বাঙালির রক্তে স্বাধীন হওয়া ভারতে, আমরাই গণহত্যার দ্বারপ্রান্তে
West Bengal : ১৯৭১-এর পরে সারা বিশ্বে মুসলমান বাঙালির উপর ঘটা সবচেয়ে বড় গণহত্যাও ঘটেছে এই ভারতবর্ষে। এবং সেটা কিন্তু হিন্দু বাঙালির দ্বারা নয়, সেটাও ঘটেছে অন্য জাতির দ্বারা।
ভারতে বাঙালির আত্মপরিচয়, বাঙালির মাতৃভাষার পরিচয় এখন হয়ে গেছে একটি অপরাধীর পরিচয়। এবং এই ঘটনাটি কিন্তু একদিনে ঘটেনি। দীর্ঘকাল ধরে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীরা বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে চরম ঘৃণার চাষ করেছে। হুগলির দেবাশিষ দাস, মুর্শিদাবাদের সুজন সরকার, কোচবিহারের আরতি ঘোষ, পূর্ব বর্ধমানের পলাশ অধিকারী, বীরভূমের গঙ্গাধর প্রামাণিক থেকে শুরু করে অজস্র মতুয়া সম্প্রদায়ের বাঙালি, অজস্র এদেশিয় মুসলমান বাঙালি, তাঁদের হেনস্থার কোনো শেষ নেই।
গণহত্যার দিকে বাঙালি জাতিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে— এই কথা শুনে অনেকে প্রথমে একটু চকিত হয়ে যাবেন। 'গণহত্যা'? গণহত্যা বলতে তো আমরা ১৯১৯-এ যে তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে খুন করেছিল পাকিস্তানি এবং জামাতি রাজাকাররা, সেটা বুঝি। কিংবা 'গণহত্যা' বলতে আমরা বুঝি নাৎসিরা ইহুদিদের যেভাবে খুন করেছিল সেই ঘটনাকে। কিন্তু আমরা গণহত্যা বলতে ভুলে যাই যে ১৯৪৩-এ এই বাংলায় বড়বাজার, কালোবাজারি এবং মজুতদারি করে ৬০ লক্ষ বাঙালিকে খুন করা হয়েছিল। আমরা গণহত্যা বলতে ভুলে যাই যে ১৯৭১-এর পরে সারা বিশ্বে সবচেয়ে বৃহৎ হিন্দু বাঙালির উপর যে গণহত্যা ঘটেছে। এই ঘটনা ভারতবর্ষেই ঘটেছে এবং সেটা ঘটেছে মুসলমান বাঙালির দ্বারা নয়, অন্য জাতির হিন্দুদের দ্বারা। বাঙালি জাতির ‘শিলা পাথর’, ‘গোঁয়েশ্বর’— এই গণহত্যাগুলির কথা জানা দরকার। আবার ১৯৭১-এর পরে সারা বিশ্বে মুসলমান বাঙালির উপর ঘটা সবচেয়ে বড় গণহত্যাও ঘটেছে এই ভারতবর্ষে। এবং সেটা কিন্তু হিন্দু বাঙালির দ্বারা নয়, সেটাও ঘটেছে অন্য জাতির দ্বারা।

মহারাষ্ট্রে পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবার
আজকের দিনে, ২০২৫ সালে আমরা আসলে গণহত্যার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছি এবং এটা কীসের ভিত্তিতে বলছি? গণহত্যার নিরীক্ষণ করা বিশ্ববরেণ্য সংস্থার সভাপতি টেন স্টেজেস অফ জেনোসাইড গণহত্যার ১০টি ধাপের একটি মাপকাঠি তৈরি করেছেন। এই মাপকাঠির মাধ্যমে গণহত্যার দিকে একটা জাতিকে কীভাবে ঠেলে দেওয়া হয়, তা চরিত্রায়ন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। আমি যদি ধাপগুলো বলি, আপনারা নিজেরাই মিলিয়ে নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে, ১০টির মধ্যে প্রায় ৭টি ধাপ প্রযোজ্য।
