কেন ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টাইনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক? জেফ্রি এপস্টাইন কে?

Trump : ২০০২ সালে ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন-কে বলেছিলেন, এপস্টাইনের সঙ্গে থাকতে আমার ভালো লাগে। তিনি এপস্টাইনকে ‘দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকার কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইকে নগ্ন মহিলার ছবি এঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যমটি ২০০৩ সালে জেফ্রি এপস্টাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি প্রতিবেদনে ধরেছে। দাবি করা হয়, ওই চিঠিতে মার্কার দিয়ে একজন নগ্ন মহিলাকে আঁকা ছিল। টাইপরাইটারকে দিয়ে লেখানো ওই শুভেচ্ছাবার্তায় বলা হয়েছিল, “শুভ জন্মদিন। তোমার প্রতিটা দিন যেন ভিন্ন অথচ দুর্দান্ত ভাবে গোপন হয়ে ওঠে।” নীচে শুধুমাত্র 'ডোনাল্ড' শব্দটি লিখে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই দু'জনের সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টাইনের একাধিক ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ইনস্ক্রিপ্ট ওই ছবির সত্যতা যাচাই করেনি। প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প এবং এপস্টাইন সত্যি কি ঘনিষ্ঠ ছিলেন? একাধিক সংবাদমাধ্যমেও এপস্টাইন এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে আনছে। 

মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক আমেরিকায় নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণার পর দাবি করেছিলেন, এপস্টাইনের ফাইলে ট্রাম্পের নাম রয়েছে। ওই ফাইল প্রকাশ্যে আনাই তাঁর আমেরিকা পার্টির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছিলেন মাস্ক। এ নিয়ে ক্রমশ জলঘোলা হচ্ছিল। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশেষ রিপোর্টটি প্রকাশের পর ওই মামলা নিয়ে আরও অস্বস্তিতে পড়েছেন ট্রাম্প।

আরও পড়ুন-‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা ‘পাগল তত্ত্ব’! ট্রাম্পের খেয়ালখুশি সিদ্ধান্ত নিয়ে যা বলছেন বিশ্লেষকরা

সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশু পাচারের অভিযোগে এপস্টাইন গ্রেফতার হওয়ার পর ট্রাম্প তার থেকে দুরত্ব বাড়াতে শুরু করেন। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সাল থেকে দুই বন্ধুর মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। মূলত ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে দু'জনের মধ্যে ঝগড়া হয়। আমেরিকার পাম সৈকতেই দু'জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আর সেই সৈকতেই একটি জমিকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে। 

ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে বলেছিলেন, "পাম সৈকতে সবাই যেমন তাঁকে চিনত, আমিও তাঁকে তেমনই চিনতাম।" কিন্তু সিএনএন-এর প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকেই দু'জনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। ফ্লাইট লগ (বিমানের সম্পর্কিত রেকর্ড) অনুসারে, ট্রাম্প পাম সৈকত থেকে নিউ ইয়র্কেও একাধিকবার এসেছিলেন এপস্টাইনের ব্যক্তিগত বিমানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দু’জনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই। তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, "আমি কখনও এপস্টাইনের বিমানে উঠিনি"। কিন্তু ফ্লাইট লগগুলিতে দেখা গেছে, ট্রাম্প ১৯৯০ থেকে সাতবার এপস্টাইনের বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন।

দু’জনের মধ্যে বেশ কিছু মিলও ছিল। মিন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন-কে বলেছিলেন, এপস্টাইনের সঙ্গে থাকতে আমার ভালো লাগে। তিনি এপস্টাইনকে ‘দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি নাকি এও বলেছিলেন, এপস্টাইনও আমার মতোই সুন্দরী নারীদের পছন্দ করে এবং তাদের বেশির ভাগই তরুণী। দু’জনেই নিউ ইয়র্কের বাইরে ম্যানহাটন থেকে ব্যবসায় সফল হয়েছিলেন।এপস্টাইনকে নিয়ে বিতর্ক থামানোরও অনেক চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ২০০৩ সালে এপস্টাইনের ৫০তম জন্মদিনে ট্রাম্পের চিঠি লিখে শুভেচ্ছা পাঠানোর ঘটনায় অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। কারণ তখন দু'জনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর। ১৯৯২ সালে ‘মার-আ-লাগো’তে একটি বিলাসবহুল পার্টিতে ‘এনবিসি নিউজ’-এর ক্যামেরায় ধরা পড়েছিলেন ট্রাম্প এবং এপস্টাইন। একটি ভিডিওতে তরুণীদের ভিড়ে ট্রাম্পকে নাচতেও দেখা গিয়েছিল। সেই দিনের দু'জনের একান্ত সাক্ষাৎও ক্যামেরাবন্দি হয়।

আরও পড়ুন- কেন ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এলন মাস্কের মাথাব্যথা?

এই পার্টির কয়েক মাস পরই ট্রাম্প আবার নিজের রিসর্ট (মার-আ-লাগো)- এ ‘ক্যালেন্ডার গার্ল’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। সেখানেও এপস্টাইন এসেছিলেন। এছাড়াও ফ্লরিডা-ভিত্তিক ব্যবসায়ী জর্জ হুরানি ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-র একটি সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনেন। তাঁর দাবি, ট্রাম্প সে দিন তাঁকে জোর করে চুম্বন করেন।

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের মতে, এপস্টাইন মামলা নিয়ে ‘প্রয়োজনের থেকে বেশি’ আলোচনা করা হচ্ছে৷ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর বিরুদ্ধে ৮৬ হাজার কোটি টাকার মানহানির মামলা করছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অনুরোধ করেছেন এপস্টাইন মামলার সকল নথি প্রকাশ করা হোক৷  প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে নাবালিকা ধর্ষণ ও নিগ্রহের অভিযোগে মামলা করা হয়। ২০১৯ সালে গ্রেফতারির কয়েক মাসের মধ্যেই জেলে আত্মহত্যা করে এপস্টাইন। তার বান্ধবী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল শিশু ও নাবালিকাদের নিয়ে যৌন পাচার চক্র চালানোর দোষী সাব্যস্ত হয়। ২০ বছরের কারাবন্দির সাজা হয়। ভার্জিনিয়া জিওফ্রে নামে এক মহিলা এই ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন। তিনি এপস্টাইনের হাতে নাবালিকা অবস্থায় নিগৃহীত হন।

এখন ট্রাম্প এই মামলায় জড়িত গ্র্যান্ড জুরির প্রতিলিপি সম্পর্কিত ফাইল প্রকাশ করতে বলেছেন। এপস্টাইনের সঙ্গী গিজলাইন ম্যাক্সওয়েলের মামলাটিও প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনও অপরাধে অভিযুক্ত বলে দাবি করা হলে তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে কি না তা যাচাই করে মার্কিন গ্র্যান্ড জুরির প্যানেল। এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ হল গোপন সাক্ষ্য নেওয়া। এই তথ্য মার্কিন আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। সাধারণত তা প্রকাশ্যে আনা যায় না। শুধুমাত্র জনস্বার্থেই আদালত সেই তথ্য প্রকাশ্যে আনে।

ট্রাম্প এবং এপস্টাইন কতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তা এখনই পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। আদৌ এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ্যে আসবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।

More Articles