কেন শরৎকালের দুর্গাপূজা পরিচিত হয় অকাল বোধন হিসাবে?

By: Sourish Das

October 14, 2021

Share

চিত্রঋণঃ গুগল

ফি-বছর নতুন ক্যালেন্ডার অথবা ফুল পঞ্জিকা বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যেকটি বাঙালি যেই দিনগুলির দিকে আগে নজর দেয় তার মধ্যে অন্যতম হলো দুর্গা পুজো বা দুর্গোৎসব। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে, ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে’ শুনলেই প্রত্যেক বাঙালির গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আর কয়েকদিন পরেই যে পুজো! ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা নতুন ক্যাপ বন্দুক, নতুন জামার জন্য বায়না ধরে বাবা মায়ের কাছে। স্কুল কলেজের বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা মেসেঞ্জার গ্রুপে শুরু হয়ে যায় পুজোর দিনগুলোর প্ল্যানিং করা। প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল অষ্টমীর শাড়ি ও পাঞ্জাবির রং ম্যাচিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার পোশাক ব্যবসায়ীরা তাদের পশরা সাজিয়ে বসে পড়েন শেষ মুহূর্তে কিছু বেশি আয় করার আশায়।

এই ৪টে দিন প্রত্যেকটি বাঙালি সবকিছু চিন্তা ভুলে নিজের কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটায়। তাদের সাথে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরে। যারা ডায়েটে থাকেন তারাও ফাস্ট ফুড কিংবা ফুচকার জন্য না করেন না এই ৪ টে দিন। কারণ এই ৪টে দিন বছরের অন্য দিনগুলির থেকে আলাদা। বছরে মাত্র এই ৪টে দিনের জন্যই যে মা দুর্গা তার ৪ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কৈলাশ থেকে মর্তে আসেন। আর ঘরের মেয়েকে আদরে, যত্নে ভরিয়ে রাখার কোনো কসুর ছাড়েনা বাঙালি। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ কেনো, গোটা বিশ্বেই এই দুর্গাপুজো অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালিত হয়।

অতিমারি থাকলেও এবারেও উমা তার বাড়িতে আসছেন তার চার ছেলে মেয়েকে নিয়ে। পুষ্পাঞ্জলি, ঠাকুর দেখা, প্যান্ডেল সবকিছুতেই এবছরও আছে কিছু বিধিনিষেধ। তবে তাই বলে কি আনন্দ থেমে থাকতে আছে নাকি! এবারেও সমান জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত হবে দুর্গাপুজো। তবে, শাস্ত্র মতে বাঙ্গালীদের দুর্গাপুজো, বা শারদীয়া দুর্গোৎসব কিন্তু মা দুর্গার পুজোর সঠিক সময় না। সঠিক সময় হলো বসন্তকাল। শরৎকালে দুর্গাপুজো করার নিয়ম চালু করেছিলেন ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম। এই কারণেই শারদীয়ার এই দুর্গাপুজো আসলে মায়ের ‘অকাল বোধন’। তবে দুর্গাপুজোয় এখনো পর্যন্ত রামচন্দ্রের পূজার কোনরকম বিধান নেই। তাই বাংলায় আমরা অকালবোধন থিমের কোন দুর্গাপূজা দেখতেও পাই না।

বাঙালিরা যারা দূর্গা পূজা সম্পর্কে একটু আগ্রহ রাখেন, তারা হয়তো সকলেই এই অকালবোধনের সঙ্গে জড়িত বহু গল্প ছোট থেকে শুনে আসছেন। আর এই সমস্ত গল্পগুলি লিখেছিলেন কৃত্তিবাস ওঝা। এই বাঙালি রামায়ণ অনুবাদক বেশ ফলাও করে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার কথা আমাদের সকলকে জানিয়েছেন। কিন্তু, রামচন্দ্রের সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্ক কিরকম? কেন তিনি অকালবোধন করেছিলেন? এই গল্পটা বিস্তারিতভাবে কিন্তু খুব হাতে গোনা মানুষই জানেন। তাই আজকের আলোচনার বিষয়টি রামচন্দ্রের অকাল বোধন ও শরৎকালীন দুর্গোৎসব।

