মেয়ের সাফল্যই মৃত্যুর কারণ? যেভাবে মুখোশ খুলল পিতৃতন্ত্র

Radhika Yadav Murder : গতবছর রাধিকা যে মিউজিক অ্যালবামে অভিনয় করেছেন, যাতে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন এক মুসলিম যুবক, সেই অভিনয় করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পিতাপুত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য চলছিলই। এই খুন সম্ভবত তার জেরেই।

রাধিকা যাদবের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। খুনি, রাধিকার বাবা দীনেশ যাদব, পুলিশের কাছে নিজেই ধরা দিয়েছে। জবানবন্দিতে বলেছে,

ওয়াজিরাবাদে দুধ আনতে গেলেও লোকে আমাকে কথা শোনাত। বলত, আমি নাকি আমার মেয়ের পয়সায় খাই। মেয়ের চরিত্র নিয়েও ওরা কেচ্ছা করত। রাধিকাকে তাই আমি ওর টেনিস একাডেমি বন্ধ করতে বলেছিলাম। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি। আমার মর্যাদা আর আত্মসম্মানে ও আঘাত করেছিল। আমি ওর ওপর খুবই বিরক্ত হয়ে ছিলাম। তাই আমি ওকে গুলি করেছি। পেছন থেকে। সেদিন যখন ও রান্না করছিল, তখন।

খুনি নিজেই আত্মসমর্পণ করে নিলে, তাকে ‘ওপেন অ্যান্ড সাট কেস’ ধরা হয়। কিন্তু খাতায় কলমে ‘সাট ডাউন’ হয়ে গেলেও এক্ষেত্রে যে-প্রশ্নটা অবিরাম মাথায় ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছে, তা হল দীনেশ যাদব তার একমাত্র কন্যাকে খুনটা করল কেন? বিশেষত সেই কন্যা, যাকে সে প্রাণাধিক ভালবাসত। যাকে দীনেশ গুরগাঁও-এর সেরা এবং সবচেয়ে খরচবহুল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়িয়েছিলেন, যাকে নিয়ে কথায়-কথায় সে পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনের কাছে গর্ব করত, যাকে টেনিস খেলার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল সে নিজেই, যাকে সেরা টেনিস কোচিং দেওয়ার জন্য খরচ করেছিলেন প্রায় আড়াই কোটি টাকা; সেই মেয়েকে, সেই খেলার কারণেই কেন খুন করল দীনেশ?

আরও পড়ুন-

মেয়ের স্বাবলম্বিতাই চক্ষুশূল।। রাধিকাহত্যা চিনিয়ে দিল পিতৃতন্ত্রের স্বরূপ

অনেকেই অবশ্য মনে করছেন টেনিস নয়। গতবছর রাধিকা যে মিউজিক অ্যালবামে অভিনয় করেছেন, যাতে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন এক মুসলিম যুবক, সেই অভিনয় করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পিতাপুত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য চলছিলই। এই খুন সম্ভবত তার জেরেই। কিন্তু খুন পরবর্তী জবানবন্দিতে দীনেশ যাদব যেহেতু সে-কথার উল্লেখমাত্র করেনি, তাই এই অ্যালিবাইতে বিশ্বাস করলে দীনেশ যাদবের জবানবন্দিকে মিথ্যে ধরতে হয়।

