সম্পর্ক, প্রেম ও স্মৃতির সংকলন, ইন্দ্রাশিস আচার্যের নতুন সিনেমা 'গুড বাই মাউন্টেন'
Goodbye Mountain : আনন্দীর ফিরে যাওয়া। অর্জুনের ভেঙে পড়া শরীর। সব দিকেই যেন একটা বিদায়ের আগের আকাশ। 'গুড বাই মাউন্টেন'-এর সেই আকাশে মেঘ মুখ ভারি করে বসে নেই। হাওয়া মৃদুমন্দ। মন, স্মৃতিশান্তিজল পেয়ে শীতল!
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!
বহু সময় পেরিয়ে এসে, ফেলে-আসা জীবনকে আরেকবার চোখের সামনে দেখতে পেলে কেমন লাগে? সময়ের ব্যবধানে অনেকটাই বদলে যায় মানুষ। সেই পালটে যাওয়া জীবনের ভেতর, আরও একবার দু-জনের দেখা হয় যদি? জীবনানন্দের কবিতার এই ইচ্ছেকেই হয়তো সত্যি করে তুলতে চায় 'গুড বাই মাউন্টেন'-এর অর্জুন। কলকাতা থেকে, বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে কেরলার একটি হিল স্টেশনে নিজের মতো সে একা একা থাকে। সেই একাকিত্বের চারিদিকে পাহাড়। ঝরনা। জঙ্গল। চা বাগান। আর, অফুরন্ত হাওয়া। ছবি যত এগোয়, বোঝা যায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে অর্জুন। হয়তো আর কিছু মাস সময় তার হাতে আছে। ঠিক এখানেই, জীবনানন্দের কবিতাকে পরিচালক নিদারুণভাবে ডেকে আনেন। কীভাবে? বলছি।
আনন্দী, অর্জুনের বিগত প্রেম। সত্য অর্থে, কোনো প্রেম-ই কি বিগত হতে পারে? না পারে না। কেবল বিগত হয় সম্পর্কের পোশাকি নাম। মন, একই থেকে যায়। অর্জুন আনন্দীকে বলেছিল বাইশ দিনের জন্য তার কাছে, এই পাহাড়ের নির্জনতায় এসে থাকতে। বাইশ বছর একসঙ্গে থাকলে কেমন লাগত, তা ওই বাইশ দিনে নিজের জীবনে অনুভব করতে চায় অর্জুন। এ-ই তো ফিরে দেখা, কুড়ি-কুড়ি বছরের পরে দেখা হলে কী হত? তার উত্তর খুঁজতেই যেন শুরু হয় ছবিটি।
আরও পড়ুন-
ঋতুপর্ণর চিত্রাঙ্গদা: ফেলে আসা প্রথম প্রেমের অবিচল চরণধ্বনি
‘গুড বাই মাউন্টেন’-এর কয়েকটি দৃশ্য ও সংলাপ মনে থেকে যাওয়ার মতো। আনন্দী আসার পর অর্জুনকে জিজ্ঞেস করে, ‘কী করে সময় কাটাতে?’ শান্ত হাসি-মুখে অর্জুন বলে, ‘অপেক্ষা করে’। এই অপেক্ষা তো আনন্দী-র জন্যই, সে-কথা আনন্দীর মতোই দর্শকও বুঝতে পেরে যান। অর্জুন ও আনন্দী, দু-জনেই মাঝবয়সি এখন। ছবিতে চারপাশে তাদের ঘুরতে যাওয়ার দৃশ্যগুলির মধ্যে সব সময়ই একটা স্মৃতি-সূত্র জাগিয়ে রেখেছেন পরিচালক। যে পাহাড়ে, অথবা ঝরনার ধারে তারা এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানেই তারা কথা বলেছে ‘অতীত’ নিয়ে। সেই জায়গাটায় আগে যখন তারা এসেছিল, কে কে ছিল তাদের সঙ্গে? কী হয়েছিল? নতুন কোনো মুহূর্ত নয়, বরং একসঙ্গে উদযাপিত সময়ের স্মৃতির দিকে তারা ফিরে গেছে। ‘কুড়ি কুড়ি বছরের পার’ শুধু ভবিষ্যৎ সময়ে দিকে তাকিয়ে থাকাকেই তো বোঝায় না, কুড়ি-বাইশ বছর পুরনো অতীতের দিকে তাকানোকেও নির্দেশ করে। পরিচালক কবিতার এই সুক্ষ্মতাকে অদ্ভুতভাবে ব্যবহার করেছেন ছবিতে। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, ছবিতে অর্জুনের দুরারোগ্য ব্যাধির কথা কিন্তু স্বচ্ছভাবে জানতে পারে না আনন্দী। তাই, সারা ছবি জুড়ে রোগের যন্ত্রণাকে পাশে রেখে, অর্জুনের বাকি ক-দিন আনন্দীর সঙ্গে বেঁচে থাকার প্যাশনকে নিদারুণভাবে দেখতে পাওয়া যায়। ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত এই চরিত্রটিকে এক শান্ত হাসি ও গভীর সহ্যক্ষমতার আবরণে আশ্চর্যভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। উলটো দিকে, ছবি যত এগিয়েছে, আনন্দী চরিত্রটি পরিণত হয়েছে, পালটেছে। এবং পালটে যাওয়া অভিব্যক্তির সঙ্গে আনায়সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

'গুড বাই মাউন্টেন'-এর একটি দৃশ্য
ছবির একটি দৃশ্য বিশেষভাবে মনে জেগে রয়েছে। আনন্দী স্নান করছে আর তার স্নানজল, সাবানের ফেনা, নালি দিয়ে স্নানঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে অর্জুন, সেই স্নানজল, সাবানের ফেনা এক হাতে অল্প তুলে নিচ্ছে। আর আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সেই স্নানজল-মাখা নিজেরই হাতের দিকে। কারণ, এই জল আনন্দীকে স্নান করতে দেখেছে। ওর সারা শরীরকে স্পর্শ করেছে এই স্নানজল! সেই জলকে ছোঁয়া মানে তো আনন্দীকেই স্পর্শ করা! খুবই সামান্য আয়োজনে এই অতুলনীয় দৃশ্যটি রচনা করেছেন পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য!