রাম এবং রাবণের যুদ্ধ তখন প্রায় শেষের পথে। যুদ্ধে একে একে মারা পড়তে শুরু করেছে সমগ্র লঙ্কাবাহিনী। রাবণ তখন একা রক্ষা করছেন তার লঙ্কাপুরীকে। হনুমানের হাতে তিনি মার খেয়ে রীতিমতো অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় রাবণ বুঝলেন অবস্থা অত্যন্ত বেগতিক। তৎক্ষণাৎ তিনি শুরু করলেন অম্বিকার স্তব। ‘আর কেহ নাহি মোর ভরসা সংসারে/ শংকর ত্যাজিল তেঁই ডাকি মা তোমারে।’ রাবণের এই কাতর আর্তনাদে মন বিহ্বল হয়ে পড়লো মায়ের। তিনি কালী রূপে রাবনকে আশ্রয় দিলেন। তিনি রাবণকে অভয় দিলেন। কিন্তু এই খবর কোনভাবে পৌঁছে গেল শ্রী রামচন্দ্রের কাছে। রামচন্দ্র বুঝলেন, এখনই কিছু না করলে পরাজয় নিশ্চিত।

তৎক্ষণাৎ সমস্ত দেবতাদের দ্বারস্থ হলেন রামচন্দ্র। দেবরাজ ইন্দ্র থেকে শুরু করে ব্রহ্মা, সকলের কাছে করজোড়ে কাকুতি মিনতি জানালেন রামচন্দ্র। অবশেষে পরামর্শ নিয়ে হাজির হলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। তিনি রামকে উপদেশ দিলেন, “দুর্গাপুজো করো। আর কোন উপায় নেই।” কিন্তু রাম বললেন, “এটা তো সম্ভব নয়। দুর্গাপুজোর আসল সময় তো বসন্তকাল। এখন যদি শরৎকালে আমি পুজো করি তাহলে তো সেটা অকাল হবে। তাছাড়া, শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী অকালবোধনে নিদ্রা ভাঙ্গাতে হবে কৃষ্ণানবমীতে। সুরথ রাজা প্রতিপদে পূজারম্ভ করলেও, সেই যুগ তো আর নেই। আমি কিভাবে পুজো করবো এই সময়ে?” রামের বিহ্বলতা দেখে ব্রহ্মা বললেন, “আমি ব্রহ্মা, আমি বিধান দিচ্ছি, শুক্লাষষ্ঠীতে বোধন করে পুজো শুরু করো। তোমার কোন অনর্থ হবে না।”

ব্রহ্মার কথায় মনে সাহস নিয়ে রামচন্দ্র শুরু করলেন দুর্গাপুজো। চণ্ডী-তে বর্ণিত আছে, সুরথ রাজা নাকি দুর্গার মাটির মূর্তি নিজের হাতে তৈরি করে পূজা করেছিলেন। ঠিক একইভাবে রামচন্দ্রও নিজের হাতে মূর্তি তৈরি করে পুজো করতে বসলেন। ষষ্ঠীর সন্ধ্যাবেলা বেল গাছের তলায় হল দেবীর বোধন। অধিবাসের সময় স্বয়ং রামচন্দ্র হাতে বেঁধে দিলেন নবপত্রিকা। সপ্তমীর দিন একদম ভোর ভোর নাগাদ স্নান করে সমস্ত রকমের বিধি মেনে পুজো করলেন স্বয়ং রামচন্দ্র। অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে করলেন অষ্টমীর পুজো। একইভাবে অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে সমস্ত নিয়মনিষ্ঠা মেনে করলেন সন্ধিপুজো। তবে, রামচন্দ্রের সব থেকে বিশেষ পুজো ছিল নবমী পুজো। এই নবমী পূজার একটি আলাদা বর্ণনা দেওয়া রয়েছে কৃত্তিবাসের লেখায়।

