বাস্তুচ্যুত ৩ হাজার ৫০০টি পরিবার! অসমের মুসলিমদের সঙ্গে কী ঘটছে?
Assam: ৭০ বছর বয়সি এই বাংলাভাষী দু'মাস বাংলাদেশে ছিলেন। পরে বাংলাদেশের কুড়িগাম জেলার একটি বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলেন তিনি।
হাজার হাজার মুসলিম পরিবারকে “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” দাগিয়ে উচ্ছেদের অভিযোগ উঠছে অসমে। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ঘৃণা ও মেরুকরণের রাজনীতি করে একটি গোষ্ঠীকে বিপদের মুখে ফেলছেন, মনে করছে নাগরিক সমাজের বড় অংশই। টার্গেট গ্রুপকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার পাশাপাশি, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, অসমের হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত ২০৪১ সালের মধ্যে সমান সমান হয়ে যাবে। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ হিন্দু এবং ৫০ শতাংশ মুসলিম। তাঁর এই বক্তব্য দেশ জুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও জলঘোলা শুরু হয়েছে। 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' ও মুসলিমসমাজের 'দ্রুত গতিতে বংশবিস্তার' তত্ত্বে ধুয়ো দিতে চাইছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা, মত রাজনৈতিক মহলের। সেইসঙ্গে চাইছেন অন্য বিজেপিশাসিত রাজ্যের মতোই 'পুশব্যাক' রাজনীতিতে চালিয়ে খেলতে।
৩০ জুলাই আউটলুক-এর একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, চলতি বছরের ২৭ মে সীমান্তরক্ষী বাহিনী অসমের বরপেটা জেলার জানিয়া গ্রামের বাসিন্দা করিম আলীকে অসমের দক্ষিণ সালমারা-মানকাচর জেলার সীমান্তবর্তী উত্তর বাংলাদেশের রৌমারি-তে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে পাঠিয়েছে। ৭০ বছর বয়সি এই বাংলাভাষী দু'মাস বাংলাদেশে ছিলেন। পরে বাংলাদেশের কুড়িগাম জেলার একটি বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলেন তিনি। আশ্রয়দাতারাই তাঁকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করেন। পরে অনেক কষ্টে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।
অউটলুকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহে অসম থেকে ৩০০ জনেরও বেশি বাংলাভাষী মুসলিমকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে। অসমে তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে দাবি করা হয়েছিল।
ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, অপরেশন সিঁদুর শুরু হওয়ার পর ১,৮৮০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১১০ জনকে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীরা ভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করে, এদের ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছিল বাংলাদেশে। তাদের অনেকেই আসলে অসমের বাসিন্দা।
আরও পড়ুন- বাঙালির রক্তে স্বাধীন হওয়া ভারতে, আমরাই গণহত্যার দ্বারপ্রান্তে
১২ জুলাই থেকে অসমের গোলপাড়া জেলার পাইকান সংরক্ষিত বন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। অসম পুলিশ ও বন বিভাগ একসঙ্গে এই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কুতুব-উদ্দিন শেখ পুলিশের গুলিতে নিহত হন বলে জানা যায়। একজন গুরুতর আহতও হয়েছেন। আহত ব্যক্তিকে গৌহাটির হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের অভিযোগ, "অবৈধ বাসিন্দাদের" সরিয়ে দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বলে রাখা ভালো, যাঁদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাঁরা সিংহভাগই বাংলাভাষী মুসলিম এবং তাঁরা বহু বছর ধরেই ওই অঞ্চলের বাসিন্দা।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ওই সংরক্ষিত বনভূমির ১৪০ হেক্টর জমি খালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় অন্তত ১০৮০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, “উচ্ছেদ চলতে থাকবে। আমাদের বনভূমি ও ভূমির উপর স্থানীয় অধিকার রক্ষার কাজ চলবে। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়াও চলবে।”
এখন বাস্তুচ্যুত বহু পরিবারই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করেছে। সংবাদমাধ্যম স্ক্রল.ইন-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে অসমের চারটি জেলায় পাঁচটি বড় বড় উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ৩ হাজার ৫০০ পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে। মল্লিকার্জুন খড়্গে ও রাহুল গান্ধীর মতো কংগ্রেস নেতারাও এই নিয়ে মুখ খুলেছেন। প্রশ্ন উঠছে, হিমন্ত বিশ্বশর্মার ৫০-৫০ তত্ত্ব নিয়েও।
২০১১ সালের অসমের আদমশুমারি অনুযায়ী, মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৩৪ শতাংশ, তার মধ্যে ৩১ শতাংশই ‘বহিরাগত’। এই তথ্য সামনে রেখে আগামী পনেরো বছরের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা। তাঁর এই কথা আদৌ যৌক্তিক? বলে রাখা ভালো, ২০১১ সালের জনশুমারিতে নাগরিক সমীক্ষা হয়নি। প্রশ্ন হল, ৩১ শতাংশ বহিরাগতই যে মুসলিম তার তো কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। তাহলে তিনি এ কথা জোর দিয়ে বলছেন কীভাবে? দেশভাগের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে অসমে মানুষজন এসেছেন ঠিকই তবে তাঁদের কত শতাংশ মুসলিম সে বিষয়ে কোনো তথ্য এখনও নেই।
আরও পড়ুন- রোহিঙ্গা সমস্যার মধ্যেই উপ্ত ছিল বাঙালি নিপীড়নের বীজ
অন্যদিকে, ১৯৪৭ সালের আগেও অসমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তখন রাজ্যটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিল। কিন্তু দেশভাগের আগে কত শতাংশ মুসলিম এই দেশে ছিল আর কারা পরবর্তী সময় এসেছে তার কোনো রেকর্ড নেই। তাহলে রাজ্যটির কত শতাংশ বহিরাগত, আর কারা আগে থেকেই এই দেশে ছিলেন তা স্পষ্ট না জানার আগেই কেন এত বড় দাবি করে বসলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী?
গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আউটলুক-কে বলেছেন, ২০২৬ সালের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমিয়া ভোটারদের সমর্থন পেতে, বাঙালি মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। বিশিষ্ট অসমিয়া বুদ্ধিজীবী হীরেন গোহাঁই বলছেন, হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বাংলাভাষী মুসলিমদের উপর আক্রমণ বাড়িয়ে, অসমীয়া মিডিয়ার সাহায্যে অসমীয়া হিন্দু ও আদিবাসীদের মধ্যে বাঙালি মুসলিমদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছেন। যাতে তাঁর প্রতি বৃহত্তর সমর্থন তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বিজেপি বরাবর ঘৃণা ও মেরুকরণের রাজনীতি করে এসেছে। তাঁদের দাবি অসমের এই পরিস্থিতি বিজেপিকে সাহায্য করলেও করতে পারে।
প্রসঙ্গত, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে আগে থেকেই মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তিনি বরাবর দাবি করে এসেছেন, বাঙালি মুসলিমরা “বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী”। ২০২৩ সালের অগাস্টে তিনি বলেন , “আমি পক্ষ নেব। এটাই আমার আদর্শ।” শুধু তাই নয়, মূল্যবৃদ্ধি ও রাজ্যে বন্যার জন্যও মুসলিমদের দায়ী করেছিলেন তিনি।
এ সবের পরও কি হেমন্ত বিশ্ব শর্মা ভোটে জয়ী হবেন, সংখ্যার জোরে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, এই পুশব্যাক থামবে কবে? অপরায়নের শেষ কোথায়?