিকে এই প্রকল্প তেমন সফল হয়নি।

আরল সাগর এখনও নিছক বড়সড় জলাশয়। তার অতীত বিপুল চেহারা হারিয়েছে সোভিয়েত তুলো চাষের কারণে। ২০১৪ সালের নাসা প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায় এর পূর্বাঞ্চলীয় দিকটি পুরোটা শুকিয়ে গেছে। এই অঞ্চলটি এখন আরালকুম মরুভূমি নামে পরিচিত। আরল সাগর বিপর্যয়কে গত শতাব্দীর মানুষ সৃষ্ট  সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।

যতটুকু জল এখনো আছে তা মূলত কাজাখস্তান সরকারের বাঁধের কারণে। তবে প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা আর কখনোই আরাল সাগরের জল সম্পূর্ণরূপে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো সমঝোতায় না পৌঁছুলে আরাল সাগরের বাকি অঞ্চলগুলোয় কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।

কূটনৈতিক সংঘাত, সীমান্ত সমঝোতা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সব মিটিয়ে এক জায়গায় এসে মতৈক্য হওয়া সম্ভব নয়। এখানেই আটকে আছে আরল সাগরের জিয়ন কাঠি। যে হৃদ একদিন সাগর নামে আক্ষরিক অর্থে পরিচিত ছিল তা এখন হৃদ তো দূরের কথা ছোট জলাশয় হয়ে থেকে গিয়েছে। ভূগোলের পরিভাষায় আরল এখনও সাগর। তবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সাগর। গত শতাব্দীতে যার অস্তিত্ব ছিল। এই একুশ শতকের প্রথম দুই দশকে এসে অস্তিত্বহীন সাগরের নাম আরল।

সৌ:
The Aral Sea Crisiswww.columbia.edu

More Articles