আন্তর্জাতিক আদালতে ইজরায়েলকে গণহত্যাকারী প্রমাণ করতে পারবে দক্ষিণ আফ্রিকা?

international court: দক্ষিণ আফ্রিকা এই নিয়ে ৮৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট পেশ করে দাবি করেছিল, ইজরায়েল যা করছে তা ‘গণহত্যাই’। কারণ তারা গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশকে মেরে ফেলতে চাইছে।

গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে ইজরায়েল, এই অভিযোগ নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘দ্য হেগ’-এর ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস (আইসিজে)-এর দ্বারস্থ হয়েছিল। এই শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মামলাগুলির মধ্যে একটি। গোটা বিশ্ব দেখতে চায়, দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগ
শেষমেশ প্রমাণ হয় কিনা। শক্তিধর দেশগুলি এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়।

উল্লেখ্য, গাজার ফিলিস্তিনিরা আইসিজে-র দ্বারস্থ হতে পারে না। কারণ তারা জাতিরাষ্ট্র নয়, তাই ফিলিস্তিনিদের হয়ে সমানুভূতিসম্পন্ন দেশ এই মামলা দায়ের করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজে-কে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে এগিয়ে আসে। দক্ষিণ আফ্রিকা চেয়েছিল আন্তর্জাতিক আদালত যেন গাজা ভূ-খণ্ডে সমস্ত সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে ইজরায়েলকে নির্দেশ দেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা এই নিয়ে ৮৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট পেশ করে দাবি করেছিল, ইজরায়েল যা করছে তা ‘গণহত্যাই’। কারণ তারা গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশকে মেরে ফেলতে চাইছে। তাদের দাবি ইজরায়েলের গণহত্যা চালানোর কার্যকলাপের মধ্যে রয়েছে- ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা, গুরুতর মানসিক এবং শারীরিক ক্ষতি করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ফিলিস্তিনিদের শারীরিক ক্ষতি হয়। ইজরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও একাধিকবার তাদের গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রকাশ পেয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে ওই রিপোর্টে।

ইজরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদে চলতি বছরের ১৫ এবং ১৬ জুলাই কলম্বিয়ায় একটি জরুরি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্পেন, আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল, তুরস্ক, চিন, কাতার-সহ ২০টিরও বেশি দেশ অংশ নেয়। দ্য হেগ গ্রুপের যৌথ সভাপতি হিসেবে কলম্বিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা সম্মিলিতভাবে এটি আয়োজন করছিল। ইজরায়েল ও তার শক্তিশালী মিত্রদের সহযোগিতায় চলমান আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে চলতি বছরের শুরুতে দ্য হেগ গ্রুপ গঠন করা হয়েছিল। গ্রুপটির প্রধান লক্ষ্য- ইজরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।

আরও পড়ুন-ত্রাণ দেখিয়ে প্রাণ নেওয়া? যা চলছে গাজায়

সম্মেলনটিতে জাতিসংঘের একাধিক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ফিলিস্তিন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রানচেসকা আলবানিজ, ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি, স্বাস্থ্য অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ত্লালেং মোফোকেং, নারীর প্রতি বৈষম্যবিরোধী জাতিসংঘ ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ার লরা নিয়িরিনকিন্ডি, ভাড়াটে সেনা বা সশস্ত্র গোষ্ঠীসংক্রান্ত জাতিসংঘের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেস ম্যাসিয়াস তোলোসা মতো প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নেন।

দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আইসিজে-তে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক মামলার পর বলিভিয়া, কলম্বিয়া, নামিবিয়া-সহ  জোটের আরও কয়েকটি সদস্যদেশও এই মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার চায়। এর ফলে মামলাটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে নামিবিয়া ও মালয়েশিয়া নিজেদের বন্দরে ইজরায়েলের অস্ত্রবাহী জাহাজ আর ঢুকতে দিচ্ছে না। ইজরায়েল সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ভেঙেছে কলম্বিয়া। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে জোটের সমস্ত সদস্য দেশ নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তা ছাড়াও গ্রুপের সদস্য দেশগুলি ইজরায়েলের বিরুদ্ধে একত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।

