বিহারের 'বিশেষ নিবিড় সংশোধনী'! কাদের বাদ দিতে এই প্রক্রিয়া?
Bihar Election : মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে অনলাইন এবং অফলাইন, দু’ভাবেই এই সংক্রান্ত বহু আবেদন জমাও পড়ে। তা সত্ত্বেও দেখা গিয়েছে পরবর্তী নির্বাচনে কিংবা তার পরের কোনো নির্বাচনে ওই নাম থেকেই গিয়েছে।
গত ২৪ জুন নির্বাচন কমিশন বিহারে 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন'-এর কাজ শুরুর কথা ঘোষণা করার পর থেকেই রাজনৈতিক দল-সহ বেশ কিছু সংগঠন অভিযোগ তুলেছে, এই প্রক্রিয়ায় বিহারের বহু মানুষ বাদ পড়বেন। অনেকেই আবার এই প্রক্রিয়াকে ঘুরপথে অসমের নাগরিক পঞ্জীকরণের সাথে তুলনা করেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলাও করেছেন। সেই মামলার শুনানিতে আদালত জানিয়েছে, যদি দেখা যায় গণহারে মানুষের নাম বাদ পড়ছে, তাহলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করবে। সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশন যেন তাদের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি এও জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো যেন বেসরকারি সংস্থার ধাঁচে কাজ করে এবং কমিশনকে কোনো ব্যক্তির নাম বাদ গেলে সহায়তা করে। বলা হয়েছে, অগামী ১২-১৩ অগস্ট আবার এই মামলার শুনানি হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় যে বহু পরিযায়ী বা প্রবাসী শ্রমিক মানুষ বাদ পড়তে চলেছেন, সেই আশঙ্কা থাকছেই।
এই আশঙ্কার মূল কারণ, অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ করা কিছু বিজ্ঞপ্তি। এই নিবিড় সংশোধনের সময়সীমা যখন প্রায় শেষ, তখন সংবাদ সংস্থাগুলোর জন্য তারা একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, এই এক মাসের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে ২১.৬ লক্ষ মৃত ভোটারের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এতে আরও জানানো হয় ৩১.৫ লক্ষ এমনও ভোটার রয়েছেন যাঁরা পাকাপাকিভাবে অন্য কোথাও বসবাস করছেন। বিজ্ঞপ্তিতে তারা মেনে নিয়েছে, ১ লক্ষ ভোটারদের কাছে বুথ স্তরের আধিকারিকেরা পৌঁছতেই পারেননি। এ ছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে, ৭ লক্ষ ভোটারের নাম অন্তত দুই বা তার বেশী জায়গায় আছে।
নির্বাচন কমিশন আগামী ১ অগস্ট যে প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করতে চলেছে তাতে সর্বমোট প্রায় ৬১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যেতে চলেছে। এই তথ্য সামনে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে দাবি করা হয়েছে, কারা বাদ পড়ছেন তা শুধু জানালেই হবে না, খসড়া তালিকায় যাঁদের নাম নেই, বিধানসভা অনুযায়ী তা প্রকাশ করতে হবে। এই দাবীর একটাই উদ্দেশ্য- যাঁদের নাম বাদ যাচ্ছে, তাঁরা যেন জানতে পারেন তাঁদের কাছে নির্বাচন কমিশন পৌঁছতে পারেনি বলেই তাঁদের নাম বাদের তালিকায় আছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই আবার বলছেন, এই নিবিড় সংশোধনী অত্যন্ত জরুরি একটি প্রক্রিয়া। এর মধ্যে দিয়েই সঠিক ভোটার তালিকা তৈরী করা সম্ভব। এর ফলেই স্বচ্ছ একটি নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে কমিশন। কিন্তু বিষয়টি কি এতটাই সরলরৈখিক? কেন বিরোধী দলগুলো এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছেন? কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী যে ৬১ লক্ষ মানুষের নাম প্রাথমিক খসড়া তালিকা থেকে বাদ যেতে চলেছে, তাঁরা মূলত কারা? তাঁদের কতজন দলিত, কতজন মহিলা, কতজন মুসলমান এই তথ্যও কিন্তু জানানো হয়নি।
আরও পড়ুন- কেন বিহারের ভোটার তালিকায় ‘নিবিড় সংশোধন’ নিয়ে বিতর্ক?