আরও পড়ুন-
বাংলা সিনেমার উচ্চতা থেকে পতন নিয়ে দু’চার কথা
‘গুড বাই মাউন্টেন’-এর অন্যতম প্রাপ্তি হল রথিজিৎ চরিত্রটি। অভিনয় করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। তিনি এই চরিত্রটিকে দ্বিস্তরী অভিনয় পদ্ধতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সকালের রোদ্দুরের মতো হাসি-খুশি রথিজিৎ রাত্রে অর্জুনের ফাঁকা ঘরে গিয়ে আনন্দী আর অর্জুনের সম্পর্কের কোনো একটা সূত্র খুঁজতে চায়। ড্রয়ারে আনন্দীর রুমাল চিনতে পেরে এক মুহূর্ত রুমালটিকে দেখে তারপরই ছুড়ে ফেলে দেয় ড্রয়ারের মধ্যে। এই দৃশ্যে, অভিনয়ের এক গভীর সুক্ষ্মতাকে আলো-অন্ধকারের মধ্যে নিজের মুখ-ভঙ্গিমায় এক মুহূর্তে ফুটিয়ে তুলেছিলেন অনির্বাণ! কিন্তু তাই বলে সকালে তার হাসি-খুশি রোদ্দুর মুখ পালটে যায়নি। পাহাড়ের ধারে, অর্জুন যখন রথিজিৎ-কে আক্ষেপস্বরে বলে এই জায়গাটায় আনন্দীকে আনা হল না, তখন আবার সেই হাসিমুখ বজায় রাখতে-রাখতেই আচমকা এক কাঠিন্যকে নিজের ভেতর ডেকে এনে রথিজিৎ বলে, তার জন্যও কিছু একটা এক্সক্লিউসিভ থাকুক। অর্থাৎ এইখানে সে-ই নিয়ে আসবে আনন্দীকে, অর্জুন নয়। সম্পর্কের মধ্যে ‘তৃতীয়’জনের যা যা জটিলতা থাকা সম্ভব সবই চরিত্রটির আছে, কিন্তু সেই জটিলতাকে এমন অদ্ভুতভাবে বহন করেছেন অনির্বাণ নিজের অভিনয়ের মধ্যে যে তাকে আর জটিলতা বলে মনে হয় না। এমনকি, পাহাড়ে খাদের মধ্যে অর্জুনকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে রথিজিৎ, এমন একটি দৃশ্যকে দেখিয়েই সরিয়ে নেন পরিচালক। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এ আসলে রথিজিতের মনেরই ইচ্ছাদৃশ্য। সেই রথিজিৎ-ই যখন ফিরে যাওয়ার সময় অর্জুনের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘ভালো থাকবেন’, তখন অনির্বাণের দ্বিস্তরীয় অভিনয়ের উচ্চতার জন্য আমরা সেই ‘ভালো থাকবেন’ কথাটির মধ্যেকার শুভ ইচ্ছাকেও বিশ্বাস করতে যেন বাধ্য হই। সম্পূর্ণ ছবি কতগুলি দৃশ্যনামের অন্তর্গত। যেমন, 'ভালবাসা বৈধ? না অবৈধ?', 'শো মাস্ট গো অন'। ছবিতে, তেমনই রথিজিৎ আসার পর্বটির নাম অনাহুত। অথচ রথি জিৎ চরিত্রটির উপস্থিতি একথা প্রমাণ করে দিল, সে অনাহুত নয়, বরং খুব বেশি করেই প্রয়োজনীয়!

অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য
আরও একটা কথা বলতেই হয়, ছবিতে দেখা যায় এক রাতে শরীরী ঘনিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছিল অর্জুন আর আনন্দী, কিন্তু বাইরের আওয়াজে তা ভেঙে যায়। সেই অর্জুনের বাড়িতেই, তার পাশের ঘরে, রথিজিৎ বারংবার মিলিত হয় আনন্দীর সঙ্গে। আনন্দীর ঘাড়ের মধ্যে নিজের মুখ গুঁজে দেওয়ার মধ্যে একটা আদর ছিল ঠিক কথা, কিন্তু এই আদর আসলে জান্তব আদর। এই ‘জান্তব’ কথাটির মধ্যেই রয়েছে প্রতিশোধ ইচ্ছা। এখানে বিশেষভাবে পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্যকে তারিফ জানাতেই হয়।
আনন্দীর ফিরে যাওয়া। অর্জুনের ভেঙে পড়া শরীর। সব দিকেই যেন একটা বিদায়ের আগের আকাশ। 'গুড বাই মাউন্টেন'-এর সেই আকাশে মেঘ মুখ ভারি করে বসে নেই। হাওয়া মৃদুমন্দ। মন, স্মৃতিশান্তিজল পেয়ে শীতল!