রামচন্দ্র বহু বনের ফুল জোগাড় করে, ফল জোগাড় করে পুজো করলেন, কিন্তু তবুও দেবী তুষ্ট হলেন না রামচন্দ্রের পুজোয়। সেই সময়, রামকে সাহায্য করতে আসলেন বিভীষণ। রামের পুজোতে দেবী দুর্গা সাড়া দিচ্ছেন না দেখে বিভীষণ উপদেশ দিলেন, “আপনি নীল পদ্ম ব্যবহার করে পুজো করুন। দেবী নিশ্চয়ই আপনার পুজোতে সাড়া দেবেন।” আবারো রাম মহা বিপদে পড়লেন। নীল পদ্ম যে বেজায় দুর্লভ। কিন্তু, দেবীর পুজো করতে যে নীল পদ্ম তাকে ব্যবহার করতেই হবে। শুরু হয়ে গেল নীল পদ্মের খোঁজ। দেবতারা অব্দি জানেন না নীল পদ্ম কোথায় পাওয়া যায়। অবশেষে রাম জানতে পারেন, পৃথিবীতে একমাত্র একটি জায়গা রয়েছে যেখানে নীল পদ্ম পাওয়া যাবে, এবং সেই জায়গাটি হল দেবীদহ হ্রদ। সেই জায়গার খোঁজ পেয়ে হনুমান তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হলেন ওই হ্রদে। সেখান থেকে তুলে আনলেন ১০৮ টি নীল রঙের পদ্মফুল। কিন্তু দুর্গা এত সহজে যে রাবনকে দেওয়া কথা ফেলতে পারবেন না। তাই তিনি রামচন্দ্রের আনা ১০৮টি নীল পদ্মের মাঝখান থেকে একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখলেন ছলনা করে।

কিন্তু রামচন্দ্রও ছাড়বার পাত্র নয়। একটি নীল পদ্মের ক্ষতিপূরণে রামচন্দ্র নিজের একটি চোখ পর্যন্ত উপড়ে নিবেদন করতে চেয়েছিলেন। অবশেষে রামচন্দ্রের একাগ্রতা এবং তার নিষ্ঠা দেখে নিজের অবস্থান থেকে টললেন দেবী দুর্গা। তিনি রাবণকে দেওয়া নিজের কথা তুলে নিলেন এবং রামচন্দ্রকে বললেন, তিনি রাবনবধ করতে পারেন। কিন্তু, যাওয়ার আগে রামচন্দ্রের উদ্দেশ্যে তিনি কিছু কথা বলে গেলেন। দেবীদুর্গা বললেন –

অকালবোধনে পূজা, কইলে তুমি দশভূজা
বিধিমতে করিলা বিন্যাস।
লোক জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য
অবনীতে করিলে প্রকাশ।।

তারপরে রামচন্দ্র দশমীর দিন সমস্ত পূজা শেষ করে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে রাবণ বধ করতে বেরিয়ে পড়লেন। যদিও রামচন্দ্রের এই দূর্গাপূজার কাহিনী আদি রামায়ণ অর্থাৎ বাল্মীকির লেখা রামায়ণে উল্লেখ করা নেই। তবে এর উল্লেখ রয়েছে দেবী ভাগবত পুরাণ এবং কালিকা পুরাণের বেশকিছু পঙক্তিতে। এই দুটি পুরাণ যথাক্রমে দুজন বাঙালি ঋষির রচিত। তবে কৃত্তিবাসের আগেও বাংলায় কিন্তু দুর্গাপুজোর প্রচার ছিল। ভবদেব ভট্টের মাটির মূর্তিতে দুর্গাপুজোর বিধান, শূলপানির দুর্গোৎসব বিবেক, স্মার্ত রঘুনন্দনের দুর্গাপূজা তত্ত্ব এই সমস্ত রচনা ছিল প্রাক-কৃত্তিবাসী যুগের রচনা। আবার, এক দিক থেকে দেখতে গেলে কৃত্তিবাসী রামায়ণের রামের করা দুর্গাপূজার বর্ণনার সঙ্গে কিন্তু পৌরাণিক দুর্গোত্সবের বর্ণনা খুব একটা মেলে না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলায় যেভাবে দুর্গাপূজা হয়, তার রীতি লেখা রয়েছে কালিকাপুরাণে। এই পুরাণে আমরা রামচন্দ্রের উল্লেখ পেয়েছি।