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে যোগেন্দ্র যাদব-সহ অন্যান্য বেশ কিছু সমাজকর্মী বিহারের রাজধানী পাটনায় একটি জনশুনানির আয়োজন করেন। তাতে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন বিচারপতি, বহু সমাজকর্মী এবং বিহারের গ্রামগঞ্জ থেকে আসা বেশ কিছু মানুষজন। তাঁদের কথার মধ্যে দিয়েই প্রকাশ হয়েছে, এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে মূলত হেনস্থার স্বীকার হচ্ছেন গরিব মহিলারা। ঠিক অসমে নাগরিকপঞ্জীকরণের তালিকা তৈরীর সময় যেমন দেখা গিয়েছিল, বিভিন্ন মুসলমান মহিলাদের বিয়ের আগের এবং পরের পদবী বদলের জন্য তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল ঠিক তেমনি ঘটেছে বিহারেও। তবে অসমে ৬ কোটি মানুষের নাগরিকপঞ্জীতে নাম তুলতে সময়ে লেগেছিল ৩ বছর। তাহলে বিহারে ৮ কোটি ভোটারের নাম এক মাসে নতুন করে তোলা কীভাবে সম্ভব? এই প্রশ্নের মতো আরও বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।
কেন এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর বিরোধিতা করা জরুরি, সেই সংক্রান্ত বেশ কিছু আলোচনাও হয়েছে। প্রথমত প্রতি রাজ্যে এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ নিয়মিতই হয়। বিহারও তার ব্যতিক্রম নয়। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিৎ, এই বিষয়টি সবার জানা। শহরাঞ্চলে এই সংক্রান্ত সচেতনতাও আছে। মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে অনলাইন এবং অফলাইন, দু’ভাবেই এই সংক্রান্ত বহু আবেদন জমাও পড়ে। তা সত্ত্বেও দেখা গিয়েছে পরবর্তী নির্বাচনে কিংবা তার পরের কোনো নির্বাচনে ওই নাম থেকেই গিয়েছে। বাংলায় এই সংক্রান্ত বহু অভিযোগ শোনা গিয়েছে।
কোনো আবেদনের ভিত্তিতে কোনো নাম বাদ দেওয়ার কাজ আসলে কমিশনের। তারা দায়িত্ত্ব নিয়ে এই কাজ না করলে, তার দায় তো মৃত ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নয়। হ্যাঁ, হতে পারে গ্রামে গঞ্জে সচেতনভাবে কমিশনকে এই তথ্য জানানো হয় না , কিন্তু তা সত্ত্বেও কমিশনের উচিৎ মৃত মানুষদের নিবন্ধীকরণ তথ্য থেকে মিলিয়ে প্রতি বছর এই তালিকা তৈরী করা। কিন্তু তা না করে, একেবারে নতুন করে নাম তোলা, আগের সমস্ত তালিকা মুছে ফেলা তো সমাধান হতে পারে না।
গত ৭৫ বছরের ভারতের ইতিহাসে আজ অবধি এই প্রক্রিয়ায় কাজ করা হয়নি। এমনকি ২০০৩ সালের যে তালিকাকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে, সেই ২০০৩ সালেও কিন্তু এই পদ্ধতি মেনে কাজ করা হয়নি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আজ অবধি যদি ১৮ বছর বয়সী কোনো মানুষ তাঁর নাম ভোটার তালিকায় তুলতে চাইতেন, তা হলে তাঁকে ফর্ম নম্বর ৬ জমা করতে হতো। অন্যদের করতে হতো না। এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে প্রতিটি ভোটারকে ঐ ফর্ম নম্বর ৬ জমা করতে হচ্ছে নাম তোলার জন্য। এই প্রক্রিয়াও সংবিধানের পরিপন্থী। সংবিধানের ১০ নম্বর ধারা বলে, কোনো ব্যক্তির নাম যদি ভোটার তালিকায় একবার ওঠে, তাঁকে যদি সেই তালিকা থেকে বাদ দিতে হয়, তাহলে তাঁকে নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করতে হবে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে তদন্ত হয়। ফরেনার্স ট্রাইবুনালে তাঁকে সশরীরে হাজিরা দিতে হয় এবং আরও অনেক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর সমাধান হয়।
অন্যদিকে, এতদিন অবধি ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হতো না। এইবার প্রথম প্রতি ভোটারকে বলা হচ্ছে- আপনি নাগরিক কি না, তার প্রমাণ দিন, তবেই আপনার নাম ভোটার তালিকায় উঠবে। এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে আদালত প্রশ্ন করেছিল, তাঁদের কি নাগরিকত্ব পরীক্ষা করার অধিকার আছে? তার উত্তরে হলফনামায় সংবিধানের ৩২৪ এবং ৩২৬ নম্বর ধারা উল্লেখ করে তারা জানিয়েছে, তাদের সেই অধিকার আছে। অথচ এই ধারা দু'টি-তে কিন্তু কোথাও এই কথা লেখা নেই। তারা ওই দু'টি ধারার উল্লেখ করলেও ১০ নম্বর ধারার কথা কিন্তু হলফনামায় লিখে জানানো হয়নি। ওখানে বলা হয়েছে যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকলে কিন্তু তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই।
আরও পড়ুন- প্রশান্ত কিশোরের নতুন রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস করে ঠকবেন বিহারবাসীরা?
