সন্দীপ ঘোষ-সহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠন! কী কী অভিযোগ?

Sandeep Ghosh : যেখানে থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয় তার পাশের ঘরটিকেই লিখিত ভাবে ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন সন্দীপ ঘোষ। চিকিৎসকদের শৌচাগার ভাঙার নির্দেশকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন।

আরজি করের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ বলেছিলেন, মহিলা চিকিৎসক একা একা কেন সেমিনার ঘরে গিয়েছিলেন? এই প্রশ্নে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল রাজ্যজুড়ে। এবার সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধেই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হল। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে আর্থিক দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ-সহ পাঁচ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনের ৪২০, ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৭ নম্বর ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। বিচার শুরু হবে ২২ জুলাই থেকে। আলিপুর সিবিআই কোর্টে চার্জ গঠন হল। কী কী অভিযোগ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে?

আরজি কর কাণ্ডের আবহে মেডিক্যাল কলেজগুলির থ্রেট কালচারের ছবি ছড়িয়ে গিয়েছিল। আরজি করের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে। তাঁর বিরুদ্ধে দাদাগিরির অভিযোগ ছিল। এই ঘটনার গোড়া থেকেই সন্দীপের সঙ্গে আরও কিছু জনের নাম উঠে এসেছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের প্যাথোলজি বিভাগের সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক বিরূপাক্ষ বিশ্বাস। মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের কাছে বিরূপাক্ষ বিশ্বাস-সহ আরও কিছু জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন চিকিৎসক-পড়ুয়ারা। একাধিক চিকিৎসক সংগঠনের দাবি, প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ এই চিকিৎসক। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়ারা দাবি করেছিলেন, ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট স্বাস্থ্য ভবন তরফে বিরূপাক্ষকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ক্ষমতার বলেই এই নির্দেশ বাস্তবায়িত করা হয়নি।

২০২৩ সাল থেকে সন্দীপ ঘোষের বদলি নিয়ে নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। বার বার তাঁর বদলির নির্দেশ জারি হতেই শুরু হয়েছে টালবাহানা। গত কয়েক বছর ধরেই আরজি করের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল। চিকিৎসার সরঞ্জাম কেনায় অবহেলা করা, চুক্তির ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ করা হয়, হাসপাতাল পরিকাঠামো সংক্রান্ত বিষয়ে গাফিলতি প্রতি ক্ষেত্রেই দুর্নীতির অভিযোগ। আরজি করের প্রাক্তন নন-মেডিক্যাল ডেপুটি সুপার আখতার আলি প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে বদলির অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল বায়ো মেডিক্যাল ওয়েস্ট এবং মধ্যরাতে বরাত বদল নিয়েও। বিতর্কের আবহে বদলির নিদের্শও জারি করেছিল স্বাস্থ্যভবন। কিন্তু সত্য হল এত টালবাহানার পরেও তিনি আরজি করের অধ্যক্ষ পদেই বহাল ছিলেন।

আরও পড়ুন-শমীক ভট্টাচার্যকে সভাপতি করে তৃণমূলের সুবিধা করে দিল বিজেপি?

বলা জরুরি, আরজি করের ঘটনা নিয়ে সন্দীপ ঘোষ প্রথমে দু'দিন কিছু বলেননি। কলেজের যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, তাঁকে অবশ্যই স্ক্যানারের নীচে আনা জরুরি বলে বারবার দাবি উঠেছিল। তার উপর সন্দীপ ঘোষ একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষ। যদিও এই দাবিগুলি নস্যাৎ করেছে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ স্বাস্থ্য সংগঠনগুলি। আরজি করের ঘটনার দু'দিন বাদে স্বেচ্ছায় সন্দীপ ঘোষ পদত্যাগ করে ছিলেন। তারপরই মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, সন্দীপকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, ও পদত্যাগ করেছে, ওকে আমরা অন্যত্র নিয়োগ করব। ওই দিনই তাঁকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে নিয়োগ করা হল। সন্দীপ ঘোষের পদত্যাগপত্র কিন্তু কেউ দেখেননি।  স্বাস্থ্যভবন থেকে বেরিয়ে তিনি একটা সাংবাদিক সম্মেলনও করেছিলেন, কিন্তু কোনো পদত্যাগপত্র দেখা যায়নি। আদৌ তিনি পদত্যাগ করেছিলেন কিনা, তার কোনো লিখিত প্রমাণ কোনো সংবাদমাধ্যম দেখাতে পারেনি। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজেও বিপুল ছাত্রবিক্ষোভ হয়। তাই যোগদান না করেই তাঁকে সেখান থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল।