আরও পড়ুন- বাঙালি অস্মিতাকে চুম্বক করেই ছাব্বিশের লড়াই, একুশের সভায় বুঝিয়ে দিলেন মমতা
প্রথম স্টেজ হচ্ছে, ক্লাসিফিকেশন; পিপল আর ডিভাইডেড ইনটু দেম অ্যান্ড আস— এটা বাঙালির ক্ষেত্রে প্রচন্ডভাবে সত্য। কারণ বাঙালি মানেই ফরেনার, বাংলাদেশি ইত্যাদি। দ্বিতীয় হচ্ছে, সিম্বোলাইজেশন; অর্থাৎ কোনো একটা ভাবে তার চরিত্রায়ন চিহ্নিতকরণ। যেমন 'মছলিখোর ', 'বাঙ্গালান ' (বাঙালি নারীদের বলা হয়) — হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী পুরুষতন্ত্রের যৌন আকাঙ্ক্ষা মেটানোর বস্তু হিসেবে যখন দেখানো হয়। যেকোনো বিজিত দাস জাতির ক্ষেত্রে নারীদের এইভাবেই চরিত্রায়ন করে সাম্রাজ্যবাদীরা। এমনকি এই কাংলু— এখন যেগুলো পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকেই বলা হচ্ছে, এটা তো আসলে আমাদের যে নিজস্ব জীবনঅভ্যাস, সেগুলোকে বিজাতীয় বলে যে চরিত্রায়ন করা।আমাদের ধর্মাচরণ নিয়ে যা বলা হচ্ছে সেটাও চিন্তার। দিল্লির চিত্তরঞ্জন কলোনির যে কালি মন্দির, বাঙালী মৎস্য-বিক্রেতারা যে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটাকে বলা হচ্ছে বাঙালীর কালীপুজো, বলা হচ্ছে অশুদ্ধ, অপবিত্র, অ-শাস্ত্রীয় ইত্যাদি।
তৃতীয় ধাপ হচ্ছে, ডিসক্রিমিনেশন। ডিসক্রিমিনেশন মানে ফুল সিভিল রাইটস। পূর্ণ যে নাগরিক অধিকার, সেটা। এবং ডিনায়াল অফ ভোটিং রাইটস। আমরা করোনার সময় দেখতে পেয়েছিলাম পরিযায়ী বাঙালিদের হিন্দিভাষী রাজ্যে, করোনার টিকাটিও দেওয়া হয়নি। এগুলো কিন্তু মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। এই সব কিছু থেকে শুরু করে, এই মুহূর্তে যে ডিনায়াল অফ ভোটিং রাইটস, ভোটাধিকার সংকুচিত করে দেওয়া— এই যে, বাংলাদেশি বলা, এনআরসির মাধ্যমে, ১২ লক্ষ হিন্দু বাঙালি এবং পাঁচ লক্ষ মুসলমান বাঙালিকে বেনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়া— এগুলির কথা বিশেষভাবে ভাবা প্রয়োজন।অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসংঘের কার্ড দিয়েছে বিজেপি এমপি শান্তনু ঠাকুর। সেই কার্ড দেখানোর পরেও, তাদেরকে বেনাগরিক হিসেবে প্রতিপন্ন হতে হয়েছে। অর্থাৎ, তুমি হিন্দু হতে পারো, বিজেপি হতে পারো, ভারতীয় হতে পারো, যা কিছু হতে পারো, মতুয়া মহাসংঘের কার্ডও থাকতে পারে, পয়সা দিয়ে পাওয়া (পয়সা নিয়েছে শান্তনু ঠাকুর)। কিন্তু, তোমার মাতৃভাষা যদি বাংলা হয়, তাহলে তোমার প্যান্ট খুলে, তোমাকে বিদেশী কিনা চেক করবে না, তুমি মুখ খুলে বাংলা বেরুলেই, তোমাকে বিদেশী হিসেবে দাগানো হবে।
আরও পড়ুন-বাঙালি অস্মিতাকে চুম্বক করেই ছাব্বিশের লড়াই, একুশের সভায় বুঝিয়ে দিলেন মমতা