বিহারের এই সংশোধনীর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা উল্লেখ করা উচিত। বিহারে গত ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করাটা সেইজন্যেই জরুরি। ৮ শতাংশ আসন অর্থাৎ ২৪৩ টির মধ্যে প্রায় ২০টি আসনে জেতা-হারার ফারাক ছিল ভোটের ১ শতাংশ। ১২ শতাংশ আসন অর্থাৎ প্রায় ৩০টি আসনের জেতা-হারার ফারাক ছিল ভোটের ১.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের কাছে যেমন এই হিসেব আছে, বিজেপির কাছেও এই হিসেব আছে। এর জন্যেই বিরোধী দলগুলি অভিযোগ করছে, নির্বাচন কমিশন বিজেপিকে সামনের নির্বাচনে সুবিধা করে দেওয়ার জন্যেই বিপুল সংখ্যক মানুষকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
মূলত কাদের নাম খসড়া থেকে বাদ যাবে, এই নিয়ে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে করা সাংবাদিক সম্মেলন থেকে কিছুটা আন্দাজ পাওয়া গিয়েছে। মূলত পরিযায়ী শ্রমিক যাঁরা একটু সচ্ছল জীবনের আশায়, কাজের খোঁজে বিহার থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান, তাঁদের নামই বাদ যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, প্রায় ৭৪ লক্ষ মানুষ বিহার থেকে বাংলা, দিল্লি, মুম্বাই, পুনে এবং চেন্নাইতে কাজ করতে যেতেন। তখন জানা গিয়েছিল এঁদের মধ্যে ৩০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ বলেছিলেন, যে বিহারে কাজ না
থাকার কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে এই কাজের খোঁজে বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এই সংখ্যা যে ২০২৫ সালে আরও বেড়েছে তা বলাই বাহুল্য। নির্বাচন কমিশন তাঁদের যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, তার মধ্যে বলা আছে ৩১.৫ লক্ষ ভোটার পাকাপাকিভাবে অন্য কোথাও বসবাস করছেন, তাঁরা যে মূলত এই পরিযায়ী শ্রমিক তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
একদিকে অনুপ্রবেশের দাবি তোলা হচ্ছে, বিহারে নাকি রোহিঙ্গা, নেপালি এবং বাংলাদেশীতে ভরে গেছে। অন্যদিকে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়েছে। অথচ নির্বাচন কমিশন কিন্তু একজনও বিদেশীকে চিহ্নিত করে বলতে পারেনি যে ২০২৪ সালের শেষ লোকসভা ভোটের তালিকায় বিদেশী ছিল। উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার, বিজেপির বিরুদ্ধে যে কাজের দাবীতে বিহার জুড়ে বিরোধী আওয়াজ উঠছে, সেটি কারা তুলছে, বিজেপি তা বুঝতে পারছে। মূলত বিহারের কর্মক্ষম মানুষ অর্থাৎ যুবক যুবতীদের দিক থেকে কাজের দাবীতে আন্দোলন দেখেই বিজেপি বুঝতে পেরেছে এই অংশের মানুষের ভোট তাঁদের বিপক্ষে যেতে পারে, তাই তাঁদেরকেই যদি বাদ দেওয়া যায়, সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। এর জন্যেই ২০০৩ সালের পরবর্তী সমস্ত ভোটারকে তাঁদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে।
প্রশ্ন হল, কিন্তু এত কিছুর পরেও কি বিহারে বিজেপি জোট আবার ক্ষমতায় আসতে পারবে? এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে যে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হচ্ছে, তা বিহারের যে কোনো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছেন। তাঁরা যদি একবার মনস্থির করে ফেলেন, যে তাঁরা বিজেপি জোটকে পরাজিত করবেন, তাহলে কোনো নির্বাচন কমিশন কিন্তু তা আটকাতে পারবে না। আদালতে যা হবে তা হবে, কিন্তু গণতন্ত্রে মানুষের শক্তিকে যারাই হেয় করবে, তাদের জন্য অনেক আশ্চর্য অপেক্ষা করে থাকবে।