জানা গিয়েছিল, যেখানে থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয় তার পাশের ঘরটিকেই লিখিত ভাবে ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন সন্দীপ ঘোষ। চিকিৎসকদের শৌচাগার ভাঙার নির্দেশকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। কারণ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, তথ্য প্রমাণের জন্য ক্রাইম সিন অক্ষত থাকা প্রয়োজন। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল বিশ্রাম কক্ষ তৈরির জন্যই নাকি ভাঙা পড়েছে সেমিনার লাগোয়া ঘর। এই কার্যক্রমের আগে স্বাস্থ্যসচিব এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছিল। প্রশ্ন উঠছে, বৈঠকে যাঁরা ছিলেন তাঁরাই বা কেন এই সিদ্ধান্তে মত দিয়েছিলেন? রাজ্যের সর্বোচ্চ স্তর থেকেই কি এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল? যদিও স্বাস্থ্য ভবনের শীর্ষ কর্তারা দাবি করেছিলেন তাঁদের থেকে এই বিষয়টি আড়াল করেই করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সেই নির্দেশে যাঁরা সই করেছেন তাঁরা কেন সই করলেন? কার নির্দেশেই বা সই করলেন?

আরও পড়ুন-অবসরের আট মাস! কেন আজও বাসভবন ছাড়েননি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়?

আরজি কর কান্ডে মৃত চিকিৎসকের বাবা-মায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ইনস্ক্রিপটের সম্পাদক অর্ক দেব। মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা বলেছিলেন, 'বিনীত গোয়েল (প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার) আমাদের মেয়েকে দেখতে দিচ্ছিল না, তাঁর বিরুদ্ধে উনি নিজে থেকে কোনো ব্যবস্থা নেননি। সন্দীপ ঘোষকে চাইলেই উনি বরখাস্ত করতে পারতেন কিন্তু তা করেননি। বরং পুরস্কার দেওয়ার মতো করে অন্য কলেজে (ন্যাশানাল মেডিক্যাল কলেজ) বদলি করেছেন। এই ঘটনাগুলি আমাদের স্তম্ভিত করেছে।'

প্রসঙ্গত, আরজি কর ঘটনায় বারবার শোনা গিয়েছে, 'উত্তরবঙ্গ লবি'র কথা। সেখানেও বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের নাম জড়িয়ে ছিল। প্রথম থেকেই শোনা গিয়েছিল, এই লবি নাকি স্বাস্থ্য ভবনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ ছিল, মোবাইল ল্যাপটপ নিয়ে পরীক্ষায় বসা থেকে নম্বর বাড়ানো, পরীক্ষক পদ থেকে অপসারণ, বদলি করা সহ ভুরি ভুরি দুর্নীতি। বেড এবং ওষুধের জন্য প্রতিমাসে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার দুর্নীতি হত। প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ এই চিকিৎসক। রাজ্যে জুড়ে দুর্নীতির যে একটা মডেল তৈরি হয়েছে তা স্পষ্ট। যেমন অনুব্রত মন্ডলের দায়িত্বে বীরভূম, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের দায়িত্বে উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন লবি। এই সিস্টেমকে প্রশ্ন করা জরুরি।

প্রশ্ন উঠছে, বহু দিন ধরে এই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হলেও, কেন তাঁদের বিরুদ্ধে তখন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি? কেন আইনি পদক্ষেপ নিতে আরজি কর কাণ্ডের অপেক্ষা করতে হল? পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন সুপারের বদলির নির্দেশে এত প্যাঁচ? কেন হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে অবহেলা, গাফিলতি, দুর্নীতির পরও রেহাই পেয়ে গিয়েছিলেন অধ্যক্ষ?

আশা করা যায়, আইনি পথেই এসব প্রশ্নের উত্তর পাবে সাধারণ মানুষ।

More Articles