দেশ জুড়ে ‘বাঙালি খেদাও’, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষেত্রেই কি প্রযোজ্য?
Citizenship under suspicion : লক্ষ্য করা উচিত, বাঙালি ছাত্রদের, বাঙালি ডাক্তারদের, বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারদের, বাঙালি শিক্ষকদের ওপর কিংবা অন্যান্য জীবিকার সঙ্গে সংযুক্ত বাঙালিদের ওপর কিন্তু এই আক্রমণ ঘটছে না।
সারা দেশে বাঙালির প্রতি একটা ‘অপর’ মনোভাব সব সময়ই ছিল। শুধু বাঙালিদের বাঙালিদের প্রতিই নয়, তেলুগুদের প্রতিও ছিল। তবে বাঙালির প্রতি ‘অপর’ মানে বাঙালিরা নিকৃষ্ট, বাঙালিরা খারাপ, এই সমীকরণটা আমি মেনে নিতে পারছি না। আমার যতটুকু জ্ঞানবুদ্ধি, আমি এই বিষয়টিকে 'বাঙালি খেদাও' হিসেবে দেখছিই না। যদিও আসামে এই বাঙালি খেদাও বিষয়টি বেশ ব্যাপক। সেখানে শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালিদের সম্পর্কে অস্বস্তি ও বৈষম্য ভালোভাবেই লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ভারতের অন্যান্য জায়গায় বাঙালি মাত্রই আক্রমণের শিকার হচ্ছে, এমনটা বললে হয়তো ভুল বলা হবে। হ্যাঁ, কোথাও-কোথাও বাঙালি বিদ্বেষ ও সে-সম্পর্কিত ঘটনার কথা জানতে পারা গেছে। কিন্তু সারা দেশের নিরিখে, সব ক-টি রাজ্যের প্রেক্ষিতে ‘বাঙালি খেদাও’ কথাটি যথাযথ নয়।

গুরুগ্রাম, গুজরাট
আসলে, ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আমরা সম্পূর্ণ বাঙালি জাতিকেই নির্দেশ করতে চাইছি। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন-ভিন্ন রাজ্যগুলিতে প্রধানত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদেরই বেশি পরিমাণে আক্রমণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। লক্ষ্য করা উচিত, বাঙালি ছাত্রদের, বাঙালি ডাক্তারদের, বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারদের, বাঙালি শিক্ষকদের ওপর কিংবা অন্যান্য জীবিকার সঙ্গে সংযুক্ত বাঙালিদের ওপর কিন্তু এই আক্রমণ ঘটছে না। আক্রমণ ঘটছে প্রধানত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ এই বিষয়টির একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি চরিত্র আছে। এই শ্রেণি চরিত্র থাকার অনেকগুলি কারণ আছে বলে আমার মনে হয়। তার মধ্যে একটা কারণ হল, ভিন্ন রাজ্যের স্থানীয় শ্রমিকেরা বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ভয় পায়, তারা মনে করে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য তাদের কাজ চলে যাবে। তাদের জীবিকাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরও পড়ুন-
ক্ষুদ্র হিন্দুত্ব ও ক্ষুদ্র সেকুলারের বিতর্কে বিবেকানন্দকে ফেলা যাবে না
‘বাঙালি খেদাও’-র ক্ষেত্রে পরিযায়ী শ্রমিকদের যে আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে তার আরেকটি কারণ হল, সারা ভারতে যে ‘হিন্দুত্ববাদ’ জেগে উঠেছে এবং ক্রমাগত হিন্দি ভাষাকে প্রধান ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে, এর একটা প্রভাব বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপরেও পড়েছে। এখানে দুটি বিষয় বলা দরকার। বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলা ভাষার জন্য যেমন আক্রমণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তেমনই ভারতে বসবাসকারী বাঙালি মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ বলে ধরে নিয়ে তাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। দেশে হিন্দুত্ববাদের বাড়তে-থাকা প্রভাব এর একটা অন্যতম কারণ।

জে জে কলোনি দিল্লি
পেটের খিদের জন্য কেউ নিজের রাজ্য ছেড়ে দেশের যেখানে খুশি যেতেই পারে। সে-অধিকার তাদের আছে। বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরাও সেভাবেই অন্য রাজ্যে যায়। কিন্তু ভাববার মতো বিষয় হল, সারা দেশে ছড়িয়ে-থাকা বিভিন্ন জীবিকার বাঙালিদের মধ্যে কেন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপরেই প্রধানত অত্যাচার চলছে! এর একটা সহজ উত্তর হল, পরিযায়ী শ্রমিকরা দুর্বল এবং তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাদের অনায়াসেই তাই আক্রমণ করা যায়। এবং যেহেতু বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই মুসলমান তাই বাংলাদেশি সন্দেহে তাদের আরও বেশি পরিমাণে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। আসলে সারা দেশে এখন মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, এমন একটা আবহ তৈরি হয়েছে। এই আবহ-ই, বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের অত্যাচারের কারণগুলির সঙ্গে জড়িত।
আরও পড়ুন-
কোনও পক্ষকে রেয়াত করেননি, হিন্দুত্বকে দূরে ঠেলে কেন বৌদ্ধধর্ম বেছেছিলেন আম্বেদকর?
আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের উচিত দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা তৈরি করা যে এ-দেশের মুসলমান বাঙালিরাও ভারতেরই নাগরিক। সংবিধান অনুযায়ী তারা দেশের মধ্যে যে-কোনো রাজ্যে গিয়ে নিজের রুজি-রুটির ব্যবস্থা করতে পারে। এ তাদের রাষ্ট্রগত অধিকার, এ-কথা যেন কেউ ভুলে না যাই।