ইন্টারন্যাশানাল কোর্ট অফ জাস্টিস (আইসিজে) হল জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত। এটি বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যেকার সমস্যার সমাধান করে। জাতিসংঘের সমস্ত সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইসিজে-এরও সদস্য। কোনও রাষ্ট্র মামলা দায়ের করতে চাইলে, আইসিজে-তে করতে হয়। এখানে ১৫ জন বিচারক রয়েছেন। বিচারকদের নির্বাচন করে সাধারণ পরিষদ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। জেনোসাইড কনভেনশন বিরোধী মামলাগুলির শুনানি হয় এখানেই।
প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপে ৬০ লক্ষ ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল। এই ঘটনা যেন আর না ঘটে তাই ১৯৪৮ সালে জেনোসাইড কনভেনশন স্বাক্ষর করেছিল বিভিন্ন দেশের শীর্ষনেতারা। অনুমোদনকারী ১৫৩টি দেশের মধ্যে ইজরায়েল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিয়ানমার, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে গণহত্যা প্রমাণ করা সবচেয়ে কঠিন একটি বিষয়। ইউএন জেনোসাইড কনভেনশন (১৯৪৮) অনুযায়ী গণহত্যা হল, জাতিগত বা ধর্মীয় কারণে কোনও গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে মুছে দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে-

১) নির্দিষ্ট কোনও একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হত্যা করা
২) নির্দিষ্ট কোনও একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের গুরুতর শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতি করা
৩) ইচ্ছাকৃত এমন পরিস্থিতির তৈরি করা যাতে তাদের শারীরিক ক্ষতি হয়
৪) জন্ম প্রতিরোধ করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া
৫) নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর বাচ্চাদের জোর করে অন্য গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করানো

আরও পড়ুন- যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে মুনাফা লুটছে মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট?

এখন গাজার ২৩ লাখ মানুষ পুরোপুরি ত্রাণে নির্ভরশীল। কিন্তু ত্রাণ আসে ইজরায়েল হয়ে। গাজার প্রায় প্রতিটি পরিবারই ঘরছাড়া।ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অন্তত ৫৭ হাজার গাজার মানুষ মারা গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশই শিশু। চলতি বছরের মে মাসের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৯৩ শতাংশ মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগছেন। মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আবার ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ)-এর কার্যক্রম চালু হয়েছে গাজায়৷ জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, গাজায় ত্রাণ বিতরণের নতুন ব্যবস্থাটি ‘অনিরাপদ' এবং এই ব্যবস্থায় আরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে৷ গুতেরেস সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘মানুষ নিজের এবং তাদের পরিবারের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে হত্যার শিকার হচ্ছেন৷ খাবারের সন্ধান কখনোই মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না৷''

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের হামলার পর এই সংঘর্ষ শুরু হয়। ওই দিন থেকে ইজরায়েল গাজায় নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইজরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে শিশুদের উপর সরাসরি হামলার পাশাপাশি খাদ্য ও চিকিৎসা পরিষেবায় বাধা দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। এর আগে ২০২৪ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাজার প্রতি ১০ ফিলিস্তিন শিশুর ৯ জনই ‘ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটে’ রয়েছে। ক্ষুধা, পিপাসা এবং মারাত্মক অপুষ্টির কারণে অনেক ফিলিস্তিন শিশুই মারা গিয়েছে। ওই বছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছিল, গাজার প্রতি ৫ শিশুর ৪ জনই প্রতি তিন দিনে অন্তত এক দিন পুরো দিন না খেয়ে থাকে।

তবে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে ইজরায়েল দাবি করে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অতিমাত্রায় বিকৃত করা। বরং হামাসই গণহত্যাকারী শক্তি। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ওই মামলা করার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছিল। হোয়াইট হাউজের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছিলেন, ওই মামলা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রসঙ্গত, ইজরায়েল, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিগুলিও হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে দাবি করে।

তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চিন, রাশিয়া, ভারত– আইসিসিকে অনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।  ইজরায়েল আইসিজে-র একাধিক নির্দেশ অমান্য করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-সহ কিছু পশ্চিমা দেশ এই নিয়ে সমালোচনা করেছিল। ইউরোপিয় ইউনিয়ন এই নিয়ে কিছু না বললেও, ইজরায়েল বরাবরের মতো আমেরিকার সমর্থন পেয়েছে। ইরাকে মিথ্যে তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধ করানোর পরও যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন বিরুদ্ধে আইসিসি কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফিলিস্তিনে ইজরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও কোনও অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। কিন্তু আফ্রিকান বহু নেতার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় একাধিকবার পক্ষপাতমূলক অবস্থান নিতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো পক্ষপাতদুষ্ট।

আর কত দিন অন্ধকার দেখতে হবে গাজাবাসীকে? সেই প্রশ্ন থাকছেই।

More Articles