তবে টেনিস বা মিউজিক এ্যালবাম-উপলক্ষ যেটাই হোক না কেন, হরিয়ানার বাসিন্দা দীনেশ যে আপন মর্যাদা আর আত্মসম্মানে আহত হয়েই মেয়েকে খুন করেছে এবং নিজেই সে-কথা স্বীকার করেছে, সে সত্য অটুট থাকে। তাই আক্ষরিক অর্থেই একে ‘অনার কিলিং’ বলা যায়। বাপের সম্মানে আঘাত করেছে যে মেয়ে, সে-তো গোটা পরিবারের মর্যাদাই ধুলোয় লুটিয়েছে। কারণ বাপ-ই তো পরিবার। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ শিখিয়েছে; সংসারে বাকিরা নিমিত্ত মাত্র। তাই পিতার মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না যে মেয়ে, তার রক্তে হরিয়ানার মাটি আগেও ভিজেছে, এবারও ভিজল। এ-বড়ো নতুন কথা নয়। চেয়ে দেখুন, এমন ভুরি-ভুরি ঘটনার পচা পাঁক হরিয়ানা, ঝাড়খন্ড, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশ কিংবা গুজরাটের আনাচ-কানাচ আজও ভরিয়ে রেখেছে। দীনেশ যাদবরা এমন একেকটা ঘটনা ঘটিয়ে তাতে নতুন করে ঢিল ফেলে কেবল। পাঁকজল খানিক খলবলিয়ে ওঠে। দুর্গন্ধ ছড়ায় নাকে। তারপর জলও থিতিয়ে যায়, নাকও সয়ে যায়। আর দেশ জোড়া পচা পাঁক আরও, আরও বাড়তে থাকে। তাকে পরিষ্কারের দায় নেয় না কেউ।

রাধিকা যাদব

অথচ দীনেশ যাদবরা কিন্তু নিজে থেকে সেই পাঁকে নামতে চায়নি। সমাজ তাদের নামিয়েছে। সেই সমাজ, যা মনে করে পুত্র সন্তান আপন রোজগারের টাকায় বাপ-মার ভরণপোষণ না করলে তা অপরাধ। আর কন্যা সন্তান তার রোজগারের সিকিভাগও বাপ-মা কে দিলে অপরাধ। মনে করে, ওসব খেলাধুলা করা মেয়েদের চরিত্র নিয়ে তো দু-চার কথা চাইলেই বলে দেওয়া যায়। আর মেয়ে অভিনয় করলে তো কথাই নেই। সে নির্ঘাত শুয়ে বেড়ায় এদিক-সেদিক। মনে করে, এমন অবাধ্য মেয়েকে বাগে আনার দায়িত্ব তো পিতারই। তাই দিনের পর দিন রাধিকার মত গুণী মেয়েরও চারিত্রিক দোষ বার করে মেয়ের বাপের কান ঝালাপালা করে দেয়; ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তিনি ঈশপের গল্পের মত অপরের মুখের কথাকে নিজের বোধবুদ্ধির থেকে বেশি সত্য বলে মনে করেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত কাঁধের ছাগলটিকে তিনি সত্যি-সত্যিই গাধা ভেবে ফেলে দেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত একজন পিতা তার পিতার ভূমিকা থেকে সরে গিয়ে নিজেই হয়ে ওঠেন শয়তান, পাঁক সমাজেরই প্রতিনিধি।

দীনেশ যাদব

আসলে রোজগেরে মেয়েদের বড়ো ভয় পায় এই সমাজ। তার ওপর রাধিকার মত সফল হলে তো কথাই নেই। আন্তর্জাতিক টেনিস ফেডারেশনের ৩৬ টি সিঙ্গল এবং ৭ টি ডাবলস খেলেও যে মেয়ে ক্ষান্ত হয় না, উলটে উইম্বলডনে খেলতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে; হরিয়ানায় মহিলাদের মধ্যে পঞ্চম আর আন্তর্জাতিক টেনিস ফেডারেশনের ১৯৯৯ র‍্যাঙ্কিং পেয়েও যে মেয়ের ডানা ক্লান্ত হয় না, বরং টেনিসের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে যেতে চায়, সে তো সাধারণ মেয়ে নেয়। সে আজ রোজগার করছে, কাল স্বাধীন হবে, পরশু নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নেবে, তরশু আপনার আমার ঘরের মেয়ের রোলমডেল হয়ে পথ দেখাবে… কী কেলেঙ্কারি কী কেলেঙ্কারি। পিতৃতান্ত্রিকতার একেবারে শিকড়ে আঘাত!। বিষবৃক্ষকে তাই মারতে হবে চারা অবস্থাতেই। নইলে সমাজে পিতৃতন্ত্র নামক 'জঙ্গল রাজ' কায়েম থাকবে কি করে?