তবে, রামচন্দ্রের দুর্গাপুজোর সবথেকে বড় প্রশ্নটিই একটি জায়গায়, রামচন্দ্র কেন এই বোধনকে অকাল বলেছিলেন? এর উত্তর মেলে কালিকা পুরাণের ২৬ থেকে ৩৩ নম্বর শ্লোকের মধ্যে। এখানে রাম বলছেন, সূর্যের দক্ষিণায়ন আসলে দেবতাদের জন্য রাত। এই সময়কালে দেবতারা সাধারণত ঘুমিয়ে থাকেন। দেবতাদের পূজা করার জন্য, তাদের ঘুম সবার আগে ভাঙ্গাতে হয়। আর এই ঘুম ভাঙ্গানোর ক্রিয়া-কলাপটি পরিচিত ‘বোধন’ হিসেবে। কৃত্তিবাসের লেখা রামায়ণে রামচন্দ্র নিজে দেবীর পূজা করেছিলেন। কিন্তু, পুরান মতে ঘটনাটা কিছুটা আলাদা। বৃহদ্ধর্ম পুরান বলে, রামচন্দ্রের মঙ্গল চাওয়ার জন্যই নাকি দেবতারা এই পূজার আয়োজন করেছেন।

পুরাণে উল্লেখ আছে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পরে রামচন্দ্রের অমঙ্গল আসার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। সেই সময় রামের যাতে অমঙ্গল না হয়, সেই জন্য স্বর্গের দেবতারা দেবী দুর্গার পূজা করলেন। সময়টা ছিল শরৎকাল। দেবতারা সাধারণত যে সময় ঘুমিয়ে থাকেন, সেই সময় ব্রহ্মা নিজেই যজমানি করে স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। তখন দেবী একজন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার মা দুর্গার বোধন করতে হবে।

দেবতারা স্বর্গ থেকে মর্তে এলেন। মর্তে এসে একটি অত্যন্ত দুর্গম জায়গায় একটি বেল গাছের শাখায় সবুজ পাতার মধ্য দিয়ে তারা আবিষ্কার করলেন একজন পরম সুন্দরী বালিকাকে। তৎক্ষণাৎ ব্রহ্মা বুঝতে পারলেন, এই কন্যাই হল দেবী দুর্গা। ব্রহ্মা শুরু করলেন তার স্তব। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিত হয়ে বালিকা রূপ ত্যাগ করে চন্ডী রূপ ধারণ করলেন দেবী দুর্গা। তখন ব্রহ্মা বললেন, “রাবণ বধ করার জন্য রামচন্দ্রকে অনুরোধ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করলাম। যতদিন না রামচন্দ্র রাবণকে বধ করতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত আমি তোমার পূজা করবো। যেমন করে আমরা আজকে তোমার বোধন করে পুজো করলাম, সেরকম ভাবেই মর্তবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করে যাবে। যতদিন এই সৃষ্টি থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তোমার পূজো হবে।”

ব্রহ্মার মুখে এই কথা শুনে দেবী চন্ডিকা বললেন, ‘সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুকে। অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশটি মুণ্ড ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাবে। তবে আরো একবার সেই মুণ্ড জোড়া লাগবে। নবমীর দিন নিহত হবে রাবণ। দশমীর দিন বিজয়োৎসব করবেন রামচন্দ্র।’ পুরান মতে কাহিনী কিছুটা এরকম ভাবেই গিয়েছিল। অষ্টমীতে সমস্ত ধরনের বিপদ কাটলো। তাই এই দিনটি পরিচিত হলো মহাষ্টমী হিসাবে। নবমীতে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করে সীতাকে লাভ করলেন। তাই এই দিনটি হয়ে উঠল মহানবমী। তারপরেই, সমস্ত পুজো শেষ করে দশমীতে বিজয়োৎসব করলেন রাম।

তবে বলা হয়, এই ব্রহ্মার পুজো থেকেই নাকি আজকের দুর্গাপুজোর সমস্ত মন্ত্র, সমস্ত আচার, সমস্ত দিনক্ষণের সূচনা। তবে হ্যাঁ, যদি রাম না থাকতেন, তাহলে আমরা শরৎকালে কোনোদিনই দুর্গাপুজো দেখতে পেতাম না। তাই বলা যায়, শারদীয়ার এই দুর্গোৎসবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসেন ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার হিসাবে পরিচিত রাম।

More Articles