প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে কানাডা! কানাডার দেওয়া শর্তগুলি কী কী?
Palestine: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিলে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা "খুব কঠিন" হয়ে পড়বে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্যের একদিন আগেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার ঘোষণা করেছিলেন ইজরায়েল যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং আরও কিছু শর্তে সম্মত না হয়, তাহলে ব্রিটেন সেপ্টেম্বরে প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। আবার এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে ফ্রান্সও একই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও বলেছেন, প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করে। দেখা যাক, কানাডার দেওয়া শর্তগুলি কী কী?
মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, জাতিসংঘের আগামী সাধারণ অধিবেশনেই কানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এটি কানাডার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন। প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজায় মানবিক পরিস্থিতির অবনতি।
মার্ক কার্নি প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দু'টি শর্ত দিয়েছে। প্রধান শর্ত হল- প্যালেস্টাইনকে আগামী বছরের মধ্যে হামাসকে ছাড়া নির্বাচন করতে হবে। অন্যটি হলো, প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষকে শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং এলাকাকে অস্ত্রমুক্ত করতে হবে। ৩০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে মার্ক কার্নি জানান, তিনি প্যালেস্টাইনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেছেন।
বহুদিন ধরেই কানাডা আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা, 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান'-এ সম্মতি জানিয়ে আসছিল। তবে এবার তিনি বলেছেন, "এখন আর এই পন্থা কার্যকর নয়।" তাঁর কথায়, "একটি স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।" তবে কানাডার কনজারভেটিভ পার্টি মার্ক প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিতে সম্মত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিলে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা "খুব কঠিন" হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন- গাজায় গণহত্যার দলিল হাতে আন্তর্জাতিক আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার সওয়াল, ন্যায়বিচার পাবে প্যালেস্টাইন?
উল্লেখ্য, ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ঘোষণার পর থেকেই মার্ক কার্নি প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গে অবস্থান পরিষ্কার করার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছিলেন। যদিও মার্ক কার্নিকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, কানাডা নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়।
উল্লেখ্য, প্যালেস্টাইনে মূলত দুটি অংশ- গাজা ও পশ্চিম তীর। ফাতাহ পার্টির নেতৃত্বে প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীরের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। আর হামাস শাসন করে গাজা। ২০০৬ সালের পর থেকে প্যালেস্টাইনে কোনো নির্বাচন হয়নি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইজরায়েলি আক্রমণে এখনও পর্যন্ত ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের প্যালেস্টাইন শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, গাজায় প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টিতে রয়েছে এবং প্রতিদিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি গাজাবাসীরা ব্যাপক মাত্রায় অনাহারে ভুগছেন বলে সতর্ক করেছে ১০০টিরও বেশি মানবধিকার সংস্থা। তাদের অভিযোগ, ইজরায়েল গাজার ভেতরে ত্রাণ পৌঁছতে দেওয়া হচ্ছে না। সেভ দ্য চিলড্রেন এবং মেডেসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ের্স (এমএসএফ)-সহ ১০০টিরও বেশি সংস্থা একটি যৌথ বিবৃতিতে এই অভিযোগ করেছে। এই ব্যাপক দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে তারা।
গাজায় ইজরায়েলের হামলায় ২৩ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১০০ জন প্যালেস্টাইনবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনের ত্রাণ নিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে। গাজায় খাদ্য সংকট দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। বিবিসি-তে লেখা হয়েছে, খাবারের সন্ধানে ছোটাছুটি করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। অনাহারে মারা যাওয়া অধিকাংশই শিশু। গত কয়েক সপ্তাহে ক্ষুধার্ত ও অপুষ্টিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। ।
আরও পড়ুন- যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে মুনাফা লুটছে মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট?
প্যালেস্টাইন ভূখণ্ডে সমস্ত জিনিস প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে ইজরায়েল। তারা দাবি করছে কোনো অবরোধ নেই এবং অপুষ্টির যে কোনো ঘটনার জন্য হামাস দায়ী। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, তারা গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৮০ দিন গাজায় কোনো খাদ্য সরবরাহ করতে পারেনি। সংস্থাটি দাবি করেছে, এখনের খাদ্যসহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এই নিয়ে সম্প্রতি ১১১টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, গাজায় গণহারে মানুষ অনাহারে রয়েছে। কিন্তু গাজার বাইরে প্রচুর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে রয়েছে। দাবি করা হয়েছে, ত্রাণ বিতরণ করতে সংস্থাগুলোকে গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স, ব্রিটেন, কানাডার এই ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জি-৭-এর তৃতীয় দেশ হিসেবে কানাডা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জি-৭ বা গ্রুপ অফ সেভেন হলে বিশ্বের শিল্পোন্নত সাতটি বড় দেশের একটি জোট। এর সদস্য দেশ- কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৪৭টি দেশই প্যালেস্টাইনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে স্পেন ও আয়ারল্যান্ড-সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশও রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, ইজরায়েলের প্রধান সমর্থক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়নি।ফ্রান্স ও ব্রিটেন যদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে দেয়, তাহলে জাতিসংঘ ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র নিরাপত্তা পরিষদ সদস্য হবে, যারা এখনো এই সিদ্ধান্ত নেয়নি।