স্বদেশিদের তৈরি এই মেলায় আসতেন বিপিনচন্দ্র পাল, সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ
Swadeshi Mela : আজও গোস্বামী ঘাটের কাছে প্রবর্তক আশ্রমের মাঠে একটি বৈষ্ণব মেলা খুব সাধারনভাবে হয়। নাম, খুন্তির মেলা। অগ্রহায়ণ মাসে মেলাটি হয়।
গঙ্গার পাড়ে চন্দননগর একসময় সশস্ত্র বিপ্লবীদের আঁতুড়ঘর ছিল। এই চন্দননগর ফরাসিদের শহর বলেই আরেক নাম ফরাসডাঙ্গা। এ অঞ্চল ছিল বিপ্লবীদের সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল। সমাজসেবক ও বিপ্লবী মতিলাল রায় এখানেই নির্মাণ করেছিলেন প্রবর্তক আশ্রম ও নবরত্ন শৈলীর শ্রীমন্দির। বর্তমানে যা দরিদ্র শিশুদের আশ্রম। তবে শুরুটা ছিল অন্যরকম। মতিলাল রায় বিপ্লবের মশাল স্বদেশিদের বুকে জ্বালিয়ে রাখতেন। নিজের বাসস্থান বিপ্লবীদের সুরক্ষার জন্য খুলে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষ, কানাইলাল দত্ত, উল্লাসকর দত্ত, বাঘাযতীন, রাসবিহারীর মতো বিপ্লবীদের চারণভূমি প্রবর্তক।
আরও পড়ুন-
বাংলায় আজও বসে শতাব্দী প্রাচীন কুম্ভমেলা।। কেমন তার আকার-প্রকার?
শ্রীঅরবিন্দ নিজে বলেছিলেন যদি তাকে জানতে হয় তাহলে আগে প্রবর্তককে জানতে হবে। সালটা ছিল ১৯১০, অরবিন্দ ঘোষ গঙ্গাপাড়ে চন্দননগরে আত্মগোপন করেন। তখন কলকাতায় তিনি আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত। সেই সময় এই প্রবর্তকে তিনি কিছুদিন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-ও এই সংঘে এসেছিলেন। ২১শে বৈশাখ ১৩৩৪, কবিগুরু প্রবর্তকে এক ভাষণে বলেছিলেন,
সত্যের উপর যার শ্রদ্ধা আছে, সে সীমার মধ্যে অসীমকে দেখতে পায়, যে মন্দিরের সত্যের উপর প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, নিত্যকালের জন্য শাশ্বত কাল থেকে শাশ্বত কাল পর্যন্ত যাঁর বিধান, তাঁর আশীর্বাদে এ ধর্মনিকেতনের সাধনা সার্থক হউক, একান্ত মনে কামনা করি, অভিনন্দন করি।
সংঘের আদর্শ ছিল ঐক্য, এবং সেই ঐক্যই আসল সাধনা। ১৯২৩ সালে নেতাজির উপস্থিতিতে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন আশ্রমে শুরু হয় 'স্বদেশি মেলা'। বিপিনচন্দ্র পালের সভাপতিত্বে ও নেতাজির সান্নিধ্যতে নবরত্ন শৈলীর শ্রীমন্দিরটি জাতীয় মন্দিরে প্রতিষ্ঠা পায়। মেলার লক্ষ্য কি ছিল জানেন? মেলার লক্ষ্য ছিল স্বদেশি পণ্যের বেচা-কেনার দ্বারা দেশীয় শিল্পের প্রসার ঘটানো। বিদেশি পণ্য বর্জন। স্বদেশি পণ্য ব্যবহারে সমাজকে উৎসাহিত করা। ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়াই ছিল মেলার প্রধান উদ্দেশ্য। এর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল সবার মধ্যে দেশপ্রেমকে জাগিয়ে তোলার তোলবার চেষ্টাও। স্বদেশি মেলা একসঙ্গে বহু মানুষকে একত্রিত করত। চরকায় কাটা সুতোর তৈরি কাপড় বিক্রি হত। তখন খাদি কাপড়ের খুবই জনপ্রিয়তা ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মানুষ আসতেন। দেশীয় পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ঐক্য স্থাপনে সূচনা হয়েছিল হিন্দুমেলা। প্রবর্তক আশ্রমের মেলার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি। নানা ধরনের দেশীয় সংস্কৃতি মেলার মাধ্যমে সামনে উঠে আসত।

প্রবর্তক সঙ্ঘ
আজও গোস্বামী ঘাটের কাছে প্রবর্তক আশ্রমের মাঠে একটি বৈষ্ণব মেলা খুব সাধারনভাবে হয়। নাম, খুন্তির মেলা। অগ্রহায়ণ মাসে মেলাটি হয়। রাধা-কৃষ্ণের পুজো হয়। কিন্তু এখন আর তাকে মেলা বলে বোঝা মুশকিল। কয়েকটি মাত্র দোকান মেলা উপলক্ষে বসে। কিন্তু এখনও এ অঞ্চলের বয়স্ক মানুষদের মুখে-মুখে ঘোরে খুন্তির মেলা ও প্রবর্তকে স্বদেশি মেলার কথা। মন্ডা মিঠাই, হরেক রকমের দেশীয় জিনিস, পুতুল নাচ, যাত্রাপালা, রঙিন কাপড়, পাটের ব্যাগ, হস্তশিল্প, হাতপাখা, তালপাতার বাঁশি ইত্যাদি সবই আজ স্মৃতি। খুন্তির মেলাতেও সেই আড়ম্বর আর নেই।
আরও পড়ুন-
মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে
অর্থ ও উদ্যোগের অভাবে অনেকদিন আগেই বন্ধ হয়েছে প্রবর্তকের স্বদেশী মেলা। বন্ধ কেন হল প্রবর্তকে স্বদেশি মেলাটি? সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোক্তাদের অভাব। ফলে গুরুত্ব হারিয়েছে মেলা। তবে প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়াতে মেলার দিনটি আশ্রমে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আয়োজিত হয়। আশ্রমে শিশুদের মাঝে অনুষ্ঠানটি উদযাপন করা হয়। প্রথম ঠিক যে স্থানে মেলার সূচনা হয়েছিল, সেখানেই অনুষ্ঠান হয়। স্মরণ করা হয় বিশেষ এই দিনটিকে।