আরও পড়ুন-

মণিপুর থেকে মুর্শিদাবাদ: মেয়েদের লাঞ্ছনাতেই উগ্রবাদীদের জয়?

তাছাড়া সন্তানকে আপন আমানত ভাবার এক দূরারোগ্য ব্যাধি তো এদেশে আছেই। বিশেষ করে কন্যা সন্তানকে। কারণ পুরুষ মানুষ রাতবিরেতে বাইরে কাজ করতে যায়, আড্ডা মারতে যায়, তারা রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না, উপরন্তু জন্মায়ই (নাকি) খানিক মেজাজি আর দুরন্ত হয়ে! তাই তাদের ভুল্ভ্রান্তির তো আর হিসেবনিকেশ চলে না। পরিবার বা সমাজের মর্যাদা রক্ষার সমস্ত দায়টাই মেয়েদের নিতে হয়। যুগে-যুগে। এই সনাতনী চিন্তাকাঠামো এতটাই প্রবল বিশ্বাসের, এতটাই জোরালো এবং মজ্জাগত যে, কন্যাকে যতই ভালবাসি না কেন, সম্মানের জায়গায় আঁচড় লাগলে কিংবা বিরক্তির কারণ হয়ে উঠলে, আপন সম্পত্তির মতোই তাকে আঘাত করা যায়, মেরে ফেলা যায়। যেমনটা করেছিল গফুর মিয়া। শরৎচন্দ্রের 'মহেশ' গল্পে।রাধিকারা তাই এই সমাজের শিকার। এই পিতৃতান্ত্রিকতার শিকার। ওরা মরেও মরে না। ওরা প্রতিবাদ নাম নিয়ে, বুকের মধ্যে অনির্বাণ আগুন হয়ে জ্বলতে থাকে ধিকি ধিকি। লোসানা ম্যাকওয়ান, আতিফি সাহালে, আহু দরাই, আঞ্জিজা শিনওয়াড়ি কিংবা মাসা আমিনির মত।

রাধিকার বাড়িতে পুলিশের তদন্ত

আর, দীনেশ যাদবরা তো বেঁচে থাকলেও, আসলে সেই কবেই মরে গেছে। মেয়েকে খুন করার অনেক আগে, মেয়েকে ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে তার অভিনীত মিউজিক অ্যালবামটি মুছে ফেলতে বলার আগে, এমনকি মেয়েকে টেনিস একাডেমী বন্ধ করতে বলারও অনেক…অনেক আগেই মরে গেছে তারা। ফ্ল্যাশব্যাকে খুঁজে নিন সেই দিনটি; একেবারে শুরুর সেদিন, যেদিন পাড়ার কোন এক প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়র মুখে মেয়ের সম্পর্কে কটু কথা শুনে প্রতিবাদ না-করে ফিরে এসেছিলেন তিনি; পাল্টা জবাব দেওয়ার বদলে দুঃখ পেয়েছিলেন আপন মনে, আর বিশ্বাস করেছিলেন যে লড়াই নয়, মেয়ের পাশে দাঁড়ানো নয়। বরং 'ওদের' কথামতো খেলা ছেড়ে দিয়ে, অভিনয় ছেড়ে দিয়ে, অ্যাকাডেমি বন্ধ করে দিয়ে তার মেয়ের উচিত সমাজের বাঁধা গত মেনে নিয়ে বাড়ির পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে সংসার পাতা। সেইদিন, ঠিক সেই মুহূর্তেই মরে যায় দীনেশ যাদবরা। খুনটা, তাই দীনেশ যাদব করেনি। একটা অলরেডি মরে যাওয়া মানুষ অন্যকে আর মারবে কি করে? রাধিকা যাদবকে হত্যা করেছি আমি, আপনি, এই সমাজ। এই পিতৃতান্ত্রিক, অবদমনকারী সমাজ। যার ঘরে-ঘরে নিত্য জমা হয় নারী নির্যাতনের পাঁক। 

আর আমরা নাক সিঁটকে থাকি। পরিষ্কার করতে এগোই না।

More Articles