চতুর্থ ধাপ হচ্ছে, ডিহিউমাইনাইজেশন। যখন একটি জাতিগোষ্ঠীকে একদম এবং তার এলাকাকেও জন্তু, কীট পতঙ্গ, বর্জ্য পদার্থ প্রভৃতিভাবে চরিত্রায়ন করা হয়। যেরকম অমিত শাহ যখন উইপোকা বলেছিলেন। বা যখন পশ্চিমবঙ্গ, ওয়েস্ট বেঙ্গলকে ওয়েস্ট (W.A.S.T.E.) অর্থাৎ জঞ্জাল, ওয়েস্ট বেঙ্গল বলা হয়।
গুরুগ্রাম, গুজরাট
পঞ্চম হচ্ছে, অর্গানাইজেশন। অর্থাৎ, সংগঠিত হওয়া এবং সংগঠিত করা, বাঙালির বিরুদ্ধে ঘৃণা বৃদ্ধির জন্য, ঘৃণামূলক অ্যাকশন নেবার জন্য। যেরকম আমি দু’ক্ষেত্রেই বলছি, এরকম ভার্চুয়াল দুনিয়ায়, বাঙালীর বিরুদ্ধে, সে বিজেপির আইটি সেল হোক বা বাঙালী বিদ্বেষী নানা হিন্দিভাষী গোষ্ঠীর নিজস্ব গ্রুপিং হোক, বিশেষত অনেকগুলো এরকম ইউপি, বিহার, রাজস্থান এবং দিল্লি থেকে অপারেট করা হয়। তারা টুইটার, ফেসবুক, ভয়ঙ্কর সব জিনিস চালায়। এমনকি গণহত্যার স্পষ্ট হিংসাও প্রকাশ করা হয়। যেরকম যখন আমফান এসেছিল, তখন একখানা মিম বেরিয়েছিল একটা হিন্দিভাষী গ্রুপ থেকে, যে, আমফানটা এসে পুরো পশ্চিমবঙ্গটাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আমফানের পরে ম্যাপে পশ্চিমবঙ্গ নেই। মিমটির অর্থ এরকম হলে কত ভালো হতো আর কি!
ষষ্ট ধাপ হল পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। সেটা আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন, অমিত শাহ থেকে শুরু করে, নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে, হিন্দি ভাষার মিডিয়া থেকে, সবকিছুই সারাক্ষণ বাঙালিদের বিরুদ্ধে এরকম জিনিস করে যাচ্ছে। আমার মনে পড়ছে, দিল্লিতে, এক সময়ে বাড়িতে ঢুকে, একজন সাংবাদিক ওখানে বলছে, 'আজতক চ্যানেল ম্যায় জো বাংলা বোলতা হ্যায়, উও রোহিঙ্গা হ্যায়, রোহিঙ্গা হ্যায়'। কথাটা ভেবে দেখুন, রোহিঙ্গারা কিন্তু আদৌ বাংলা ভাষা বলে না, রোহিঙ্গা একটি আলাদা ভাষা। কিন্তু, এই যে ঘৃণার চর্চা সেটা সারা দেশ জুড়ে চলছে। কেবল ভাষা ও জাতির পরিচয়ের ভিত্তিতে অত্যচার চলছে। এর পরের স্তরগুলিতে রয়েছে ডিটেনশন ক্যাম্প, তারপর এক্সটারমিনেশন। এখন শুধু গণহারে হত্যা করাটা বাকি আছে। এবং এরপরের ধাপটাই হল ডিনায়াল বা অস্বীকার। যখন গণহত্যার পর সেই গণহত্যাকে অস্বীকার করা হবে। এই অব্দি এখনও আমরা পৌঁছয়নি। তবে এই দশম ধাপ বেশি দূর নয়। এই হল টেন স্টেজেস অফ জেনোসাইড। এখন বাঙালিদের ভাবা উচিত, তাঁদের রক্তে স্বাধীন হওয়া এই দেশে তাঁদের অবস্থা আজ কতটা কোণঠাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনও যদি না ভাবি তাহলে বাঙালির প্রতি হেনস্থা, তাচ্ছিল্য, অপমান শীঘ্রই গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।